কোথায় চাবি রেখেছেন, কারও ফোন নম্বর কিংবা জরুরি কোনও কাজের কথা- অনেক সময়ই ছোটখাটো বিষয় মনে রাখতে হিমশিম খেতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি ও মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্মৃতিশক্তি উন্নত করার এমনই ১০টি সহজ ও আনন্দদায়ক উপায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন কিছু শিখুন: মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার অন্যতম উপায় নতুন কিছু শেখা। দাবা খেলা, নতুন ভাষা আয়ত্ত করা কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোসহ যে কোনও নতুন দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা মস্তিষ্ককে চর্চার মধ্যে রাখে। নিয়মিত শেখার অভ্যাস মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগগুলোকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
বই পড়ার অভ্যাস গড়ুন: স্মৃতিশক্তি বাড়াতে জটিল কোনও প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পছন্দের বই পড়ার অভ্যাসই হতে পারে সহজ শুরু। গল্প, উপন্যাস কিংবা তথ্যভিত্তিক বইসহ যে ধরনের লেখা পড়তে ভালো লাগে, সেটিই বেছে নিন। নিয়মিত পড়াশোনা চিন্তাশক্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতেও সাহায্য করে।
মনোযোগের পথে বাধা কমান: এক কাজ করতে করতে বারবার মোবাইল দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারার অভ্যাস মনোযোগ নষ্ট করে। ফলে কোনও তথ্য মনে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ফোন দূরে রাখুন। একসঙ্গে অনেক কাজ করার বদলে একটি কাজে মন দিন।
তথ্যকে গল্পের সঙ্গে জুড়ুন: কোনও বিষয় মনে রাখতে সেটিকে গল্পের আকারে সাজিয়ে নিতে পারেন। যেমন, কয়েকটি নাম বা তথ্য মনে রাখার প্রয়োজন হলে সেগুলোকে নিয়ে মনে মনে একটি গল্প তৈরি করুন। একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনাকে যুক্ত করলে তথ্য মনে রাখা সহজ হতে পারে।
পরিচিত জায়গাকে স্মৃতির ঠিকানা বানান: স্মৃতিশক্তি চর্চার একটি কৌশল হলো ‘মেমোরি প্যালেস’। এর জন্য নিজের পরিচিত কোনও জায়গা বা বাড়ির কথা ভাবুন। মনে রাখার তালিকার প্রতিটি বিষয়কে বাড়ির আলাদা জায়গার সঙ্গে জুড়ে দিন। যেমন, বাজারের তালিকার প্রথম জিনিসটি বসার ঘরে, পরেরটি রান্নাঘরে এভাবে কল্পনা করুন। পরে মনে মনে সেই জায়গাগুলো ঘুরে দেখলেই তালিকার বিষয়গুলো মনে পড়তে পারে।
তারিখ ও সংখ্যার সঙ্গে ছবি জুড়ুন: জন্মদিন বা বিশেষ কোনও তারিখ মনে রাখতে সংখ্যার সঙ্গে পরিচিত বস্তু, রং কিংবা প্রতীকের মিল খুঁজে নিতে পারেন। কোনও বিমূর্ত বিষয়কে চোখের সামনে কল্পনা করা যায় এমন ছবিতে বদলে ফেললে তা মনে রাখা সহজ হয়। প্রয়োজনে সেই ছবি নিয়ে ছোট্ট গল্পও তৈরি করতে পারেন।
সংকেত শব্দ ব্যবহার করুন: পড়াশোনা বা পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় অনেক তথ্য মনে রাখতে হয়। সে ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের প্রথম অক্ষর দিয়ে নতুন শব্দ বা বাক্য তৈরি করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ম্নেমনিক’ বা স্মৃতি-সহায়ক কৌশল। পাশাপাশি বিষয়গুলোকে একটি মূল ধারণার সঙ্গে শাখা-প্রশাখার মতো সাজিয়ে মাইন্ড ম্যাপ তৈরি করলেও মনে রাখা সুবিধাজনক হয়।
বিরতি দিয়ে বারবার ঝালিয়ে নিন: একবার পড়লেই সব তথ্য দীর্ঘদিন মনে থাকে না। তাই নির্দিষ্ট বিরতিতে শেখা বিষয়গুলো আবার মনে করার চেষ্টা করুন। প্রথম দিন কয়েকবার পড়ার পর পরের দিন, কয়েক দিন পর, তারপর সপ্তাহ বা মাসের ব্যবধানে বিষয়টি ঝালিয়ে নিতে পারেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘স্পেসড রিপিটিশন’। নিয়মিত অনুশীলনে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
জরুরি কাজ লিখে রাখুন: চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, জন্মদিন কিংবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা মনে রাখার জন্য শুধু স্মৃতির ওপর নির্ভর না করাই ভালো। ডায়েরি বা ফোনের নোটে লিখে রাখুন। প্রয়োজনে অ্যালার্মও সেট করুন। এতে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা কমবে এবং সময়মতো কাজ করা সহজ হবে।
পর্যাপ্ত ঘুমান: স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে ঘুমের গুরুত্ব অনেক। দিনের বেলা শেখা তথ্য ঘুমের সময় মস্তিষ্কে সুসংহত হয়। তাই রাতে পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক বারবারা সাহাকিয়ানের পরামর্শ, প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের চেষ্টা করা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখার সময় ক্লান্তি এলে ছোট বিরতি বা ঘুমও মস্তিষ্ককে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য কোনও একটি কৌশলের ওপর নির্ভর না করে নতুন কিছু শেখা, নিয়মিত পড়া, মনোযোগ ধরে রাখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মতো অভ্যাস একসঙ্গে গড়ে তোলা জরুরি। ছোট ছোট এই পরিবর্তনই মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে।