X
সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২
২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

বদরুদ্দীন উমরের ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা ।। একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

ড. এম আবদুল আলীম
২২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:৫৫আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:৫৫

বামপন্থী রাজনীতিবিদ, মার্কসীয় তাত্ত্বিক ও ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসকার বদরুদ্দীন উমর নব্বই বছরে পদার্পণ করেছেন। এই দীর্ঘ জীবনে বহুমাত্রিক কর্মের মধ্যে লেখালেখি এবং গবেষণাকর্মই তাঁর প্রধান পরিচয় দাঁড় করিয়েছে। তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিকে সমাজবীক্ষণ করেছেন। সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাম্প্রদায়িকতা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বিদ্যাসাগর, কৃষক আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, সমকালীন দেশ-কাল-বিশ্ব প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। সমাজবদলের আশায় জীবনভর মার্কসবাদের লাল ঝান্ডা উড়িয়েছেন। কয়েক দশক ধরে সম্পাদনা করছেন ‘সংস্কৃতি’ নামের পত্রিকা। এ লেখায় আলোচনা-বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বদরুদ্দীন উমরের ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা-প্রসঙ্গ। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চায় বদরুদ্দীন উমরের হাতেখড়ি ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে; এবং সেটা ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা রচনার মাধ্যমে। ১৯৫২ সালের ২৫শে মে ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকায় লিখিত ‘পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। পরবর্তীকালে রচনা ও সম্পাদনা করেছেন ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক ছয়টি গ্রন্থ; সে-গ্রন্থগুলো হলো―‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (১ম খণ্ড ১৯৭০, ২য় খণ্ড ১৯৭৬, ৩য় খণ্ড ১৯৮১), ‘ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ (১৯৮০), ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ (১৯৮১), ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল’ (১ম খণ্ড ১৯৮৪, ২য় খণ্ড ১৯৮৫)। এছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন এবং একুশের চেতনা নিয়ে তাঁর বেশকিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ১৯৯৮ সালে ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর “ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতকরণ ও তার নায়কেরা” শিরোনামের প্রবন্ধটির কথা।

    রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের একেবারে শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিসে’র সঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল। তাঁর পিতা আবুল হাশিম ছিলেন ভাষা-আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী অন্যতম শীর্ষ নেতা। যিনি ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২০শে ফেব্রুয়ারি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে ভাষা-আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়ায় অপচেষ্টা চালালে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের নবাবপুর রোডের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যে সভা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে ভাষা-আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণী সভাগুলোতে যোগ দেন। আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে তাঁকে গ্রেফতার করে দীর্ঘ সময় বিনাবিচারে কারাবন্দি করে রাখা হয়। কীর্তিমান রাজনীতিক আবুল হাশিমের পুত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র বদরুদ্দীন উমর ভাষা-আন্দোলনের মিছিল-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন এবং শুরু থেকেই এ আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে ‘অবলোকন’ করেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর এর পক্ষ থেকে একটি ইস্তেহার প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে সে দায়িত্ব বর্তায় বদরুদ্দীন উমরের ওপর। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে তাঁর ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ নামে ইস্তেহারটির দশ হাজার কপি মুদ্রিত হয়। তবে অল্প কয়েকটি বিলি করার পরই তা পুলিশের হেফাজতে নিয়ে বাজেয়াপ্ত করা হয়।

    ১৯৫২ সালের ২৫ মে ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরস্থিতি’ শিরোনামে বদরুদ্দীন উমরের যে-প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়, তাতে তিনি রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে পর্যালোচনা করে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কীভাবে গণস্বার্থকে পদ্দলিত করে শ্রেণিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং জনগণ কীভাবে তার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে, তা পর্যালোচনা করেছেন উমর। ভাষা-আন্দোলনকে তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বঞ্চনা ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা থেকে সৃষ্ট আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ইসলামের দোহাই দিয়ে জনগণের অধিকার হরণ করে যে অনৈসলামিক কর্মকা- করছে, তাও তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তিনি মুমূর্ষু রোগীর উদাহরণ টেনে লিখেছেন, ‘আগত মৃত্যুর কবল হইতে মকর ধ্বজ প্রয়োগ করিয়া রোগীকে যেমন বেশিক্ষণ ঠেকাইয়া রাখা যায় না ঠিক তেমনি ভাবে গণমন হইতে সর্বপ্রকারে বিচ্ছিন্ন হইয়া নিরাপত্তা আইনের নামে সরকারি মকর ধ্বজ প্রয়োগ করিয়া মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে যে তাহাদের এই অনৈসলামী শাসন বেশি দিন কায়েম থাকিবে তাহা হইলে অত্যন্ত আকস্মিকতার মধ্যেই আমাদের এই ধারণার অসারতার সহিত তাহাদের পরিচয় ঘটিবে না, ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হইবে মাত্র।’

দুই.
ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চায় বদরুদ্দীন উমরের সেরা কাজ ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থটি। তিন খণ্ডে রচিত এ গ্রন্থে সর্বপ্রথম ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিসরে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ভাষা-আন্দোলনের পটভূমি হিসেবে এতে পূর্ববঙ্গের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক চালচিত্রের অনুপুঙ্ক্ষ বয়ান বিপুল তথ্যসম্ভারে উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের দশটি পরিচ্ছেদে ভাষা-আন্দোলনের সূত্রপাত থেকে আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ, আরবি হরফে বাংলা চালুর অপপ্রয়াস, পূর্ববাংলা ভাষা-কমিটির কার্যক্রম এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস ও এ রাজনৈতিক দলের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে ছয়টি পরিচ্ছেদে পূর্ববঙ্গের দুর্ভিক্ষ, জমিদারি ব্যবস্থা ও প্রজাস্বত্ব আইন, কৃষক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, জুলুম ও প্রতিরোধ আন্দোলন, মুলনীতিবিরোধী আন্দোলন ইত্যাকার বিষয় স্থান পেয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে রয়েছে পনেরোটি পরিচ্ছেদ। এতে পূর্ববঙ্গের শ্রমিক আন্দোলন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, প্রাথমিক শিক্ষক ধর্মঘট, ছাত্র আন্দোলনের নতুন পর্যায়, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গঠন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা, খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তৃতার প্রতিক্রিয়া, ২০ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির ঘটনাপ্রবাহ, ভাষা-আন্দোলনের পরবর্তী পরিস্থিতি, মার্চ-এপ্রিলের ঘটনাবলি, এলিস কমিশনের কার্যক্রম এবং ভাষা-আন্দোলনের সামগ্রিক মূল্যায়ন করা হয়েছে।

   ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থটি নিবিড়ভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, তিন খণ্ডের সাড়ে এগারো-শ পৃষ্ঠার বইটিতে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ দুই পর্বের ভাষা-আন্দোলনের ঘটনা, সাংগঠনিক প্রয়াস, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা, ভাষাশহীদদের কথা, পত্র-পত্রিকা অবদান ইত্যাকার বিষয় স্থান পেয়েছে মাত্র সাড়ে তিন-শ পৃষ্ঠাব্যাপী। বাকী আট-শ পৃষ্ঠায় রয়েছে পূর্ববঙ্গের তৎকালীন রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবরণ। এই যে ভাষা-আন্দোলনের চেয়ে তার পটভূমি ও তৎকালীন সমাজ-রাজনীতিকে তিনি বড় ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন, সে-প্র্রসঙ্গে নিজেই বলেছেন : ‘ভাষা আন্দোলনের ওপর বই করার চিন্তা প্রথমে আমি করিনি। ... আমি চিন্তা করেছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিকাশের ইতিহাস লিখব। ভাবলাম কারও কারও সঙ্গে আলাপ করি। ... এক পারিবারিক বন্ধু বললেন, আনি যে কাজটা করছেন, সেটাকে ভাষা আন্দোলনের ওপর দাঁড় করান। মনে করলাম বড়জোর শ শানেক পৃষ্ঠার বই হবে। কাজে কিছু দূর অগ্রসর হয়ে দেখলাম, ক্যানভাস তো অনেক বিশাল! যা বলা হয়, ঘটনা তো সেভাবে না। ’৫২ সালে আন্দোলন হলো, গুলি হলো, অভ্যুত্থানের মতো অবস্থা হলো। গ্রামের কৃষকেরা পর্যন্ত আন্দোলিত হলো। তা থেকে মনে হলো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কৃষকদের বড় রকমের মোহভঙ্গ হলো, তারা দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত হলো। আরেকটা জিনিস লক্ষ করে দেখলাম, ’৪৮ সালে ভাষার মিছিল পুরান ঢাকার দিকে যেতে পারত না, ’৫২ সালে পুরান ঢাকা থেকেই শক্তি-সহায়তা এল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরমানুষের ক্ষোভও দানা বাঁধল। রূপান্তরটা আমার মনে দাগ কাটল। দুই সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে কী ঘটল, সেটা আমাকে দেখতে হবে। স্ফুলিঙ্গ কীভাবে সমগ্র দেশময় দাবানল সৃষ্টি করল, সেটা দেখতে চাইলাম। এই বড় পটভূমির মধ্যে আমি ভাষা আন্দোলনকে ধরতে চাইলাম।’

    গণ-আজাদী লীগ গঠন (জুলাই ১৯৪৭) এবং এ সংগঠনের শিক্ষা ও ভাষা বিষয়ক দাবিকে বদরুদ্দীন উমর রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সূত্রপাত বলে অভিহিত করেছেন। এ সংগঠনই সর্বপ্রথম তাঁদের মেনিফেস্টোতে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান এবং বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলে। এর পর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দীন আহমদের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রতিবাদী প্রবন্ধের (‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’) বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এরপর গণতান্ত্রিক যুবলীগ (সেপ্টেম্বর ১৯৪৭), তমদ্দুন মজলিস (সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) প্রভৃতি সংগঠনের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক বক্তব্য এবং এর দাবিতে পালন করা বিভিন্ন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রদের প্রথম সভা আয়োজন, করাচীর শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা বিষয়ে প্রস্তাব পাশ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের জনসভা ভণ্ডুল, পলাশি ব্যারাকে উর্দুপ্রেমীদের হামলা, ওয়ার্কার্স ক্যাম্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের রশিদ বই নিয়ে ঝামেলা, প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও এর কর্মকা-, গণপরিষদে ভাষা-বিষয়ক প্রস্তাব নিয়ে তুল-কালাম কা- এবং তার প্রতিক্রিয়ায় রাজপথে আন্দোলন, সিলেটের ভাষা-আন্দোলনকারীদের ওপর প্রতিক্রিয়াশীলদের হামলা, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন, ১১ মার্চ ধর্মঘট, ছাত্রনেতৃবৃন্দের সঙ্গে খাজা নাজিমুদ্দীনের চুক্তি, জিন্নাহর ঢাকায় আগমন এবং রেসকোর্স ও কাজন হলের সমাবর্তন-সভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা প্রদান, ছাত্রনেতৃবৃন্দের সঙ্গে জিন্নাহর বৈঠক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন; এভাবে ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বের (১৯৪৮) ইতিহাস তুলে ধরেছেন। দ্বিতীয়, অর্থাৎ―চূড়ান্ত পর্বের (১৯৫২) ভাষা-আন্দোলনের সূত্রপাত হিসেবে বদরুদ্দীন উমর উল্লেখ করেছেন পল্টন ময়দানের জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্য প্রদানের পর থেকে। এর আগে আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের উদ্যোগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও এর সঙ্গে সম্পৃক্তদের কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছেন। খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন, কমিউনিস্ট পার্টির বিবৃতি, ৪ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট, পতাকা দিবস, কমিউনিস্ট পার্টির সার্কুলার-ইশতেহার, পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন, ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক, ২১ ফেব্রুয়ারি আতলার সমাবেশ ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, পুলিশের গুলিবর্ষণ ও হতাহতের ঘটনা, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরিষদের ভেতর এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে মার্চ-এপ্রিলের ঘটনাবলির বিববণ বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন (১৯৫৩) এবং আবুল কাসেমের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ (১৯৫২) গ্রন্থে ভাষা-আন্দোলনের নানাপ্রসঙ্গ স্থান পেলেও বদরুদ্দীন উমরের আগে আর কোনো গ্রন্থে এতো সুনির্দিষ্টভাবে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি। এখানেই গ্রন্থটির বিশেষত্ব।

তিন.
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটি গবেষক-পাঠকদের সমাদর পেয়েছে। তবে গভীরভাবে পাঠ এবং নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে এর নানা সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হিসেবে তিনি গণ-আজাদী লীগের উদ্যোগের কথা বলেছেন, বলেছেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দীন আহমদের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ড. মুহমদ শহীদুল্লাহ প্রবন্ধ লেখার কথা। কিন্তু শুরুর আগেও শুরু থাকে বলে একটি কথা আছে, যেমন প্রদীপ জ্বালানোর পূর্বে সলতে পাকাতে হয়! রাজপথে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সূত্রপাতের আগেও কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা এ আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত। প্রাসঙ্গিকভাবে তার কিছু বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো। ইংরেজরা পাঞ্জাব দখল করে ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে। পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮২ সালে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঞ্জাবি ভাষা পড়ানো হলেও পাঞ্জাবি মুসলমানেরা সে ভাষা চর্চা করেনি, এমনকি সেখানকার হিন্দুরাও নয়। সেখানকার মুসলমানেরা উর্দুকে, হিন্দুরা হিন্দিকে এবং শিখরা পাঞ্জাবিকে তাদের সংস্কৃতিচর্চার বাহন করেছে। কবি ইকবাল এবং ফয়েজ আহম্মেদ ফয়েজ মাতৃভাষা পাঞ্জাবি পরিত্যাগ করে উর্দু এবং ফার্সিতে সাহিত্যসাধনা করেছেন। একটি ঘটনা ঘটে ১৮৬৭ সালে। ওই বছর ভারতের বেনারশের হিন্দু নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের প্রধান ভাষা উর্দুর পরিবর্তে তাদের ওপর হিন্দি চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়, যা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মুসলমানদেও উর্দুপ্রীতি বাড়ায়। ‘আশরাফ’ মুসলমানদের প্রতিনিধি নবাব আবদুল লতিফের ‘মোহামেডান লিটিরারি সোসাইটি’র প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্মে বাংলা ভাষার প্রবেশাধিকার না থাকা এবং ১৮৮২ সালে হান্টার কমিশনে উত্থাপিত মতামতে তাঁর বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির মুসলমানদের ভাষা বলে অভিহিত করার বিষয়টি তাৎপর্যবহ। এছাড়া ঔপনিবেশিক শাসনামলে পাঞ্জাবি সৈন্যদের মধ্যে উর্দু ভাষার ব্যবহারের প্রসঙ্গ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উর্দু রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের পেছনে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। পাঞ্জাবি মুসলমানদের উর্দুপ্রীতির আরও একটি কারণ ছিল, তা হলো―ব্রিটিশ শাসনামলে পাঞ্জাবি মুসলমানেরা উল্লেখযোগ্য হারে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। তাদের সাধারণ ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিলো রোমান-উর্দু, অর্থাৎ রোমান হরফে লেখা উর্দু ভাষাকে। ঐ সময় ব্রিটিশ আইসিএস কর্মকর্তাদের মধ্যেও রোমান-উর্দুর প্রচলন ছিলো। বিলেতের অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডে ডাব্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে রোমান-উর্দু শেখার ব্যবস্থা ছিলো। পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাববিস্তারী পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী পরবর্তীকালে উর্দুকে যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রচলনের প্রয়াস চালিয়েছিলো, তার পেছনেও এসব ঘটনা বিশেষভাবে কাজ করেছে। আরেকটি প্রসঙ্গ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, তা হলো―স্যাডলার কমিশনের সুপারিশে ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রথম ম্যাট্রিকুলেশন (প্রবেশিকা) পরীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়। অর্থাৎ, পাকিস্তান হওয়ার আগেই ব্রিটিশরা বাংলা প্রদেশে বাংলা ভাষাকে স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম করেছিলেন। বাঙালির মাতৃভাষাচর্চা এবং এর প্রতি প্রীতিবোধ জাগ্রত হতে এ উদ্যোগ বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

    ইতিহাসে দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড সর্বপ্রথম তাঁর A Grammer of Bengal Language গ্রন্থে ‘সরকারি ও বেসরকারি কাজে বাংলা ভাষা বিশেষ উপযোগী’ বলে উল্লেখ করেন। নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯১১ সালে এক ভাষণে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলাকে গভীরভাবে ধারণ করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯১৭ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির দ্বিতীয় সাহিত্য-সম্মিলনে সভাপতির অভিভাষণে প্রশ্ন রাখেন : ‘মাতৃভাষার উন্নতি ব্যতীত কোনও জাতি কখনও কি বড় হইতে পারিয়াছে?’ তিনি ১৯১৮ সালে ‘ভারতের সাধারণ ভাষা’ নামক আরেকটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেন : ‘সাহিত্যের শক্তির দিক দিয়া বিচার করিলে ভারতে একটিমাত্র ভাষা সাধারণ ভাষার দাবী করিতে পারে।’ ১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য এক লিখিত প্রস্তাবে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী বলেন, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক না-কেন, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে। ১৯২৭ সালে তৎকালীন আসাম ব্যবস্থাপক সভায় সিলেট থেকে নির্বাচিত সদস্য আবদুল হামিদ চৌধুরী বাংলা ভাষায় প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর পর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উর্দু বনাম বাংলা বিতর্কে বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো অভিমত তুলে ধরেন সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, কমরেড মুজফ্ফর আহমদসহ অনেক চিন্তাবিদ। মওলানা আকরাম খাঁ ১৯৩৭ সালে ‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে বলেন, ‘বাঙ্গালা সব দিক দিক দিয়াই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হইবার দাবী করিতে পারে।’ ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন প্রাদেশিক কাউন্সিলের অধিবেশনে। কবি ফররুখ আহমদ তাঁর সনেট এবং প্রবন্ধে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরে লেখেন, ‘বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’ ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান হায়দ্রাবাদে মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মোছলেমিনের বার্ষিক অধিবেশনে ঘোষণা করেন, ‘উর্দ্দুই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হইবে।’ চৌধুরী খালিকুজ্জামানের বক্তব্যে কোনো প্রতিবাদ হয়েছিলো কিনা তা জানা যায় না; তবে ১৯৪৭ সালের জুন মাস থেকেই পূর্ববঙ্গের সচেতন বুদ্ধিজীবীগণ রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য অভিমত যেমন তুলে ধরেন, তেমনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করেন। প্রথম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় প্রাবন্ধিক আবদুল হকের লেখনীতে। তিনি ১৯৪৭ সালের ২২ ও ২৩ জুন কলকাতার ইত্তেহাদ পত্রিকায় দুই কিস্তিতে ‘বাংলা-ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’, ৩০ জুন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, ২৭ জুলাই পুনরায় ইত্তেহাদ পত্রিকায় ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’ এবং ৩ আগস্ট বেগম পত্রিকায় ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামে একাধারে চারটি প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৪৭ সালের ২৭ জুন দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এ বছর ৩০ জুন আজাদ পত্রিকায় ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে বিভিন্ন মত ও পন্থার মানুষের বিতর্ক ছাপা হয়। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমি বিস্তারিত পরিসরে তুলে ধরলেও বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে বাংলা ভাষা ও উর্দু ভাষা-সংক্রান্ত এই ঐতিহাতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ স্থান পায়নি, যা এ ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ। 

চার.
‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ অর্থাৎ ‘পর্যালোচনা’ অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে বদরুদ্দীন উমর ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস-অনুসন্ধানের স্বরূপ তুলে ধরে এ আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলন এবং বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে তিনি বায়ান্নর আন্দোলন কেন ব্যাপকতা লাভ করেছিল, তা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, দেশভাগের পূর্বে এ অঞ্চলের মানুষ যে-স্বপ্ন দেখেছিল, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের সর্বৈব শোষণের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণই ছিল ভাষা-আন্দোলনের গণচরিত্র লাভের প্রধান কারণ। পাকিস্তানি সা¤্রাজ্যবাদকে তিনি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি নয়া-উপনিবেশ বলে অভিহিত করেছেন। তবে ভাষা-আন্দোলন যে সা¤্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন ছিল না, তাও স্পষ্ট করে বলেছেন। সংগঠন হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি ও তাঁর ফ্রন্ট সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগকে তিনি ভাষা-আন্দোলনের মূল সংগঠন বলে অভিহিত করেছেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অবদান পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে প্রধান হলেও তখনো পর্যন্ত তার সাংগঠনিক শক্তি তেমন উল্লেখযোগ্য ছিলো না এবং কর্মী সংখ্যাও ছিলো অল্প। মুসলিম ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্র সংগঠন হলেও যুবলীগের তুলনায় তার সাংগঠনিক শক্তি এবং উদ্যোগও কম ছিলো।’ ভাষা-আন্দোলনের মধ্যে তিনি অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করেছেন। ছাত্র ইউনিয়ন এবং গণতন্ত্রী পার্টির মতো অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার সংগঠনের জন্ম ভাষা-আন্দোলনের ফলেই সম্ভব হয়েছে বলে তাঁর ধারণা। কমিউনিস্ট পার্টি একুশের চেতনার মূল স্পিরিট ধরতে পারেনি, ফলে ভাষা-আন্দোলন পরবর্তীকালে জনগণকে সংগঠিত করে একটি লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। যা আওয়ামী লীগ পেরেছিল, ফলে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে দলটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে গেছে। এ আন্দোলনকে বদরুদ্দীন উমর ভাষা-সম্পর্কিত প্রশ্ন এবং ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। একে তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সামগ্রিক দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছেন।

    বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা-আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটি আদ্যোপান্ত পাঠ করলে দেখা যায়, বহু ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক সত্তার কাছে গবেষক সত্তা পরাভূত হয়েছে। এ গ্রন্থ রচনার কালে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর কমিউনিস্ট। নেপাল নাগের প্রেরণায় কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিকে ধ্যান-জ্ঞান করে মার্কসবাদকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে কমিউনিস্ট পার্টি এবং এর ফ্রন্ট সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতা-কর্মীদের অবদানকে তিনি বড় করে দেখেছেন। একটি বিষয় সচেতন কিংবা অসচেতন, যেভাবেই হোক-না-কেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও এর নেতা-কর্মীদের ভাষা-আন্দোলনে অবদান এড়িয়ে গেছেন, উপেক্ষা করেছেন এবং সময় সময় বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, তাঁর এ এমন প্রয়াসের বিরুদ্ধে মযাহারুল ইসলাম, আবদুল গাফফার চৌধুরীসহ যাঁরা মসিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁরাও অনেক সময় করেছেন অতিরঞ্জন। ফলে বদরুদ্দীন উমর এবং তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে ইতিহাসের বিকৃতি যেমন ঘটেছে, তেমনি ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের নানা বিষয়ে নতুন প্রজন্মের পাঠক এবং গবেষকগণ পড়েছেন গোলকধাঁধায়। তাঁর গ্রন্থসহ প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যায়, ‘সংস্কৃতি’ (সপ্তম বর্ষ, সংখ্যা মার্চ ১৯৯৮) পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতকরণ ও তার নায়কেরা’র কথা। এগুলোতে ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস-বিকৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই ইতিহাস-বিকৃতি ঘটিয়েছেন। এ প্রবন্ধে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা-আন্দোলনে অবদান নিয়ে তিনি যা লিখেছেন, তা বস্তুনিষ্ঠ নয়। আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের অবদান সম্পর্কে যা লিখেছেন, তা ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করা ব্যতীত আর কিছু নয়। তিনি লিখেছেন : ‘বস্তুতঃপক্ষে সে সময়ে আওয়ামী লীগের নিজেরই তেমন কোনও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি ছিল না। সে কারণে আওয়ামী লীগের কোন মুখ্য তো নয়ই, এমনকি কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও যে সে আন্দোলনে ছিল, এমন বলা চলে না, যদিও মুসলিম ছাত্রলীগের বিভিন্ন স্তরের কিছু কর্মী ও নেতা তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।’ বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে।

    পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়; এ অঞ্চলে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কৃষক-প্রজা পার্টি, রাডিক্যাল ডেমোক্যাটিক পার্টি, স্বরাজ পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক প্রভৃতি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বিদ্যমান ছিল। তবে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টি বেশি সক্রিয় ছিল। চল্লিশের দশকে পূর্ববঙ্গে একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগের। এর মূলে ছিল পাকিস্তান আন্দোলন এবং আবুল হাশিম ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো জাতীয় নেতার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং গণমুখী রাজনৈতিক কর্মসূচি। কর্মী শিবিরের মাধ্যমে তাঁরা তরুণদের সংগঠিত করেন। মূলত এ দু-নেতার কারণেই ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে এ অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয় এবং মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় খাজা নাজিমুদ্দীন এবং মওলানা আকরম খাঁর প্রভাবে আবুল হাশিম এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তাঁদের অনুসারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। নানান টানাপড়েনে শেষ পর্যন্ত এই দুই নেতার অনুসারীরা গড়ে তোলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (১৯৪৮) এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (১৯৪৯)। আগে থেকেই জনভিত্তি থাকায় এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ নেতার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সম্মোহনী নেতৃত্বের গুণে দ্রুতই সংগঠন দুটি পূর্ববঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, ছাত্র ফেডারেশনের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ব্যাপক অবদান রাখে। পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পর গড়ে ওঠা ভাষা-আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাইমউদ্দীন আহমদ; সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, আবদুল আওয়াল, এম এ ওয়াদুদ প্রমুখ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন, ১১ই মার্চের ধর্মঘট পালন, খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন, জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিবাদ, পরিষদ ভবন ঘেরাও প্রভৃতি কর্মসূচিতে এ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় ছাত্রসভা। সভাশেষে পরিষদ ভবন ঘেরাও করা হয়। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ছাড়াও জুলুম-প্রতিরোধ আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নেতৃত্ব দেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৪৯ সালের মূলনীতি-বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ব্যাপক অবদান রাখেন। এছাড়া খাদ্য আন্দোলনসহ ভাষা-আন্দোলনের সমসাময়িক বিভিন্ন আন্দোলন সংগঠনে এ সংগঠন দুটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আরবি হরফ প্রচলনের বিরুদ্ধে তাঁরা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন, ছাত্রলীগ সভাপতি পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন এবং বিবৃতি দেন। ১৯৫১ সালে আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ওই সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান। কাজেই ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত ছিল না বলে বদরুদ্দীন উমর যা লিখেছেন, তা ইতিহাসনিষ্ঠ নয়।

    ১৯৫২ সালের ২৭শে জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানের জনসভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা প্রত্যয় ব্যক্ত করলে ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। খাজা নাজিমুদ্দীন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হামিদ খান ভাসানী সম্পর্কে বিষোদ্গার করেন। এর প্রতিবাদে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বিবৃতি দেন। ৩১শে জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি (সূত্র : আবুল হাশিমের স্মৃতিচারণ) এবং ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। জেলাভিত্তিক সংগ্রাম পরিষদগুলোর কাঠামোতেও একই কমিটিতে সভাপতি এবং আহ্বায়কের নাম পাওয়া যায়। ২১শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণার পরে জেলায় জেলায় ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করতে সফরে বেরিয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দও জোর তৎপরতা শুরু করেন। নিরাপত্তা বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান এ সময় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি ছাত্রনেতা খালেক নেওয়াজ খান, অলি আহাদ, এম এ ওয়াদুদ, জিল্লুর রহমান, আবদুস সামাদ আজাদ প্রমুখের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনে নির্দেশনা দেন। (সূত্র : গোয়েন্দা প্রতিবেদন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’) শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমেদের অনশনে আন্দোলনে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। ১৪৪-ধারা ভঙ্গ করার প্রশ্নে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকলেও ছাত্ররা ১৪৪-ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নামলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তাতে শামিল হন। ২১ ফেব্রুয়ারির মূল কর্মসূচিতে একটি দাবি ছিল আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি। ২১শে ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হন আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক খন্দকার মুশতাক আহমদ. ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক। ২১শে ফেব্রুয়ারির পরে গ্রেফতার করা হয় ছাত্রলীগের নগর সম্পাদক এম এ ওয়াদুদসহ অনেক নেতা-কর্মীকে। এর পর প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র-সংসদের ভি. পি. এবং ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি গোলাম মাওলাকে এবং পরে আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খানকে আহ্বায়ক করে পুনর্গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর আরেকটি ঘটনা ঘটে; এবং সেটা ঘটে পরিষদের অভ্যন্তরে। শামসুদ্দীন আহমদ, আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, আনোয়ারা খাতুন, খয়রাত হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি পার্টি। তাঁরা পরিষদের ভেতরে-বাইরে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার থাকেন। এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিবৃতি দেন এবং আন্দোলনে নেতা-কর্মীদের করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেন। ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্ব দানে অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বহু নেতা-কর্মীকে। এপ্রিল মাসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যে জেলা প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খান, বক্তৃতা করেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকে। এভাবে অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী মুসলিম নেতা-কর্মীরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন, যা বদরুদ্দীন আহমদ তাঁর গ্রন্থে উপেক্ষা করেছেন। প্রবন্ধের ছোট্ট পরিসরে এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও বিশদ পর্যালোচনা সম্ভব নয়। আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন এ বিষয়ে এ লেখকের রচিত গ্রন্থসমূহ (‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’, কথাপ্রকাশ ২০২০; ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’, বাংলা একাডেমি, ২০২০; ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন’, আগামী প্রকাশনী, ২০২১; ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস’, আগামী প্রকাশনী ২০২১)। বদরুদ্দীন উমর প্রধানত পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক নও-বেলাল’ পত্রিকা, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতাদের সাক্ষাৎকার, কমিউনিস্ট পার্টির দলিলপত্র প্রভৃতির আলোকে তাঁর গ্রন্থের বিষয় সাজিয়েছেন। আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’, দলের ইশেতেহারসমূহ, নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি এবং তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য তথ্য ব্যবহার করেননি। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি মোহাচ্ছন্নতা, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্নতা, অর্থাৎ―একপেশে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থ যতটা বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার দরকার ছিল, তা হয়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনসমূহে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ভাষা-আন্দোলনের যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তাতে ছাত্র লীগ, আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমরের বহু বক্তব্য অসার বলে প্রমাণিত হয়েছে। এতদ্সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের প্রথম গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তীকালে অনেকেই অনুসন্ধান চালালেও বদরুদ্দীন উমরের মতো একনিষ্ঠতার পরিচয় দিতে পারেননি; এ কথা আহমদ রফিক, বশীর আলহেলাল, আনিসুজ্জামান, সফর আলী আখন্দ, হায়াৎ মামুদ, আতিউর রহমান, এম আর মাহবুবসহ যাঁরা এ বিষয়ে গ্রন্থ-রচনা করেছেন, তাঁদের নাম স্মরণ রেখেই বলা যায়।

পাঁচ.
১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছে বদরুদ্দীন উমরের ‘ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ গ্রন্থটি। বিভিন্ন সময়ে রচিত ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ স্থান দিয়েছেন। প্রবন্ধগুলো হলো―‘পূর্ববাঙলায় জাতীয় নির্যাতন ও ভাষা আন্দোলন’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারীর আহ্বান’, ‘জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারী’, ‘ভাষা আন্দোলন ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধিতা’, ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা’, ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা’। এসব প্রবন্ধে উমর তাঁর নিজস্ব ঢঙে ভাষা-আন্দোলন ও একুশের চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা করতে গিয়ে কোন কোন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তার বিবরণ দিয়েছেন। একটি প্রবন্ধে ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে ড. মযহারুল ইসলামের তোলা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার সমস্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনের হাতে এর বিকৃতি ঘটার কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে, তমদ্দুন মজলিস-সংশ্লিষ্টরা যেভাবে এ আন্দোলনের কৃতিত্ব ছিনতাই করতে চেয়েছেন, তার বলিষ্ঠ জবাব দিয়েছেন তিনি। ভাষা-আন্দোলনকে কিছু সংখ্যক ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীর আন্দোলন বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তাও তিনি খণ্ডন করেছেন। এ আন্দোলনকে তিনি পূর্ববঙ্গের জনগণের আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। দেশের মানুষের প্রতি মুসলিম লীগ সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের ফলেই যে ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, এ কথাও তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাতে ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল একটি উপলক্ষ্য মাত্র। তবে উমরের এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণের যথেষ্ট যুক্তি-তথ্য রয়েছে। কারণ, শুরু থেকেই এ আন্দোলন ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ছাত্র-সংগঠনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ও নির্দেশনায় পরিচালিত আন্দোলন। ২১শে ফেব্রুয়ারির পর এ আন্দোলন গণচরিত্র ধারণ করলেও বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে জেলায় জেলায় গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ (১৯৮১) গ্রন্থটি ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনের সময় রচিত পুস্তিকার বিস্তৃত রূপ। গ্রন্থটি কিশোরদের উপযোগী করে রচিত। এতে নতুন বক্তব্য নেই। এ যেন ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থেরই সরলভাষ্য।

ছয়.
বদরুদ্দীন উমর ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল’ (১ম খণ্ড ১৯৮৪, ২য় খণ্ড ১৯৮৫) নমে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। দুই খণ্ডে প্রকাশিত এ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কিত পুস্তিকা, স্মারকলিপি, তদন্ত কমিশন রিপোর্ট, চিঠি-নোট এবং সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। এতে কায়েদে আজমের কাছে প্রেরিত স্মারকলিপি, ভাইস চ্যান্সেলরের বিবৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির প্রস্তাবাবলি, এলিস কমিশনের রিপোর্ট, মওলানা রাগিব আহসানের পাকিসানের ভাষানীতি প্রভৃতি সংকলিত হয়েছে। চিঠি ও নোটের মধ্যে রয়েছে রণেশ দাশগুপ্ত, সুষমা দে, প্রমোদ দাস, আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক, আসহাবউদ্দীন আহমদ, আনিসুজ্জামান, আবদুল ওয়াহাব, জসীম উদদীন এবং কিউ. কিউ. এম. জহুরের চিঠি ও নোট। যাঁদের সাক্ষাৎকার সংকলন করা হয়েছে, তাঁরা হলেন―কামরুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ইমতিয়াজউদ্দীন খান, শামসুদ্দীন আহমদ, অজিতকুমার গুহ, সৈয়দ আলী আহসান, অজয় ভট্টাচার্য, নগেন সরকার, আবদুল হক, খোন্দকার মুশতাক আহমদ, শফিউদ্দিন আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, আবুল কাসেম, শাহেদ আলী, রণেশ দাশগুপ্ত, মাখলুকুর রহমান, শহীদুল্লা কায়সার, তফজ্জল আলী, আবদুল মোতালেব মালেক, হামিদা রহমান, শওকত আলী, ক্যাপ্টেন শাহজাহান, আতাউর রহমান, মোহাম্মদ তোয়াহা, হাশিমউদ্দীন আহমদ, শাহ আজিজুর রহমান, মহিউদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আতাউর রহমান খান, মাহমুদ নূরুল হুদা, আবু সাঈদ মহম্মদ আবদুর রউফ, মাহমুদ আলী, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, সুফিয়া আহমেদ, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ, বদরুল আমীন, শামসুজ্জোহা, আবদুল আউয়াল, ইউসুফ আলী চৌধুরী, নূরুল আমীন, আজিজ আহমেদ, আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আবদুল আউয়াল ভূঁইয়া, কিউ. কিউ. এম জহুর, কাজী মহম্মদ ইদরিস, খায়রুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, সৈয়দ নূরুদ্দীন, মুস্তফা রওশন আলম মুকুল, মাহবুব জামাল জাহেদী, খন্দকার গোলাম মোস্তফা, সাদেক খান, মুজিবুল হক এবং হেদায়েত হোসেন চৌধুরী। সাক্ষাৎকার প্রদানকারীগণ অধিকাংশই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বিধায় এতে বিধৃত তথ্য ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। ভাষা-আন্দোলনের ঘটনা, পক্ষ-বিপক্ষের ব্যক্তির ভূমিকা, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের অবদান প্রভৃতি বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে গ্রন্থটি সহায়ক। কাজটি কষ্টসাধ্য এবং দীর্ঘ শ্রম ও ধৈর্যের ফসল। বদরুদ্দীন উমর এমন দুঃসাধ্য কাজটি না করলে ভাষা-আন্দোলনের যথাযথ ইতিহাস জানা অসম্ভব হতো। গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের সংকলন করা হয়েছে ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কিত বিভিন্ন সংগঠনের প্রচার পুস্তিকা, ইশতেহার ও কমিউনিস্ট পার্টির দলিলপত্র। এসব দলিল বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। কালের করাল গ্রাস থেকে এগুলোকে রক্ষা করে বদরুদ্দীন উমর পালন করেছেন ঐতিহাসিক গুরুদায়িত্ব। তাঁর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থ অপেক্ষা এ গ্রন্থটি কম গুরুত্ববহ নয়।

    বদরুদ্দীন উমর নব্বই বছরে পদার্পণ করেছেন। এমন দীর্ঘায়ু লাভ নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের। আনিসুজ্জামান বলেছেন, সৃষ্টিশীল এবং কর্মমুখর জীবন না হলে দীর্ঘায়ু লাভের কোনো বিশেষত্ব বা গৌরব নেই। এদিক থেকে বদরুদ্দীন উমরের দীর্ঘজীবন বিশেষত্বের দাবিদার। তিনি দীর্ঘ জীবনভর লেখালেখি ও গবেষণায় সময় কাটিয়েছেন। ভাষা-আন্দোলন গবেষণায় তিনি পথিকৃতের দাবিদার। বহু ক্ষেত্রে তিনি রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলেও তাঁর গ্রন্থ পাঠক এবং গবেষকমহলে সমাদৃত হয়েছে। সমালোচনা এবং বিতর্কও কম হয়নি। তাঁর কলম এখনো সচল। আমরা যাঁরা ইতিহাস-ঐতিহ্য-অন্বেষণ করি; বিশেষ করে, ভাষা-আন্দোলন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল পোষণ করি, বদরুদ্দীন উমরের কাছে আমাদের আহ্বান, যেসব ক্ষেত্রে তাঁর ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, সেসব বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও ইতিহাসের আকর উপাদানের আলোকে সংশোধন করলে ইতিহাসে তিনি ভিন্নভাব মূল্যায়িত হবেন। বাস্তবতা হলো―ইতিহাসে ভিন্নপাঠ, ভিন্নমত, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই থাকবে; তবে ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করে নয়। হাত দিয়ে যেমন সূর্যকে ঢাকা যায় না, তেমনি একপেশে তথ্য এবং একচোখা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারাও ইতিহাসের সত্যকে লুকানো যায় না। সময়ের ব্যবধানে কোনো না কোনো গবেষকের হাতে তার উদ্ঘাটন হয়ই। তাছাড়া, সময়ের ব্যবধানে সবকিছু ক্ষয়ে যায়, অনালোকিত এবং দুষ্প্রাপ্য তথ্যের প্রবাহে ইতিহাসের প্রচলিত ধারণাও বদলে যায়। ক্রমাগত রূপান্তর, গ্রহণ-বর্জনের কষ্টিপাথরে যাচাই করেই নির্ণীত হয় ইতিহাসের সত্য। বদরুদ্দীন উমর তাঁর ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে তথ্য-পরিমার্জন করে ইতিহাসের প্রকৃত সত্য পাঠকের সামনে হাজির করবেন। তাঁর নব্বই বছরপূর্তিতে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আমেরিকায় ৪ মুসলিম হত্যা: তীব্র নিন্দা বাইডেনের
আমেরিকায় ৪ মুসলিম হত্যা: তীব্র নিন্দা বাইডেনের
পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইকালে আটক সেই যুবলীগ নেতা বহিষ্কার
পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইকালে আটক সেই যুবলীগ নেতা বহিষ্কার
হত্যাকাণ্ডের ২ মাস পর ঢাবিতে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’
হত্যাকাণ্ডের ২ মাস পর ঢাবিতে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’
স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় ব্রাজিলে জার্মান কূটনীতিক আটক
স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় ব্রাজিলে জার্মান কূটনীতিক আটক
এ বিভাগের সর্বশেষ
সুরের বিকৃতি এবং মৌলবাদ
রবীন্দ্রসংগীতসুরের বিকৃতি এবং মৌলবাদ
লেখক হওয়ার জন্য জন্ম যার ।। পর্ব—১
পথে নেমে পথ খোঁজালেখক হওয়ার জন্য জন্ম যার ।। পর্ব—১
একেকটি শব্দ হয়ে যেতে পারে একেকটি পথ : জাকির জাফরান 
একেকটি শব্দ হয়ে যেতে পারে একেকটি পথ : জাকির জাফরান 
আবুল হাসানের মানবপ্রেম
আবুল হাসানের মানবপ্রেম
তর্জমায় শেষ বলে কিছু নেই : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
তর্জমায় শেষ বলে কিছু নেই : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়