X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
২০ আষাঢ় ১৪২৯
জয়নুল আবেদিন

বাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০০:০০

‘এখন তো চারিদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ। একটা স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষের কোন ছবি হয় না’—জয়নুল আবেদিনের এ উক্তি কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক। কল্পনাকে তুলির আঁচড় দিয়ে সার্থক রূপায়ণ করতে সক্ষম হয়েছেন জয়নুল আবেদিন (২৯ ডিসেম্বর, ১৯১৪-২৮ মে, ১৯৭৬)। তিনি গণমানুষের চিত্রশিল্পী। তবে বাংলাদেশেই জয়নুল আবেদিনকে শিল্পী হিসেবে তাঁর শিল্পকর্মকে যথাযথ উপস্থাপনের একটা ঘাটতি রয়েছে। তবে তাকে নিয়ে বর্তমানে কিছুটা আলোচনা এগিয়েছে। তিনি শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে সফল। বাংলাদেশে চিত্রকলাচর্চার অগ্রপথিক জয়নুল আবেদিন। তৎকালীন মুসলিম গ্রামবাংলার জনগোষ্ঠীর সমকালের চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর চিত্রকর্মে। তাঁর চিত্রকর্মে মানবতা ফুটে উঠেছে; ফুটে উঠেছে বাঙালি জাতির জীবন-সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ-বেদনা-বঞ্চনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি।

জয়নুল আবেদিন সমাজের প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে শিল্পী ও সংগঠনের অব্যর্থ ভূমিকা রেখেছেন। জানা যায়, ‘কলকাতা আর্ট’ কলেজে অধ্যয়নকালীন অবস্থায় নতুনত্ব সৃষ্টিতে ব্যাকুল থাকিতেন জয়নুল। হিন্দু-শিক্ষার্থী-প্রধান কলেজের শিক্ষার্থীরা পৌরাণিক, ধর্মীয়, রোমান্টিক বা কলকাতার চিত্র তুলে ধরতেই অভ্যস্ত ছিলেন। জয়নুল কিন্তু বিপরীত স্রোতে হাঁটলেন। এসব বাদ দিয়ে বাঙালি চিত্রজগতে ব্যতিক্রমী ধারা সৃষ্টি করলেন। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করুণ কাহিনি, দুর্ভিক্ষের প্রতিচ্ছায়া হিসেবে ছবি আঁকলেন। তাঁর বিখ্যাত সেই ‘দুর্ভিক্ষ চিত্র’-এ অনাহারে ও অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা প্রাণীর চিত্র তুলে ধরে ব্যাপক জনপ্রিয় হন। বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাস এবং শিল্পী জয়নুল আবেদিন একসূত্রে গাঁথা। তাত্ত্বিক অর্থে জয়নুল নিজেই শিল্পী। একটা পশ্চাদপদ সমাজের শিল্পমানসকে জয়নুল টেনে বের করে এনেছেন সমাজপটে। ব্যবহারিক জ্ঞান-কাঠামোর কেন্দ্র হলো প্রতিষ্ঠান। প্রাতিষ্ঠানিক-শিল্প শিক্ষা আন্দোলনের নায়ক জয়নুলই। তিনি একাধারে শিল্পী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব। উভয়ক্ষেত্রে তিনি সফল। লোকসাধারণে জয়নুল অপরিচিত নন; শিল্পী হিসেবে তিনি অসংবাদিত। বরং তিনি গণমানুষের শিল্পী তিনি। তিনি স্থানীয় লোকসংস্কৃতিকে প্রকৃতিকে ধারণ করেছেন, জনপ্রিয়ও হয়েছেন।

জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মে সমকালের ছাপচিত্র পাওয়া যায়—চিত্রকর্মে তাঁর রক্তমেশা রয়েছে। তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দুর্ভিক্ষ ১৯৪৩’। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের চিত্র এঁকে সারাবিশ্বে বিশেষ খ্যাতি পান। বাংলাদেশে তাকে ‘আধুনিক শিল্পের জনক’ বলা হয়। আবেদিনের চিত্রকর্মে মানবতা আধুনিকতার মুখ্য বিষয়। তাঁর অনেক চিত্রকর্মে মানবতা মুখ্য হয়ে উঠেছে। তিনি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্র এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৫৭-এ নৌকা, ১৯৫৯-এ সংগ্রাম, ১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ম্যাডোনা বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম। জয়নুলের শিল্পকর্মে দেখা যায়, বাংলার গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির দৃশ্যকল্পের প্রতিফলন। বাংলার কৃষিসংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রকৃতি-কাঠামো এতে প্রোথিত আছে। এই সংস্কৃতি এই অঞ্চলের ভেতরকার রূপ। ১৯৬৯ সালে গ্রামবাংলার উৎসব নিয়ে ৬৫ ফুটের চিত্রকর্ম ‘নবান্ন’, ১৯৭৪ সালে ‘মনপুরা-৭০’ দুটিও নন্দিত চিত্রকর্ম। এছাড়া ‘সাঁওতাল রমণী’, ‘মই দেওয়া’, ‘ঝড়’, ‘কাক’, ‘বিদ্রোহী’ প্রশংসা কুড়িয়েছে। জানা যায়, তাঁর তিন হাজারের বেশি চিত্রকর্ম রয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ৮০৭টি, ময়মনসিংহ সংগ্রহশালায় ৬২টি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে প্রায় ৫০০ চিত্রকর্ম প্রদর্শন/রক্ষিত রয়েছে। জয়নুলের পরিবারের নিকটে আরও ৪০০টির বেশি চিত্রকর্ম রয়েছে।

পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশের চিত্রকলার উল্লেখযোগ্য মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল জয়নুলসহ প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর আধুনিক আঙ্গিকের চিত্রকলা, জীবন ও নিসর্গনির্ভর সমবাস্তববাদী চিত্রকলা, ইউরোপীয় সমকালীন রীতি প্রচলন, বিমূর্ততা প্রভৃতি। এসময়ে বাংলাদেশের চিত্রকলায় আধুনিক আঙ্গিক পেতে থাকে। বাস্তববাদী বা রূপান্তরধর্মী আঙ্গিক থেকে মানব অবয়বের স্টাইলাইজড উপস্থাপনা ও নিসর্গদৃশ্যের সহজীকৃত রূপায়ণ হতে থাকে। লোকজ শিল্প ফর্মের সঙ্গে আধুনিক আঙ্গিকের সংমিশ্রণের নিরীক্ষাধর্মী কাজের নেতৃত্বে ছিলেন জয়নুল আবেদিন। ১৯৪৮ সনে ঢাকায় প্রথম চারুকলা ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে আধুনিক চিত্রকলার যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ ছিলেন জয়নুল আবেদিন। একটি ধর্মভিত্তিক নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে একটি চারুকলা ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠা রীতিমত অবিশ্বাস্য ঘটনা। জয়নুল আবেদিন ও তাঁর সহযোগীদের অদম্য উৎসাহ তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব করেছিল। ‘চারুকলা ইন্সটিটিউট’ প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই আবার কামরুল হাসানের উদ্যোগে ও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সরকারি পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সমান্তরাল এক আন্দোলন শুরু করেন ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ নামে সংগঠনের মাধ্যমে।

দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা বাদ দিলে দেশভাগের পূর্ববর্তী (১৯৩০-৪৬) জয়নুল আবেদিনের অনেক চিত্রই এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে অপরিচিত বা একেবারেই কম আলোচিত। ‘শম্ভুগঞ্জ (কালিকলমের স্কেচ, ১৯৩৩)’, ‘হাঁস (জলরং, ১৯৩৩)’, ‘ফসল মাড়াই (জলরং, ১৯৩৪)’, ‘বনানী দুমকা (জলরং, ১৯৩৪)’, ‘পল্লিদৃশ্য (জলরং, ১৯৩৪)’, ‘ঘোড়ার মুখ (পেন্সিল-তেলরং, ১৯৩৪)’, ‘বাইসন জু স্টাডি (জলরং, ১৯৩৫)’, ‘মজুর (পেন্সিল-স্কেচ, ১৯৩৫)’ প্রভৃতি। ১৯৩৮-এ ব্রহ্মপুত্র নদসংক্রান্ত ছটি জলরং চিত্রের জন্য ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্ট’ কর্তৃক ‘গোল্ড মেডেল’ পেয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন। দুর্ভাগ্য যে, ওইসব চিত্র আমাদের কাছে প্রায় অপরিচিত। তাকে জানতে রোসা মারিয়া ফালভো সম্পাদিত ‘গ্রেট মাস্টার্স অব বাংলাদেশ জয়নুল আবেদিন’ সংকলনটির কাছে সহয়তা নেওয়া যেতে পারে। রোসা মারিয়া ফালভোর সম্পাদনায় জয়নুলকে নিয়ে বইটির দুটো দিক আছে। এক শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা, অপর শিল্পকর্মের ছবি। জয়নুলের শিল্পকর্মে বাংলার ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি কিভাবে এসেছে রোসার বক্তব্যে সেটা স্পষ্ট। এতে শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন আবুল মনসুর, নজরুল ইসলাম ও আবুল হাসনাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পীর স্ত্রী মিসেস জাহানারা আবেদিনের সাক্ষাৎকার। বইটির আলোচনায় দুটো জিনিস উঠে এসেছে। এই শিল্পী শিল্পের উপাদানের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী আর ফর্মের দিক হতে আধুনিক। বাংলাদেশে শিল্পীদের শিল্পকর্মের ধরন, প্রকরণ, ফর্ম আর তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া বোঝার জন্য যে ধরনের এলবাম বা গ্রন্থ থাকা দরকার সেটা নেই বললেই চলে। তবে এক্ষেত্রে রোসার সম্পাদিত জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্মের সংকলনটি অনন্য।

ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা ১৯৬৮ সালে জয়নুল আবেদিনকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি দেয়। তার আগে ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে মর্যাদাকর খেতাব হেলাল-ই ইমতিয়াজ পান এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দেয়। ১৯৩৮ সালে চিত্রপ্রদর্শনীতে ‘নিখিল ভারত’ স্বর্ণপদক পান। বুধগ্রহে আবিষ্কৃত ৭৬৩টি গহ্বরের মধ্যে একটি গহ্বরের ‘আবেদিন গহ্বর’। ২০০৯ সালে ‘আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন’ বুধ গ্রহের বিভিন্ন গহ্বরগুলোকে মানবতার অবদানের জন্য সম্মান জানাতে ইয়েটস, বাচ, বালজাক, বিথোভেন এবং পাবলো নেরুদা মহান ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের সেরা শিল্পী জয়নুল আবেদিনের নামেও নামকরণ করা হয়েছে। ‘আবেদিন গহ্বর’-এর দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার এবং উচ্চতা ২২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার।

শিল্পীর চিন্তার জগৎ বুঝতে তার শিল্পকর্ম আর যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণের বিকল্প নেই। একজন শিল্পীর শিল্পকর্ম অধ্যয়ন করতে হলে সেই শিল্পীর বিভিন্ন পর্বের সৃষ্টিসমূহকে যেমন গণ্য করতে হয়, পাশাপাশি সেই সময়কালের পরিবেশ-সমাজ সম্পর্কেও জানতে হয়। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এ ব্যাপারে সজাগ ছিলেন। আধুনিক শিল্পের মর্ম বুঝতে তিনটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, চিন্তার গুণগত মান। গুণগত মান বলতে মানবকেন্দ্রিকতা। দ্বিতীয়ত শিল্পের প্রকাশভঙ্গি। তিনি প্রকাশভঙ্গিকে লড়াই হিসেবে দেখেননি। দেখেছেন রাজনৈতিক সচেতনতার জায়গা থেকে। কেননা তাঁর অঙ্কিত ইমেজ অস্তিত্বের সংকটের সম্মুখীন বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংস্কৃতিতে ব্যস্ত। আর তৃতীয়ত আঙ্গিকের কাঠামো। আঙ্গিকের ক্ষেত্রে জয়নুল আধুনিক, দ্ব্যর্থকতাহীন।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপি নেতাদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন: তথ্যমন্ত্রী
বিএনপি নেতাদের মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন: তথ্যমন্ত্রী
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৩৬ জন
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৩৬ জন
লুহানস্ক দখল মহাকাশে উদযাপন করলেন রুশ মহাকাশচারীরা
লুহানস্ক দখল মহাকাশে উদযাপন করলেন রুশ মহাকাশচারীরা
বন্যায় আরও ৫ জনের মৃত্যু
বন্যায় আরও ৫ জনের মৃত্যু
এ বিভাগের সর্বশেষ
খোঁপায় গমখেতের মায়া
খোঁপায় গমখেতের মায়া
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার মঙ্গলবার
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার মঙ্গলবার
কুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
পর্ব—চারকুসতুনতুনিয়ায় কয়েকদিন
মানববাদী মধুসূদনের নারীপ্রগতিভাবনা
মানববাদী মধুসূদনের নারীপ্রগতিভাবনা