X
শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২
১৪ আশ্বিন ১৪২৯
পাখিদের নির্মিত সাঁকো

অশ্রুবিন্দুর মতো স্পষ্ট ও নিঃসঙ্গ

ধ্রুব সাদিক
১৮ জুন ২০২১, ১০:৩২আপডেট : ১৮ জুন ২০২১, ১৯:৪২

কোন আলোড়ন-বিলোড়নে তাড়িত হয়ে কবি কবিতা লেখেন, এবং কবিতা আসলে কী; সেটা জানার দিকে পাঠক-পথিক যখন মনোযোগ দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়, তখন তাদের পড়ে যেতে হয় যেন– কুল নাই কিনার নাই এক অতল নিমজ্জমানতায়। কবিতা আসলে কী– তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় কিংবা মানবিন্দুতে কোনো কবি বা কবিতার সমালোচক অদ্যাবধি আসতে পেরেছেন কিনা তা নিশ্চিত করতে পারা না-গেলেও, আমরা ধারণা করতে পারি, ভাঙা সংকেতের মতো কবির কাছে অশ্রুবিন্দুর মতো স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় একখণ্ড নিঃসঙ্গ কবিতা।

কবিতা-সমুদ্র থেকে কবির ভাবনা এবং কবিতার দু'চার পঙক্তি সেঁচে তুলে আনতে বসেছি মূলত সমসাময়িক বাংলা কবিতার অগ্রগণ্য কবি কুমার চক্রবর্তীর ‘পাখিদের নির্মিত সাঁকো’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনার নিমিত্তে। ‘পাখিদের নির্মিত সাঁকো’ কাব্যগ্রন্থের শুরুতেই কুমার চক্রবর্তী আমাদের মস্তিষ্কে চমকে-গমকে-দমকে এক ধরনের আচম্বার সঞ্চার ঘটান। পাশাপাশি, তার আত্মার কথকতা দিয়ে আমাদেরকে নতুন চিন্তা এবং অনুভূতির সাথে পরিচয় ঘটান এই বলে, 'পবিত্রতা আছে জীবনের যারা বিম্ব-প্রতিবিম্বের অন্বয়কে সংশয়াচ্ছন্ন করেছিল ভারাক্রান্ত বাস্তবতায়।'

পাখির হৃদয় নিয়ে, পাখিদের দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে কুমারের নির্মাণ করা সাঁকোর শব্দ-অনুভূতি মস্তিষ্কের গোপন প্রকোষ্ঠে দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়ায়, সেই অনুভূতির ঝংকার এমন প্রগাঢ় আন্দোলন তোলে যা আমাদের টেনে নিয়ে যায় শব্দ থেকে শব্দে, কথা থেকে কথায়, চিন্তা থেকে চিন্তায়। কুমার আমাদেরকে তার কাব্যকলার প্রমত্ততা দিয়ে নির্মিত সাঁকোটিতে দোদুল্যমান অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে এক অন্তর্লোকের দিকেও টেনে নিয়ে যান। তিনি বলেন, 'জীবনের চাঁদ ও নক্ষত্ররা অব্যাহতি চায় সংবেদনের অতীব নীল দীর্ঘসূত্রিতায়।' নক্ষত্র যে পথে হাঁটে, যে পথে শুয়ে থাকে আলো, সারল্যবোধ, সে পাঠ-যাত্রায়, ফলে, আমাদের পাখিদের নির্মাণ করা সাঁকোর শব্দের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে সিঞ্চন করতে হয়, উঠতে হয়, আবার অবগাহন করতে হয়। অতলান্তিক সাঁকোটিতে দাঁড়িয়ে থাকা কতটা সূক্ষ্ম, সেই অনুভূতির ভার কবি আমাদের বহন করতে বলেন এই জ্ঞান করে, 'যেন আমরা মেষগুলোকে ছেড়ে দিতে পারি বিরাজিত পর্বতের সানুদেশে।'

ঘুমপথ ধরে খরমুজখেত আর কালপুরুষের সম্মোহিত অবগাহনের মাঠে নৈঃশব্দ্য ও মৌনকে সাথে করে হেঁটে যেতে যেতে কবি সমন্বিত এক অভিরূপ দেখেন; আমাদের দেখান: বিস্তৃত সারল্যবোধ, আলোর শুয়ে থাকা, ত্রিমাত্রিক রং আর পাখিপ্রযুক্তির সাবলীল অন্ধকার। পাখিদের প্রতিভার বলে যে অন্ধকারে নির্মিত হয় সূর্যাস্তের সাঁকো। 'পাখিদের নির্মিত সাঁকো’র পাঠাভিজ্ঞতা থেকে দ্বিধাহীনচিত্তে বলা যায়: ভাষার কুহকী শরীর নয়, অন্তঃস্থিত সত্তায় জন্ম হওয়া বোধকেই কুমার তার কাব্যগ্রন্থে বিশেষ প্রাধান্য দিয়েছেন। বোধকে হৃদয়ে ধারণ করে, থরথর স্ফটিক স্বচ্ছ হৃদয়াবেগ কবিতার হৃদ-পেয়ালায় প্রকাশমান রেখে, শব্দবাক্যছন্দ সহযোগে কুমার নির্মাণ করেছেন পাখিদের জন্য কথার পসরা। যার কারণে 'পাখিদের নির্মিত সাঁকো’য় আমরা কবির বৃক্ষমনকে লক্ষ্য করি বর্ষার আর্দ্র লিরিকে মেঘ-জলের শরীরে স্নান করে মগ্নতার উল্লাসে নীরবতার গান শুনতে; মুষলধারে দাঁড়িয়ে তাকে উদঘাটন করতে দেখি মেঘের রহস্য সময়ের দিকে তাকিয়ে। মেঘভরতিগ্রাম, নদীজীবনের জলশুশ্রার আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে হাসিকান্নায় দাঁড়িয়ে থাকা, থমকে যাওয়াও তিনি আমাদের অনুধাবন করিয়ে দেন, 'তবু তুমি জানো আহা ওগো মেঘ ওগো বর্ণরাত/ তব অন্ধকারে একা জীবনের সুলুক সন্ধান/ এখন অক্ষত অশ্রু নেত্রপাতে স্বপ্ন জমে জীবনসমান।' 'ফলে মেঘ, হাহাকারকৃত শিমুল ফোটার মেঘ, সিন্ধু থেকে ভেজা লেন্স এনে/ মম চোখে সেঁটে দাও অবলীলাক্রমে।'

পাখিদের নির্মিত সাঁকো’ পাঠ করার কালে আমরা আমাদের হৃদয়-নিম্নভূমি ও উপত্যকাগুলোর নড়াচড়া টের পাই। আমাদের উদারা, মুদারা আর তারার রহস্যময় পরদাগুলোও যেন নড়াচড়া করে ওঠে। কুমার তার আত্মার কতকথা নৈঃশব্দ্যের লিমেরিকে বলেন, 'চিন্তার বেদনা আছে তোমরা জানো', 'রাত নিয়ে বেঁচে থাকে যারা, অন্ধকার নিয়ে বেঁচে থাকে যারা– তারা স্তব্ধতা ও নিঃশ্বাসকে নিয়ে মাতাল হতে পারে।' ফলত পাখিদের জন্য নির্মিত সাঁকোটির নির্মাণের কালে 'জীবনের হলকর্ষণে ক্লান্ত' এবং 'সন্ধিরহিত বাস্তবতায় পরাস্ত' দলছুট পাখিদের অন্তঃস্থিত বেদনার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। পাখিগুলো আসলে জ্যোতির্বিদ তারা অন্তরীক্ষমণ্ডলে নয়, হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে, মনে করে তাদের পরিচিত লোকের ছায়া। তারা ঘুরে বেড়ায় পাহাড় আর সমভূমির গুপ্ত জায়গায় কবিতা-নক্ষত্রের উপাদানের নিমিত্তে। অলীক অস্থিরতা যা তাড়িয়ে ফেরে কবিমানসে, নীরব মুহূর্তের গুড়িগুড়ি অন্ধকার উন্মোচন করার নেশায় কবি তার স্বজনদের বলেন, দূরদর্শী গ্রহরা যারা 'পবিত্রতা আর শুদ্ধতার জীবন নিয়ে ষড়যন্ত্ররত', যারা শুধু মিথ্যা 'শূন্যগর্ভ অহংকার ছড়ায়' তাদের ছেড়ে সবুজ অরণ্যে চলে যাওয়া উত্তম। তিনি বলেন, 'দেখো, আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি সেই মুহূর্তটিকে যখন নক্ষত্ররা চাঁদের ঠিক পরিসীমার কাছে এসে দাঁড়ায়। তারা খোঁজে অন্ধকারের সূত্রটিকে, যা স্বচ্ছতার এক অদ্ভুত বাতাবরণকে মুক্ত করেছিল আমাদের অহেতুক চিন্তার আবেশমুগ্ধতায়।'

কুমারের পাখিদের নির্মিত সাঁকো আসলে এমন এক অপার্থিব যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি, যা যতদূর কল্পনা-এপসিলন খেলে যায়, তার সমান্তরালে, হৃদয়ের অতলের হৃদয় খুঁড়ে রচনা করা যন্ত্রণার অমৃত শরাব। আমরা হয়তো আমাদের চর্মচক্ষুতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্তকিছুরই যন্ত্রণা কবিকে কিভাবে বিদ্ধ করে তা দেখা থেকে বঞ্চিত থাকি কিন্তু কবিতা পাঠ করার কালে কবি ঠিক আমাদেরকেও তার অমরগীতিতে ভাগীদার করেন। আমাদের চারপাশের শূন্যতাকে স্নায়ুর বেদনা দিয়ে অনুভব করতে বলে কুমার সকল মানুষের যন্ত্রণা নিজে বহন করার পাশাপাশি সকলের মাঝে একা হয়েও এক হতে বলেন। ফলে গোধূলির আকাশে যতদূর দৃষ্টি পৌঁছায়, অনুভবের চোখে দেখা মেলে করুন এক সবুজ অন্ধকারের; যে অন্ধকারে একজন মানুষ পাখি হয়ে নানান রঙের, নানান জাতের পাখিদের সাথে ওড়াউড়ি করেন। পানকৌড়ির ধ্যানমৌন অবস্থা অবলোকন করে বিমুগ্ধ মানুষটি আমাদের অনুধাবন করিয়ে দেন নীরবতার ভেতর প্রতিধ্বনিত নদীর কলতান। আমাদের তিনি আরও অনুধাবন করিয়ে দেন, 'যারা হৃদয়ের বিকেলগুলোকে নিয়ে স্থির হতে চায় তারা সমস্ত লৌকিকতার উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে রেখেছে।' বৃক্ষ আর পাখির ভূমিকাকে যেখানে বস্তুগতি করেছে বিবেচিত পটভূমিকাল, কল্পনাশ্রিত মেঘেরা যেভাবে অতিক্রম করে যায় রহস্যময় চাঁদ, বিমুগ্ধ মানুষেরা যেভাবে ধীরে হেঁটে যায় লুব্ধতার পাখিদের নির্মিত সাঁকোয়, তেমনই, কুমার চক্রবর্তী আমাদের জানিয়ে দেন, 'সমস্ত প্রশস্ততম পরাজিত পথে হেঁটে জানতে পেরেছি জ্ঞানের দম্ভগুলো যা কেবলই শূন্যগর্ভ অহংকার ছড়ায়; তার থেকে অন্ধকারে একাকী উড়ে তরুণ সবুজের অরণ্যে চলে যাওয়া ভালো অনেক।'

কৃষণ চন্দর বলেছেন, 'যে-কোনো সভ্যতার উৎকৃষ্ট ব্যারোমিটার হলো তার কবি-সাহিত্যিক।' উক্তিটি কতখানি সত্য সেটা আমরা অনুধাবন করতে পারি কুমারের বলা কথা থেকে, 'কবিতা হচ্ছে হেদিসের দিকে অভিযাত্রা, সেই অধোলোক যেখানে বাস্তব তার উত্তরপ্রকৃতিতে বিরাজ করে।' সমকালীন বাংলা কবিতায় প্রায়-বিরল সংশয় আর বিশ্বাসের দোলাচলে দোদুল্যমান দ্বান্দ্বিক আত্মার অন্তর্গত ভাষার এক নিপুণ কারিগর কবি কুমার চক্রবর্তী। কুমারের কবিতা এমন এক ভাব প্রতিভাজাত, যা মানব সমাজের প্রকৃতি ও সময়ের ভূমিকায় মহাবিশ্বলোকের ইশারার প্রতি সঙ্গতিসাধক। কবি তার হৃদয় প্রকাশিত রেখে, তার পাঁজরের ব্যথা দিয়ে মানবসভ্যতার আত্মার গানগুলো উন্মোচন করে বলেন, 'তোমরা আমার গান ছুঁয়ে থাকো, তোমরা আমার দিগন্তে গলিয়ে দাও অশ্রুভেজা চোখ।' আমাদের তিনি পাহাড় আর সমুদ্র-বেষ্টনীর ভেতর দিয়ে তার সফরসঙ্গী করে আলো-আঁধারির একটি সাঁকোপথ ধরে অবচেতন মনে চেনা-তবু-অচেনা এক পথে হেঁটে নিয়ে গিয়ে আমাদের একপ্রকার বাধ্য করেন পাখিদের প্রতিভার বলে নির্মিত সূর্যাস্তের সাঁকোতে হৃদয়, মগজ তথা সমস্ত সত্তাকে একাত্ম করে নিমগ্ন হতে। কবি আমাদের ঝরে পড়া অশ্রুসিক্ত আবেশ থেকে আহবান করেন এক ক্রন্দসীতে বিলীয়মান হতে। যেতে যেতে তিনি আমাদের বলেন, 'সত্যিকার পথভোলা অঙ্কহীন', 'তোমাদের চিন্তা দিয়ে আমার চিন্তাকে পরিচ্ছন্ন করব, এবং শেষবারের মতো হাসব– জীবনের পলাতক হাসি।' কবি তার মানুষের চোখমুখের দিকে তাকিয়ে গুমোটকান্নায় বলে যান, 'তোমাদের যাবতীয় চোখগুলোর দিকে আর তাকাতে পারি না। সেখানে দেখি সমুদ্র ও মরুভূমির হতাশা। এ সমস্ত জ্যামিতি আর ভূগোলের কান্না, আর সরলতা, কেন যে মিলে যায় দুঃখ এবং বিষণ্ণতার চোখগুলো, সেই চোখগুলো যাদের গর্ভে লুকিয়ে আছে অব্যক্ত জীবনের খনিজ বেদনা।'

কুমার চক্রবর্তী জ্ঞানী এবং ধ্যানী কবির কবিতার ছত্রে-ছত্রে জ্ঞান, ধ্যান এবং চিন্তার নানান উপাদান পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। জীবনের প্রতি গভীরভাবে আষ্টেপৃষ্টে ঘনিষ্ঠ কুমারের ‘পাখিদের নির্মিত সাঁকো’র পাঠাভিজ্ঞতার সাথে পল ভ্যালেরির বলা, 'স্নায়ুই হলো সবচেয়ে বড়ো কবি' উক্তিটির যথার্থতা টের পাওয়া যায়। অরণ্যের নির্জনতা; বাসনার একান্ত আলো-অন্ধকার, এবং তিনি চোখ রাখেন বিন্দুপরিধির চারপাশে আর অনুভব করেন শূন্যতাকে স্নায়ুর বেদনা দিয়ে। সময়ের প্রস্থান হয়, স্মৃতির হয় রদবদল; কিন্তু কুমারকে তার স্নায়ুর বেদনার নীল বিষে নিলীয়মান হওয়ার পরও মনে রাখতে হয় চলে যাওয়া সময়, আলোকরশ্মির উজ্জ্বল কিরণ, ফুলের অবিশ্রান্ত বিলানো সৌরভ, নীরবতার ভেতর প্রতিধ্বনিত নদী, সময়-সমুদ্র, অবান্তর স্বপ্নমুখ, বাগানের প্রকাশরীতি। স্মরণ করেন কুমার তার পরিচিত নদীটিকে, যে নদী একবার সমুদ্রের দিকে গিয়েছিল, তারপর সূর্যের সোনালি বুনুনের ভেতর পড়েছিল ঘুমিয়ে। কবি যেন স্বয়ং ইউলিসিস– জ্ঞানী এবং প্রতিজ্ঞাবাক্যে অনড়ভাবে স্থির পরিভ্রমণরত জীবনপথিক। ইলিয়াম থেকে ইথাকায় নয়, জীবনের নানান পথ ঘুরে, সংশয়াচ্ছন্ন জীবনের বিম্ব-প্রতিবিম্বের অন্বয়ের ভারাক্রান্ত বাস্তবতায় স্থির তিনি নিজের অন্তরাত্মায়। নিজের সাথে নিজের প্রার্থনার গানে তিনি বলেন, 'যারা হৃদয়ের বিকেলগুলোকে নিয়ে স্থির হতে চায় তারা সমস্ত লৌকিকতার উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে রেখেছে।'

কুমার চক্রবর্তীর কবিতা বলার ভঙ্গি এবং ভাষাটি মাধুর্যপূর্ণ এবং শক্তিশালী। মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং দ্যোতনা কবিকে কবিতার উৎসমুখে জিইয়ে রাখে। কবিকে ঔৎসুক করে মানুষসহ দুনিয়ার তাবৎ প্রাণপ্রবাহের প্রতি। কবি কি পান করে গন্ধঘোর রাতের রূপকথায়? কি কথা থাকে তার আত্মার বৈঠকখানায়? আত্মার ওঠাপড়ার ভূমিকা কবির কাছে স্পষ্টতর হয়ে উঠেও কেন অস্পষ্ট থাকে? ফলত বেদনাদের যে নিজস্ব ভাষা আছে, সেটা আপনা থেকেই কুমার চক্রবর্তীর কবিতায় অনুভূত হয়ে যায়। কিন্তু অনুভূত হয়ে তারপর আবার মনে হয়, এই বেদনা, এই মৌন, এই জীবনের নির্জনতা, এই পরাবাস্তবে হারানো অঙ্গ খুঁজে ফেরাতে অন্য এক জীবন যেন কাজ করে। জীবনের ওপারের জীবনকে ছোঁয়ার প্রাণপণে আকুলতা কাজ করে। কুমারের কবিতায় পাঠককে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হতে হয় মূলত নানান প্রশ্নের তিনি উদয় ঘটান। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যস্থিত যে বৃত্ত, বিন্দু, পরিধিতে স্নানরত অবস্থায় কবি, তিনি তার সহস্নানে আমাদেরকে চান একাত্ম করতে। কবি যদিও আমাদের নানান ধ্যানপথ ধরে হাঁটান, তবে, এসব বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হয় না, কবি কখন কোন সময় কোন প্রেক্ষিতে বলেন, 'জন্মের ভেতর বেঁচে থাকা মানে ঠাসাঠাসি করে থাকা', 'হারানোর রহস্যগুলো নিয়ে নদীপারে বসে থাকি আর অনুভব করি হাড়ের একক নির্জনতা', 'প্রতিটি পাখির ঠোঁটে লাল বাঁকা-বাঁশি, তারা বসে আছে আমার অদৃশ্য ডালপালায়।' হাসিকান্নার মিশেলের এই জীবনে, এই বেঁচে থাকায় কত যে তার রূপ-রঙ। রক্তিম কেমন বিদীর্ণ করে ডুবে যাওয়া সূর্য আর সূর্যাস্তের রঙ দেখে আমাদের মন যেমন আন্দোলিত হয়ে ওঠে, অস্তিত্বের সংকট তেমনি আমাদের চিন্তাগ্রস্ত করে। আমরা যেন একটি বৃত্তের মধ্যে আটকে থাকা এক প্রাণী, যারা নিয়তির শিকার হয়ে এই মহাকালে ছিটকে পড়েছি। কুমার আমাদেরকে তার কবিতায় শশী, সিসিফাস, জোসেফ, রাশকোলনিকভ, ম্যরসল্ট, খোকা, অরেলিয়ানোসহ কত চরিত্র, কত নাম, কত কথা, কত চিন্তার সাথেও পরিচয় ঘটান। ফলত যা আনন্দ তাই দুঃখ, জীবন উপভোগকে অনুধাবন করতে পারাটাও জরুরি জ্ঞান করে কুমার তার আত্মার সরপড়া ছায়াবাস্তবতা থেকে অনুধাবন করিয়ে দেন, 'বেদনাদের নিজস্ব ভাষা আছে, নিজস্ব অধিকারবোধ আছে।' 'আমি ছায়াদের শরীরে ঢুকে পড়ি আর প্রগাঢ় ছায়াশিশু হই।' 'আমার আছে শোকমিছিলের মতো স্তব্ধতা, আছে শুনশান দুপুরের অদৃশ্য বক্রতা। রয়েছে ব্যক্তিগত বেদনার মতো নিপাট ক্ষীণজীবিতা।' 'বারতাটুকু ধরে রাখতে চাই– ঠিক চাঁদের কাছে থমকে-থাকা মেঘনূপুরটির মতো।' 'ধরে দেখি মৃত্যুর কড়ি ও কোমল, আর আঁধারের ভারসাম্যবেদনা।' 'যখন রাত হয়ে যায়, তখন কে-যেন অদৃশ্য গোলাপ খুলে দেখিয়ে দেয় নিষিদ্ধ জাদুঘর ও তার যাবতীয় স্পর্শকাতরতাগুলো।' 'আমি ছিলাম সমুদ্রের গভীরে স্বপ্ন আর স্বপ্নের গভীরে নগ্ন আপেল বিচিটির মতো– বেদনাহত।' 'পাখসাটে তরঙ্গ তুলি আপন ভারসাম্য ভুলে। গোপন অসুখ, অচিকিৎস্য, শুধু একবার ভাটিখানায় গিয়ে ভালো হয়েছিলাম স্নিগ্ধ আগুনের চোয়ানি পান করে।'

আত্মার কথকতার ভ্রমণ ক্লান্ত করে কবিকে; কিন্তু তারপরও কবি ভ্রমণে ক্লান্তিহীন মেঘেদের অনুরাগী পথে আশ্চর্য সরাইখানায় বসে যে মানুষদের হৃদয়পথে ভর করে কুহক ও ছায়াবাজি, তাদের নিয়েও ভাবনারত থাকেন। কবি ভাবনারত থাকেন, সমুদ্র থেকে ফিরে যে মানুষ জলের ছবি বুকে নিয়ে সারাক্ষণ চুপ করে থাকে। কবির অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, যাপিত জীবন, বেঁচে থাকা, জীবনের ঘানি টেনে যাওয়া, সর্বোপরি, কেন এই বেঁচে থাকা– এইসব নানান দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরও একটু শান্তির জন্য কবির, মানুষের, প্রাণপাখি প্রাণপণে প্রাণপাত করে। যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের, মানুষের সাথে তার, জীবনানন্দের, দেখা কি হয়েছিলো? দেখা হয়েও কেন হয় না; কোন সে বিপন্ন-বিস্ময়ের খেলা কবিমানসে খেলা করে? কবিতার আলোড়িত বাগানবিলাসের বিলোড়ন যার মধ্যে একবার খেলা করেছে, সেই মানুষমাত্রই জানে, এ-কোন জগতে আসলে নিমজ্জমান থাকে সেই সত্তা। এই জগতে ফুলের সামবায়িক ধারণাগুলো একাট্টা হয়ে কবির সাথে সম্বন্ধস্থাপিত করে কবির নিম্নভূমি ও উপত্যকাগুলোকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। ‘পাখিদের নির্মিত সাঁকো’র জীবন মূলত জীবনের হলকর্ষণে ক্লান্ত হয়, ছায়ান্ধকার হাওয়াকলে অট্টহাসি হাসে। সন্ধিরহিত বাস্তবতায় পরাস্ত মানবশিশুদের শুধু কেবলই যেন দৃশ্যের জন্ম হয়। কেউ যায় না মরে। শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ফেলে যাওয়া ঋতু থেকে জেগে ওঠা কাকভেজা মাঠে পাখিদের প্রতিক্ষায়।

/জেডএস/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সার্কাসের বাঘের ডেরায় ‘ঈশা খাঁ’র হানা!
এ সপ্তাহের সিনেমাসার্কাসের বাঘের ডেরায় ‘ঈশা খাঁ’র হানা!
কুমিল্লায় সড়কে ঝরলো ৩ প্রাণ
কুমিল্লায় সড়কে ঝরলো ৩ প্রাণ
সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে গানচিত্র
সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে গানচিত্র
ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের চুক্তি
ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের চুক্তি
এ বিভাগের সর্বশেষ
নারীবিহীন পুরুষেরা 
নারীবিহীন পুরুষেরা 
লেখক শেখ হাসিনা
লেখক শেখ হাসিনা
আমার সৈয়দ হক
আমার সৈয়দ হক
হিলারি মেন্টেলের মৃত্যু
হিলারি মেন্টেলের মৃত্যু
চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রের সাহসআশ্রিত মানুষ 
চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রের সাহসআশ্রিত মানুষ