আগুনের ধোঁয়ায় সংরক্ষিত মৃতদেহ, মৃত্যুর আগেই শুরু হতো প্রক্রিয়া!

  ফিচার ডেস্ক
০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫ আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫

প্রাচীন মিশরের পিরামিডে হাজার হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত রয়েছে বহু মমি। কাপড়ে মোড়ানো মৃতদেহ সংরক্ষণের সেই পদ্ধতি বিশ্বজুড়েই পরিচিত। তবে এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে প্রচলিত ছিল এক অদ্ভুত মমিকরণ পদ্ধতি। আগুনের তাপ ও ধোঁয়া ব্যবহার করে শুকিয়ে ফেলা হতো মৃতদেহ। আর কয়েক শতাব্দী ধরে পাহাড়ের গুহায় সংরক্ষিত রয়েছে সেই সব মমি। এই বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি মমিগুলি পরিচিত ‘আগুনের মমি’ নামে।

ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলের বেঙ্গুয়েট প্রদেশের পাহাড়ি এলাকা কাবায়ানে বাস করে ইবালোই জনগোষ্ঠী। তাদের পূর্বপুরুষেরা টিম্বাক, বাঙ্গাওসহ বিভিন্ন পাহাড়ের গুহায় মৃতদের মমি করে সংরক্ষণ করতেন। তাই এই মমিগুলো ইবালোই মমি বা কাবায়ান মমি নামেও পরিচিত। গবেষকদের ধারণা, প্রায় ৮০০ বছর আগে এই প্রথার প্রচলন শুরু হয়েছিল। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এর ইতিহাস আরও পুরোনো।

ষোড়শ শতকে ফিলিপাইনে স্পেনীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করে। খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আগুনের ধোঁয়ায় মৃতদেহ সংরক্ষণের এই প্রথাও।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইবালোইদের মমি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হতো মানুষের মৃত্যুর আগেই। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে পান করতে দেওয়া হতো বিশেষ ধরনের নোনতা পানীয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস ছিল, এতে শরীরের অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যাবে এবং মমি তৈরি করা সহজ হবে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারণার পক্ষে বিশেষ যুক্তি খুঁজে পায়নি।

মানুষটির মৃত্যু হলে শুরু হতো আসল কাজ। প্রথমে ঠান্ডা পানি দিয়ে মৃতদেহ ধুয়ে পরিষ্কার করা হতো। এরপর বিশেষ ধরনের কম্বল দিয়ে শরীর ঢেকে মাথায় পরানো হতো একধরনের কাপড়। মৃতদেহকে বসানো হতো কাঠের তৈরি বিশেষ চেয়ারে। কম্বল দিয়ে শরীর বেঁধে এমনভাবে রাখা হতো, যাতে মাথা সোজা থাকে।

এরপর শুরু হতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মৃতদেহের নিচে ছোট আগুন জ্বালিয়ে তার তাপ ও ধোঁয়ার সাহায্যে ধীরে ধীরে শরীর শুকিয়ে ফেলা হতো। সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে আনা হতো না মৃতদেহকে। তাপে শরীরের জলীয় অংশ বেরিয়ে আসত। সেই তরল সংগ্রহ করে রাখা হতো আলাদা পাত্রে। পুরো শরীর শুকোতে কখনও এক সপ্তাহ, কখনও আবার এক মাস পর্যন্ত সময় লাগতো।

শুকিয়ে যাওয়া মৃতদেহকে এরপর কিছু সময়ের জন্য সূর্যের আলোয় রাখা হতো। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের প্রবীণেরা এক বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। মৃতদেহের ত্বকের ওপরের অংশ পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হতো লতাপাতা ও শিকড় দিয়ে তৈরি বিশেষ মিশ্রণ। পাশাপাশি জ্বালানো হতো তামাক। সেই ধোঁয়া মৃতদেহের নাক ও মুখ দিয়ে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হতো। ইবালোইদের বিশ্বাস ছিল, এতে শরীরের ভেতরে অবশিষ্ট আর্দ্রতাও শুকিয়ে যাবে।

সব কাজ শেষ হলে মৃতদেহকে কয়েক স্তর কাপড়ে মুড়ে কাঠের কফিনে রাখা হতো। অনেকটা মায়ের গর্ভে শিশুর থাকার ভঙ্গিতে দেহটি সাজানো হতো। এরপর নানা ধর্মীয় আচার পালন করে পাহাড়ের গুহায় নিয়ে যাওয়া হতো মমি। সেখানেই হতো শেষ আশ্রয়।

ইবালোইদের বিশ্বাস, একবার যে গুহায় কোনও মমিকে সমাধিস্থ করা হয়েছে, সেখান থেকে তাকে অন্যত্র সরানো উচিত নয়। এতে মৃতের আত্মা কষ্ট পায় এবং পরিবারের ওপর অভিশাপ নেমে আসতে পারে। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও তারা অনেক সময় এই বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।

তবে দুর্গম পাহাড়ি গুহায় সংরক্ষিত থাকলেও চোরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি এই মমিগুলি। সবচেয়ে আলোচিত চুরির ঘটনা ঘটেছিল ১৯১৯ সালে। সেই সময় চুরি যায় আপো আন্নু নামে এক বিখ্যাত মমি। প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই মমির সারা শরীরে ছিল নানা নকশার উল্কি। গবেষকদের ধারণা, তিনি ছিলেন ইবালোই সমাজের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং দক্ষ শিকারি। স্থানীয়দের কাছে তার মর্যাদা ছিল দেবতুল্য।

মমিটি চুরি হওয়ার পর ইবালোইদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। তাদের বিশ্বাস ছিল, আপো আন্নুর মমি সরিয়ে নেওয়ার কারণেই এলাকায় একের পর এক দুর্যোগ নেমে আসছে। পরে জানা যায়, এক ধর্মযাজক সমাধি গুহা থেকে মমিটি সরিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর সেটি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে একসময় পৌঁছায় এক সংগ্রাহকের কাছে। ১৯৮৪ সালে ওই সংগ্রাহক মমিটি ফিলিপাইনের জাতীয় জাদুঘরে পাঠিয়ে দেন। পরে সরকার ইবালোই নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মমিটি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। প্রয়োজনীয় আচার পালনের পর আপো আন্নুকে আবার তার পুরোনো সমাধি গুহায় ফিরিয়ে রাখা হয়। ভবিষ্যতে চুরি ঠেকাতে সেখানে বসানো হয় লোহার দরজা।

২০০০ সালের দিকে আরও কয়েকটি আগুনের মমি চুরি হয়। পরে সেগুলোর কয়েকটি ইউরোপের বিভিন্ন সংগ্রাহকের কাছে পৌঁছে যায়। ২০০৪ সালে আটটি মমি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনও বেশ কয়েকটির খোঁজ মেলেনি।

শুধু ফিলিপাইন নয়, পাপুয়া নিউ গিনির কয়েকটি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আগুন ও ধোঁয়ার সাহায্যে মৃতদেহ সংরক্ষণের প্রথা ছিল। তবে কাবায়ানের আগুনের মমিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫০ থেকে ৮০টি এমন মমির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। চুরি ঠেকাতে অনেক সমাধি গুহার অবস্থান গোপন রাখা হয়।

আধুনিক যুগেও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভোলেননি ইবালোইরা। তারা মমির উদ্দেশে খাবার ও পানীয় উৎসর্গ করেন। গবেষকদেরও ইচ্ছেমতো গুহায় প্রবেশের অনুমতি মেলে না। স্থানীয় নেতাদের সম্মতি নিতে হয়। এমনকি গবেষণার সময় গুহার ভেতরে একজন স্থানীয় প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তার দায়িত্ব গবেষকেরা কী করছেন, কেন করছেন, তা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে ব্যাখ্যা করা। অর্থাৎ কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ইবালোইদের কাছে এই মমি নিছক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, বরং তাদের পূর্বপুরুষ ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

/এমএএল/
সম্পর্কিত
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’
১০ ট্রিলিয়ন ডলারের পুরস্কার! জিততে হলে করতে হবে উদ্ভট সব কাণ্ড
‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ সিরিজের পর্দার আড়ালের অজানা কাহিনি
সর্বশেষ খবর
মেরেনতিয়েলকে ছাড়াই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে উরুগুয়ের দল ঘোষণা
মেরেনতিয়েলকে ছাড়াই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে উরুগুয়ের দল ঘোষণা
২০ বছর আগে কেন ‘রামায়ণ’ থেকে সরে দাঁড়ান সালমান, জানালেন নিজেই
২০ বছর আগে কেন ‘রামায়ণ’ থেকে সরে দাঁড়ান সালমান, জানালেন নিজেই
প্রিয় টেডি বিয়ারকে জড়িয়ে ধরার দিন
প্রিয় টেডি বিয়ারকে জড়িয়ে ধরার দিন
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে আজ ৬ ঘণ্টা টোল দিতে হবে না
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে আজ ৬ ঘণ্টা টোল দিতে হবে না
সর্বাধিক পঠিত
প্রথমদিন সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, যেতে খরচ লাগে কত
প্রথমদিন সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, যেতে খরচ লাগে কত
এবার বিকল্প পথে রূপপুরে পৌঁছালো ইউরেনিয়ামের পঞ্চম চালান
এবার বিকল্প পথে রূপপুরে পৌঁছালো ইউরেনিয়ামের পঞ্চম চালান
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’
এক দিনের ব্যবধানে কমলো স্বর্ণের দাম
এক দিনের ব্যবধানে কমলো স্বর্ণের দাম
তানজিন তিশার সদস্যপদ স্থগিত করলো অভিনয়শিল্পী সংঘ
তানজিন তিশার সদস্যপদ স্থগিত করলো অভিনয়শিল্পী সংঘ