অকারণে মিথ্যা বলছেন?

Send
রানা নাগ
প্রকাশিত : ১৯:৪৫, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫১, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

ধরা যাক, আপনার বন্ধু বেনু ঈদে একটি ওড়না কিনেছেন বেশ আকর্ষণীয়। আপনি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন এটি কোথা থেকে কিনেছেন। বাড়ির পাশের মার্কেট থেকেও কিনে সে অনায়াসে উত্তর করলো, বিদেশে থেকে ছোট খালা এনেছে। বছর চারেক আগে কেনা। কোনও কারণ ছাড়াই মিথ্যা বললেন তিনি।

শফিকেরও একই অবস্থা। ঈদে ময়মনসিংহ গিয়ে ফোন পানিতে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। ঈদের ৯দিনের ছুটিতে তাকে একদমই খুঁজে পাওয়া গেল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নেই, ফোনে তো নেই। বাড়িতেই ভীষণ আনন্দের সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু অফিসে ফেরার পর জানালেন শফিক ভারতে গিয়েছিল। জরুরি পারিবারিক কাজে ভারত থাকায় কারও সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। ঈদটাই এবার মাটি হলো এমন আক্ষেপও করলেন সহকর্মীদের সঙ্গে।

এই অকারণে মিথ্যা বলাটা এক ধরনের মানসিক রোগ। মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের  ভাষায় এর আলাদা করে নেই। এটিকে সরাসরি রোগ না বলে রোগের উপসর্গ বলেই দাবি করেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।  এই উপসর্গ আক্রান্ত ব্যক্তি কারণে-অকারণে মিথ্যা বলেন। স্বাভাবিক বিচারে বিষয়টি বড় সমস্যা মনে না হলেও একটা সময়ে এই অকারণ মিথ্যা বলার জন্য আক্রান্ত ব্যক্তি ক্রমেই একা হয়ে যান, বন্ধু-স্বজনদের কাছে হেয় হন।

রোগীর এই মিথ্যা বলে কোনও লাভ হয় না, হয়তো সেগুলো নিতান্তই ছাপোষা মিথ্যা বা বানিয়ে বানিয়ে কথা বলা, যাতে কারও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না বা কারও কোনো লাভ হচ্ছে না। তবু তিনি এগুলো বলে যান। জিজ্ঞাসা করা হলে তিনিও বলেন যে কোনওভাবে মিথ্যা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেননা, তার অস্থিরবোধ হয়। মিথ্যা বা বানিয়ে বলে তবেই শান্তি।

এসব কারণে এই রোগের রোগীদের আইনি ঝামেলার সম্মুখীন হওয়ারও ইতিহাস আছে। কেন মানুষের এমন রোগ হয় তা এখনো জানা যায়নি যদিও গবেষণা চলছে।

তবে চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়—সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি সাথে কিছু ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে। তাই কারও যদি এ ধরনের সমস্যা থেকে থাকে, তবে নিসঙ্গ হয়ে যাওয়া বা বড় ধরনের আইনি ঝামেলায় পড়ার আগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, মিথ্যা কথা বলাটা সরাসরি কোনো রোগ নয় এটি বরং একটি বড় রোগের উপসর্গ। এই অভ্যাস যেকোনও মানুষকে সিজোফ্রেনিক করে তুলতে পারে।

কেনও মিথ্যা বলে সেটির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এন্টি সোশ্যাল পারসোনালিটি, আত্মবিশ্বাসের অভাব, নিজেকে নিয়ে অসন্তুষ্টি, কিংবা নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে মানুষ এ ধরনের ক্রমাগত মিথ্যা বলে থাকে। তবে কখনও কখনো বিপদগ্রস্ত লোক নিজে বাঁচতে মিথ্যা বলে। নির্যাতিত মানুষগুলো নির্যাতন থেকে বাঁচতেও মিথ্যা বলে থাকে। এটি দুর্ঘটনাজনিত মিথ্যা।

তবে ক্রমশ মিথ্যা বলা ব্যক্তিরা নিজের করা ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না বলেই মিথ্যা বলে। অনেক সময় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মিথ্যা বলে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে এ ধরনের লোক। এদের মধ্যে অপ্রাপ্তি ও হতাশা ভীষণরকম কাজ করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস ও নৈতিক উন্নয়নের ঘাটতি থাকলেও মানুষ মিথ্যা বলে। বলা যায় আদর্শ ঘাটতি থাকলেও মিথ্যা বলে।  

যে ব্যক্তি মিথ্যা বলেন, তাকে তার সমাজ, পরিবার ও পরিপার্শ্ব ঠেলে দেয় এই মিথ্যা বলার জন্য। তাই পরিবার থেকে নৈতিকতার শিক্ষা পাওয়াটা জরুরি। ছোট ছোট মিথ্যা থেকেই বড় সংকট হয়। পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ বাসা বাঁধতে পারে। আশেপাশে যারা মিথ্যা বলাটা টের পাবেন তাদেরই উচিত সেই ব্যক্তিকে সহায়তা করা।  

 

/এফএএন/

লাইভ

টপ