শিল্পসাহিত্য যত বেশি ইনক্লুসিভ, তত বেশি এলিটিস্ট

অনুবাদ : শাহরিয়ার হিরাজ
০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৪৫আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:২২

আজকাল অনেক সংস্কৃতিমনা মানুষ উঁচু গলায় নিজেদের অ্যান্টি-এলিটিস্ট বলে প্রচার করেন। তাদের মতে, শিল্প হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। আসলে এই বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতির ঝান্ডাধারীরা মধ্যযুগীয় কোনো মঠের সন্ন্যাসীদের মতোই রক্ষণশীল বা কুয়ার ব্যাঙ। তারা নিজেদের প্রগতিশীল অথচ কট্টর মতাদর্শকে বজায় রাখতে এক ধরনের দুর্বোধ্য ও গুপ্ত ভাষায় কথাবার্তা বলে। যে শিল্পকে তারা এত প্রাধান্য দেয়, তা আসলে এতই জটিল আর কঠিন যে, নিজেদের ঘরানার মানুষজন ছাড়া বাকি কেউ তেমন একটা বোঝে না। ফলে বাকিদের সংস্কৃতির পরিসরের বাইরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়।

যেমন, ‘টার্নার প্রাইজ’ বহুদিন ধরে চমৎকার সব চিত্রকর্মের চেয়ে বাজে কাজগুলোকেই পুরস্কৃত করে যাচ্ছে। আজকাল যেসব ফিকশনকে সেরা বলে প্রচার করা হয়, তার অনেকগুলাই আসলে ঠিকঠাক মতো পড়া যায় না। এর বাইরে অন্য দিকে আছে গণহারে তৈরি হওয়া সস্তা বিনোদন। এসব বই, সিনেমা, গান শুধু নিম্ন রুচির মানুষদের কাছেই ভালো লাগে।

ম্যাথিউ আর্নল্ড ভাষায় “পৃথিবীতে যেসব ভালো চিন্তা করা হয়েছে ও বলা হয়েছে” তা উপভোগ করার মতো মানুষ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। তার বক্তব্যটিই একটা সময় পর্যন্ত বিবিসির দিকনির্দেশক নীতি ছিল। কিন্তু প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন সংকটে জর্জরিত এই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সম্ভবত আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগে পৌঁছানো সম্ভব না। যেমন আগে কেনেথ ক্লার্কের ‘সিভিলাইজেশন’-এর মতো অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। বিবিসি টু-এর ‘দ্য রিভিউ শো’ ১০ বছর হলো বন্ধ হয়েছে। সম্প্রতি মেলভিন ব্র্যাগও ‘ইন আওয়ার টাইম’ অনুষ্ঠানটি ছেড়ে দিয়েছেন। এই প্রবণতা অর্থাৎ বুদ্ধিমান জনগণের প্রতি এক ধরনের এলিটিস্ট বৈরিতা নতুন কিছু না।

 ‘দ্য ইনটেলেকচুয়াল অ্যান্ড দ্য মেসেস (১৯৯২)’
ঊনবিংশ শতকে শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটেনে জনসংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। একই শতকের শেষভাগে গৃহীত শিক্ষাসংস্কারের ফলে পাঠকসমাজও বিপুলভাবে বিস্তৃত হয়। কিন্তু জন ক্যারি তার গ্রন্থ ‘দ্য ইনটেলেকচুয়াল অ্যান্ড দ্য মেসেস (১৯৯২)’-এ বলেন, “এই দুই পরিবর্তনের ফলেই একটা শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল।”

বিশ শতকের শুরুর দিকে ডব্লিউ বি ইয়েটস ও জর্জ বার্নার্ড শ থেকে শুরু করে ডি. এইচ. লরেন্স পর্যন্ত বহু লেখক জাতির বৌদ্ধিক ও গাঠনিক মান অক্ষুণ্ন রাখতে ইউজেনিক্সের মতবাদ সমর্থন করেছিলেন। তারা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখার জন্যে লেখার ভাষাকে কঠিন করে তুলতেন।

এই চিন্তকদের কাছে ‘অযৌক্তিক ও অস্পষ্টতা’ ছিল সচেতনভাবে পরিচর্যার গুণ। এর বিপরীতে ক্যারি যুক্তি দেন, সাহিত্যের সমৃদ্ধি থেকে সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া উচিত নয়। এই অবস্থানই ব্যাখ্যা করে ফিলিপ লারকিনের প্রতি তার গভীর অনুরাগের বিষয়টি। ক্যারি লিখেছিলেন, “আধুনিক অনেক কবির মতো তিনি মনে করেন না যে দুর্বোধ্য হওয়াটাই এই কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা।”

ক্যারি এন্টি-এলিটিস্ট ছিলেন, কিন্তু তাই বলে তিনি সংস্কৃতির ‘ডাম্বিং ডাউন’ এর পক্ষে ছিলেন না। যেমন আজকাল দেখা যায় অনেক সচেতন মানুষ গর্ব করে বলে তারা সুপারহিরো সিনেমার ভক্ত।

জন ক্যারি
তিনি জন মিল্টন ও চার্লস ডিকেন্স থেকে শুরু করে জন ডনের মতো বহু স্বীকৃত লেখকের ওপর বই লিখেছিলেন এই বিশ্বাস নিয়ে যে, শিল্পসাহিত্য শুধু অক্সফোর্ডের মতো অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে পারা সুবিধাভোগীদের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে।

পুরো কর্মজীবন জুড়ে হাই-কালচার আর আমজনতার মধ্যকার ব্যবধান কমাতে কাজ করেছেন ক্যারি। তিনি শুধু অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ছিলেন না, নিয়মিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে লেখালেখি করেছেন, রেডিয়ো-টেলিভিশনে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন।

তবে ক্যারির গণতান্ত্রিক মনোভাবকে তার বেড়ে ওঠার সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের বিংশ শতাব্দীর মেধাভিত্তিক সমাজের অংশ, যে সময়ে গ্রামার স্কুলগুলোর উত্থানের ফলে গরিব পরিবার থেকে উঠে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ অভিজাত শিক্ষা লাভের সুযোগ পেত।

এড্রিয়ান উলড্রিজ মেধাভিত্তিক ব্যবস্থাকে “বিপ্লবী ধারণা” বলে অভিহিত করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্রামার স্কুলগুলো নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ সমাজকে রূপান্তরিত করেছিল। লেখক অ্যালান বেনেট, সংগীতশিল্পী মিক জ্যাগার, সম্প্রচারক ব্র্যাগ, এমনকি পরপর তিনজন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী টেড হিথ, মার্গারেট থ্যাচার ও জন মেজর—সকলেই গ্রামার স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন।

জন ক্যারি
প্রকৃতপক্ষে, ক্যারি তার ২০১৪ সালের স্মৃতিকথা ‘An Unexpected Professor’-কে “অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি, গ্রামার স্কুলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শ্রদ্ধাঞ্জলি” বলে উল্লেখ করেছিলেন। সে সময় এখন আর নেই। বহু গ্রামার স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা ফি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। আজকের দিনে মানুষের কাছে ক্লাসিক সাহিত্য পড়ার বা যেকোনো কিছু পড়ার পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধা আছে, কিন্তু তাদের বেশিরভাগই বরং ফোনে টিকটক ভিডিয়ো দেখে বা ক্যান্ডি ক্রাশ সাগা খেলতে বেশি পছন্দ করে।

ক্যারি জীবদ্দশায় সংস্কৃতিতে যে সুন্দর ভারসাম্য ছিল তা এখন আর নেই। বছরের পর বছর ধরে যে সাহিত্যকর্মগুলোকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবেসেছেন, সেগুলোর পাঠক ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে; অথচ যে বকবকানি আজ শিল্পের নাম ধারণ করে আছে, তা এখনো দশাননের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

হাই-কালচার আবারও একচেটিয়া হয়ে উঠছে। ক্যারি মহান সাংস্কৃতিক মিশন আজ পরাজয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

মূল: টোমিওয়া ওউওলাডে/টেলিগ্রাফ

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী