ষাটের দশকে আবির্ভূত বাংলা ভাষার অন্যতম পৌরুষদীপ্ত নাম রফিক আজাদ। প্রতিবাদী এই কবি তাঁর দ্রোহকে শুধু লেখনিতে আবদ্ধ না রেখে, জাতির চরম ক্রান্তিলগ্নে ১৯৭১-এ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাই তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপ এসেছে বিশেষ প্রত্যাশা নিয়ে। যুদ্ধপূর্ব আবেগ আর যুদ্ধপরবর্তী প্রাপ্তির সমীকরণ মেলেনি বলে এই কবির বর্ণমালা হয়েছে বিদ্রোহী। পরে সময় অতিক্রান্তির সঙ্গে সঙ্গে সে বিদ্রোহও পেয়েছে ভিন্নরূপ। একাত্তরের আগে কবি ছিলেন প্রধানত আত্মমগ্ন, ব্যক্তি অনুভবের বাণীবাহক। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কবির আসনকে সরিয়ে এনেছে জনগণের কাতারে, তাকে করেছে সমগ্র জনগণের যন্ত্রণা, প্রত্যাশা ও অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এভাবে ব্যক্তির অনুভব ও বোধ একাত্ম হয়েছে সবার অনুভব ও বোধের সঙ্গে। কবিতায় প্রকাশিত অনুভূতি ব্যক্তি কবির তবু তা দেশও জাতির অনুভবের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের কবিতা কেবল সমকালের সংকট ও প্রত্যয়কে তুলে ধরেনি, তা বাংলাদেশের কাব্যধারায় চেতনার জগতে উন্মোচিত করেছে নতুন মূল্যবোধ এবং বাংলা কাব্যকে দিয়েছে নব সুষমা।
সমকালীন সময়ে সমস্ত বেদনাবোধ, বিক্ষোভ, উত্তাপ, সন্তাপকে ধারণ করে বাংলাদেশের কবিদের হাতে কবিতা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে নিজস্ব অনুভূতির চেতনায় শানিত হয়ে। কবিদের লেখা পঙ্ক্তিমালায় তখনকার সময়ের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা, নির্মম অত্যাচার, লুণ্ঠন, নির্যাতন ছাড়াও উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের রণযুদ্ধের গৌরবগাঁথা। স্বদেশ প্রেম তাদের কবিতার পঙ্ক্তিতে উচ্চারিত হয়েছে অসীম সাহসে ও মুক্তির চেতনা বাংলা কবিতায় স্থান করে নেয় মুক্তিযোদ্ধা, বুলেট, বারুদ, মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড, বাংকার, ট্যাংক, গেরিলা, ইত্যাদি শব্দ। পাশাপাশি কবিতার বিষয় ও আবেগও যায় বদলে। ক্রোধ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, ঘৃণা, অঙ্গীকার, রক্তাক্ত আর্তনাদ কিংবা মুক্তিসেনার দৃপ্ত পদধ্বনি এমনভাবে এর আগে কখনো আমাদের কবিতায় ফুটে ওঠেনি। ফুলের গন্ধ ছাপিয়ে কবিতায় এসেছে বারুদের গন্ধ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক ধারাবাহিক আন্দোলনের চরম পর্যায়। এই আন্দোলন পঁচিশে মার্চের কালো রাত সত্ত্বেও ছাব্বিশে মার্চ থেকেই শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ আন্দোলন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যাতে এগিয়ে যেতে না পারে সেজন্যে পথে পথে তৈরি হয়েছিল ব্যারিকেড। রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্র-যুবা থেকে শুরু করে সাধারণ বালকও যুক্ত হয়েছিল সেই প্রতিরোধ সংগ্রামে। স্বদেশ-সমাজ-সংসারের কালের যন্ত্রণায় নেমে এসেছে শ্বাসরোধ করা অন্ধকার। তখন তিনি মানবতার অস্তিত্বের পঙ্ক্তিতে মুক্তির আকুলতা নিয়ে ১,৪৭,৫৭০ বর্গমাইল সারবৌভোম ফেরি করে ৭ কোটি মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন।
কবি এ দেশ তাঁর প্রেয়সীর ভালোবাসার হাতে তুলে দিতে চান যা তাঁর প্রেয়সী ইচ্ছের সুতোয় সাজাবে, যেমন ফুলের মালা স্তরে স্তরে সাজে। কবি রফিক আজাদ এ দেশকে একটি গোলাপের মতো সুন্দর ভেবেছেন এ দেশের প্রতিটি নারী মা বোন অসহায় বৃদ্ধা-বৃদ্ধ ও শিশুকে গোলাপ ভেবেছেন। ভেবেছেন বাংলা ভাষা সংস্কৃতিকে। এ গোলাপকে পশ্চিমা তথা পাকিস্তানিরা নষ্ট করতে চায়। ধ্বংস করে পায়ে পিষতে চায়। তাই তিনি আত্মগত বা অন্তর্গত বেদনায় শিল্পী-রূপের নির্মাণে নির্মিত করেন দুঃখের শিলালিপি—
"গোলাপ, তোমাকে ঘিরে ষড়যন্ত্রে মেতেছে মানুষ
প্রকাশ্যে তোমাকে আজ ন্যাংটা করে ফ্যাশন প্যারেডে
নামিয়েছে কারা? ঐ দ্যাখো ব্রায়ার পাইপ মুখে
সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো লোকের সামনে আগাগোড়া
ক্রুর চোখে দেখে নিচ্ছে লোলজিহ্বা প্রবীণ শকুন"
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সময়খণ্ডে সামূহিক ভাঙনের তোড়ে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সনাতন বন্ধনে চিড় ধরেছে। সমাজ ব্যক্তির দায়িত্ব নিতে অক্ষম, প্রত্যাশা পূরণে অসমর্থ, নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থ: ব্যক্তিও হারিয়ে ফেলেছে সমাজকে দেওয়ার মতো তার সব সম্পদ-সামর্থ্য হয়ে। ধ্বংস যুগ থেকে মুক্তির আকুলতায় কবি রফিক আজাদ নিজেকে সৃষ্টি করেছেন কালের মুক্তিবাহক হিসেবে। বিদ্যুৎ দীপ্তির উদ্ভাসিত শক্তি জাদুরজিয়নকাঠির সংস্পর্শে জীবন যন্ত্রণা অভিঘাত থেকে দেশ তথা দেশের মানুষদের জন্য শত্রুর ভীতির মানুষ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যযুগীয় বর্বরতা কবিকে করেছে যন্ত্রণাদায়ক। বিষণ্ন বেদনায় কবি এঁকেছেন আক্রান্ত স্বদেশের ছবি। ধ্বংসলীলা, মৃত্যুতাড়িত গৃহহারা মানুষের উদ্বাস্তু জীবন, উজাড় হয়ে যাওয়া গ্রাম-গ্রামান্তরের শূন্যতা ও হাহাকার সেদিন কবির অন্তরে জন্ম দিয়েছিল ক্ষোভ ও ঘৃণার বারুদের। সেই ক্ষোভেরই তীব্র ঐ কবিতায় অসীম আত্মত্যাগ ও মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত যে স্বাধীনতা তা তাঁর কাছে কেবল নিছক যুদ্ধ বিজয় নয়।
স্বাধীনতাকে তিনি দেখেছেন আবহমানকালের বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বপ্ন আর সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে। তা কেবল বাংলার প্রকৃতির হৃদয়গ্রাহী সৌন্দর্যের মোহাঞ্জন মাখানো আলপনা নয়, এই স্বাধীনতা শিশু-কিশোর, যুবা-বৃদ্ধ, ছাত্র-শ্রমিক, জেলে-চাষি সবার সোনালি স্বপ্নের ফসল দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্ছ্বসিত ফোয়ারার আবেগ উৎসারিত হয়েছে কবিতায়। তাতে ধ্বনি হয়েছে কবিদের অনুভব, স্বপ্ন ও অঙ্গীকার।
"বিলাপে মুখর হও, নতজানু, দুঃখিত, নতুবা
গ্রেনেডের মতো ক্রোধে ফেটে পড়ে ধসাবে প্রাসাদ।"
এসব কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে আমাদের জীবনে ও মরণে সঞ্জীবনী অনির্বাণ শিখা। কখনও এসব কবিতায় মূর্ত হয়েছে বাঙালির অপরাজেয় প্রাণ-শক্তি; কখনও কবিতা হয়ে উঠেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বপ্ন-সাধের পতাকা। কখনও কবিতায় মূর্ত হয়েছে একাত্তরের কালো রাতের দুঃস্বপ্ন, কখনও তা হয়ে উঠেছে দুর্নিবার সাহস ও বিক্রমের অনন্য বীরগাথা। একাত্তরের মার্চে হানাদার বাহিনী যে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল দেশকে তাকে শেষ পর্যন্ত ছাপিয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। একজন কবি কোনো একটি বিশেষকালের মধ্যে আবদ্ধ নন। তিনি ক্রমাগত অগ্রসরমান। এককাল থেকে অন্য কালে একসময় অন্য সময়ে। বহুকালজ্ঞ কবি তাই অতীত থেকে বীজ নিয়ে বর্তমান সাজান আর বর্তমানের ফসল নিয়ে আগামী।
রফিক আজাদ এমনই এক সম্পন্ন কবি। একাত্তরের লালিত স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় দুঃখে ভারাক্রান্ত এ কবি আজও ক্রমাগত আগামীকালের দিকে ধাবমান। জাতীয় জীবনের নানা অসংগতি সংশয় দ্বন্দ্ব বিবাদ তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে প্রতিনিয়ত। যখন এ দেশ রণক্ষেত্র, চারদিকে বারুদ আর মৃত্যু গন্ধ, ধ্বংসের লেলিহান শিখায় প্রজ্বলিত বৃক্ষরাজি সোনালি ফসল গৃহ ও গৃহস্থালি এবং মানুষের অন্তর—তখনও পলাতক স্রোতের পিছু ধাবিত হয়নি যে ক'জন তাদেরই একজন রফিক আজাদ। মৃত্যুর বিভীষিকা তাকে দেশছাড়া করেনি, রক্তের তীব্র ভয়াল স্রোত তাকে মাতৃবুক থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। একাত্তরে বাংলাদেশের হৃদয় আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকা কবি তার অবস্থানকে চিহ্নিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই কবিকে কবিতার ভাবনা-রূপান্তরের মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফলে দেশি ও সবকিছু ধ্বংস হয়। ফলে কবির মনেও জাগ্রত হয় জাতিকে জেগে তোলার জাগানিয়া পক্তি উপস্থাপন করার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের সবমানুষ কিন্তু মুক্তির জন্য কাজ করেনি। কিছু মানুষ দেশি ও মানুষকে ভয়ভীতি হত্যা, লুঠ, ধর্ষণ করে পাকিস্তানিদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারা দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও মা-বোনের সম্ভ্রমকে পরাজিত শক্তির হাতে বিকিয়ে দিয়েছে।
"সার্বভৌম পাঁচটি আঙ্গুল
আমরা বড়রা, আজকাল তুলে দিই
বাজার-চলতি কিছু মূল্যবান পণ্যের সম্ভার
আমাদের এই ক্রয় তালিকায় অবলীলাক্রমে চলে আসে
জলপাই রঙ জিপ, কোমরে পিস্তল"
মুক্তিযোদ্ধারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেমমূলক, নজরুলের বিদ্রোহ জাগানিয়া, জীবনানন্দের বাঙলার রূপমুগ্ধতাসমৃদ্ধ কবিতাসমূহের দ্বারা। তাদের প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল দেশপ্রেমের গানসমূহ, যেসব গান মূলত সুরারোপিত কবিতা। ফ্রন্টে, বাংকারে, রাতের অন্ধকারে তাদের বুকের ভেতর দীপ্যমান আলো হয়ে জ্বলেছে কবিতা, শ্রুতিতে বেজেছে দেশমাতৃকার প্রতি নিবেদিত গানের সুরধ্বনি। কেবল বাঙালি কবিরা নন, মুক্তিযুদ্ধ অনুপ্রাণিত করেছিল ভিনদেশি কবিদের। প্রখ্যাত মার্কিন বীট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সুবিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর যশোর রোড’, একাত্তরে এক কোটি বাঙালি শরণার্থীর অবর্ণনীয় দুর্ভোগকে দারুণ চিত্রিত করেছে।
"ভদ্রমহোদয়গণ প্রতীক্ষায় আছেন দীর্ঘকাল।
যখন আসবে তারা নগ্নপদে পাদুকা বিহীন
স্বার্থপর সভ্যতার আলোকে উজ্জ্বল সুমসৃণ
মূর্খ মুখগুলি সহসা বিবর্ণ হবে তোমাদের
চকচকে চামড়া তুলে নেবে পবিত্র ঘৃণায় তারা
শ্রেনি-সুত্রে শত্রু তারা, সেইসব সশস্ত্র সুন্দর
তোমাদের রংচঙ্গে মুখ থেতলে দেবে ক্রোধে;
ঘৃন্য মেদমলিন শরীর মাড়িয়ে মাড়িয়ে যাবে"
ষাটের দশক ও সত্তরের দশক পূর্ব পাকিস্তান শুধু ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝেই বিভাজন করেননি, করেছে ভৌগোলিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। তাই রফিক আজাদ কলমের পাশাপাশি অস্ত্র হাতে দেশকে অপশক্তির হাত থেকে মুক্ত করেন এবং খাঁটি স্বদেশপ্রেমিক কবি হিসেবে বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কবিতায় সঞ্চার করেছে এক নতুন মাত্রা এটা সর্বজনবিদিত তবু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রঙকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ করবে এমন কবির কবিতার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বহুকাল। রফিক আজাদ সেই কবি যিনি একাত্তরের রক্তাক্ত বাংলার ইতিহাস উত্তরণ আর শৃঙ্খলমুক্তির ইতিহাস রচনার দ্বারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হয় উঠেছেন আমাদের সূর্য সারথি ।








