প্রায় সকল পণ্ডিত একমত যে রহস্যবাদী ধর্মতত্ত্বের বৈপরীত্য নিজের প্রকাশ-অক্ষমতায় নিহিত রয়েছে। কেননা, আমরা যদি স্বীকার করি ঐশী সত্তা পরম অতীত কিংবা বোধগম্যতার সীমার ঊর্ধ্বে তাহলে এটাও মানতে হবে যে মানুষের ভাষাকাঠামোর পক্ষে সেই বাস্তবতাকে ধারণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। এমন সংকট অন্য যে-কোনো ক্ষেত্রের চেয়ে সুফিবাদে বেশি অনুভূত হয়। তাই দেখা যায় সুফিসাধক দরবেশেরা সত্যের প্রত্যক্ষ, মধ্যস্থতাহীন ও অভিজ্ঞতার উপলব্ধির সাধনার ক্ষেত্রে উচ্চতম মার্গে যোগাযোগে এই সংকটে উপনীত হন। কারণ ওই একটাই যে, মানুষের সীমিত শব্দভান্ডার দিয়ে অসীম ও ঐশী অভিজ্ঞতার বর্ণনা করা যায় না। অবশ্য এই অসম্ভবের পথে সাধকরা সমাধান হিসেবে বেছে নেন ‘মাজাজ’ বা ‘মেটাফোর’ বা ‘রূপক’কে। ধ্রুপদী সুফিসাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে ইবনুল আরাবির গূঢ় দার্শনিক রচনা থেকে শুরু করে মাওলানা রুমির উচ্ছ্বাসময় বাণীতে, এবং পরবর্তীকালেও দেখা গেছে রূপককে তাত্ত্বিক কিংবা কবিরা নিছক কাব্যকৗশল হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং একে তারা এক অপরিহার্য জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রয়োজন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বলতে বাধা নেই যে সুফিবাদে বস্তুজগৎ আল্লাহর পথে বাধা নয়; বরং তা নিদর্শন ও প্রতিফলনের এক গূঢ় ক্ষেত্র, যা একটি একক আধ্যাত্মিক উৎসের ইঙ্গিত করে। ফলে এক্ষেত্রে ভাষাকেও নতুনভাবে ব্যবহার করতে হয় নির্দেশ ও ইশারা হিসেবে। সুফিবাদী কবিরা তাই মদের মাদকতা, প্রেম ও বিরহের যন্ত্রণা কিংবা বিচ্ছিন্ন বাঁশির করুণ রাগিণীর জাগতিক চিত্রকল্প ব্যবহার করে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ এবং অদৃশ্য জগতের মধ্যে সেতু তৈরি করেন। রূপক এক্ষেত্রে তাই হয়ে ওঠে এমন এক রূপান্তরমূলক বাহন, যা ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাকে আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে পরিণত করে। এছাড়া সত্যকে ক্ষীণ করার পরিবর্তে রূপক এমন অপরিহার্য কাঠামো হয়ে ওঠে যে, তাতে অবর্ণনীয় চেতনার উপলব্ধিও সম্ভব হয়। ভাষা ও রহস্যবাদের আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে সুফিবাদ রূপককে শুধু আল্লাহকে বর্ণনার আধার হিসেবে ব্যবহার করে না। বরং খোদা-প্রেমিক বা অনুসন্ধানীর যুক্তিনির্ভর অহংকে ভেঙে দেওয়ার আধ্যাত্মিক উপায় হিসেবেও এতে ব্যবহার করা হয়। একপর্যায়ে সুফিবাদে রূপক হয়ে ওঠে ঐশী সত্যের আভাসবাহী এক বিরল ভাষা-প্রতীক।
প্রথাগত ইসলামি শাস্ত্রে শব্দের শব্দার্থ এবং রূপকার্থের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। প্রথাগত ভাষাবিজ্ঞানেও শাব্দিক অর্থকে বস্তুনিষ্ঠ সত্যের আধার হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, এবং রূপককে ধরা হয় অলঙ্কারমূলক বিচ্যুতি হিসেবে। কিন্তু সুফি-অধিবিদ্যা এই উভয়বিদ ভাষাকাঠামোকে উলটে দেয়। অনেক সুফি দার্শনিকের কাছে দৃশ্যমান জগৎ যেহেতু চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়, মূলত ক্ষণস্থায়ী ছায়া তাই বস্তুজগতের ব্যাখ্যায় বাগার্থ প্রকৃত অর্থে শাব্দিক হতে পারে না। সুফিদের যুক্তি যেখানে একমাত্র অরূপ বাস্তবতা প্রকৃত সত্য, সেখানে জাগতিক ভাষা স্বভাবতই রূপাত্মক চারিত্র্য ধারণ করে। তাই কোনো সুফি কবি যখন প্রেম বা মাদকতার কথা বলেন, তখন আসলে জাগতিক কোনো শব্দ ধার করে ঐশী কোনো ধারণা বোঝাতে চান না, বরং তিনি সেই ঐশী বাস্তবতাকে পুনরুদ্ধার করেন যাকে জাগতিক ভাষা বহু আগেই ধূসর করে ফেলেছে। অস্তিত্বের এমন বিপর্যয় বা বিপরীত দর্শন সবচেয়ে পরিণত রূপ লাভ করে ইবনুল আরাবির চিন্তায়। পরবর্তীকালে গবেষকেরা তার দর্শনকে ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ বা ‘সত্তার একত্ববাদ’ নামে অভিহিত করেন। এতে বলা হয় অস্তিত্ব মূলত একক বাস্তবতা আর সৃষ্টি হচ্ছে ঐশী সত্তার প্রকাশ। এই তত্ত্বে মহাবিশ্ব বিস্তৃত আয়নার এক রূপক। ইবনুল আরাবি অনুসারে সৃষ্টি আল্লাহর নাম ও গুণাবলির প্রতিফলনস্বরূপ এক আয়না। আল্লাহ সৃষ্টির আয়নাকে বিম্বাধার করেন স্বীয় গুপ্ত রূপকে প্রকাশ্য করতে, যাতে তার গুণাবলির যথাযথ প্রতিফলন ঘটে। আয়নার এমন রূপক তাই হয়ে ওঠে এক অপরিহার্য জ্ঞানতাত্ত্বিক উপকরণ। আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবি যেমন একই সঙ্গে মূল বস্তুর সঙ্গে অভিন্ন এবং পৃথক, তেমনি বিশ্বজগৎও আল্লাহর প্রতিফলন যে তার নিজের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই, অথচ তা উৎসের রূপ প্রকাশ করে। বিশ্বজগৎকে আল্লাহ বা পরম সত্তার প্রতিফলনের সমষ্টি হিসেবে দেখার ফলে সুফিদের উপলব্ধি হচ্ছে প্রতিটি বস্তু, অনুভূতি ও শব্দ মূলত স্বতন্ত্র রূপকচিহ্ন, যা শেষপর্যন্ত ঐশী উৎসকেই নির্দেশ করে।
প্রতিচ্ছায়ার জগতে পথ চলার জন্য ইবনুল আরাবির অধিবিদ্যক সুফিবাদ ‘তাওয়িল’ নামক তত্ত্বের আশ্রয় নেয়। এর শাব্দিক অর্থ ‘প্রত্যাবর্তন’ বা ‘চূড়ান্ত অর্থে পৌঁছানো’। তবে তাওয়িল-তত্ত্ব সুফিবাদে এমন এক অন্তর্নিহিত পদ্ধতি, যার ভিতর দিয়ে অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি ধর্ম, ভাষা ও প্রকৃতির বাহ্যিক আবরণ ভেদ করে তার অন্তর্গত আধ্যাত্মিক সার আবিষ্কার করে। তাওয়িলের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে রূপক। তা ভাবুককে বাধ্য করে ভাষা বা অভিজ্ঞতার উপরিতলে থেমে না থেকে তার গভীরতর উৎসের দিকে অগ্রসর হতে। এক্ষেত্রে রূপককে আরাবি সহ অপর তাত্ত্বিকেরা এক ধরনের স্বচ্ছ পর্দার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ হিসেবে বলেছেন তা পরম সত্যের তীব্র জ্যোতিকে এমনভাবে আচ্ছাদিত করে যাতে মানুষের চোখ তা সহ্য করতে পারে। একই সঙ্গে সেই সত্যের রেখাও অংশত উন্মোচিত করে, যাতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি তা উপলব্ধি করতে পারে। ইবনুল আরাবির অধিবিদ্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে ‘বারজাখ’। একে আরাবি ও তার অনুসারীরা এমন এক মধ্যবর্তী জগৎ বলে চিহ্নিত করেছেন যা ঐশী আদেশের আধ্যাত্মিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুজগতের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। ইবনুল আরাবির ধারণার আলোকে রূপককে একটি ভাষাগত বারজাখ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। তাত্ত্বিকেরা মনে করেন বারজাখের মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে রূপক রহস্যবাদী ধর্মতত্ত্বকে দুই ধরনের বিপদ থেকে সুরক্ষা দেয়। প্রথমত, তাশবিহ, যা আল্লাহর নৈকট্য ও সাদৃশ্যের দিকটিকে গুরুত্ব দেয়; এবং দ্বিতীয়ত, তানজিহ, যা তার পরম অতীততা ও অতুলনীয়তাকে জোর দেয়। ইবনুল আরাবির মতে, বারজাখ এই দুই প্রবণতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। এমনকি এই ভারসাম্যের মাধ্যমে রূপক মানববুদ্ধিকে নিরাপদে ঐশী বাস্তবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে সাহায্য করে। ফলে ভাষা আর সীমাবদ্ধতার কারাগার থাকে না, বরং অসীমের দিকে আরোহণের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সুফিবাদের অধিবিদ্যাগত কাঠামো যখন প্রতিষ্ঠিত হয় (যেমন, ইবনুল আরাবি-প্রভাবিত দর্শনে দৃশ্যমান বিশ্বকে আধ্যাত্মিক জগতের ছায়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং অন্যান্য অধিবিদ্যকের চিন্তা অনুযায়ী), তখন সুফিসাহিত্যের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়ের ওপর। আর সেই উদ্দেশ্যে ভাবুক ও কবিরা সচেতনভাবে এমন শব্দভান্ডার ব্যবহার করতে থাকেন, যা প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় মানদণ্ডে নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত বলেও বিবেচিত। ধ্রুপদী ইসলামে প্রকাশ্য মদ্যপান, সামাজিক অনিয়ম কিংবা উন্মুক্ত কামনা-বাসনায় কঠোর নিষেধ রয়েছে। কিন্তু হাফিজ শিরাজি, মাওলানা রুমি ও ইবনুল ফারিদের মতো সুফিকবিরা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ চিত্রকল্পকে নিজেদের কাব্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। এধরনের চিত্রকল্পকে ভোগবাদের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সমীচীন নয়; বরং এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল একটি গভীর আলংকারিক ও আধ্যাত্মিক তাগিদ। কেননা, আল্লাহর দিদার লাভের তীব্র ও আত্মবিধ্বংসী উচ্ছ্বাস প্রকাশে সমাজ, আইন ও নীতির নিগড়ে বাঁধা প্রচলিত ধর্মীয় ভাষা কবিদের কাছে উপযুক্ত মনে হয়নি। ফলে তারা জাগতিক অতিক্রমণের ভাষা ব্যবহার করে পাঠকের যুক্তিনির্ভর চেতনায় ধাক্কা দিতে চাইলেন। এছাড়াও এর মাধ্যমে কবিরা বর্ণিত অভিজ্ঞতায় নৈতিক বিধান ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের প্রচলিত সীমাকেও অতিক্রম করেন।
অতিক্রমণধর্মী রূপকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মদ। একে গ্রহণ করা হয় আধ্যাত্মিক মাদকতার জটিল প্রতীক হিসেবে। শরিয়তে মদ হারাম, কারণ তা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে, কিন্তু কবিরা এই চিত্রকল্পকে নতুন আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে রূপান্তরিত করলেন কবিতায়। কারণ চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক মিলনের পথে বড়ো বাধা হচ্ছে সেই বুদ্ধি, যা সর্বদা ‘আমি’ এবং ‘তুমি’-এর মধ্যে বিভাজন বজায় রাখতে চায়। তাই চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক মিলনের পথে সীমাবদ্ধ বুদ্ধি ও অহংকেন্দ্রিক আত্মচেতনার সীমা অতিক্রম করতে হয়। এমন রূপক-কাঠামোতে মদ হয়ে যায় ঐশী প্রেম ও মারিফতের প্রতীক; পেয়ালা হয় সাধকের হৃদয়ের প্রতীক; সাকি হয় কখনো পির, কখনো রাসূল, কখনো ঐশী অনুগ্রহের বাহক, আবার কারও কাব্যে আল্লাহ প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়। মেহখানা হয় সেই আধ্যাত্মিক ধ্বংসস্তূপের প্রতীক, যেখানে অহংকার সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। তাই এই অপার্থিব মদে ‘মাতাল’ হওয়া মানে হচ্ছে ফানা-লাভ অর্থাৎ অহং-সত্তার বিলুপ্তি সাধন। ইবনুল ফারিদের বিখ্যাত মদিরা-গাঁথার কিছু অংশের ভাবার্থ এমন যে, ‘আমরা প্রিয়তমের স্মরণে এমন মদ পান করেছি, যার নেশায় আমরা আচ্ছন্ন হয়েছিলাম আঙুরলতা সৃষ্টিরও পূর্বে।’ এই রূপকের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে, আত্মার আল্লাহর প্রেমজনিত মাদকতা পৃথিবীর অস্তিত্বেরও পূর্ববর্তী এক আদি বাস্তবতা। মদ কেবল সেই শাশ্বত অভিজ্ঞতার স্থূল অনুকরণ মাত্র।
উন্মত্ত প্রেমের রূপক মদ-প্রতীকের সমান্তরালে সুফিসাহিত্যে আরেক রূপক হচ্ছে উগ্র ও সর্বগ্রাসী প্রেম বা ‘ইশক্’। প্রচলিত ধর্মকথায় সাধারণত ‘স্নেহপূর্ণ প্রেম’ অর্থে ‘মাহাব্বাহ’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও, সুফিরা সচেতনভাবে বেছে নেন ইশক্-কে। কেননা ইশক্ এমন এক প্রেম, যা মানুষকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করে ফেলে, তাকে উন্মত্ত করে তোলে এবং পৃথিবীর সব দুয়ার বন্ধ করে দেয়। অনেক সুফি কবির কাছে মানবিক প্রেম (‘ইশক্-এ-মাজাজি’) হচ্ছে আল্লাহ-প্রেম (‘ইশক-এ-হাকিকি’) উপলব্ধির প্রস্তুতিপর্ব। এই রূপকভাষায় মানবাত্মাকে উপস্থাপন করা হয় অসহায় ও অশ্রুসিক্ত প্রেমিক হিসেবে; আর আল্লাহকে দেখানো হয় পরম সুন্দর, মোহনীয় এবং কখনও কখনও দূরবর্তী প্রিয়তম হিসেবে। এখানে জাগতিক দয়িতার শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে রূপান্তর করা হয়। যেমন, অনেক সুফিকবিতায় প্রিয়তমার কালো কেশরাশি সৃষ্টিজগতের বহুমাত্রিক পর্দার প্রতীক, যা আল্লাহ আলোকে আড়াল করে রাখে। গালের সূক্ষ্ম রোমরাজি আল্লাহ করুণার সূক্ষ্ম প্রকাশের প্রতীক; চোখের দৃষ্টি আল্লাহ মহিমার সেই আকস্মিক ঝলকের প্রতীক, যা প্রেমিকের ব্যক্তিসত্তাকে বিহ্বল ও বিলীন করে দেয়। এরূপ প্রেমের রূপক দ্বিবিধ ভূমিকাও পালন করতে দেখা যায়। প্রথমত, তা মহাজাগতিক নির্বাসনের যন্ত্রণা তথা বিচ্ছেদের বেদনা এবং মিলনের আকাঙ্ক্ষাকে গভীরভাবে প্রকাশ করে। দ্বিতীয়ত, তা মানুষ ও আল্লাহ সম্পর্ককে পরম আত্মসমর্পণের সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। দয়িতা তার অহংকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনতার দাবি ত্যাগ করে দয়িত বা মাশুকের পায়ের কাছে সমর্পিত হয়। এভাবে মানবিক প্রেমের শারীরিক ও আবেগঘন চিত্রকল্প ব্যবহার করে সুফিকবিতা স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ককে বিমূর্ত ভাবের গণ্ডি থেকে বের করে আনে। এভাবে আল্লাহকে কেবল বিমূর্ত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা হিসেবে নয়, বরং প্রত্যক্ষ প্রেমাস্পদ বাস্তবতা হিসেবে অনুভব ও উপলব্ধি করা হয়। আল্লাহকে এমন তীব্রতায় ভালোবাসতে হয়, যা একসময় আত্মবিস্মৃতির সীমায় পৌঁছে যায়। এভাবে আবেগ, উচ্ছ্বাস ও অতিক্রমণের কাব্যিক রূপকের মাধ্যমে পাপ, কামনা ও উন্মত্ততার পার্থিব শব্দভান্ডার ঐশী অর্থে অভিষিক্ত হয় এবং আত্মার মুক্তির ভাষায় পরিণত হয়।
মদ ও প্রেমের চিত্রকল্প যেখানে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার উচ্ছ্বাসময় শিখরকে ধারণ করে, সেখানে সুফিসাধনার বাস্তব পথ মূলত দীর্ঘ, কঠিন এবং ধাপে ধাপে অগ্রসরমান এক আত্মরূপান্তরের প্রক্রিয়াও। সুফিবাদে মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক সত্য হচ্ছে এক গভীর অস্তিত্বগত বেদনা। সুফিকাব্যে মানবাত্মাকে তার আদি উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়। আত্মার এই নির্বাসন, বিচ্ছিন্নতা এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করার জন্য সুফিকাব্যে বিচ্ছেদ ও মৌলিক রূপান্তরের রূপক ব্যবহার করা হয়। এসব রূপক কেবল দুঃখের বর্ণনা দেয় না, বরং মানবিক কষ্টকে এমন এক পরিশোধনের পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যা আত্মাকে ঐশী উৎসে প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত করে। উদাহরণস্বরূপ বাঁশির আর্তনাদের কথা বলা যায়। তা বিচ্ছিন্ন আত্মার রূপক। মহাজাগতিক বিচ্ছেদের এমন বিখ্যাত রূপক পাওয়া যায় মাওলানা রুমির কবিতায়। রুমি প্রচলিত ধর্মীয় ভূমিকা এড়িয়ে তার মহাকাব্য শুরু করেন বাঁশির বিলাপ দিয়ে: ‘বাঁশির কথা শোনো, সে বিচ্ছেদের কাহিনি বলছে।’ এখানে রুমি বাঁশিকে মানবাত্মার বহুমাত্রিক রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বাঁশিটি ছিল জন্মস্থান বাঁশবাগানে প্রোথিত। সেই বাঁশবাগান আত্মার আদিম, প্রাক্-জাগতিক অবস্থার প্রতীক, যখন সে ঐশী নৈকট্যে ছিল। কিন্তু একসময় বাঁশকে তার উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়; ফাঁপা করা হয়, তার শরীরে অসংখ্য ছিদ্র সৃষ্টি করা হয়। রুমির এই রূপক ইঙ্গিত করে যে, ঠিক এই ক্ষতগুলোর কারণেই বাঁশি সুর সৃষ্টি করতে পারে। যদি তা অক্ষত থাকত, তবে কখনও সংগীতের বাহন হতে পারত না। আরও গভীর তাৎপর্য হলো যে বাঁশির ভেতর দিয়ে যে-শ্বাস প্রবাহিত হয়, তা তার নিজের নয়; তা বাদক বা সংগীতজ্ঞের শ্বাস। বাদকের শ্বাস এখানে ঐশী প্রাণশক্তির প্রতীক হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে। রুমির এই রূপকতত্ত্বে মানুষের দুঃখ, শূন্যতা এবং অপূর্ণতার অনুভূতিই তাকে ঐশী শ্বাসগ্রহণের উপযুক্ত পাত্রে পরিণত করে। বাঁশির করুণ সুর তো আত্মার নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার আর্তনাদ। ফলে সুফিতত্ত্বে মানুষের সমস্ত বেদনা শেষপর্যন্ত আদি উৎসে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষারই গোপন প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
সুফিবাদে আত্মা যখন তার বিচ্ছিন্নতার সত্য উপলব্ধি করে, তখন তাকে এক গভীর অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সুফিচিন্তকরা এই আত্মরূপান্তরকে কিমিয়া বা আধ্যাত্মিক রসায়নের রূপকে ব্যাখ্যা করেছেন। বাহ্যিক অর্থে ‘কিমিয়া’ হলো নিম্নমানের ধাতু (যেমন, সীসাকে) উন্নত ধাতু (যেমন, সোনা)-তে রূপান্তরের প্রচেষ্টা। কিন্তু সুফিচিন্তায় এই প্রক্রিয়াকে অধিবিদ্যক অর্থ প্রদান করা হয়েছে। এখানে অপরিশোধিত ‘নফসে আম্মারা’ হচ্ছে ভারী, অমার্জিত সীসা; পার্থিব আসক্তি, অহংকার ও অজ্ঞতা তার মলিনতা। অন্যদিকে ‘দার্শনিকের পাথর’ কখনো খোদা-প্রেম বা ইশক্, কখনো মারিফত, কখনো-বা ঐশী অনুগ্রহের প্রতীক। সুফিসাধনার দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামকে বুঝতে আধ্যাত্মিক রসায়নের এই রূপক একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকেও নির্দেশ করে। যেমন, সীসাকে সোনায় রূপান্তরিত হতে হলে তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হতে হয় এবং গলনাঙ্কের তীব্র উত্তাপ সহ্য করতে হয়; তেমনি মানব-অহংকেও তার ভ্রান্ত ধারণা, আত্মমুগ্ধতা ও জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্ত হতে হলে কঠিন পরীক্ষার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। সুফিবাদে সাধকের জীবনে যে-দুঃখ, বেদনা, হতাশা, অন্তর্দ্বন্দ্ব কিংবা আধ্যাত্মিক শুষ্কতা আসে, তা খোদা-পরিত্যাগের চিহ্ন নয়। বরং এগুলো সেই আধ্যাত্মিক চুল্লির উত্তাপ, যা অহংকারের কঠিন আবরণকে গলিয়ে দেয়। রূপকটি সুফিবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘ফানা’ (‘আত্মবিলয়’) এবং ‘বাকা’-র (‘আল্লাহ মধ্যে স্থিতি’) সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, সীসাকে সোনা হতে হলে তার পূর্বের রূপ, গুণাবলি ও পরিচয় সম্পূর্ণরূপে বিলীন করতে হয়, তেমনি মানবসত্তাকেও তার সীমাবদ্ধ অহং-পরিচয় ত্যাগ করতে হয়, যাতে সে আল্লাহ আলোর প্রতিফলক হয়ে উঠতে পারে। ইবনুল আরাবির অধিবিদ্যায় একে ‘তাজাল্লি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এভাবে সুফিবাদে কাঁদতে থাকা বাঁশি এবং রসায়নাগারের জ্বলন্ত ধাতুর রূপকের মাধ্যমে মানবজীবনের বেদনাকে অর্থহীন ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়, বরং ঐশী প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সেখানে মানুষের দুঃখ তখন আর অভিশাপ নয়, বরং তা হয়ে ওঠে আত্মার শুদ্ধিকরণের এক আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।
রূপককে সুফিসাহিত্যে আধ্যাত্মিক সত্যে পৌঁছানোর সেতু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তা হলেও সাধকেরা তার অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা ও বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা জানতেন রূপক অনেকসময় জ্ঞানার্জনের পথ না হয়ে জ্ঞানের প্রতিবন্ধক হয়েও উঠতে পারে। যদি কোনো সাধক রূপকের অন্তর্নিহিত সত্যে পৌঁছানোর পরিবর্তে রূপকের বাহ্যিক চিত্রকল্পে আটকে যান; যদি সাধক মদের প্রতীকের বদলে বাস্তব মদে, প্রেমাস্পদের প্রতীকের বদলে শারীরিক সৌন্দর্যে, অথবা খানকাহর প্রতীকের বদলে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে মুগ্ধ হয়ে পড়েন; তবে রূপক আর জানালা না হয়ে প্রাচীর হয়ে পথ আটকে দিতে পারে। সুফি মতে অতিক্রম করা না গেলে রূপক এক সময় জড়প্রতিমায় পরিণত হয়। প্রতীক তখন আর নির্দেশক থাকে না, বরং নিজেই উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থাকে কিছু সুফি চিন্তাবিদ ‘আধ্যাত্মিক শিরকে’র সূক্ষ্ম রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ এখানে অনেক ভক্ত অসীম ও নিরপেক্ষ ঐশীসত্তার বদলে কোনো সীমাবদ্ধ প্রতীককে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেন।
সুফিবাদে রূপককে একটি অস্থায়ী নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। কেননা, তা বোঝাপড়ার জন্য নির্মিত, কিন্তু কার্যসিদ্ধির পর ভেঙে ফেলতে হয়। এমন বিরোধপূর্ণ চারিত্র্য থেকেই সুফিকাব্যে বিশেষ আলংকারিক কৌশলের জন্ম হয়েছিল; ভাষার আত্ম-অতিক্রমণ। মাওলানা রুমি এবং হাফিজ শিরাজির মতো কবিরা প্রায়ই সমৃদ্ধ রূপক নির্মাণের পর হঠাৎ ঘোষণা করেন, বিশেষত রুমির বক্তব্যে যে, প্রকৃত সত্য ভাষার অতীত। তাহলে রূপক এখানে এক ধরনের প্রতীকী আচ্ছাদন হিসেবে কাজ করে। যেমন, কখনও আল্লাহকে এমন এক প্রেমাস্পদ হিসেবে চিত্রিত করা হয় যিনি ‘আশিক’কে ধ্বংস করেন; আবার একই সঙ্গে তাকে এমন এক স্নেহশীল অভিভাবক হিসেবে দেখানো হয় যিনি সেই আশিককে আরোগ্যও দান করেন। এই পরস্পরবিরোধী রূপকের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনকে আল্লাহ সম্পর্কে কোনো স্থির ও মানবতুল্য ধারণা থেকে বিরত রাখা। তাই রূপক নির্মাণের কৌশলও এমন যে নিজেদের মধ্যকার বৈপরীত্যের ভারেই যেন তারা ভেঙে পড়ে। আর সেই ভাঙনের মধ্য দিয়ে মানুষের যুক্তিবোধ প্রবেশ করে এক বিস্ময়কর ভাববিহ্বল অবস্থায়; যাকে সুফিরা বলেন ‘মুগ্ধ-বিস্ময়’। সুফিচিন্তায় উল্লিখিত বিস্ময় কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং তা এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক অবস্থান। এখানে মানুষ আল্লাহকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা বন্ধ করে দেয় এবং প্রত্যক্ষ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
হয়ত এজন্যে সুফি-রূপকতার চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে ওঠে নীরবতা। তা তাৎপর্যপূর্ণও যে, মাওলানা রুমির কাব্যে পুনরাবর্তিত আহ্বান হিসেবে এসেছে ‘খামোশ’ শব্দটি। তা সুফি-ঐতিহ্যের মৌলিক বৈপরীত্যকেও প্রকাশ করে যে, এতে ভাষার ব্যবহার তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করে। তাহলে সুফিসাহিত্যে রূপক হয়ে ওঠে সেই শক্তি, যা অনুসন্ধিৎসুর চেতনাকে উচ্চতর স্তরে পৌঁছায়। কিন্তু নদী পার হওয়ার পর নৌকার মতো লক্ষ্যপথে পৌঁছে গেলে একে পরিত্যাগ করতে হয়। এপ্রসঙ্গে আরও বলা যেতে পারে যে, ধরা যাক ভাষার প্রধান উপাদান শব্দের কথা। শব্দকে যদি আমরা সাগরের উপরিভাগের সৃষ্ট ঢেউ হিসেবে ভাবি তাহলে তা থেকে আমরা পানির গতিবিধির ইঙ্গিত হয়ত পেতে পারি, তাই বলে সাগরের গতিবিধি তো আশা করতে পারি না। তাই সাধক যখন ‘ফানা’র অভিজ্ঞতার জগতে ঢুকেন, তখন ভাষার জন্য অপরিহার্য দ্বৈততা যেমন বক্তা, শব্দ ও শ্রোতার পৃথক অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়। সেই গভীর উপলব্ধির জগতে তাই রূপকের সেতুও অদৃশ্য হয়ে যায়। কেননা, তখন সাধকের অভিজ্ঞতায় মানবসত্তা ও পরমসত্তার মধ্যকার বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির বিলুপ্তি ঘটে গেছে।
সুতরাং সুফিবাদ ও রূপকের সম্পর্ক নিছক শৈল্পিক অলংকরণের কারণে নয়, বরং বলা যেতে পারে তা জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত অপরিহার্যতা থেকে উদ্গত। যেহেতু ঐশী বাস্তবতা ভাষার কাঠামোগত এবং দ্বৈত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে, তাই বস্তুজগতের প্রচলিত বাগার্থের ভাষা সেই বাস্তবতাকে ধারণ করতেও অক্ষম। সুফি-ঐতিহ্য ভাষার এই সংকট মোকাবেলার একটি স্বতন্ত্র উপায় হিসেবে রূপক বা মাজাজের সৃষ্টিশীল প্রয়োগকে গুরুত্ব দেয়। তাই মদের আড্ডাখানার আপাত অপবিত্র পরিবেশ, উন্মত্ত প্রেমের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আবেগ, বিচ্ছিন্ন বাঁশির বিলাপ কিংবা রসায়নের আগুনে ধাতুর রূপান্তর এমনসব জাগতিক চিত্রকল্প নতুন অর্থে কবিরা রূপক আকারে হাজির করেন, যা আদপে ভাষাগত বারজাখ হিসেবেই ধরা পড়ে। তা হয়ে ওঠে এমন এক নির্মাণ, যা সীমিত মানবচেতনাকে অসীম বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এই মধ্যবর্তী ভাষিক পরিসর মানুষকে একদিকে আল্লাহকে মানবীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ করার বিপদ থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে পরমকে এতটাই অতীত ও বিমূর্ত করে তোলার বিপদ থেকেও মুক্ত রাখে যে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞেয় হয়ে ওঠেন।
তাহলে কথা এই দাঁড়ায় যে, সুফিবাদে রূপক কোনো কাল্পনিক নির্মাণ বা অসত্য বর্ণনা নয়। বরং অনেক সুফি চিন্তকের কাছে তা জাগতিক ছায়ার মাধ্যমে পরম বাস্তবতার ইঙ্গিত বহনকারী ভাষাকাঠামো। তাদের কাছে রূপক এক অর্থে পথহারানো আত্মার জন্য একটি অপরিহার্য নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে; যা জীবনের বিচ্ছেদ, বেদনা ও নির্বাসনের অভিজ্ঞতাকে আধ্যাত্মিক উৎসে প্রত্যাবর্তনের অর্থবহ যাত্রায় রূপান্তরিত করে। তবে সুফিবাদে রূপকের ব্যবহারের প্রকৃত মহিমা নিহিত থাকে তার গভীর আত্মসচেতনতায়। সুফিচিন্তা মানবজীবনে মুগ্ধকর ও স্থায়ী কাব্যিক চিত্রকল্পগুলোর জন্ম দিয়েছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে চিন্তকরা কখনও ভুলে যাননি যে প্রতিটি রূপকের একটা সীমানা আছে। প্রতিটি উপমা, প্রতিটি প্রতীক এবং প্রতিটি চিত্রকল্প শেষপর্যন্ত এমন এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, যা এসবকেই অতিক্রম করে। এই কারণে সুফি আধ্যাত্মিক যাত্রার চূড়ান্ত গন্তব্য ভাষা নয়, বরং ভাষার অতীত; রূপক নয়, বরং রূপকের অন্তর্নিহিত সত্য; শব্দ নয়, বরং নীরবতা। রূপক আত্মানুসন্ধানীকে পথ দেখায়, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছায় না। তা হচ্ছে সেই দীপশিখা, যা পথ দেখায় কিন্তু গন্তব্য নয়। সুতরাং সুফিবাদে রূপকের সর্বোচ্চ সাফল্য নিহিত রয়েছে এই সত্যে যে, তা শেষপর্যন্ত নিজেকে অতিক্রম করতে শেখায়। যখন আত্মা ফানার অভিজ্ঞতায় উপনীত হয়, তখন ভাষা, প্রতীক ও ব্যাখ্যার সমস্ত সেতু বিলীন হয়ে যায়। তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল সেই একক, অবর্ণনীয় এবং অসীম ঐশী উপস্থিতি, যার দিকে সমস্ত রূপক, সমস্ত কবিতা এবং সমস্ত আধ্যাত্মিক সাধনা সুদূর অতীত থেকে ইঙ্গিত করে এসেছে। এই অর্থে সুফিবাদে রূপক কেবল সাহিত্যিক কৌশল নয়; তা মানবসত্তার অসীমের দিকে যাত্রার এক আধ্যাত্মিক পথরেখা-যেখানে প্রতিটি শব্দ নীরবতার দিকে, প্রতিটি প্রতীক সত্যের দিকে এবং প্রতিটি ছায়া আলোর উৎসের দিক ধাবিত।









