আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার ২০২৬

ইরানি লেখক পারসিপুরের নিষিদ্ধ নভেলা যুক্তরাজ্যে প্রকাশ

মৃত্তিকা তৃণ
১৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:২১আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৩

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় মনোনীত হওয়া ইরানি লেখক শাহরনুশ পারসিপুরের নিষিদ্ধ নভেলা ‘Women Without Men’ প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

৮০ বছর বয়সি পারসিপুর ইরানের অন্যতম খ্যাতিমান লেখক এবং সবচেয়ে সাহসী ও মৌলিক নারীবাদী কণ্ঠগুলোর একজন। ১৯৮০–এর দশকে তার গল্পগুলো ইরানের সাহিত্যজগতে ব্যাপক আলোচনার বিষয় ছিল। সে সময় তাকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই প্রায় পাঁচ বছর কারাবন্দি থাকতে হয়।

ইরানি লেখক পারসিপুরের নিষিদ্ধ নভেলা যুক্তরাজ্যে প্রকাশ

১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের সময়কার তেহরানকে পটভূমি করে লেখা ‘Women Without Men’ উপন্যাসটি জাদুবাস্তবতা এবং ঐতিহ্যবাহী ইরানি রূপকের মিশ্রণে নারীর শরীরের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করে। এতে পাঁচ নারীর গল্প বলা হয়েছে—

মুনিস: ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু মৃত্যুর পরও গল্প বলা চালিয়ে যায়।
ফায়েজেহ: ধার্মিক নারী, ধর্ষণের পর যার বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।
জাররিন: এক যৌনকর্মী, যে একসময় তার ক্রেতাদের মুখবিহীন দেখতে শুরু করে এবং সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
মাহদোখত: যৌনতার ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যে সে একসময় গাছে রূপান্তরিত হয়।
ফাররুখলাকা: মধ্যবিত্ত স্বামীকে ছেড়ে শহরের বাইরে একটি বাগান কিনে নেয়।

শেষ পর্যন্ত তারা সবাই সেই বাগানে একত্রিত হয়—যেখানে বিয়ে, পুরুষের নিয়ন্ত্রণ এবং যৌন লজ্জা থেকে সাময়িক আশ্রয় তৈরি হয়।

ইরানে এখনও বইটি নিষিদ্ধ হলেও বইটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ২০০৯ সালে এর চলচ্চিত্র সংস্করণও মুক্তি পায়।

ইরানি লেখক পারসিপুরের নিষিদ্ধ নভেলা যুক্তরাজ্যে প্রকাশ

শাহরনুশ পারসিপুরের সঙ্গে দিনা নায়েরির কথোপকথন—

শাহরনুশ পারসিপুর ৯০–এর দশকের মাঝামাঝি থেকে নির্বাসনে আছেন। আমাদের কথা হয় ফারসি ভাষায়। তার ইংরেজি সীমিত, আর আমার ফারসি খুবই সাধারণ। মাঝে মাঝে শব্দ খুঁজে দেখতে হয়। আমি কারাগারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইতে গিয়ে অদ্ভুতভাবে জিজ্ঞেস করি—“জেল কেমন ছিল?” তিনি হেসে বলেন, “খুব ভালো। জেল তো সবসময়ই ভালো।”

আমি জানতে চাই, এই বই লেখার জন্য এত ব্যক্তিগত ঝুঁকি নেওয়া কি সার্থক ছিল? তিনি বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র আমাকে ভয় দেখাতে এবং শাস্তি দিতে চেয়েছিল। এক কর্মকর্তার স্ত্রী বলেছিলেন বইটি ইসলামবিরোধী। কিন্তু বইটি ইসলামবিরোধী নয়। তার সমস্যা ছিল বইয়ের একটি অংশ—যেখানে কৌমার্য নিয়ে কথা বলা হয়েছে।”

তিনি বারবার একটি শব্দে ফিরে যান—‘বেকারাত’, অর্থাৎ কৌমার্য। তার মতে, গ্রেপ্তারের মূল কারণ ছিল এই বিষয়টি নিয়ে লেখা।

তিনি বলেন, “ইরানে কৌমার্যের গভীর সামাজিক অর্থ আছে। এটা বোঝায় এই নারী অন্য কারো সঙ্গে ছিল না। বিষয়টি খুবই শক্তভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমার দাদি বলতেন, যে নারী কুমারী নয় সে দোজখে যাবে।”

তিনি জানান, ছোটোবেলায় নিজের শরীর পরীক্ষা করে তিনি ভুল করে ভেবেছিলেন যে তিনি কুমারীত্ব হারিয়ে ফেলেছেন, কারণ কেউ কখনো মেয়েদের শরীরের গঠন বোঝায়নি।

“আমাকে কিছুই বলা হয়নি। আমি অনেক বছর ভেবেছি আমি কুমারী নই। সেই কষ্ট থেকেই এই বই লিখেছি—যাতে অন্য মেয়েরা এমন কষ্ট না পায়।”

তিনি বলেন, “বছরের পর বছর নারীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যেন তারা শুধু একজন পুরুষের জন্যই থাকবে।”

যখন তিনি মাকে বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন তিনি কুমারী নন, তখন মা বলেছিলেন: “কোনো সমস্যা নেই। তুমি কাজ করতে পারো, নিজের জীবন গড়তে পারো, একজন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারো।”

কিন্তু সমাজের চাপ ছিল সর্বত্র—দাদি, খালা, সমাজ এবং বিশেষ করে পুরুষদের কাছ থেকে। পারসিপুর বলেন, “প্রতিটি পুরুষই প্রথম হতে চায়। ইংরেজ পুরুষ, আমেরিকান পুরুষ—সবাই। তারা তুলনা চায় না।”

আমি যখন বলি আধুনিক পুরুষদের ক্ষেত্রে এটা সবসময় সত্য নয়, তিনি শান্তভাবে বলেন, “এটা সর্বজনীন।”
তার কথায়, “যদি কোনো নারী কুমারী না হয়, মানুষ বলে তার জীবন শেষ।”

তবুও তিনি বলেন, কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক নারী এখন কাজ খুঁজে স্বাধীন হতে চাইছে। তিনি “হোয়াইট ম্যারেজ” বা আনুষ্ঠানিক বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকার প্রবণতার কথাও বলেন। “এখন এটা স্বাভাবিক,” তিনি বলেন। “ইসলামি প্রজাতন্ত্র জানেও না। কেউ যাচাই করে না। মানুষ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা চায়।”

ইরানি লেখক পারসিপুরের নিষিদ্ধ নভেলা যুক্তরাজ্যে প্রকাশ

গত ২০ বছর ধরে পারসিপুর সান ফ্রান্সিসকোর কাছে একটি ইরানি সম্প্রদায়ে বাস করছেন। তিনি খুব কম ইংরেজি বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে ব্রিজ খেলেন এবং পারস্য নববর্ষ নওরোজ উদ্‌যাপন করেন ঐতিহ্যবাহী হাফ্‌ত-সিন সাজিয়ে।

তিনি বলেন, “আমি প্রায় শুধু ইরানিদের সঙ্গেই থাকি।”

গত চার–পাঁচ বছর ধরে তিনি লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। “আমার ভাবনা আর ধারণাগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমি ইরানে নেই, তাই নতুন কিছু লিখতে পারি না। আমি ক্যালিফোর্নিয়ার গল্প লিখতে পারি না।”

বর্তমান বিক্ষোভ সম্পর্কে তিনি বলেন, “ইরানের নারীরা অনেক বদলে গেছে। অনেকেই এখন হিজাব ছাড়া বের হয়। তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র কী ভাবছে তা নিয়ে ভাবেই না।”

একটু থেমে তিনি বলেন— “ইরানের নারীরাই একদিন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটাবে।”

প্রকাশ: দ্য গার্ডিয়ান

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি