জাতীয় সংকটে বা সামাজিক সংকটকালীন যে কবি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যান তিনিই মহান হন, বড়ো কবি হন। বিভিন্ন সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে বিশ্বের অনেক কবি লড়াই করেছেন কবিতা দিয়ে। বাস্তবেও নেমে পড়েছেন লড়াইয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন; বলা যায় বিশ্বকবিদের অগ্রগামী। নজরুল নিজের সন্তানদের যেমন অসাম্প্রদায়িক নাম রেখেছেন, অস্ত্র হাতে লড়াইও করেছেন সৈনিক হয়ে। অর্থনীতি, সমাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রনীতি সবকিছুই চলে এসেছে তার কবিতা কিংবা সাহিত্যে। অত্যাচারীদের সহ্য করতে না পেরেই বলেই ফেলেন, ‘যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!’ অসাম্যের বিরুদ্ধে আপোশহীন নজরুল। অনিয়মকারীর বিরুদ্ধে (ঘর কিংবা বাইরের) তার ‘মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে’।
হুইটম্যান, আলেকজান্ডার পুশকিন কিংবা অনেক কবি জাতীয় সংকটে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। সব মহান কবিই সমসাময়িক বিভিন্ন সংকটে বুক চিতিয়ে কবিতা দিয়ে লড়াই করেছেন। কোনো শিল্পী, সাহিত্যিক কিংবা কবিকে মহান হতে হলে এ মনোভাবের ব্যত্যয় ঘটানো যায় না। অনেকে হয়তো জীবনানন্দ দাশের নাম তুলে এনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু তার অনেক কবিতা সমাজের মুখোশ খুলে দিয়েছে, সমাজের অন্ধকার ও কদাকার দিকগুলোকে তিরস্কার করা হয়েছে। প্রকাশে তিনি সরাসরি প্রচলিত বিদ্রোহী হননি ঠিক আছে, কিন্তু প্রতীকী প্রকাশে তিনি অনেক অসাম্যকে তুলে এনেছেন। তাই বলা চলে, কবিকে মহান হতে হলে সমসাময়িককে এড়িয়ে গেলে হয় না, মানুষকে কেন্দ্রে রেখে বিবেক প্রয়োগ করতেই হবে। বিশ্বে যারা বিখ্যাত হয়েছেন, সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন মানুষকে নিয়ে। যারা বিজয়ী হয়েছেন তারা বরণীয় হন। সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে পরাজিতরাও মানুষের মনে স্থান পান। আসলে, মানুষ-কেন্দ্রিক যুদ্ধে কেউ পরাজিত হন না। ক্ষমতা নিজের পক্ষে আনতে বা কোনো কিছু কুক্ষিগত করতে ধ্বংসকেও বেছে নেওয়ার রীতি বহুকাল থেকেই চলে আসছে। সীমালঙ্ঘনকারীকে কেউ পছন্দ করেন না! ধ্বংসস্তূপ থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে সৃষ্টি—‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? —প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!/ আসছে নবীন–জীবন-হারা অ-সুন্দরে কর্তে ছেদন’। সমাজের ক্ষমতার কাঠামোর প্রত্যক্ষ চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সর্বদা ক্ষমতার বলয়ে থাকা শোষকদের দ্বারা প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়। শোষকরা তাদেরই জীবনীশক্তি ব্যবহার করে তাদের নিপীড়িত করে রাখে। সংকট, অবক্ষয়, অত্যাচারী প্রভু কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ের শাসকগোষ্ঠী নিয়ে মহাবিরক্ত কবি নজরুল। বিভিন্ন অনিয়ম আর বৈষম্য দেখে কিংবা সহে সহে বড় ক্লান্ত হয়ে উঠেছেন। তাই তো বিদ্রোহী সুর ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। ‘মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত’ হয়েছেন তিনি—কবে হবেন শান্ত? —‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না—/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না’।
জাতীয় সংকট কবিতা হলো যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সামাজিক বিশৃঙ্খলার সময়ে রচিত শক্তিশালী পঙ্ক্তি, যা জনবেদনা তুলে ধরতে, মুক্তির জন্য কিংবা অন্যায্যতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সম্মিলিত শোককে অনুধাবন করতে ব্যবহৃত হয়। কাব্যিক বক্তা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতাদর্শের মুখপাত্র হিসেবে নয়, বরং একজন স্বশাসিত নৈতিক সাক্ষী হিসেবে অবস্থান করেন। মানুষই মুখ্য—মানবতাই প্রধান ধারণা। এছাড়া মহান হওয়া সম্ভব নয়। নজরুলের মূল বাণীই এটা:
"গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।"
(মানুষ)
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? /কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’—কাজী নজরুল ইসলাম কবিতায় একটি অসাম্প্রদায়িক কণ্ঠস্বরের ওপর আলোকপাত করেন। তীব্র সামাজিক ও ধর্মীয় সংঘাতের সময়ে সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূর করতে তাদের শিল্পকে ব্যবহার করেছিলেন। কবিরা কীভাবে নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মঞ্চ ব্যবহার করেন তা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা অনুসন্ধ্যান করলেই সহজেই বুঝে নেওয়া সম্ভব। ‘মানুষ’-ই সব ধারণার ঊর্ধ্বে। ‘মানুষ’-কেন্দ্রিক কল্যাণই প্রকৃত কল্যাণ। ধর্ম, দেশ, কাল ভিন্ন হলেও সব মানুষের রকত একইরকমের লাল—কোনো পার্থক্য নেই, তাই বিভিন্নভাবে বিভাজন কাম্য নয়— ‘গাহি সাম্যের গান—/মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!/ নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,/সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি (মানুষ)’। ধর্ম ও সংকীর্ণতা মানুষকে খাটো করে দিচ্ছে। কিন্তু, নজরুলের মতো কবিরা এটা হতে দিতে চান না। কেননা, এটা কাম্য হতে পারে না।
প্রতিবাদ ও জনসমাবেশে কবিতা সংক্ষিপ্ত অথচ বলিষ্ঠ এক জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম। নাগরিক অধিকার ও নারী মুক্তি আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’—সর্বত্রই কবিতার এমন এক শক্তি রয়েছে যা শহরের কোনো চত্বরে জনসমাগম ঘটাতে পারে, আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো সংক্ষিপ্ত ও জোরালোও হতে পারে। ঘটনা আড়াল করা, জনমতকে প্রভাবিত করা কিংবা আরও খারাপ কোনো উদ্দেশ্যে তৈরি রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের বাগাড়ম্বরের মুখে দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণ করা কবির এক অপরিহার্য ভূমিকা। সব অমানবিক শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং তাদের মোকাবিলা করে, যারা ওপরমহল থেকে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো কঠোর সত্যকে উন্মোচন করে, সচেতনতা জাগিয়ে তোলে এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ল্যাংস্টন হিউজের কবিতার মতোই এগুলোর কোনো কোনোটি জোর দিয়ে বলেন, নিপীড়নের দ্বারা নির্মিত এই সব দেয়াল অবশ্যই ভেঙে ফেলতে হবে— That all these walls oppression builds / Will have to go! প্রতিটি কবিতাই আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে কেন কবিতা অপরিহার্য ও কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে, তা তুলে ধরে। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ভাষা আরও জোরালো কিংবা আরও ঝাঁঝালো:
‘এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।।
...এই লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হান্ছে লাঞ্ছনা,
মোদের অশ্রু দিয়েই জ্ব’লবে দেশে আবার বজ্রানল।।’
(এই শিকল পরা ছল)
কিংবা
‘কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙ্গে ফেল্ কর্ রে লোপাট রক্ত-জমাট
শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!
...নাচে ঐ কাল-বোশেখী, কাটাবি কাল ব'সে কি?
দে রে দেখি ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি'।
লাথি মার, ভাঙ্রে তালা ! যত সব বন্দী-শালায় —
আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা, ফেল্ উপাড়ি’
(ভাঙার গান)
প্রকৃত বীর লড়ে যান অকাতরে। বক্সের বাইরে এসে স্রোতের বিপরীতে ন্যায়ের পথে চলাই হচ্ছে সত্যিকার বীরদের আনন্দদায়ক পথ। নজরুলও তাই, তিনিও বাইরের বিশ্ব দেখতে চান, নিজের মতো গড়তে চানÑ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, / কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে (সংকল্প)’। তবে ঘরের শত্রুকে পরাস্ত করে আগে জয় করতে হবে। স্থান-কাল-পাত্র-ভেদে সব স্থানে এ নীতি প্রয়োগ করতে হবে। ঘরের শত্রুই (যাকে আমরা মিত্র মনে করে থাকি) জয়ের পথে বাধা হয়ে আসতে পারে। এ বিষয়ে সংকল্প বা দৃঢ়তা দেখাতে হয়।
‘আপনার ঘরে আছে যে শত্রু
তারে আগে করো জয়,
ভাঙো সে দেয়াল, প্রদীপের আলো
যাহা আগুলিয়া রয়।’
(আশীর্বাদ)
‘দেখিনু সেদিন রেলে,/ কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে! (কুলি-মজুর)’ —কবি নজরুল দুর্বলদের পক্ষে থাকতে চেয়েছেন। অভয় দিয়েছেন, শুভদিন আসতেছে। দুর্বল কিংবা অত্যাচারিতদের আর একা-একা সংগ্রাম কিংবা লড়াই করা লাগবে না। কবি নজরুল তাদের পাশে থাকবেন। ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিপক্ষে লড়াই করার একত্রে শামিল হওয়ার জন্য জন্য যুব-তরুণদেরকে আহ্বান করেছেন বারবার, কেননা অত্যাচারীরা ঋণের ভার বাড়িয়েই তুলছে, এখান থেকে পরিত্রাণ দরকার:
‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার হে!
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার॥
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ —
ছিঁড়িয়াছে পাল কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত।
কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত,
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার॥’
কিংবা
‘নতুন পথের যাত্রা-পথিক
চালাও অভিযান!
উচ্চ কণ্ঠে উচ্চার আজ -
“মানুষ মহীয়ান!”
...পাতাল ফেড়ে চলবি মাতাল
স্বর্গে দিবি টান্।’
(অভিযান)
সমস্ত অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা শাসকগষ্ঠীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কবি নজরুল উল্কার বেগে দ্রুতবেগে চলতে চান, ধূমকেতুর মতো আকস্মিকভাবে ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তুতির ছাড়াই তৎক্ষনাতই বীরের মতো লড়তে চান কবি নজরুল:
‘বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!’
সমাজের প্রকৃত রূপ বা সত্য উন্মোচন করা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কাজ। কাজী নজরুল ইসলাম সাধারণ মানুষের পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। ক্ষমতা-কেন্দ্রিক সমাজের শোষণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ তার কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নজরুলের কাব্যে জাতিগত সহিংসতা ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সর্বদা নিগৃহীত ও ভাগ্যহত মানুষের কথা ধ্বনিত হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের পথ নির্দেশ করেছেন। ক্ষমতা এবং প্রতিরোধের তাত্ত্বিক ধারণার আলোকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি সর্বদা উচ্চকিত কণ্ঠস্বর তাকে জনপ্রিয় কবি হিসাবে পরিচিতি লাভ করাতে সক্ষম হয়েছে। উচ্চকিত স্বর ও সপক্ষের শক্তি নিয়েই নতুন পৃথিবী পড়তে চান, কোরাস জয়োল্লাস করতে চান:
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!’
(প্রলয়োল্লাস)









