জানেন নাকি তুরস্কের গোবেকলি তেপে কী

জীবনযাপন ডেস্ক
২৪ জুলাই ২০২৬, ১৪:১৩ আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৪:১৩

মানুষ আগে ঘর বানিয়েছিল, নাকি মন্দির? আগে কৃষক হয়েছিল, নাকি উপাসক? দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদদের প্রচলিত ধারণা ছিল মানুষ প্রথমে স্থায়ী বসতি গড়েছে, কৃষিকাজ শুরু করেছে, তারপর গড়ে তুলেছে ধর্মীয় স্থাপনা। কিন্তু তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি পাহাড়চূড়া সেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সেই পাহাড়ের নাম গোবেকলি তেপে। প্রায় ১২ হাজার বছর পুরোনো এই প্রত্নস্থলকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত ধর্মীয় স্থাপনা বা আচার-অনুষ্ঠানভিত্তিক কমপ্লেক্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এটি নির্মিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন মানুষের কৃষিকাজ বা স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের শানলিউরফা প্রদেশে, শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, একটি নিরিবিলি টিলার নিচে কয়েক হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল বিশাল পাথরের স্তম্ভ। সময়ের ধুলো, মাটির স্তর আর বিস্মৃতির আবরণ ভেদ করে যখন সেগুলো আবার দিনের আলোয় ফিরে আসে, তখন মানবসভ্যতার ইতিহাস যেন নতুন করে লেখা শুরু হয়।

প্রায় ১২ হাজার বছর আগে যখন পৃথিবীতে মিশরের পিরামিডের অস্তিত্ব ছিল না, স্টোনহেঞ্জ নির্মিত হয়নি, এমনকি মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরির প্রচলনও শুরু হয়নি, তখন একদল শিকারি-সংগ্রাহক মানুষ বিশাল চুনাপাথরের স্তম্ভ কেটে নির্মাণ করেছিলেন এক রহস্যময় স্থাপনা। প্রতিটি টি-আকৃতির স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ৫ থেকে ৬ মিটার, আর ওজন কয়েক টন। এসব স্তম্ভের গায়ে নিখুঁতভাবে খোদাই করা রয়েছে শিয়াল, সাপ, বুনো শূকর, সিংহ, শকুন, বিচ্ছুসহ নানা বন্য প্রাণীর অবয়ব। হাজার বছরের ঝড়-বৃষ্টি, রোদ আর সময়ের ক্ষয় পেরিয়েও সেই খোদাই আজও বিস্ময় জাগায়।

তখনও মানুষ কৃষিকাজ শুরু করেনি, স্থায়ী নগর বা রাষ্ট্র গড়ে ওঠেনি, ছিল না কোনও রাজা, প্রাসাদ কিংবা লিখিত ভাষা। তবু তারা পরিকল্পিতভাবে বিশাল পাথর কেটে, দূর থেকে বহন করে এবং নিখুঁত বিন্যাসে স্থাপন করে নির্মাণ করেছিলেন এমন এক স্মৃতিস্তম্ভ, যা আজও প্রকৌশলী, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করে। গোবেকলি তেপে যেন প্রমাণ করে, সংগঠিত মানবশ্রম ও বিশ্বাসের শক্তি সভ্যতার অনেক পরিচিত অধ্যায়েরও আগে জন্ম নিয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদদের প্রচলিত ধারণা ছিল কৃষিই মানুষকে স্থায়ী বসতি গড়তে শিখিয়েছে। আর সেই স্থায়ী জীবন থেকেই জন্ম নিয়েছে সংগঠিত সমাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়। কিন্তু গোবেকলি তেপে যেন সেই পরিচিত ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এখানে এসে অনেক গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষ কি আসলে বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের টানেই প্রথম বড় পরিসরে একত্রিত হয়েছিল? ধর্মীয় আচার পালনের প্রয়োজনই কি তাদের স্থায়ী বসতি গড়তে এবং পরে কৃষিকাজ শুরু করতে উৎসাহিত করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, তবে এটুকু নিশ্চিত যে গোবেকলি তেপে মানবসভ্যতার বিকাশ নিয়ে প্রচলিত ধারণায় এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

আধুনিক বিশ্বের নজরে গোবেকলি তেপে আসে ১৯৯৪ সালে, যখন জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লাউস শ্মিটের নেতৃত্বে সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে মাটির নিচ থেকে উন্মোচিত হতে থাকে বৃত্তাকার পাথরের ঘেরা কাঠামো, বিশাল টি-আকৃতির স্তম্ভ এবং প্রাণী ও বিমূর্ত প্রতীকে ভরা অসাধারণ খোদাই। প্রতিটি নতুন আবিষ্কারই মানব ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এই অসাধারণ ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে ইউনেস্কো গোবেকলি তেপেকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থানের মর্যাদা দেয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। জনপ্রিয়ভাবে গোবেকলি তেপেকে ‘বিশ্বের প্রথম মন্দির’ বলা হলেও, প্রত্নতত্ত্ববিদরা সাধারণত আরও সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেন। কারণ এখানে এমন কোনও লিখিত দলিল বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা নিশ্চিতভাবে এটিকে একটি মন্দির হিসেবে প্রমাণ করে। তাই গবেষকদের কাছে একে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত ধর্মীয় বা আচার-অনুষ্ঠানভিত্তিক কমপ্লেক্স বলাই অধিক গ্রহণযোগ্য।

গোবেকলি তেপে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ নয়। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একটি আবিষ্কারও হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দিতে পারে। আর সে কারণেই এই নীরব পাথরের স্তম্ভগুলো আজও মানবসভ্যতার অন্যতম গভীর রহস্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
বিদেশ সফরে দেশ নির্বাচনে কী প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী 
দুই শতাব্দীর স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে কলাকোপার ব্রজ নিকেতন
১৬ হাজার নারীর চুলে ভরা তুরস্কের অদ্ভুত জাদুঘর
সর্বশেষ খবর
মর্গে মরদেহের সঙ্গে ‘বিকৃত যৌনাচার’ নিয়ে প্রতিবেদন, সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
মর্গে মরদেহের সঙ্গে ‘বিকৃত যৌনাচার’ নিয়ে প্রতিবেদন, সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনের আগের দিন ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার
ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনের আগের দিন ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ভোটের আগেই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে উত্তাপ
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ভোটের আগেই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে উত্তাপ
নাচের ভিডিওতে ভাইরাল পরীমণি, সঙ্গে কিবরিয়া
নাচের ভিডিওতে ভাইরাল পরীমণি, সঙ্গে কিবরিয়া
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন