X
বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২
১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
আহমদ রফিক

পরাজিত নন

ফিরোজ আহমেদ
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:১৯আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:১৯

গল্পটা আমি শুনেছিলাম কয়েক বছর আগে। আহমদ রফিকের মুখেই। গল্পটা একদিকে ব্যর্থতার, অপমানের এবং প্রত্যাখ্যানেরও। আরেকদিকে হয়তো এটাই ‘বেহাত বিপ্লব’-এর প্রতিচ্ছবি।
বাংলা ট্রিবিউনের সাহিত্য সম্পাদকের প্রস্তাব পাওয়ামাত্র কয়েক বছর ধরে অস্বস্তি দেওয়া এই কাহিনিটার খুঁটিনাটির খোঁজে কাল আবারও গেলাম আহমদ রফিকের কাছে। যারা প্রজ্ঞাবান, তাদের জন্য অবশ্য কাহিনির মর্মটুকু বাদ দিয়ে বাকি সব অনুষঙ্গমাত্র, গল্পটা বলে ফেললেই চলত। কিন্তু দস্তাবেজে যাদের আগ্রহ বিস্তর, তাদের শান্তির জন্যই প্রবীণ মানুষটিকে জ্বালাতন করতেই হলো। 
’৫২-এর ভাষা আন্দোলন বহু তরুণকে বদলে দিয়েছিল, আজীবনের জন্য। মতিন-তোয়াহা-অলি আহাদসহ আরও অনেকে রাজনীতি করেছেন চিরজীবন। যারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করেননি, তাদের অনেকেই রাজনীতির কাছাকাছি থেকে অন্য কোনো সামাজিক দায়িত্ব পালন করবার চেষ্টা করেছেন, আমৃত্যু। আহমদ রফিক তাদেরই একজন। ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্ম তাঁর। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ বা আন্দোলনের ইতিহাসটাকে শুদ্ধভাবে রচনা শুধু নয়, ভাষা আন্দোলনের চেতনায় সমাজটাকেও পুনর্নির্মাণের সাধ্যমতো চেষ্টায় সব সময় সজাগ থেকেছেন আহমদ রফিক। 

দুই.
বাংলা ভাষা প্রবর্তনে করণীয় নির্ধারণ নিয়ে একটা সভা আহবান করা হয়েছিল সেদিন; আয়োজকদের অদক্ষতায় প্রায় কেউই সেদিন আসেননি। আহমদ রফিক যথাসময়েই এসেছিলেন। সভাটা না হলেও সময় কাটাতে নানান গালগল্প হলো, বিশেষ করে পরিভাষার সমস্যা নিয়ে তিনি দীর্ঘক্ষণ বললেন। পরিভাষা নেই—এটি বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার বিরোধীদের সবচেয়ে বেশিবার দেখানো অজুহাত। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় তর্জমায় এই প্রতিবন্ধকতার ইতিহাস ভাষান্তরের ইতিহাসেরই সমবয়সী। উদাহরণ হিসেবে যেমন আসতে পারে লুক্রিশাসের কথা। লুক্রিশাস ছিলেন একজন লাতিনভাষী, খ্রিষ্টজন্মের ৯৯ বছর পূর্বে তার জন্ম, মৃত্যু খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫ সালে। রোমানরা ততদিনে গ্রিসসহ পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা আর এশিয়ায় সিরিয়া পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করে ফেলেছে। ঐতিহ্যগত কারণেই, তখনকার দিনের দর্শনের, আর সব বিদ্যারও, ভাষা ছিল গ্রিক। বিশ্বজয়ী সিকান্দারের সৌজন্যে গ্রিক দর্শন আর বিজ্ঞান শুধু পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত হয়নি, অন্য সভ্যতার সারা দুনিয়া থেকে তারা নিয়েছেও প্রচুর। তো লুক্রিশাস ছিলেন একজন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের অনুরাগী, দুই হাজার বছর পর এই এপিকিউরাসের ওপরই মার্কস তার ডক্টরাল থিসিস করেছিলেন। যাই হোক, এই গ্রিক দর্শনকে মাতৃভাষায়, লাতিনে অনুবাদ করতে গিয়ে খুব সমস্যায় পড়ছিলেন লুক্রিশাস। যেমন—
‘মাঝে মাঝে লুক্রিশাস গ্রিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষাকে লাতিনে স্থানান্তর করার সমস্যায় পড়ে যান, আর তা নিয়ে অভিযোগও করেন। এক পর্যায়ে তিনি 'আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভাষার দারিদ্র্য’ নিয়ে কথা বলেন।’
পরবর্তী দেড় হাজার বছর ধরে যে লাতিন রাজত্ব করেছে দর্শন আর বিজ্ঞানে, তার জন্মকথার অন্তত আধখানা পাওয়া যাবে লুক্রিশাসের এই অনুযোগে। কিন্তু লুক্রিশাসরা দরিদ্র বলে মাতৃভাষাকে পরিত্যাগ করেননি, গ্রিক ভাষা শ্রেষ্ঠতর বলে তাকে কেবল পূজার আসনে বসিয়ে রাখেননি। সাধ্যমত গ্রিক জ্ঞানকে লাতিন ভাষায় তর্জমা করেছেন। কিন্তু পরিভাষার দিক দিয়ে দারিদ্র্যের অভিযোগে বাংলাকে বঞ্চিত করার এই প্রশ্নটা আবারো তাকে করতেই কাল সন্ধ্যায় তিনি বললেন—
‘পরিভাষা কেনো সমস্যা হতে যাবে? ঘাড়ের কাছে এই যে পেশী, এটার নামটা গ্রিক—স্টারনোক্লেইডোমাস্টোইড—আপনার পক্ষে এটা উচ্চারণ করতে কষ্ট হবে। এটা কি ইংরেজি? ইংরেজরা তাদের চিকিৎসাবিদ্যার বই লেখার সময় ভাষাটা ইংরেজি রাখলেও পরিভাষাগুলো, এই নামগুলো হুবহু গ্রিক বা লাতিনেই রেখেছে। পরিভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এইসব শব্দমালাকে তো অনুবাদ করার দরকার নাই, অনায়াসে রেখে দেয়া যায়। হেপাটিকামকে অবশ্য তারা লিভার করেছে। নামবাচককে অনুবাদ না করলেও চলে।’
বোঝা গেল, লুক্রিশাসরা যে বিপদে পড়েছিলেন, তার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান মানবজাতি এত বছরে আবিষ্কার করেছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিভাষার একটা কাঠামো গ্রহণ করে। ফলে ভাষা ভিন্ন ভিন্ন হলেও বহু শব্দের পরিভাষা একই থাকছে। কোনো কোনো স্থানে বিদেশি শব্দটার উচ্চারণ আর বানানটাকে বদলে খানিকটা দেশি চেহারা দিয়ে, যেমন গ্রিক ফিলসফি থেকে আরবি ফালাসিফা, আরবি আমির ইউরোপে অ্যাডমিরাল হিসেবে আত্মীকৃত হয়েছে। আবার কখনো নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে একদম নতুন শব্দ বানিয়ে নিয়ে, জাদুঘর-চিড়িয়াখানা-অনুবীক্ষণযন্ত্র-কলাকৈবল্যবাদ সবগুলো শব্দই বাংলা ভাষায় নতুন।
শোনা কথা, তাই আহমদ রফিকের মতটা জেনে রাখার জন্যই বললাম : ‘চীনারা নাকি বিদেশী পরিভাষাও না নিয়ে যথাসম্ভব দেশী পরিভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করে?’
‘সেটা তো ঠিকই, কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম, বাংলায় উচ্চশিক্ষা দিতে একেবারেই তো রাজি হয় না, তাই অন্তত ওটুকু সুবিধা দিয়ে বিদেশী পরিভাষাগুলো যথাসম্ভব রেখেই চেষ্টা করলাম।’

পরিভাষা নির্মাণে তার যুক্ততা বহুবছরের। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানালেন : “পরিভাষা সমস্যার কথা সবাই বলেন তো, সেইজন্য ‘চিকিৎসা বিজ্ঞান পরিভাষা কোষ’ তৈরি করেছিলাম। আমার আগে বাংলা একাডেমির অত্যন্ত ছোট একটা পরিভাষা কোষ ছিল। আমাদেরই আরেক বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার ছিলেন, ডাক্তার মোর্তোজা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন, মোর্তোজা এটা করেছিলেন। বাংলা একাডেমি আমাকে বলাতে, আমি ওতে কয়েক হাজার শব্দ সংযোজন করি। বইটা বেশ মোটা হয়। আমি এতে বহু শব্দ পরিবর্ধন পরিমার্জন করি। চিকিৎসা বিজ্ঞান পরিভাষা কোষ নামে বাংলা একাডেমি এটা প্রকাশ করে। এরপর পরিভাষা নামে একটা অনিয়মিত সংকলন প্রকাশ করেছি বেশ কিছুদিন।”
“তারপর একে একে বেড়িয়েছে রসায়ন পরিভাষা কোষ, পদার্থবিদ্যা পরিভাষা কোষ, উদ্ভিদবিদ্যা পরিভাষা কোষ...”
কিন্তু একদিকে পরিভাষা কোষ বেড়িয়েছে, আরেকদিকে তো বাংলায় পরীক্ষা দেয়া নিষিদ্ধ হয়েছে, পরিভাষার অভাবের কথাই বলে! আহমদ রফিক একটু উত্তেজিত হন : “আমি বলি, পরিভাষা কোনো সমস্যাই না। সমস্যা আমাদের চিন্তায়। শ্রেণিস্বার্থে। যে শ্রেণির হাতে সমাজ অর্থনীতি যাদের হাতে শাসিত, তারা যদি শিক্ষাটাকে ব্যাপক করে, যদি অনেক বেশি ছাত্র আসে, তাহলে তারা বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে।”

তিন.
কথা প্রসঙ্গেই উঠলো জাপানের গোটা শিক্ষাটাকে মাতৃভাষায় রূপান্তরের অভিজ্ঞতার কথা। সারা দুনিয়ার জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ এই অভিজ্ঞতাটাকে চিনুয়া আচেবে সারসংকলন করেছেন এভাবে—
‘আমার দাদা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮৮০ দশকের শুরুর দিককার স্নাতক। তার খেরোখাতা ভর্তি ছিল ইংরেজিতে। আমার পিতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯২০-এর দশকের স্নাতক, আর তার খেরোখাতার আধাআধি ছিল ইংরেজিতে, বাকি আধখানা জাপানি ভাষায়। এক প্রজন্ম পর আমি যখন স্নাতক হই, আমার সবটা টোকাটুকি হয়েছিল জাপানি ভাষায়। এভাবে আমাদের নিজেদের ভাষার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতাকে পুরোটা আত্মস্থ করতে লেগেছিল তিনটে প্রজন্ম।’
কিন্তু দৃষ্টান্ত যতই উৎকৃষ্ট হোক, বাংলাদেশকে তা অনুসরণ করতেই কেন হবে?
‘আমি বরাবরই বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা দেয়ার পক্ষপাতী। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, উচ্চশিক্ষাও। চিকিৎসাশাস্ত্র পড়াশোনা তো বেশ জটিল। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, লিখিত পরীক্ষা খুব ভালো দিয়ে অনেকেই মৌখিক পরীক্ষায় উত্তর দিতে দিয়ে তোতলায়। অর্থাৎ জানা জিনিস অন্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন... এই কথাটা আমি লিখেছিও বহু জায়গায়—তখন পরীক্ষক মনে করেন এ তো কিছু জানেই না... বাংলা একাডেমির সাথে কথা বলে ডেভিডসনের টেকসট বুক অব মেডিসিন আর কানিংহামের এনাটমি এই দুটো বিশাল মোটা বই বিভিন্ন জনকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছিলাম। সম্পাদনায় ছিলাম আমি, সাঈদ হায়দার আর পরে এসে যোগ দিলেন শুভাগত চৌধুরী।
আমরা সম্পাদনা করতে গিয়ে দেখলাম আমাদের চিকিৎসকরা কত কম বাংলা জানেন। এবং বিশ্বাস করবেন না, নামটা মনে নেই কে করেছিল, হৃদযন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন অধ্যায় পুরোটা আমাকে নতুন করে লিখতে হয়েছিল সম্পাদক হিসেবে। আরও অনেকগুলো অধ্যায়েও তাই। যাই হোক, তবুও সেটা বেরুলো।’
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গ্রন্থগুলোর এই অনুবাদযজ্ঞ সফল হলে তা একটা বিশাল ঘটনা হতে পারত বাংলায়। এরই ধারাবাহিকতায় অনূদিত হতে পারত চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাকি সব পাঠ্যবইও। হয়তো বাকি সব বিভাগও এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারত। কিন্তু যা ঘটল, তা স্রেফ অপচয়।
‘সেগুলো যখন গুদামে পড়ে থাকল, আমি আর হায়দার মিলে ঢাকা মেডিকেলের অধ্যক্ষের সাথে দেখা করলাম। কে ছিলেন, ঠিক মনে নেই। সামনে একজন অধ্যাপকও বসে ছিলেন। সালটাও ঠিক খেয়াল নেই, অনেক আগে। তিনি বয়সে আমাদের অনেক ছোট। তারা সবাই বললেন, এটা কিভাবে সম্ভব! এটা কিভাবে সম্ভব! এটা কিভাবে সম্ভব!
আমাদের খুব ক্ষুব্ধ মন নিয়ে ফিরে আসতে হলো। এটাও বলেছিলাম, সম্প্রতি শুনেছি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকল্প প্রশ্নমালা বাংলায় থাকে, যদি কেউ ইচ্ছে করে বাংলায় উত্তর দিতে পারে। বাংলায় পরীক্ষা দেয়া গেলে ছাত্ররা অনেক ভালো করবে। কাজ হলো না।
ওনার বললেন, কত নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে ইংরেজিতে। বললাম, সেগুলো যুক্ত করে দেয়া যাবে নতুন সংস্করণগুলোতে। আমি তাদের বলেছিলাম, আপনিও ছাত্র ছিলেন আমিও ছাত্র ছিলাম, আমরা জানি বাংলায় উত্তর দিতে পারলে ছাত্ররা অনেক সহজে বুঝে উত্তর দিতে পারবেন। কোনো লাভ হলো না। বইগুলো বাংলা একাডেমির গুদামে ঘুণে ধরে পচে শেষ হলো। কয়েক লক্ষ টাকার অপচয়।’

চার.
ভাষা আন্দোলনে কারাবরণ করা এক শহীদ অধ্যাপককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আহমদ শরীফ তার দিনপঞ্জীতে লিখেছিলেন:
"সরকারী ও বেসরকারী সর্বক্ষেত্রে বাঙলা ব্যবহারের ঔচিত্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে কোন এক সভায় বক্তৃতা দিয়ে আমার সঙ্গেই ফিরছিলেন। আমি কথা প্রসেঙ্গ তাঁকে বললাম, বাঙলার পক্ষে তো জোরালো বক্তৃতা দিয়ে এলেন, কিন্তু নিজের সন্তানদের তো ইংরেজী মাধ্যমে পড়াচ্ছেন। উত্তরে বললেন, পাগল নাকি, আমার নিজের সর্বনাশ করব নাকি!"
আহমদ রফিক কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আর দোষারোপের পক্ষে নন। বললেন, “সেদিনও এক মহিলা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে গেলেন, বাংলায় কথা বলায় তার সন্তানকে শাস্তি দেয়া হয়েছে।”

তাহলে পড়াচ্ছেন কেনো ইংরেজি মাধ্যমে? কারণ তো সোজা, না হলে যুদ্ধে পিছিয়ে পড়বেন। জ্ঞান নয়, মানদণ্ড যদি হয় ইংরেজি লেখা ও বলার ক্ষমতা, তাহলে কোন অভিভাবক তার সন্তানদের এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা কামনা করবেন? “ফলে আমি আর অভিভাবকদের দোষ দেই না, দোষ রাষ্ট্রের, ব্যবস্থার।” এই ব্যবস্থাটি তো ব্যক্তি নয়, বরং যে শ্রেণিটি ক্ষমতায় আছে, তারাই তাদের ভাষার সূত্রে অর্জিত ক্ষমতার স্বার্থকে টিকিয়ে রাখতে নতুনদেরও এই স্বার্থে জড়িয়ে ফেলে, কিংবা একই প্রতিযোগিতায় টেনে নিয়ে আসে। এই সব আলাপে সময় ফুরলো।
ফিরে এসে মনে হলো, বইগুলোর চেহারাই তো দেখা হলো না! আবারো বৃদ্ধ মানুষটাকে জ্বালাতে হলো, এবং বিষণ্ন কণ্ঠেই তিনি জানালেন, বইগুলোর কোনোটিই তার কাছে নেই। এতবার বাড়ি বদলেছেন, কোথায় কিভাবে সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে।
যে উদ্যোগটি একটা যুগ-পরিবর্তনের সূচনা করতে পারতো, চিকিৎসাবিদ্যা পড়ুয়াদের ঘরে ঘরে যে বইটার উপস্থিত থাকার কথা ছিল, তার পরিকল্পকের কাছেই নেই তা একটাও! বাংলা একাডেমিতে? থাকতে পারে, জানালেন তিনি। নাও থাকতে পারে, তাহলে আর পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কাও জানালেন।
একদম হারিয়ে যায়নি, বাংলা একাডেমিতে সাহিত্য সম্পাদক জাহিদ সোহাগ সমভিব্যাহারে দেখে এসেছিলাম, পাঠাগারে নীরবে অপেক্ষা করছে কানিংহামের ‘প্রাকটিক্যাল এনাটমি ম্যানুয়েল’, দুইখণ্ডে ভেভিডসনের ‘চিকিৎসা বিজ্ঞান : মূলসূত্র ও প্রয়োগ’, আর সেই ‘চিকিৎসাবিদ্যা পরিভাষা’। একটা উলটে দেখলাম, ১৯৮৩ সালটা জ্বলজ্বল করছে। যুগান্তর ঘটেনি, ব্যর্থতায় পর্যবসিত এই প্রকল্পটা তারপরও বাংলায় উচ্চশিক্ষার ইতিহাস রচনার চেষ্টার মহৎ একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে, ভাষাকে ভালোবেসে বিপুল শ্রম নিয়োগের একটা প্রকল্প হিসেবে থেকে যাবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সেই অধ্যক্ষের নামটাও জানা থাকলে মন্দ হতো না, একবার মনে হলো খোঁজ নেই। পরপরই অবশ্য তার প্রতি ব্যক্তিগত সব অভিযোগটা তুলে নিলাম, বাকি সবার চেয়ে বাড়তি কী এমন অপরাধ তিনি করেছেন! তার পথেই তো সব বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল-পদার্থ-রসায়ন-উদ্ভিদবিদ্যা-সমাজবিজ্ঞান একে একে সব বিদ্যার পরিসরেই তো বাংলা বিলুপ্ত হলো। 
আহমদ রফিক পরাজিত নন, বাংলা ভাষাও না। তবে একটা সাময়িক পিছুহটা হয়েছে। যা কিছু অর্জন হতে পারতো, প্রতিষ্ঠানগুলোর অসহযোগিতা, ঔদ্ধত্য আর গোপন-প্রকাশ্য ষড়যন্ত্রে, কখনো কখনো অন্তর্ঘাতেরও ফলে উচ্চশিক্ষার বেলায় সেই অগ্রগতি ঘটেনি। অন্যদিকে, বহু দেশেই কিন্তু মাতৃভাষা জনগণের জাতীয় জাগরণের আগে পর্যন্ত শাসকদের, অভিজাতদের এই উপেক্ষার শিকার হয়েছে। যেমন ইংরেজি ভাষার বেলাতেই, এই রানী এলিজাবেথের রাজত্বে স্বয়ং শেকসপীয়রের সময়ে শিক্ষার বাহন ছিল না। কারণ: “ইংরেজিতে শিক্ষা দেয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি বহুবিধ। শিক্ষা উচ্ছন্নে যাবে, কেননা ধ্রুপদী ভাষাশিক্ষার জন্য আর প্রণোদনা থাকবে না।
ইতর লোকজনের মাঝে শিক্ষার বিস্তার তো বিপজ্জনক। পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজের জন্য ইংরেজি ভাষা অসুবিধাজনক, কারণ এটাতে প্রয়োজনীয় পারিভাষিক শব্দসমূহের ঘাটতি আছে। ইংরজি একটা ‘স্থুল’ আর ‘বর্বর’ স্বভাবের ভাষা, নিদারুণ এর প্রকাশের ক্ষমতার অভাব। ভাষাটা অসুবিধাজনক আর অস্থিরমতি, বিপরীতে ধ্রুপদী গ্রিক আর লাতিনে অর্থ সর্বদা ‘স্থিরকৃত’। ব্রিটেনের বাইরে এই ভাষা সাধারণভাবে কেউ জানে না, আর লাতিন একটা আন্তর্জাতিক ভাষা।”
ব্রিটিশ সমাজকেও এই রূপান্তরের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে, যখন শ্রমিক ও কৃষকের মাঝে যদি কখনো সত্যিকারের শিক্ষার চাহিদা জাগে, উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির আধিপত্যের মাঝে যে শ্রেণিস্বার্থের উপস্থিতি দেখেছেন আহমদ রফিক, সেই কোটারি স্বার্থের বিরুদ্ধে যদি কোনো জাগরণ ঘটে, নিশ্চয়ই বাংলা তার স্থান করে নেবে। তার আগ পর্যন্ত, তার যা কিছু গৌরব, তা কেবল কোটি কোটি বাংলাভাষীর মুখের ভাষা হিসেবে, সাহিত্যের ভাষা হিসেবে, আত্মপ্রকাশের ভাষা হিসেবেই।

 

/জেডএস/
ফ্রান্সকে  হারিয়ে দিলো তিউনেশিয়া
ফ্রান্সকে হারিয়ে দিলো তিউনেশিয়া
নতুন অধ্যায়ে আফরান নিশো, সঙ্গে তমা মির্জা
নতুন অধ্যায়ে আফরান নিশো, সঙ্গে তমা মির্জা
প্রতিটির হিসাব নিচ্ছি, সাজানো মামলা দেবেন না: মির্জা ফখরুল
নয়া পল্টনেই অনুমতি দিতে হবেপ্রতিটির হিসাব নিচ্ছি, সাজানো মামলা দেবেন না: মির্জা ফখরুল
সর্বাধিক পঠিত
লুট হওয়া ১১ অস্ত্র মিয়ানমার থেকে ফেরত পাওয়ার আশা বিজিবির
লুট হওয়া ১১ অস্ত্র মিয়ানমার থেকে ফেরত পাওয়ার আশা বিজিবির
ফিফার মান বাঁচালেন ‘বিটিএস’ জাংকুক!
ফিফার মান বাঁচালেন ‘বিটিএস’ জাংকুক!
রিট করার পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্ট
ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণরিট করার পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্ট
৪ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেন চলাচল বন্ধ
৪ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেন চলাচল বন্ধ
তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতা
তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতা