X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

মিহির দা, আমরা আর ফোন করব না

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ২২:৪৭

ফেসবুক দেখাল। অনেকের ওয়ালে। মিহির সেনগুপ্তর ছবি। মানে খারাপ কিছু? মিহির দা’র খারাপ কিছু? এমন কল্পনা তো আমার হতে পারে না। ফোন করলাম এদিক-ওদিক। হ্যাঁ। অনেক টুকরো-টাকরা স্মৃতির তলায় জ্বলছে অশ্রুবিন্দু। যেন মিহির দা’র মৃতদেহ সঙ্গে নিয়ে মাত্রই বসলাম ডিনারে। অনেক আয়োজন করে করা রান্না, বিষাদ। স্নায়ু ফুঁড়ে জেগে উঠেছে বিষাদবৃক্ষ।
*
কাগজ প্রকাশনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে গেলাম মৌচাকে, তার এক আত্মীয়র বাসায়। আমার মাস্টারমশাই [কবি শামীম রেজা] ২৫/২৬ হাজার টাকা দিতে বললেন। আমি বিস্ময় চেপে ভিন্ন প্রস্তাবও রাখলাম। কিন্তু যেতেই হলো পুরো টাকা নিয়ে। সঙ্গে এক সাংবাদিক বন্ধু সাক্ষাৎকার নেবেন বাংলা ট্রিবিউনের জন্য।
কৃষ্ণবর্ণের এক মাঝারি উচ্চতার এক পৌঢ় একের পর এক সিগারেট টেনেই যাচ্ছেন। সাক্ষাৎকারে মনে নেই। আড্ডা আর উচ্ছ্বাস। আর আমাদের আদরস্নেহ। বিদায়বেলায় ভেজা চোখ।
সেই পাণ্ডুলিপি ‘শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ’ হয়ে বইমেলায় বের হলো। রীতিমতো যুদ্ধ করে।
*
আবার ঢাকায় এলেন। ততক্ষণে তার লিখে দেওয়া বিষাদবৃক্ষ পড়ে ফেলেছি। তখন কবি’তে নিয়মিত আড্ডা। মিহির দা ফোনে জানালেন, আসছেন। তাকে দেখে পায়ের ধুলা নিলাম। বললাম, বিষাদবৃক্ষর লেখকের পায়ের ধুলা মাথায় নিলাম।
তিনি আবেগে আপ্লুত হন বারবার। দেশ হারানোর ব্যথা জেগে ওঠে। আমাদের সিগারেট অফার করেন। সজলের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। যেন ঘর পালানো পুত্রকে পেয়েছে পিতা। আবার বিদায়। তার চোখ ছলছল।
*
তার একটি বই প্রকাশ করে ও লেখা ছেপে কিছু রয়্যালিটি আমার হাতে জমেছে। সেসব দিলাম। কোনো বই-ই তাকে সন্তুষ্টি দেয়নি, ভুলে ভরা। এর কারণ পাণ্ডুলিপি জমা দেবার পর, ফিরতি মেকাপ-ফাইল নিজে আর পড়ে দেখতেন না। সেই ধাত তার নেই।
*
এক শীতের রাতে এই বৃদ্ধ কলকাতা স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের গাড়ি আছে কিন্তু ড্রাইভার ভাড়া করে নিতে হয়। এমন গাড়িতে আমার সঙ্গে উঠলেন ট্রেনযাত্রী মা-মেয়ে। যেই মা তার যুবতী মেয়েকে নিয়ে ঢাকা ঘুরে এসেছেন পত্রমিতার সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে। আমাকে চেপে ধরলেন, তার স্মৃতির পথঘাট ধরে যেন তার বন্ধুর সন্ধান পাইয়ে দেই। তার স্মৃতি কম করে হলেও তিরিশ বছর আগের। তার গল্প শুনে শুনে আমরা প্রচণ্ড জ্যাম উৎরিয়ে যাচ্ছে ভদ্রেশ্বর।
বৌ’দি বিশাল রান্নাবান্না করে বসে আছেন। 
দোতলা ঘর। বাসায় তারা দুজনই। আমি এসে জমল হাটবাজার। 
আমার কাজ সকালে নদী পেরিয়ে কলকাতার ট্রেন ধরা। সারা দিন ঘোরাঘুরি। আসলে জহর সেনমজুমদারের সঙ্গে অসম্পূর্ণ একটি কাজ সম্পন্ন করতেই যেই যাত্রা। তাকে আবিষ্কার করি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতারত অবস্থায়। ‘পড়বি তো মালির ঘাড়ে’ এমন দশা তার।
*
আমার কাজ সাঙ্গ হয়ে এলো। তার আগে হুগলির নানা স্থান ঘুরে দেখালেন মিহির দা। শামীম রেজা আর মুহম্মদ মুহসিনকে তিনি যে কী ভালোবাসেন! ফলে বারবার অভিমান ভরা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ তার। আমাকেও যেন পেয়েছেন তাদের ছায়া হিসেবে।
আমি উঠব কলেজ স্ট্রিটে। মহাবোধি সোসাইটিতে। বিদায় দিতে স্টেশন পর্যন্ত এলেন। অশ্রু সংবরণ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তা ছেড়ে দিলেন। ডুকরে উঠলেন ভেতর থেকে। তাকে কী সান্ত্বনা দেবো।
*
প্রায়ই ফোন করতেন। ফোন করি না কেন, এই অভিযোগও করতেন। শামীমকে ফোন করতে বলিস। সজলকে ফোনে পাচ্ছি না কেন? আমাদের সংসার কেমন চলছে ইত্যাদি।
*
আবার কলকাতা যাবার বাতিক চাপল। সঙ্গী অহ নওরোজ। থাকি কলেজস্ট্রিটে। একদিন ফোন করে রওনা হলাম, ঘণ্টা খানেক সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম। টেবিলভর্তি খাবার।
আমরা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে, তিনি সিগারেট হাতে ভেতরে। বললেন, কদিন বাঁচি না-বাঁচি, তোদের কচি মুখ দেখলে ভালো লাগে। ফোন করিস। 
আবার চোখ ছলছল।
*
সে যাত্রায় ঘনঘন তার ফোন। কিন্তু ফোন করব করব ভেবেও আমার ফোন করা হয়ে ওঠে না। মিহির দা’ও ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছেন। হয়তো মাস ছয়েক আগে একবার ফোন করেছিলাম, তার বই সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্য হয়েছে এই সংবাদ দিতে। ফোন বাজেনি। তার আগে সূর্যের জন্মের সংবাদ দিয়েছি হয়তো।
তবে তার শেষ ফোনেও অনেক কথার পর বলেছিলেন, সজলকে ফোন করতে বলিস। শামীমকে ফোন করতে বলিস।

মিহির দা, আমরা আর ফোন করব না।  

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পমন্ত্রীকে ৩ ঘণ্টা জেরা 
শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পমন্ত্রীকে ৩ ঘণ্টা জেরা 
এনআইডির বয়স সংশোধনে ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ
এনআইডির বয়স সংশোধনে ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ
গাড়ি তল্লাশিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও র‍্যাবের হাতাহাতি, তদন্ত কমিটি গঠন
গাড়ি তল্লাশিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও র‍্যাবের হাতাহাতি, তদন্ত কমিটি গঠন
জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান ডিএনসিসির মেয়রের
জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান ডিএনসিসির মেয়রের
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত