X
বুধবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য : আঙ্গিকে রাষ্ট্রদর্শন

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৪৮

বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) বিশ শতকের প্রথমাংশের লেখক। কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩০) সাহিত্যধর্মের অনুসরণে বাংলা সাহিত্যে একটি দার্শনিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এই দিকপরিবর্তনের দর্শনধারণকারী লেখকদের মধ্যে অন্যতম বুদ্ধদেব বসু। এই যুগ কেবল রবীন্দ্রবলয় অতিক্রমণের অভিপ্রকাশ মাত্র নয়। কল্লোল যুগের সাহিত্যদর্শন বিশ্বরাজনীতির আমূলস্পর্শী প্রভাবেরও বিশেষ প্রতিফলন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) প্রাক্-পর্যায় যেমন সেসময়ের মানুষের জীবনবোধে একটি অনিশ্চয়তা এবং দ্বন্দ্ববোধের জন্ম দেয়, তেমনি এই দুই বিশ্বযুদ্ধের প্রতিফল ভারতীয় মননে তীব্র বিচ্ছিন্নবোধেরও উন্মেষ ঘটায়। জীবন ও সাহিত্যের এই বোধ ও দর্শনগত পরিবর্তনের সময়ের মধ্যদিয়ে বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যবোধের সৃষ্টি হয়। ফলে, তাঁর কবিতায় রোম্যান্টিকতাবোধের সূত্রে কবিচেতনায় প্রথিত থাকে আধুনিক সময়ের একজন বিচ্ছিন্নতাবোধযুক্ত ব্যক্তিসত্তা। এই ব্যক্তিসত্তাই বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্যের বিবিধ পুরাণনির্ভর চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিনির্মিত হয়। ভারতীয় পুরাণকে উৎস হিসেবে গ্রহণ করে তা থেকে বুদ্ধদেব বসু তাঁর কাব্যনাট্যের অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেন। কিন্তু, তাঁর কাব্যনাট্যসমূহের পৌরাণিক আখ্যান বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তার সমন্বয়ে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি বিমূর্ত রূপ ধারণ করে। এই আখ্যান-‘বিষয়’ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের স্বরূপ, সংকট উন্মোচন করে তার সূত্রেই একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শন উপস্থাপন করে। ব্যক্তির ‘স্বরূপ সত্তা’ অর্জনের সচেতন প্রয়াসের মাধ্যমেই এই রাষ্ট্রচিন্তা একটি শাশ্বতবোধের প্রতিও পরিচালিত হয়।

 সময় ব্যক্তিকে তার স্বকীয় সত্তা অর্জনের জন্য ধাবিত করে। মার্টিন হাইডেগারের [Martin Heidegger : 1889-1976] এই অভিমত ব্যক্তির সত্তাকে সময়ের সাপেক্ষতায় পরিমাপ করে। এর পরবর্তী ধাপে জ্যাঁ পল সার্ত্রে [Jean-Paul Sartre : 1905-1980] ব্যক্তির সত্তাকে পরিপূর্ণতা অর্জনের সাপেক্ষে বিবেচনা করেন। ফলে, তাঁর পরিমাপে সত্তা মূলত শূন্যতার বোধ থেকে পরিচালিত হয়। ‘সত্তা’র এই দ্বিবিধ দর্শন বিশ শতকের সময়ে এবং বিশ্বব্যবস্থায় বিকশিত হয়। বিশ শতক সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে একটি ব্যাপক পরিবর্তনের কাল। কারণ এ সময় সমগ্র পৃথিবীর রাষ্ট্রব্যবস্থার আঙ্গিকে পরিবর্তন সংঘটিত হতে থাকে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা এর অন্তর্গত মানুষের জীবনের দর্শনগত এবং আকার-আকরণগত অবস্থার প্রতিফল। আবার, এই রাষ্ট্রব্যবস্থা এ সকল মানুষের সার্বিক নিয়ন্ত্রকও। তাই, বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রচিন্তার এবং রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন মানুষকে এক চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের মধ্যে নিক্ষেপ করে। ফলে, জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার এবং ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ পল সার্ত্রে যেমন ব্যক্তি মানুষের সত্তা-স্বরূপ নির্ণয়ে সচেষ্ট, তেমনি ভারতীয় দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধিৎসু বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৬)। তাঁর ‘সত্তা’ বিষয়ক দর্শনের চর্চা পরিলক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাঁর কবিতা, কথাসাহিত্য এবং কাব্যনাট্যের আঙ্গিকে।

এক.

বুদ্ধদেব বসু কবিতায় প্রবল রোম্যান্টিকতাবোধ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু এই রোম্যান্টিকতা কেবল উইলিয়াম ওর্ডসওয়ার্থ [William Wordsworth : 1770-1850] প্রবর্তিত রোম্যান্টিসিজমের সৌন্দর্য বা আলোকময়তা মাত্র নয়। সেস্থলে ‘ব্যক্তি হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবোচ্ছ্বাসকে’ বুদ্ধদেব বসু গ্রহণ করেন কল্পনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ হিসেবে। কারণ তিনি তাঁর কবিতায় বলেন :

‘আমিহীন বিশ্ব নেই, চরাচরে আমিই বিম্বিত :
প্রকৃতি ও কাল শুধু নটনটী, আমি নাট্যকার,
এবং দ্রষ্টাও আমি—যতক্ষণ শেষ বজ্রপাতে
বিলুপ্ত না হয় সত্তা, মহাবিশ্ব, আর ভগবান।’

সত্তার এমন অভিপ্রকাশ-কল্পনা স্বরূপগতভাবে রোম্যান্টিকতা। বুদ্ধদেব বসু নিজে নিজের আত্মপরিচয় দেন ‘দুর্মরভাবে রোম্যান্টিকতার পক্ষপাতি হিসেবে’ এবং বুদ্ধদেব বসু ‘শেষবজ্রপাতে বিলুপ্ত না হওয়া সত্তা, মহাবিশ্ব, আর ভগবানের দ্রষ্টা’। ফলে তিনি চিরন্তনতারও শিল্পী। বাংলা সাহিত্যে এরূপ চিরন্তনতার বোধের পূর্বসূত্র বিদ্যমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) কবিতায়। ‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি/ শত রূপে শত বার/ জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।/ চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় / গাঁথিয়াছে গীতহার, / কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, / নিয়েছ সে উপহার/ জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’ মূলত সময়ের পরিসীমাকে অতিক্রম করার মাধ্যমেই সত্তা তার চিরকালীন অস্তিত্ব ঘোষণা করে। আবার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সত্তা সর্বব্যাপীও। তাঁর অপর একটি কবিতা ‘আত্মসমর্পণে’ এই ব্যাপ্তি প্রকাশিত হয়, ‘চোখে চোখে থেকে কাছে নহ তবু,/ দূরেতে থেকেও দূরে নহ কভু/ সৃষ্টি ব্যাপীয়া রয়েছে তবু/ আপন অন্তঃপুরে।’ এই সত্তাকে চিহ্নিত করা যায় ‘স্বরূপ সত্তা’ (bing in itself) হিসেবে। কারণ এই সত্তা একটি নির্বিশেষ (indeterminate) সত্তার বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত করে। বুদ্ধদেব বসু কল্লোলের লেখক এবং রবীন্দ্রবলয়ের অতিক্রমণ প্রয়াসী হলেও তিনি একটি বিশ্বব্যাপী নির্বিশেষ সত্তার বোধ ধারণ করেন। তাই, শার্ল বোদলেয়ারের [Charles Baudelaire : 1821-1867] কবিতার ‘দুঃখসাধনা’ বুদ্ধদেব বসুর বিশ্লেষণে ‘অমৃতের জন্য বিরহবেদনা’ এবং ‘গভীরতম আধ্যাত্মিক অর্থে প্রজ্ঞা’র উৎস।ফলে, ফ্রান্সের এই বিচ্ছিন্নতাবোধের এবং নেতিদর্শনের কবিকে বুদ্ধদেব বসু ‘কবিদের রাজা, সত্য দেবতা হিসেবে গ্রহণ করেন।’ গতি ও স্থিতির মধ্যদিয়ে সত্তার নির্মিতির স্বরূপ বোদরেয়ার এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতায় ব্যক্ত করলেও উভয়ের প্রকাশ স্বতন্ত্র।‘বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ারের কাব্যভাবনায়ও চৈতন্যের অমোঘ স্পর্শ অনুভব করেন। কাব্যকলার সৃষ্টিতে প্রেরণাকে স্বীকার করলেও প্রেরণালব্ধ অভিজ্ঞান যে চৈতন্যের স্পর্শে কাব্যে রূপান্তরিত হয়, সেই চৈতন্যেরও পরিপোষকি তিনি।’

বুদ্ধদেব বসু বাংলা কবিতার ভিত্তিভূমির দর্শন এবং আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোতে বিক্ষিপ্ত মানুষের স্বগোতক্তি উভয়কেই ধারণ করে তাঁর সাহিত্যদর্শন গঠন করেন। তাই, তাঁর কাব্যনাট্য তপস্বী ও তরঙ্গিনীতে (১৯৬৬) ঋষ্যশৃঙ্গকে যাত্রা করতে হয় শূন্যতার প্রতি, অন্ধকারের দিকে। কিন্তু তা নেতিদর্শনজাত নয়। বিচ্ছিন্নতাকামী এই অভিযাত্রার গভীরে একটি সুগভীর আশাবাদ এবং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাও ব্যঞ্জনা লাভ করে। ফলে, আলোকময়তা এবং নেতিদর্শনের পরম দ্বন্দ্ব থাকলেও ঋষ্যশৃঙ্গ বলে :

‘কেউ কি কোথাও ফিরে যেতে পারে,… আমরা যেখানেই যাই, সেই দেশই নূতন। আমার সেই আশ্রম আজ লুপ্ত হ’য়ে গিয়েছে। সেই আমি লুপ্ত হ’য়ে গিয়েছি। আমাকে সব নূতন করে ফিরে পেতে হবে। আমার গন্তব্য আমি জানি না, কিন্তু হয়ত তা তোমারও গন্তব্য।’

পুরাণের আশ্রয়ে রচিত হলেও বুদ্ধদেব বসু তপস্বী ও তরঙ্গিনীর ভূমিকায় ঘোষণা করেন যে, এই নাটকের অনেকখানি অংশ তাঁর কল্পিত, এবং রচনাটিও শিল্পিত—অর্থাৎ, একটি পুরাণকাহিনিকে তিনি নিজের মনমতো করে নতুনভাবে সাজিয়ে নিয়েছেন এবং তাতে সঞ্চার করেছেন আধুনিক মানুষের মানসতা ও দ্বন্দবেদনা।…ঋষ্যশৃঙ্গ এবং তরঙ্গিনী পুরাকালের অধিবাসী হলেও মনস্তত্ত্বে আধুনিক সময়ের সমকালীন। ‘আগাগোড়া পৌরাণিক আবহে মোড়া থাকলেও তপস্বী ও তরঙ্গিনী আধুনিক মানুষের দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং বেদনার রূপচিত্র। নাট্যকার প্রেম ও কামের স্বরূপ, রাজকুমারী শান্তার কৌমার্য প্রত্যার্পণের আখ্যান এবং সর্বোপরি সচেতনভাবে পুরাণের পুনর্নিমাণের প্রসঙ্গে এই আধুনিক মানসতার উল্লেখ করেন। কিন্তু, বিশ শতকের সাহিত্যে পুরাণের বিনির্মাণ কেবল শিল্পচর্চার প্রতিফলন মাত্র নয়। পুরাণ মানুষকে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্ম করে তোলে। জাতিগত নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক শাসন-পর্বে পুরাণ মানুষকে তার আত্মপরিচয় জানায়। পুরাণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ‘যৌথ অবচেতন’কে (collective unconscious) উদ্দীপ্ত করে তোলে। একই সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী মানুষকে তার স্বরূপ উপলব্ধিতে তাড়িত করে। উপনিবেশ পরবর্তীকালেও পুরাণ মানুষকে তার অস্তিত্ব এবং সত্তার দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণের উপাদান সরবরাহ করে। ফলে বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় প্রথম প‌র্যায় থেকে পুরাণ শিল্পোপাদান থাকলেও তা ক্রমে একটি বিশেষ গভীরতা লাভ করে। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত বুদ্ধদেব বসুর কাব্য মরচে পড়া পেরেকের গানের নাম কবিতা এবং তপস্বী ও তরঙ্গিনী কাব্যনাট্যে একই পুরাণকাহিনি নিয়ে রচিত হয়। এ উভয় রচনায় বিধৃত আধুনিক মানস প্রেম ও কামের স্বরূপ অনুসন্ধান সূত্রে মূলত তাদের ‘অস্তিত্ব’ সম্পর্কেসচেতন হয়ে ওঠে। তাদের এই অস্তিত্বচেতনার পরিপ্রেক্ষিত যে অঙ্গরাজ্য তা সামন্তশাসনের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্কট নিয়েও উপস্থিত হয়। কারণ তপস্বী ও তরঙ্গিনী কাব্যনাট্যের প্রথম অংকে প্রথম দূতের জিজ্ঞাসা, ‘রাজা যদি স্বস্থ ও ধর্মাত্মা, কবে প্রজাদের এই কষ্ট কেন?’ ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত কাব্যনাট্যে রাজার সঙ্গে রাজ্যের দৈবসংযুক্তি যে নাট্যকারের একমাত্র কম্য নয় তা স্পষ্টতা লাভ করে যখন একই সংলাপ বিনিময়ে দ্বিতীয় দূত বলে, ‘এমন যদি হয় যে দেবতারা মানুষেরই কপলকল্পনা?...ধর্ম নেই, শাস্ত্রসমূহ প্রহেলিকামাত্র, আর অন্ধকারে আমাদের আলো শুধু আলেয়া?...পরান্নপুষ্ট স্বার্থান্বেষী প্রবঞ্চক ব্রাহ্মণ’।এই সংশয় ধর্মবিরুদ্ধতা মাত্র নয়। এটি একইসঙ্গে যুক্তিনিষ্ঠ মননের জিজ্ঞাসাও। সুতরাং, ‘রাজা যদি স্বস্থ ও ধর্মাত্মা, তবে প্রজাদের এই কষ্ট কেন?’, এই জিজ্ঞাসা কোনো দৈবতাড়িত বোধজাত প্রশ্ন নয়। রাজার স্বাস্থ্য মূলত তার মানসিক স্বাস্থ্য, রাজার রাজ্য শাসনের দর্শন যদি ধর্ম অনুসারী হয় অর্থাৎ, ন্যায্যতার অনুসারী হয় তবে প্রজাদের কষ্ট অবান্তর হয়ে ওঠে। এছাড়াও অঙ্গরাজ্যের বৃষ্টিহীনতা রাজার বীর্যহীনতারই প্রতিরূপক। পুরাণে অঙ্গরাজ্যের রাজা লোমপাদ বৃদ্ধ। যেহেতু রাজা বীর্য‌হীন ফলে রাজ্যও বৃষ্টিহীন। অঙ্গরাজ্যে বৃষ্টির জন্য অপাপবিদ্ধ মুণির কৌমার্য ভঙ্গ করা প্রথম প্রয়োজন। সুতরাং, ঋষ্যশৃঙ্গের বীর্যপাতের সঙ্গে অঙ্গরাজ্যের প্রকৃতিতে বৃষ্টিপাত সম্পৃক্ত। কিন্তু যেহেতেু রাজার সঙ্গেই রাজ্যের সম্বন্ধ বিদ্যমান, ফলে অপাপবিদ্ধ মুণির কৌমার্য ভঞ্জনই সংকটের সমাধান নয়। মুণিকে রাজা লোমপাদকন্যা শান্তার সঙ্গে বিবাহসূত্রে সম্পৃক্ত হয়ে রাজা হতে হবে। অর্থাৎ, অপাপবিদ্ধ মুণিকে হতে হবে রাজ্যের উত্তরাধিকারী। আর ভাবগত দিক থেকে বৃষ্টি যেমন মাটির ক্ষেত্রে ফসলের উৎপাদক শক্তি, সেই সূত্রে মানুষের বীর্য মানুষ উৎপাদন করে অর্থাৎ, মেধা, বুদ্ধি ইত্যাদি উৎপাদন করে। মূলত বৃদ্ধ রাজা লোমপাদ সময়োপযোগী রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে অক্ষম। রাষ্ট্রে উদ্বুদ্ধ পরিবর্তিত সময়ের সংকটের নিরসনে প্রয়োজন নতুন রাষ্ট্রনীতি নির্ধারক। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, রাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায়ে না এবং সর্বদা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে চায়। ফলে নতুন নীতিনির্ধারক অর্থাৎ নতুন রাষ্ট্রনায়ককে পূর্বের রাষ্ট্রনায়কের পারম্পার্য বজায় রাখতে হয়।

অপাপবিদ্ধ ঋষ্যশৃঙ্গ তার নিষ্কাম জীবন এবং তপস্যা ত্যাগ করে ঋষী থেকে পুরুষ হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু করে, যে যাত্রার অভীষ্ঠ তরঙ্গিনীমাত্র নয়। ঋষ্যশৃঙ্গের অভীষ্ঠ হয়ে ওঠে তরঙ্গিনীর মুখাবয়ব, শরীর, আচার, উপাচার।তপস্বী ও তরঙ্গিনী নাটকের প্রারম্ভে বুদ্ধদেব বসু উদ্বৃত করেন টি. এস. এলিয়টের [Thomas Stearns Eliot : 1888-1865] কবিতার দুটি পংক্তি : `I’m looking for a face I had/ Before the world was’. নাটকের অন্তিমপর্বে ঋষ্যশৃঙ্গও একটি হারিয়ে যাওয়া মুখের স্মৃতি তরঙ্গিনীকে উপলব্ধি করাতে বলে :

আমার সেই দৃষ্টি যা তোমাকে স্বপ্নেও কষ্ট দিয়েছে, তা আর আমর চোখে ফিরে আসবে না। কিন্তু তোমার সেই অন্য মুখ হারিয়ে যায়নি, তুমি তা ফিরে পেতে পারো। দর্পণে নয়, হয়তো অন্য কারো চোখেও নয়—কোথায় আমি জানি না; কিন্তু এ-কথা জানি যে কোথাও, কোনো অন্তরালে সেই মুখ চিরকাল ধরে আছে, চিরকাল ধরে থাকবে। তা খুঁজতে হবে তোমাকেই, চিনে নিতে হবে তোমাকেই। মনে আশা রাখো। হৃদয়ে রাখো আনন্দ।

ঋষ্যশৃঙ্গের পূর্বের দৃষ্টি যা বিদ্যমান ছিল অঙ্গরাজ্যে আসার পূর্বে তরঙ্গিনী নামক ভাবের প্রথম দর্শনে এবং উপলব্ধিতে, তা আর ফিরে আসবে না।The face before the world made, সেই মুখ যা রাজা ঋষ্যশৃঙ্গের জন্মের পূর্ববর্তী তা আর ফিরে আসবে না। এটা জেনেও সে সম্পূর্ণ রিক্ত হওয়ার জন্য এবং সম্পূর্ণরূপে শূন্যতায় নিমজ্জিত হতে অগ্রসর। কারণ সে সেই পূর্ববর্তী মুখ বা ‘স্বরূপ সত্তা’র অনুসন্ধানী। এই স্বরূপ সত্তা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়কের আদর্শ বা রাষ্ট্রদর্শন। এই রাষ্ট্রদর্শনের জন্যই তাকে বৃদ্ধ রাজা লোমপাদের স্থলাভিসিক্ত করা হয়। এই নিষ্কাম রাষ্ট্রদর্শন তরঙ্গিনীরূপী ভাবের দ্বারা আরো বেশি উজ্জীবিত হয় বা পূর্ণতার প্রতি ধাবিত হয়। কিন্তু, এই মানস বা ভাবাদর্শ বাঁধাপ্রাপ্ত হয় শান্তার সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার কারণে। ঋষ্যশৃঙ্গের বিবাহ তার পূর্ববর্তী শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়তুল্য। এছাড়াও যে তরঙ্গিনীর দ্বারা তার ভাবগত স্তরায়ন বা জাগরণ ঘটে তার অনুপস্থিতিও নতুন রাষ্ট্রনায়ককে শূন্যতায়, নিরানন্দে নিপতিত করে। ফলে, তার স্বকীয়তা, সৃষ্টিশীল সত্তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে থাকে। ঋষ্যশৃঙ্গ তার দর্শনের বদ্ধতার মধ্যেও পুনরুজ্জীবিত হতে সচেষ্ট, যেমন শান্তাকে সে বলে :

রাত্রে অন্ধকারে—তুমি যখন আমর বাহুবন্ধনে ধরা দিতে, আমি কল্পনা করতাম তুমি শান্তা নও—সেই অন্য নারী। অন্ধকারেও সমতা নেই, শান্তা, অন্ধকারেও লুপ্ত হয় না স্মৃতি।

সুতরাং, ঐতিহ্যের সঙ্গে ব্যক্তিমানসের সংশ্লেষে যে সত্তা নির্মিতি লাভ করে তা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কাঠামোয় আবদ্ধ আত্মদর্শনবিচ্যুত মানুষেরও স্বরূপ। তাই এই আরোপন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে সহায়ক নয়। রাষ্ট্রব্যবস্থার এমন সঙ্কটাবস্থা থেকে নিষ্ক্রান্তির সূত্র নির্দেশ বুদ্ধদেব বসুর অভীষ্ট না হলেও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কীভাবে ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তার একটি শিল্পিত রূপ তাঁর তপস্বী ও তরঙ্গিনী

পুরাণ একটি জাতি বো গোষ্ঠীর যৌথ অবচেতনের সংগঠক আবার, পুরাণ একটি জাতির অতীতও। অতীতকে বর্জন করে একজন ব্যক্তির নিজস্ব প্রতিরূপ গড়ে উঠতে পারে না। কারণ, অতীত ব্যতীত ব্যক্তির অস্তিত্ব অপূর্ণাঙ্গ ও ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে। এই অতীতকে টি. এস. এলিয়ট `Tradition’ বা ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, ‘it cannot be inherrited’, ঐতিহ্যকে পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। ঐতিহ্যের সূত্রে প্রাপ্ত মনন মানুষকে তার জাতির অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে অনুপ্রাণিত করে। ফলে ঐতিহ্যের মধ্যদিয়ে প্রাপ্ত historical sence লেখককে চিরন্তনতার বোধযুক্ত করে।

          বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্যে ব্যবহৃত পুরাণ লেখকের চিরন্তনতার বোধসঞ্জাত। ভারতীয় মানসের স্বরূপ নির্ণয়ের শিল্প সৃষ্টিতে পুরাণের এই ব্যবহার লেখকের ঐতিহ্যানুগামিতার পরিচয় বহন করে। একইসঙ্গে, তিনি এই ঐতিহ্যগত অতীতের সূত্রে তাঁর সমসময়কে নির্ণয় করতে সক্ষম হন। কারণ, `The past should be altered by the present as much as the present is directed by the past.’[iii] ফলে, পুরাণ বুদ্ধদেব বসুর রচনার শিল্পকুশলতার মাধ্যমে আধুনিক সময়ের প্রতিরূপক একইসঙ্গে স্বরূপ নির্ণায়ক হয়ে ওঠে।

আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিদ্যমান বিবিধ সঙ্কটের মধ্যেও রাষ্ট্রকে প্রাজ্ঞভাবে পরিচালনাকারী শক্তির গুরুত্ব বিদ্যমান। অন্ম্নী অঙ্গনা কাব্যনাট্যে এরূপ অপরিহার্য শক্তির বার্তা ধ্বনিত হয়। অনাম্নী অঙ্গনা রানি অম্বিকাকে জানায়, ব্যাস অঙ্গনাকে বলেছেন,

তুমি তার নাম দিয়ো বিদুর, কেননা বিদ্যা হবে তার স্বভাবসিদ্ধ

… … …

ঘোর যুদ্ধ আসন্ন : তিনি নিজে থাকবেন দূরে,
আর তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র—ঘটনাস্থলে উপস্থিত—
তবু থাকবে শান্ত, শান্তির সাধক, নির্লিপ্ত,
যেন সিন্ধুবিহারী হংস, তরঙ্গ যাকে সিক্ত করে না।

মহাভারতের আসন্ন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যা ধর্মযুদ্ধ হিসেবেও অভিহিত সেখানে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই যুদ্ধ মূলত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠারই যুদ্ধ, যা সাধিত হবে সাধারণ মানুষের আত্মদানের মাধ্যমে। রাষ্ট্রনায়কের জন্য ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করাই বিশেষ প্রয়োজনীয়। ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে এরূপ যুদ্ধপরিস্থিতি অনিবার্য না হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন বিদুরের মতো মন্ত্রী। অঙ্গনার ভাষায় বিদুর ‘একমাত্র ধবলতার সংকেত’। যখন ব্যাসের অপর দুই পুত্র ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই বিদুরের তুলনায় হীন, তখন কেবল জন্মজঠরের শ্রেণিভেদের কারণে তারা শাসক হওয়ার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রও এই সম্পর্কসূত্রকে দক্ষতা এবং দার্শনিকতার তুলনায় অধিক গুরুত্ব দেয়। আর এই অপরিণামদর্শিতার অবশ্যম্ভাবী অফল ক্ষমতার লাভের দ্বন্দ্ব।

এছাড়াও অঙ্গনা অপর একটি সত্তা যার ‘নামহীন অস্তিত্ব কাঙ্ক্ষিত দুর্গধাম’। আসন্ন যুদ্ধে একজন স্থিতধী ব্যক্তির জন্য অঙ্গনার দাসত্ববরণ তাকে মহৎ করে তোলে। ‘মাতৃত্ব অনাম্নী অঙ্গনাকে এক স্পষ্ট উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।’২৮ বিদুরের জন্মদান অঙ্গনার নিষ্কাম কর্ম মাত্র নয়। নিজের স্মরণচিহ্ন, নিজের প্রমাণ, নিজের অভিজ্ঞান অর্জন অর্থাৎ, অঙ্গনা অপর সত্তা অম্বিকার সাপেক্ষে স্বরূপ সত্তা অর্জনের দিকে ধাবিত করে। পুরাণের বিপুল পরিমাণ আখ্যানের মধ্যে অনাম্নী অঙ্গনা অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠে। অঙ্গনা এবং রাষ্ট্রের আত্মত্যাগী কল্যাণকামী মানুষ প্রজ্ঞার জন্য বিদ্যার জন্য সর্বোপরি রাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কল্যাণের জন্য নিভৃতে আত্মদান করে।

যুদ্ধকে প্রতিরোধ করা যায় না। তাই যুদ্ধই মানুষের কাছে একমাত্র পথ, যা তাকে তার স্বরূপ প্রমাণ করতে সহায়তা করতে পারে। আত্মপরিচয় থেকে বঞ্চিত, আত্মঅধিকার থেকে বঞ্চিত এই মানুষগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। সত্তার মধ্যকার প্রবল বিচ্ছিন্নতাবোধই এই স্বভূমি বঞ্চিত মানুষদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম পার্থ নাটকের প্রথম পার্থ কর্ণ এই স্বভূমীবঞ্চিত মানুষদের প্রতিভূ।এই নির্বাসিত (Exil) সত্তার কারণ জাতীয়তাবাদ। বুদ্ধদেব বসু নিজেও ব্যক্তিজীবনে তাঁর মাতৃভূমি থেকে নির্বাসিত। তাঁর নির্বাসনের এই বেদনা প্রকাশিত হয় একটি চিঠিতে। ১৮৬৪ সালে আত্মজা মিমিকে লিখিত চিঠিতে তিনি বলেন :

প্রবাসের একটা বেদনা আছে,… দেশের বাইরে আমাদের অস্তিত্ব অস্পষ্ট—এটা আমার পক্ষে বিশেষভাবে সত্য, কেননা আমি সাহিত্যিক,… এবার যেন আমি টোমাস মান-এর মনোভাব আর স্টোফান ৎসোয়াইখ-এর বেদনা বুঝতে পারছি—বারবার মনে হচ্ছে যে ওই বর্বরের দ্বারা অধ্যুষিত বাংলাদেশ আমার দেশ, সেখানে ছাড়া কোথাও আমার সত্যিকারের স্থান নেই। আমি জানি, আমার দেশ আমার মনমতো নয়, অনেক মনঃপীড়া সেখানে সহ্য করেছি ও করতে হবে, কিন্তু তাই বলে আমি অন্য স্বদেশ পাব কোথায়?

বুদ্ধদেব বসু অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর শিক্ষাজীবনও সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মসূত্রে তিনি কলকাতায় গমন করেন। দেশভাগ তাঁকে তাঁর জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে যে দ্বন্দ্বের সূচনা করে তা একটি স্থায়ী রূপ লাভ করে। ফলে, বিভাগের স্বীকৃতিতে উন্মূল মানুষদের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা পতিত হয় অস্তিত্বের অধারাবাহিকতায়। নিজেরে অতীত থেকে এই মানুষগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে, তারা নিজের কাছেই নিজেকে প্রমাণ করতে বাধ্য হয়ে পড়ে। মানুষের স্বকীয় সত্তা তার শূন্যতা অতিক্রম করতে অপর সত্তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় উপনীত হয়। এমনই বিচ্ছিন্ন একটি ব্যক্তিসত্তা কর্ণ। সকল যোগ্যতার অধিকারী হয়েও আত্মপরিচয়হীন সে। তাই ‘সব হত্যাই ভ্রাতৃহত্যা’ জেনেও, কর্ণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। কর্ণ মনে করে, ‘আমার পরাজয়ে আমি ধন্য’। যখন অর্জুনকে কৃষ্ণ ত্যাগ করে যান তখন এই দারিদ্র্য তাঁর ঐশ্বর্যের মাঝেই ছিল[iv] কিন্তু কর্ণের নিজের পরাজয়ই ছিল তার জয়। কারণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সকলেই পরাজিত হবে। কেবল কর্ণ জয়ী কারণ, কর্ণকে পরাজিত করবে স্বয়ং বিশ্বম্ভর কৃষ্ণ। আত্মপরিচয়হীনতা কর্ণের এমন অপ্রতিরোদ্ধ উদ্দোমের উৎস। এই পরিচয়শূন্যতা, অস্তিত্বহীনতার কারণ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত যুদ্ধ। যতই যুদ্ধের মধ্যদিয়ে উন্মূল ব্যক্তিসত্তার প্রাবল্য স্বীকৃত হোক, বুদ্ধদেব বসু এই যুদ্ধের প্রবল বিরোধী। প্রথম পার্থ নাটকের অন্ত্যে যুদ্ধের অনিবার্যতা অনুভব করে দ্বিতীয় বৃদ্ধের জবানিতে নাট্যকার ঘোষণা করেন :

কেউ কেউ কামনা করেন মহত্ত্ব—মৃত্যুর মূল্যেও।
মানি, তাঁরা শ্রদ্ধেয়। কিন্তু, আমি তাঁদের ভয় করি।
আমি বলি, তারাই ধন্য, যারা সাধারণ,
যাদের চরম লক্ষ্য সহজ সুখ, সাংসারিক তৃপ্তি—
তাদের জন্যই মানব বংশ আবহমান।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্কট উপলব্ধি করে বুদ্ধদেব বসু একটি সাধারণ জীবনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন, কিন্তু সেক্ষেত্রেও তিনি শাশ্বত জীবনবোধেরই অনুসারী।

ভারতীয় ঐতিহ্যের বোধ এবং জীবনবোধের চিরন্তন সত্য বুদ্ধদেব বসুর শিল্পীমানসকে গঠন করে। কাব্যনাট্য রচনায় তিনি পুরাণকে গ্রহণ করেন তাঁর ঐতিহ্যসচেতন মননের কারণেই। পুরাণ একটি জাতির সার্বিক দর্শনকেই ধারণ করে। ফলে, তিনি আধুনিক মানসিকতার রূপায়নে পুরাণের ব্যবহার করলেও তা সমকালকেই প্রবলভাবে অভিব্যক্ত করে। ব্যক্তিসত্তার গতিপ্রকৃতির গভীরতা অন্বেষণের সূত্রে বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য পরিব্যাপ্ত রাষ্ট্রচিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়। রবীন্দ্রবলয় অতিক্রমণ করে বাংলা সাহিত্যকে আরো বেশি বিষয়নিষ্ঠ ও শিল্পনিষ্ঠ করে তুলতে তিনি পুরাণের গভীরেই স্থাপন করেন যুক্তিনির্ভর ঈশ্বরহীন মানুষকে। কাব্যনাট্যের ভূমিতে এ মানুষদের অস্তিত্বশীল করে তুলতে যে রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত নির্মিত হয় তা বুদ্ধদেব বসুর রাষ্ট্রদর্শনকে প্রতিফলিত করে। বুদ্ধদেব বসুর এই রাষ্ট্রদর্শন একটি নির্বাসনহীন, নিরবচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তার আবাসস্থল নির্মাণ করে। অস্তিত্বসচেতন ও চিরন্তন সত্তার পরিপূরক রাষ্ট্ররূপই বুদ্ধদেব বসুর রাষ্ট্রদর্শন।

তথ্যসূত্র :

১. William Wordsworth তাঁর ‘Preface to Lyrical Ballads’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘For all good poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: and though this be true, Poems to which any value can be attached were never produced on any variety of subjects but by a man who, being possessed of more than usual organic sensibility, had also thought long and deeply.’ https://faculty.csbsju.edu/dbeach/beautytruth/Wordsworth-PrefaceLB.pdf.,P.4.
২ . আব্দুল মান্নান সৈয়দ, “বুদ্ধদেব বসু: প্রকৃতি ও সংস্কৃতি”, ‘দশ দিগন্তের দ্রষ্টা’, প্রবন্ধসংগ্রহ ১, ১ম সং., ঢাকা: অনন্যা, ২০১০, পৃ.৭৪।
৩ . বেগম আখতার কামাল (সম্পা.), বুদ্ধদেব বসু নির্বাচিত প্রবন্ধসমগ্র, ১ম সং., ঢাকা: অবসর, ২০১৪, পৃ.চৌদ্দ।
৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড, তয় সং., কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৩৪৮।
৫ . প্রাগুক্ত, পৃ.১৩০।
৬. শৈলরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘সত্তা স্বরূপতঃ যা, তা-ই স্বরূপ-সত্তা(in-itself)। স্বরূপ-সত্তা বলতে সার্ত্র সত্তার বহুবিধ, অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের প্রাচুর্যপূর্ণ—সামগ্রিক রূপটিকেই বোঝাতে চেয়েছেন।এই সত্তা শুধুমাত্র ‘আছে’ (Is), এবং সে নির্বিশেষ (indeterminet)।’

     শৈলেরঞ্জন ভট্টাচার্য, ‘জাঁ-পল সার্ত্রের দৃষ্টিতে সত্তার বিভিন্ন রূপ’, জাঁ-পল সার্ত্র, সম্পা. বীতশোক ভট্টাচার্য ও সুবল সামন্ত, কলকাতা:এবং মুশায়রা, ২০১৭, পৃ. ১৪৫।
৭ . নির্বিশেষ সত্তা মূলত সত্তার চিরকালীন বোধকে নির্দেশ করে।
৮ . বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রশক্তিকে স্বীকার করে লেখেন, ‘তিনি সরল শুধু উপর-স্তরে, শুধু আপতিকরূপে, কিন্তু গভীর দেশে অনিশ্চিত ও কুটিল; স্রেতে, প্রতিস্রোতে আবার নিত্যমথিত; আরো গভীরে ঝড়ের জন্মস্থল, আবর হয়তো এমনকি—খরদন্ত মকর-নক্রের দুঃস্বপ্ন নীড়।…বাংলা ভাষায় তিনি কবিতা লেখার কাজটি অনেক বেশি কঠিন করে দিয়েছেন। একজনের বেশি রবীন্দ্রনাথ সম্ভব নয়; তাঁর পরে কবিতা লিখতে হলে এমন কাজ বেছে নিতে হবে যে-কাজ তিনি করেননি; তুলনায় তা ক্ষুদ্র হলে- ক্ষুদ্র হবারই সম্ভাবনা- তাই নিয়ে তৃপ্ত থাকা চাই।’

 বুদ্ধদেব বসু, “রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক”, সাহিত্যচর্চা, ৮ম সং., কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০১৫, পৃ. ১০৭।
৯ . বুদ্ধদেব বসু, শার্ল বোদলোয়ার তাঁর কবিতা, ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০১৭, পৃ. ৩৪
১০ .তদেব।
১১[1]. তদেব।
১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।
১৩. মাহবুব সাদিক, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা বিষয় ও প্রকরণ, ১ম পুনর্মু., ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১১, পৃ. ১৩।
১৪. বুদ্ধদেব বসু, ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’, সম্পা. বিশ্বজিৎ ঘোষ, বুদ্ধদেব বসু কাব্যনাট্যসমগ্র, ১ম সং., ঢাকা: অবসর, পৃ. ৭৮।
১৫ . প্রাগুক্ত, পৃ.৭৯।
১৬. প্রাগুক্ত, পৃ.৪।
১৭ . মাহবুব সাদিক, বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্য একালের জীবনভাষ্য, ১ম সং., ঢাকা: নবযুগ, ২০০৯, পৃ.৩৪।
১৮ . Collective unconsciousness বা ‘যৌথ অবচেতন’ ধারণার প্রবক্তা কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং [Carl Jung:1885-1961]। ইয়ুঙের মতে, ‘সমষ্টিগত অবচেতনের হাইপোথিসিস সেই বর্গের অন্তর্গত যা লোকে প্রথমে আশ্চর্য মনে করে কিন্তু অচিরেই তাকে অধিগত করে ও পরিচিত ধারণার মত করে ব্যবহার করে। সাধারণভাবে সমষ্টিগত অবচেতনের ধারণার ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। অবচেতনের দার্শনিক ধারণার পর, কারুস এবং ফন হার্টমান যে আকার প্রদান করেন, তা বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের ছাপিয়ে যাওয়া ঢেউয়ে তলিয়ে যায়, কোনোভাবে পিছনে একটা বুদ্বুদ রেখে গিয়ে, তা পুনরায় আবির্ভূত হয়।’
কার্ল ‍গুস্তাভ ইয়ুং, চারটে আর্কেটাইপ, অনূ. শামসুদ্দীন চৌধুরী, ১ম সং., ঢাকা: বর্ণায়ন, ২০১৫, পৃ.১৫।
১৯ . ব্যক্তি যখন বিষয়বস্তুর কারণে এবং পরার্থ সত্তার সাপেক্ষে স্বনির্ভর সত্তা থেকে ক্রমে স্বরূপ সত্তার দিকে ধাবিত হয় এবং এই যাত্রা সম্পর্কে সচেতন থাকে তখন তাকে জ্যাঁ পল সার্ত্রে চিন্তানুসারে অস্তিত্বচেতনা বলা হয়।
    Hazel E. Barnes (Trans.), Jean Paul Satre Bing and Nothingness, https://archive.org/.../in.../2015.69160.Jean-paul-Sartre-Being-And-Nothingness_djvu.text, p.78.

২০ . বুদ্ধদেব বসু, ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’, প্রাগুক্ত, পৃ.১২।
২১ . সময়, স্থান এবং পরিস্থিতি অনুসারে যে সিদ্ধান্ত সকল মানুষ এবং সব কিছুর জন্য অধিক মঙ্গলময় বা ইতিবাচক হয় তাকে বলা হয় ন্যায্যতা। মহাভারতে ধর্মের অভিধায় সর্বত্র ন্যায্যতাই প্রতিষ্ঠিত হয়।
২২ . বুদ্ধদেব বসু, ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’, প্রাগুক্ত, পৃ.৭৮।
২৩ . প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৪।
২৪ . T.S. Eliot, `Tradition and individual talent’, Selected Essays, London: FABER   AND FABER LIMITED, p.14.
২৫ . T.S. Eliot, `Tradition and individual talent’, p.15.
২৬ . বুদ্ধদেব বসু, ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৩।
২৭ . প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৬।
২৮ . জগন্নাথ ঘোষ, নাট্য শিল্পী বুদ্ধদেব বসু, ১ম সং., কলকাতা: করুণা প্রকাশ, ১৯৯৮, পৃ. ৫০।
২৯ . এডওয়ার সাইদ তাঁর `Reflection on Exile’ প্রবন্ধে বলেন, ‘exile is irremediably secular and unbearably historical; that it is produced by human beings for other human beings; and that, like death but without death’s ultimate mercy, it has torn millions of people from the nourishment of tradition, family, and geography?’.(Edward w. Said, Reflestions on exile and other essays, www.mcrg.ac.in/.../65.Said,%20Edward,%20Reflections_on_Exile_and_Other_Essay(BookFi)p.181.
৩০ . মীনাক্ষী দত্ত, স্মৃতিতে, চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর সারস্বত গোষ্ঠী, ১ম সং., কলকাতা : প্রতিভাস, ২০১১, পৃ. ১৫৮।
৩১ . ভূঁইয়া ইকবাল, বুদ্ধদেব বসু, ১ম সং., কলকাতা : প্রতিভাস, ২০১৪, পৃ. ১১।
৩২ . প্রাগুক্ত, পৃ. ১২।
৩৩ . প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩।
৩৪ . বুদ্ধদেব বসু, ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯৬।
৩৫ . প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০১।
৩৬ . বুদ্ধদেব বসু, ‘ঐশ্বর্য দারিদ্র্য : দারিদ্র্যের ঐশ্বর্য’, ‘মহাভারতের কথা’, বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধসমগ্র ৪, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০১৫, পৃ. ৫৬৫।
৩৭ . প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০২।

 

 

/জেডএস/
সম্পর্কিত
দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা ঘোষণা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা ঘোষণা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
দুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
সমকালীন অস্ট্রেলিয়ান গল্পদুনিয়ার মজদুর এক হও ।। জুলি কোহ
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
৪৫ বছরের লেখালিখির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফোটা একগুচ্ছ গোলাপ
জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা ঘোষণা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা ঘোষণা
মাসুদ রানার চেয়েও অধিক
মাসুদ রানার চেয়েও অধিক
© 2022 Bangla Tribune