প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের ভোজসভায় বিজয়ীরা সংক্ষিপ্ত ও আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দেন। সাধারণত তারা সুইডিশ একাডেমিকে ধন্যবাদ জানান ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হাঙ্গেরীয় ঔপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুই বলেননি। তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন অতীতের প্রতি। ধন্যবাদ জানান প্রাচীন গ্রিসের শিল্পীদের, ইতালীয় রেনেসাঁকে, কিয়োটো শহরকে এবং ফিওদোর দস্তয়েভ্স্কি, উইলিয়াম ফকনার ও ইয়োহান সেবাস্টিয়ান বাখের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তাদের ‘ঐশ্বরিকতার জন্য’।
তিনি তার বন্ধুদেরও ধন্যবাদ জানান। তাদের অনেকেই তখন মারা গেছেন। তাদের ব্যক্তিগত প্রভাবের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন— “আমি আমার বন্ধু যোস্কা পালনিককে ধন্যবাদ জানাই। ১৯৬০ সালে একটি ওয়াটার-স্লাইডের দ্বিতীয় ধাপে দাঁড়িয়ে সে আমাকে বলেছিল, শিশুর জন্ম কীভাবে হয়। সেই সত্য জানার পর আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে, আমার মনে হয়েছিল আমি যেন মরে যাই।”
যারা ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস পড়েছেন, তাদের কাছে এই বক্তৃতা বিস্ময়কর মনে হবে না। তার লেখার বিষয়বস্তু গভীর জ্ঞাননির্ভর। তার কাহিনির পটভূমি নানা দেশ ও সংস্কৃতিতে বিস্তৃত। তার কল্পনার জগৎ প্রলয়ময়, কিন্তু একই সঙ্গে তাতে তীক্ষ্ণ রসবোধও রয়েছে।
তার চরিত্ররা প্রায়ই উন্মাদ অথবা স্বপ্নদ্রষ্টা—অনেক সময় এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তারা এমন এক নিষ্ঠুর ও নির্দয় পৃথিবীতে বাস করে, যেখানে সৌন্দর্য ও পরম সত্যের এক পবিত্র অনুভূতির প্রতি তাদের অটল বিশ্বাস থাকে।
তুর্কি-মার্কিন সাহিত্যসমালোচক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক মেরভে এমরে এথেন্স আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের এ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তিনি হাঙ্গেরীয় ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন। ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন অটিলি মালজেট। ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে।
নোবেল পুরস্কার গ্রহণের ভোজসভায় আপনার বক্তৃতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। বিশেষ করে আপনার বড় ভাইয়ের প্রসঙ্গটি। আপনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন, কারণ ছোটবেলায় তিনি আপনাকে কাঁধে তুলে নিতেন। আপনাকে শিখিয়েছিলেন—“পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখাও সম্ভব।" তার কাঁধে বসে আপনি পৃথিবীর কোন রূপ নতুন করে দেখেছিলেন?
শুরুতে? কিছুই না। বড় ভাই আমার ওপর খুব রাগ করত। কারণ, তার কাঁধে চড়লে আমার ছোট্ট প্যান্টে প্রায়ই একটা বিপত্তি ঘটত। ব্যাপারটা তার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। রাগে সে আমাকে ঝাঁকিয়ে দিত। তখন পৃথিবী দেখার সুযোগ খুব একটা পেতাম না।
এখন আমরা দুজনই অনেক বৃদ্ধ। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ব্যাপারটা তখন কতটা বিরক্তিকর ছিল। সে হেসে বলল, “এখনো সেই অনুভূতি টের পাই।” তবে তার কাঁধে বসে একটা জিনিস দেখেছিলাম—পৃথিবী যেন সব সময় গতির মধ্যে আছে, চারদিকে অবিরাম চলমান।
সেই থেকে চেষ্টা করেছি, প্রতিটি কাজে সেই গতিটুকু ধরে রাখতে। ছোটবেলায় যখন সুর রচনা করতাম, তখনও সেই গতি আমাকে পথ দেখিয়েছে। পরে যখন লিখতে শুরু করলাম, তখন আমার বাক্যও সেই গতির ছন্দে গড়ে উঠেছে।
মনে হচ্ছে, এই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমি একটু বেশিই গম্ভীর হয়ে গেলাম।
আপনার বাক্যগুলোর মধ্যে সেই গতির স্পষ্ট উপস্থিতি আছে। সেগুলো দীর্ঘ, জটিল, পুনরাবৃত্তির বিশেষ ছন্দে গঠিত। কখনো কখনো একটি বাক্য পুরো একটি উপন্যাস জুড়েও বিস্তৃত হয়েছে, যেমন ‘হার্শ্ট ০৭৭৬৯’-এ। কিন্তু শুরু থেকেই আপনার লেখার ধরন এমন ছিল না। আপনার কৌশল সময়ের সঙ্গে বদলেছে। প্রথম বড় পরিবর্তন আসে ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স’ থেকে ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’-এ। সেখানে প্রতিটি ছোট অধ্যায় মূলত একটি মাত্র বাক্যে নির্মিত, যা সাধারণত একটি ঘটনা, একটি পরিবেশ বা একটি চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করে। পরে ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ থেকে ‘ব্যারন ভেঙ্কহাইমস হোমকামিং’-এ এসে আবার পরিবর্তন দেখা যায়। সেখানে দীর্ঘ দীর্ঘ পর্ব, প্রতিটিই একটি মাত্র বাক্যে লেখা, কিন্তু সেই বাক্য বহু ঘটনা, বহু চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময় ও স্থানের নানা স্তরকে একসঙ্গে বহন করে। আপনার এই গতিবোধ কীভাবে আপনার বাক্য নির্মাণকে প্রভাবিত করেছে?
আমার মনে হয়, এর কারণ আমি ক্রমশ কথ্য ভাষার আরও কাছাকাছি চলে এসেছি। ধরুন, একজন মানুষ সত্যিই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে চায়। একজন পুরুষ একজন নারীকে বলতে চায়, কিংবা একজন নারী একজন পুরুষকে— "আমি সতেরো বছর ধরে তোমাকে ভালোবাসি। আর এই অনুভূতি বয়ে বেড়াতে পারছি না। আমাকে তোমাকে বলতেই হবে। এভাবে আর চলতে পারে না..." এমন একটি বিস্ফোরণধর্মী স্বীকারোক্তিকে কি ছোট ছোট, গোছানো বাক্যে ভেঙে ফেলা সম্ভব? জীবন্ত কথাবার্তা তো এভাবে চলে না। এই প্রশ্নটাই আমার কাছে গতির সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ করেছে। আমার কাছে একটি গদ্যরচনার চরিত্র নির্ভর করে তার সঠিক গতির ওপর। অবশ্য আমি এখানে পদার্থবিজ্ঞানের গতি বোঝাচ্ছি না। আমি রূপক অর্থে বলছি। যদিও এই রূপক অর্থের সঙ্গে বাস্তব গতিরও কিছু সম্পর্ক রয়েছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমার প্রথম দুই-তিনটি বইয়ে আমি এই দায়িত্ব অনুভব করিনি যে স্বীকারোক্তিমূলক জীবন্ত ভাষাকে আমাকে ব্যবহার করতেই হবে। পরে বিষয়টি আমার কাছে অনেক বেশি গুরুতর হয়ে ওঠে। কারণ, আমি প্রকাশিত প্রতিটি বই নিয়েই ক্রমশ আরও অসন্তুষ্ট হতে থাকি। শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগবে, কিন্তু আমি প্রায় আমার সব বইকেই ব্যর্থ বলে মনে করি। এই একের পর এক ব্যর্থতা যদি না ঘটত, তাহলে প্রথম বই প্রকাশের পরই হয়তো আমি লেখা ছেড়ে দিতাম। মধ্যবয়সে এসে, যখন আমি ‘সেইওবো দেয়ার বিলো’ লিখছিলাম, তখন সত্যিই আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে চেয়েছিলাম।
আমি বলতে চেয়েছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ কিছুই বলতে পারছি না। কারণ, “গুরুত্বপূর্ণ” বলে আদৌ কিছু আছে কি না, সেই ধারণাটাই তখন আমার কাছে প্রশ্নের মুখে ছিল। এমনকি ভাষায় কিছু স্পষ্ট করে প্রকাশ করার ধারণাটিও আমাকে দোটানায় ফেলেছিল। কিন্তু স্বীকারোক্তির ভাষা নিয়ে আমার কোনো সংকোচ ছিল না। নিজের জীবনের পেছনের দিকে ঘটে চলা নানা ঘটনার ভেতর থেকে হঠাৎ একটি সূক্ষ্ম সুতো যেন আমার হাতে এসে ধরা দিত। সেটি হঠাৎ আমার মস্তিষ্কে বিস্ফোরণের মতো জ্বলে উঠত। তারপর আমি সেই সুতোর পথ ধরেই লেখা শুরু করতাম।
প্রথমে বাক্যগুলো শুধু আমার মাথার ভেতরেই জন্ম নিত। আমি তখন যে ঘরেই থাকতাম, সেই ঘরের ভেতর বারবার পায়চারি করতাম। হঠাৎ একসময় মনে হতো, যেন পনেরো বা বিশ পৃষ্ঠার লেখা তৈরি হয়ে গেছে। পুরোনো এ-ফোর কাগজে লেখার আগেই আমি তার ছন্দ, সুর, তাল ও গতি—সব ভুল নিজের মনে ঠিক করে ফেলতাম। যেন আমি ফ্রিডরিখ হোল্ডারলিন বা হাইনরিখ ফন ক্লাইস্ট-এর মতো এক উন্মত্ত স্বপ্নদ্রষ্টা। সে সময় আমার সঙ্গে বসবাস করা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ অন্য কোনো বিষয়ে আমি মনোযোগ দিতে পারতাম না।
আমার লক্ষ্য ছিল এমন সব চরিত্র সৃষ্টি করা, যাদের অস্তিত্ব নেই। তাদের এমনভাবে বাস্তবতার ভেতরে নিয়ে আসা যেন তারা সেখানেই স্থায়ী হতে পারে। যেমন ধরুন, প্রিন্স মিশকিন। আজ তিনি আর শুধু দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের চরিত্র নন। তিনি আমাদের বাস্তবতারই অংশ হয়ে গেছেন। দস্তয়েভস্কি তাকে এমন শক্তি দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন যে, আজ আমরা বাস্তবতাকে যেভাবে অনুভব করি, তার মধ্যেই প্রিন্স মিশকিন বাস করেন। আমিও ঠিক তেমন কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম।
আপনি বলেছিলেন, আপনি সন্তুষ্ট নন, কারণ আপনার কাছে আপনার সব লেখাই ব্যর্থ মনে হয়। এমন সিদ্ধান্তে আপনি কীভাবে পৌঁছালেন? আপনার কী মনে হয়, কোন জিনিসটি আপনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি?
আমি নিজের বইয়ের পাঠক নই। স্বেচ্ছায় কখনো নিজের বই আবার পড়ি না। কিন্তু আমার এক বন্ধু ছিলেন, বেলা তার। তিনি আমার লেখার ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র বানাতেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। তার জন্য আমাকে নিজের লেখা জোরে জোরে পড়তে হতো, চিত্রনাট্য লিখতে হতো। এই কাজটি আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। কারণ ভয় পেতাম, আবার সেই একই ঘটনা ঘটবে। আসলে সেটাই ঘটত।
পড়তে পড়তে হঠাৎ আমি ছন্দের ভুল, সুরের ভুল, বিষয়বস্তুর ভুল কিংবা গঠনের ত্রুটি দেখতে পেতাম। মনে হতো, আমি ভুল করেছি। কিন্তু এমন ভুলও আমার চোখে পুরো কাজটাকে মাটি করে দেয়। এতে আমি এত বিরক্ত হতাম যে পরের বইয়ে সেই ভুল সংশোধনের চেষ্টা করতাম। আমার পুরো জীবনই যেন এ ধরনের ক্ষতিপূরণের চেষ্টা। তবে খুব একটা সফল হচ্ছি না। হয়তো এটাকে ‘পারফেকশনিজম’ বলা যায় না। কারণ নিজের ভুল ছাড়া অন্যদের ভুল আমি পছন্দ করি। বিশেষ করে বেলা তারের জন্য কাজ করার সময় করা ভুলগুলো।
ধরুন, জাপানি শিল্পকলার কথা। অনেকে জাপানি শিল্পের প্রশংসা করেন তার পারফেকশনিজমের জন্য। কিন্তু জাপানি শিল্প আসলে পারফেকশনিজম নয়। তারা অসমতাকে ভালোবাসে। খাবারের টেবিল সাজানো হোক বা কোনো বৌদ্ধ মঠের পাথরের বাগান—সেখানে কেন্দ্রীয় সমতা বা নিখুঁত অনুপাতের কোনো নিয়ম নেই। বরং সেখানে ভুল বা অসমতার প্রতি ভালোবাসা আছে। মেইজি যুগের জাপানি মৃৎশিল্পে কোনো বস্তুতে যদি স্পষ্ট কোনো ত্রুটি থাকে, তাহলে সেটিকে আরও মূল্যবান মনে করা হয়। কারণ সেই ত্রুটিই তাকে আলাদা করে তোলে। আমিও অন্য সব বিষয়ে এমনই ভাবি। শুধু নিজের বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
তাহলে কি বলা যায়, আপনার প্রতিটি উপন্যাসই নিজের গদ্যকে আরও নিখুঁত করার এই আবেশ থেকে জন্ম নিয়েছে? আপনার চরিত্রগুলোর মধ্যেও এমন আবেশ দেখা যায়। তারা সুন্দর ও বিরল জিনিসের মধ্যে পবিত্র কিছু খুঁজে বেড়ায়। কখনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে, কখনো কোনো বাগানে, তিমির কঙ্কালে, বাখের সঙ্গীতে, নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির বইয়ে বা অ্যাক্রোপলিসে। কিন্তু খুব কম মানুষই তাদের বোঝে। অনেক সময় তারা ধ্বংস হয়ে যায়, কেউ বিকলাঙ্গ হয়, কেউ মারা যায়। কারণ তারা উপলব্ধি করে, “উচ্চতর জগৎ মানুষের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে।” বর্বরতায় ভরা এই পৃথিবীতে, যেখানে কিছুই পবিত্র নয়, সেখানে সৌন্দর্যের প্রতি এই আবেশের মূল্য কী?
সুন্দর যা কিছু—প্রকৃতির সৃষ্টি হোক, মানুষের সৃষ্টি হোক, ঈশ্বরের সৃষ্টি হোক কিংবা জীবনের নিজের সৃষ্টি—সবই এমন এক জগতে অবস্থান করে, যা কখনো বদলে যায় না। শুধু আমরা বদলাই। সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বদলে যায়। তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বদলে যায়। রেনেসাঁ যুগে সেই সম্ভাবনা বেড়েছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে তা নষ্ট হয়ে গেছে। নিখুঁত সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটানোর, তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের, তাকে আমাদের আত্মাকে স্পর্শ করতে দেওয়ার সুযোগ আমরা হারিয়েছি।
আমার বইগুলোতে এই চিন্তাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। আমি এই সংকট আমার চরিত্রগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছি। তাদের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছি, তারা কীভাবে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
আমার বইগুলোর একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো, আমি নিজের ব্যর্থতাগুলো চরিত্রগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দিই। তারাই কষ্ট পায়। কারণ আমি আর কষ্ট পেতে চাই না।
সৌন্দর্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কি এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে, মানুষের কষ্ট কি এখন সবচেয়ে বেশি?
মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক যুগ এসেছে। আমি এখন শুধু ইউরোপীয় সভ্যতার কথা বলছি। প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় সমাজে মানুষ দেবতাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক সত্য হিসেবে মেনে নিত। কোনো দেবতার উদ্দেশে মন্দিরের সামনে বলি দেওয়া তাদের কাছে অস্বাভাবিক ছিল না। ফলে বাস্তব জীবন ও অতীন্দ্রিয় জগতের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তারা অনুভব করত না। পরে খ্রিষ্টধর্মের আবির্ভাব ঘটে। খ্রিষ্টধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। তা হলো, মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি, মহাবিশ্ব—সব কিছুর মূল কারণ একটিমাত্র সত্তার মধ্যে কেন্দ্রীভূত। এর ফলে মানুষ শান্তি পেয়েছিল। ঈশ্বর ও মানুষের জগতের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা রইল না। তখন প্রধান প্রশ্ন ছিল, এই উপলব্ধি কীভাবে সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।
অবশ্যই বাস্তবতা কখনো আদর্শ ছিল না। সবাই যখন খুশি ঈশ্বরের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারত না। ঈশ্বর সৌন্দর্যের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। সেই ভিত্তি ছিল কোনো কিছুর দৃশ্যমান রূপ ও আকার। অর্থাৎ এমন কিছু, যাকে চিহ্নিত করা যায়।
তারপর এলো রেনেসাঁ। এটিও ছিল বাস্তবমুখী একটি যুগ। শিক্ষিত মানুষরা কিছুটা রহস্যময়তা থেকে সরে এসে মানুষের তৈরি সৌন্দর্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু বারোক যুগের পর থেকে সমস্যাগুলো বাড়তে থাকে। ঈশ্বরকে নয়, ঐশ্বরিক অনুভূতিকে হারানো একটি পৃথিবী মানুষের জন্য অবশ্যই কঠিন ছিল। তবু মানুষ সেই পৃথিবী উপভোগ করেছে। কারণ ঈশ্বর না থাকলেও পৃথিবী আছে। মানুষ নিজের ইচ্ছামতো অনেক কিছু নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজ আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি?








