‘উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে’: পথিক রবীন্দ্রনাথ

Send
কুমার চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ১৫:৪৩, নভেম্বর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৩, নভেম্বর ১১, ২০১৯

গত পর্বের পর থেকে

৩.

রবীন্দ্রনাথের ভেতর এই বহিরাগততার আলাপ, সত্তার অন্তর্বৃত্তের তান, মনশ্চাঞ্চল্যের কাঁপন, এই পালিয়ে বেড়াবার গৎ সমগ্র জীবন ধরেই স্পন্দিত ছিল—কখনো বিলম্বিত কখনো-বা মধ্যলয়ে, এবং এসবের ছিল এক সাবলীল অভিব্যঞ্জনা ও অভিসন্ধান। সারাজীবন না-মেলার একটি উৎকণ্ঠা এবং অনুভবকে নিয়ে তিনি চলেছিলেন। ভেলায় করে তীরে এসে ভেলা ঘুরিয়ে দেওয়া, বা অর্থময়তাকে এক নিমিষে অর্থহীন করে দেওয়ার নান্দনিক সৃষ্টিশীলতায় তিনি আজও একক। এ হলো নিস্তব্ধ ও নিশ্চল দ্বন্দ্ব যা রবীন্দ্রনাথের হাতে পরিণত হয়েছে পারিজাতে, বা নাগকেশরের স্মিতরূপে। পালাতে চেয়েছেন তিনি কিন্তু পারেননি, ফিরে আসতে হয়েছে প্রস্থানপূর্ব কেন্দ্রে; মনকেই তাই পলায়ণপর করেছেন যেন পথিক হয়ে বিশ্বকে পেতে পারেন অবলীলায়, যেন পথিকের উদাসীনতায় গ্রহণ করতে পারেন জীবন ও পৃথিবীকে, অথবা তার তিন জন্মভূমিকে। এজন্যই ‘পথের সঞ্চয়’-এ তিনি বলেন: ‘ভাগ্যক্রমে পৃথিবীতে আসিয়াছি, পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় যথাসম্ভব সম্পূর্ণ করিয়া যাইব, ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। দুইটা চক্ষু পাইয়াছি, সেই দুটা চক্ষু বিরাটকে যতদিক দিয়া যত বিচিত্র করিয়া দেখিবে ততই সার্থক হইবে।’ কবিতায় তিনি এই বোধকে ব্যক্ত করেছেন, বলেছেন, ‘ইচ্ছা করে, আপনার করি/ যেখানে যা-কিছু আছে’। অস্তি-নাস্তি, আলো-আঁধারির দোলনে অবিরত আন্দোলিত ছিলেন তিনি, ছিন্নপত্রে তাই তিনি নির্দ্বিধায় বলেন: ‘আমি একটি সজীব পিয়ানো যন্ত্রের মতো: ভিতরে অন্ধকারের মধ্যে অনেকগুলো তার এবং কলবল আছে, কখন যে এসে জানায় কিছুই জানি নে, কেন বাজে তাও সম্পূর্ণ বোঝা শক্ত। কেবল কী বাজে সেইটেই জানি—সুখ বাজে কি ব্যথা বাজে, কড়ি বাজে কি কোমল বাজে, তালে বাজে কি বেতালে বাজে এইটুকুই বুঝতে পারি।’ কখনো পালাতে চেয়েছেন নিজেরই ভেতরে, ভেতরের আত্মঅরণ্যের গভীরে, তার অন্তর্গত আলো-অন্ধকারে:

 ‘হৃদয় নামেতে এক বিশাল অরণ্য আছে

দিশে দিশে নাহিক কিনারা,

তারি মাঝে হনু আত্মহারা।

সে-বন আঁধারে ঢাকা, গাছের জটিল শাখা

সহস্র স্নেহের বাহু দিয়ে

আঁধার পালিছে বুকে নিয়ে।’

বোঝা যায়, এ এক রোম্যান্টিক অনুভূতি যা আত্মকে তুচ্ছ করতে চায়, অবলুপ্ত করতে চায় নিজেরই আরেক অজানা বলয়ে। একটি অপরিজ্ঞাত, অব্যক্ত, অথচ নিত্য আস্তিত্বিক উপস্থিতি তার মধ্যে ক্রিয়া করে, হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই। যন্ত্রী এখানে নিমিত্তমাত্র, কে যেন আনমনে বাজিয়ে যায়, সুর ওঠে জীবন ভেদ করে, আবার তা জীবনের সমুদ্রে ডুবেও যায়। এ হচ্ছে এক অকারণ অভিঘাত, এক করুণাঘন পরিক্রমণ, যা সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যে, ও তার জীবনে, স্নিগ্ধ উজান-ভাটার মতো বিরাজমান থাকে। অকারণ ভাবনার স্বেচ্ছাচারিতা, অকারণে ঘটে যাওয়া ব্যাপার তাই আজীবন তাকে তাড়িত করেছে। এমনকি যখন তিনি গৃহকাতর তখনো। ছেলেমানুষের কাগজের নৌকার মতো এক-একটি দিন ভাসিয়ে দেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন, কারণ দিনগুলো ছিল অলসগমনে যেন-বা  মৌনমুখর। কখনো হাহাকার করেছেন জীবনের কিছু হলো না বলে। এই হাহাকার বিলাপের মতো শোনায় যখন তিনি বলেন: ‘এখনো বুকের মাঝে দিন রয়েছে দারুণ শূন্য,/ সে শূন্য কি এ জনমে পূরিবে না আর?’ কখনো জীবনের চিরন্তন দর্শন এবং রহস্যে তাড়িত হয়ে উপনীত হয়েছেন একজাতীয় উদগাঢ় প্রতীতিতে, যা-ও পথিকভাবনার শাঁসে উদ্ভাসিত:

এই খেয়া চিরদিন চলে নদীস্রোতে—

কেউ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে।

যারা রম্য-বহিরাগত বা মনস-বহিঃস্থিত, তারা নিজেদের পথিক ভাবতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। পথিক এমন-এক ধারণা যা মূলত দূরের ভাবনা, বহির্মুখিতার হাতছানি। ঘর নয়, চারপাশ নয়, তারও বাইরে আরেক জগতের আমন্ত্রণ। এক মায়ার টান অনুভব করে মানুষ, পরকে আপন করার অভিলাষ কাজ করতে থাকে তার মনে, পরকে জানারও প্রত্যয় থাকে মনে। রবীন্দ্রনাথও উপলব্ধি করেছেন এই টান। নিজেকে ‘মানবজগৎ ও বস্তুজগৎ-এর মাঝে উভচর’ বলে মনে করতেন। বলেছেন, ‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।’ নিজেকে তিনি বলেছেন ‘পথের পথী’, ভাবতেন প্রবাসীও। একদা মনে করতেন: জগতে নয়, মনেই সবার অস্তিত্ব। তার অর্ন্তজীবনে পথ ও তার অন্বেষণ ছিল এক অমোঘ ঘটনা। এর ফলেই শারীরিক যাত্রার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তিনি চাইলেন বের হয়ে পড়তে। আর পিতার নিকট থেকে যখন হিমালয় যাওয়ার এ সুযোগ এল তখন যারপরনাই আনন্দে তিনি দিশেহারা হয়ে উঠলেন। চিৎকার করে ভরতে চাইলেন ‘চাই’ যেতে। ১৮৭৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হলো তার প্রথম দীর্ঘ ভ্রমণ। তার আগের বছর কলকাতায় ডেঙ্গুজ্বর ব্যাপকভাবে দেখা দিলে গঙ্গা তীরবর্তী পানিহাটি বাগান বাড়িতে তিনি পরিবারের সাথে অবস্থান করেন আর প্রথমবারের মতো প্রকৃতির ব্যাপকত্ব ও বৈচিত্র্য বিষয়ে সজাগ হয়ে ওঠেন। গঙ্গার তীরভূমি যেন ‘পূর্ব জন্মের পরিচয়ে’ তাকে কোলে করে নিল। কিন্তু তা ছিল না ভ্রমণ, ছিল সুবিধাজনক একটি বাসাবদল, রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য।

৪.

কিন্তু প্রথম ভ্রমণই দীর্ঘ ও ব্যাপ্ত, এবং তা নিয়ে যায় বিশালের কাছে, ব্যাপক ও বিস্তৃতের কাছে, আর যাচ্ছেন অজানাতাড়িত বহির্সন্ধানী এক বালক যে-তার চারপাশের পরিবেশে একদম হাঁপিয়ে উঠেছে, মুক্তি খুঁজছে প্রকৃতির মাঝে। সেবারের মূল ভ্রমণস্থানই হিমালয়, তবে যাবার পথে ছিল শান্তিনিকেতন ও অমৃতসর, শান্তিনিকেতনে প্রাথমিক দেখা মেলে বিশ্বপ্রকৃতির। এ ভ্রমণ প্রথমবারের মতো তাকে প্রকৃতির ব্যাপকতার সাথে পরিচয় করাল। শান্তিনিকেতনে খোয়াইয়ের অধিত্যকা-উপত্যকায় নতুন একটা-কিছুর সন্ধানে তিনি ঘুরে বেড়াতেন, নিজেকে মনে করতেন ওই ক্ষুদ্র রাজ্যের লিভিংস্টোন। স্তব্ধতা আর রূপবৈচিত্র্যের এক আকর হিমালয়। মূলত পাহাড়-পর্বতের রয়েছে একধরনের কেন্দ্রাভিগ টান, পথিককে চিরমুগ্ধত্বের জ্বালে আটকে রাখে। রহস্যময়তা আর মনোভিরামতা দিয়ে হিমালয় কীভাবে তাকে মুগ্ধ করল যখন তার বয়স টেনেটুনে এগারো!

পাহাড়-পর্বতের একধরনের উন্নত মহিমা আছে, আছে জাদুময়তা, মৌনের সম্ভার; সে ঘোর লাগায়, সত্তার চঞ্চল এলাকাগুলোকে স্থির আর দার্ঢ্য করে, ভাবুকতার ঘনত্বকে দৃঢ় করে, আঠালো করে, স্ফটিক করে; দেয়  মহিমা বা ঈশ্বরত্বের ভিন্ন-এক স্পর্শ। অনন্তের আনাগোনা আর স্থির উপস্থিতিগুলো সেখানে স্পষ্ট এবং সাবলীল হয়, ভ্রামণিক শারীরিক ও মানসিকভাবে উদযাপন করেন তা, চাঙ্গা হয় তার জীবন। নিত্য আর অনিত্যের একাকারত্ব ব্যক্তিকে মাত্রা দেয়, ব্যক্তি তার জীবনের মাত্রাগুলোকে পূর্ণমাত্রা দিতে পারঙ্গম হয়ে ওঠেন, হর্ষ আর হাহাকারকে এক করতে সক্ষম হয়ে ওঠেন। দিনের সৌন্দর্য আর রাতের অরূপ ব্যক্তির কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হয়, আলো-অন্ধকার তার গাঢ়তাকে ভিন্নমাত্রায় ঢেলে দেয়। ব্যক্তি সহজেই আবিষ্কার করতে পারে নিজেকে, এবং জগৎ ও তার প্রবহমাণতা তার কাছে সহজ ও স্বাভাবিক বলে মনে হতে থাকে। পাহাড়-পর্বত তাই মানুষের কাছে চির আকাঙ্ক্ষিত দর্শনীয় স্থান: স্থাবর-জঙ্গম। সম্ভবত দীর্ঘত্ব, উচ্চতার রহস্যের জন্যই পাহাড়-পর্বত এতটা আকর্ষণীয় এবং রহস্যময় মানুষের কাছে। টমাস মানের বিখ্যাত উপন্যাস জাদুপর্বত-এর কথা আমাদের জানা, উপন্যাসে যা সমূহ রহস্য নিয়ে হাজির হয়। উপন্যাসের নায়ক হান্স কাসটোর্ফ সেই পর্বতে একুশ দিনের জন্য গিয়ে সাত বছর অবস্থান করে আর মুখোমুখি হতে থাকে নানা রহস্যের, সমভূমি থেকে উচ্চভূমিতে গমন তার জীবন-ভাবনাকে বদলে দিতে থাকে, সে মুখোমুখি হতে থাকে স্থানকালের গোলকধাঁধায়, স্যানাটোরিয়ামে সে দেখে আল্পস পর্বতের রহস্যময়তা, তার শিকড়-বাঁকড়। আর হিমালয় তো ভারতীয়দের কাছে পবিত্রতার অবতারণ। সমস্ত পুরাণরহস্য আর মহাপ্রস্থানের মার্গ এখানে সমীকৃত। মানুষের মুক্তির এক উচ্চ ঠিকানা। বলতে গেলে, হিমালয় যেন ভারতীয়দের যৌথ-অবচেতনের স্থায়ী এক মনস্কামনা। মেঘদূত-এ দেখা যায়, রামগিরি আশ্রমে নির্বাসিত যক্ষ বলছে বর্ষার তরুণ মেঘকে গঙ্গার উৎপত্তিস্থল হিমালয়ের শিখরে গিয়ে পথশ্রম লাঘবের কথা, বলছে আরো: পর্বতের গায়ে কুরচি ফুলের কথা, কস্তুরীগন্ধী হিমালয়ের পাথরের কথা, হিমালয়ের ওপর পোকায়-করা অসংখ্য ছিদ্রবিশিষ্ট কীচক বাঁশগুলোতে বাতাস ঢোকার কারণে আন্দোলিত মধুর ধ্বনির কথা, কৈলাস পর্বতে অতিথি হওয়ার কথা, মানস সরোবরমুখী উড়ন্ত হংসের কথা, ক্রৌঞ্চরন্ধ্রের কথা, অলকাপুরীর কথা, আরও কত কী!

জীবনস্মৃতিতে এই হিমালয় ভ্রমণের আবাহন ও অভিঘাত নিয়ে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। বলা যায়, এ ভ্রমণই তাকে প্রথমবারের মতো উতল করে তুলেছিল, মনকে খুলে দিয়েছিল বাইরের পৃথিবীর সাথে একাত্ম হতে। মহাপৃথিবীর সাথে তার যে-যোগাযোগ স্থাপিত হবে পরে, এ ভ্রমণ তার উন্মেষসূত্র হিসেবে কাজ করেছিল। ড্যালহৌসি পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখর বক্রোটায় আবাস ছিল তাদের, সেখান থেকে তিনি দেখতেন মহাপৃথিবীর মহিমাকে। ভ্রমণকালে পর্বতের উপত্যকা-অধিত্যকায় নানা চৈতালি ফসলের ভাঁজে ভাঁজে, পঙতিতে পঙতিতে, সৌন্দর্যের আগুন তিনি আবিষ্কার করলেন। কেলুবনে লাঠি নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন যেটা অন্তত সব শিশু-কিশোরের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের এক সাধারণ দিক। বিশাল বৃক্ষগুলোর বিরাট ছায়া, তাদের বিপুল প্রাণ দেখলেন তিনি হেঁটে হেঁটে, পেলেন বৃক্ষের স্পর্শের ‘ঘন শীতলতা’, রাতে কাচের জানলা দিয়ে দেখলেন নক্ষত্রের অস্পষ্টতায় পর্বতচূড়ায় শোভিত ‘পাণ্ডুলিপি তুষারদীপ্তি’। পিতার কাছে আরও শিখলেন জ্যোতির্বিদ্যা: ‘ডাকবাংলায় পৌঁছিলে পিতৃদেব বাংলার বাহিরে চৌকি লইয়া বসিতেন। সন্ধ্যা হইলে পর্বতের স্বচ্ছ আকাশে তারাগুলো আশ্চর্য সুস্পষ্ট হইয়া উঠিত এবং পিতা আমাকে গ্রহ-তারকা চিনাইয়া দিয়া জ্যোতিষ্ক সম্বন্ধে আলোচনা করিতেন।’ নিশ্চয়ই অভিভূত তিনি, কেননা বালকের জন্য এ হলো আশ্চর্যের এক মহাপ্রাপ্তি। ছোটোবেলা থেকেই তিনি তার পিতাকে দেখেছেন ভ্রামণিক হিসেবে, হয়তো অজ্ঞাতসারে পিতার ভ্রমণপিপাসা তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল।

বলা যায়, এ ভ্রমণটি ছিল তার ভ্রামণিক সত্তার অঙ্কুরোদ্গম, অস্তিত্বের প্রথম সচেতন জাগরণী সংগীত, এক বাস্তব-আলম্বিত তান। যেন এক ফোঁটা মধুর জন্ম হলো কবিহৃদয়ে যাকে তিনি সময়ান্তরে করে তুলবেন বিশাল এক চাক। এ ভ্রমণ একজন শহুরে বালককে যেন প্রথমবারের মতো পরিচিত ও অন্তরঙ্গ করালো বিশ্বপ্রকৃতির সাথে, যা একফোঁটা বিন্দুর মতো জন্ম-নেওয়া পরিব্রাজনবোধকে চাগিয়ে তুলেছিল উত্তুঙ্গে। এজন্যই যৌবনারম্ভে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে গরুর গাড়িতে করে পেশোয়ার যাবার বাসনার কথা তিনি তার পিতৃদেবকে অনায়াসে বলতে পেরেছিলেন যা সদর্থকভাবে সমর্থিত হয় পিতার দ্বারা। যখন তিনি বলেন, বাইরে যাবার ইচ্ছাটাই মানুষের স্বভাবসিদ্ধ, বা বের হয়ে পড়াটাই তার উদ্দেশ্য, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এর বীজ নিহিত রয়েছে এই হিমালয় ভ্রমণের মাধুর্য্যে। তিনি বলেছেন, ‘প্রাণ আপনি চায় চলিতে’, আর এই চলার প্রেরণা তাকে বেগবান করে তুলেছিল, ফলে বাহির হবার ডাক, যাকে তিনি বলেছেন বাসাবদল করবার ডাক, তাকে উন্মাতাল করেছিল এককভাবে। কে-যেন তাকে বলল এসে : ‘চলো, চলো, চলো। ঝরনার মতো চলো, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো চলো, প্রভাতের পাখির মতো চলো, অরুণোদয়ের আালোর মতো চলো! সেইজন্যই তো পৃথিবী এমন বৃহৎ, জহৎ এমন বিচিত্র, আকাশ এমন অসীম।’ এ হচ্ছে টান যা তিনি নিয়ত অনুভব করতেন। বিশ্ব তাকে টানছে যে-টানের কথা তিনি কবিতায় বলেছিলেন: ‘বিশাল বিশ্বে চারি দিক হতে প্রতি কণা মোরে টানিছে/ আমার দুয়ারে নিখিল জগৎ শত কোটি কর হানিছে।’

ড্যালহৌসি পাহাড় আর হিমালয় ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথকে ভেতরের দিকে থেকে বাইরের দিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। জগতের মহাপ্রাকৃতিকতার সাথে তাকে চিরদিনের তরে বেঁধে দিয়েছিল বলা যায়। বিশ্বপ্রকৃতি এবং মহাজগতের দিকে তার আদিটানকে স্থির করে দিল। এ ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি ‘ক্ষুদ্র ভ্রমণকারী’ হিসেবে হলেন আত্মপ্রকাশিত এবং পথচলায় প্রত্যয়দীপ্ত। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কিছুদিনের মধ্যেই বনফুল কাব্যে রূপলাভ করে, বোধগম্য যে এই ভ্রমণ তার সৃষ্টিশীলতার উন্মোচক ছিল। লিখেছিলেন ‘হিমালয়’ নামে একটি কবিতাও। এই ভ্রমণের পর আরও বিশিষ্ট যা ঘটল তা হলো, ‘এখন নারী-হৃদয়ের রহস্যলোকে তার প্রবেশের সুযোগ ঘটল।’ আরেকটি বিষয় হলো, এ সময়েই তিনি বৈষ্ণবপদাবলী-সাহিত্যের সাথে পরিচিত হতে লাগলেন। এবং এটাও এক প্রতীকী ব্যঞ্জনা, যে, বৈষ্ণবপদাবলীর ভাবগত উচ্ছ্বাসে তিনি নিমজ্জিত হলেন তখন।

এই ভ্রমণের পাঁচ বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় ব্যাপক ভ্রমণ: ইংল্যান্ড যান ১৮৭৮ সালে, পূর্ববঙ্গ ভ্রমণও শুরু হয় আবর্তিত রূপে, আর এই পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ তার চৈতন্য ও প্রতিস্বের ওপর গভীর এবং স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। তিনি হয়ে উঠলেন যেন প্রকৃতি ও জীবনপ্রেমিক, প্রকৃতির স্পর্শে তিনি হতে লাগলেন হৃদয়ের কবি। লেখার স্বরূপ চিহ্নিত হতে লাগল, লেখা হয়ে উঠল প্রকৃত, সত্য, সরল ও গভীর। এরপর ঘটতে থাকে তার ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণ, ভারতবর্ষের ভেতরের ভ্রমণ, জাপান, চিন, জাভা, সিঙ্গাপুর, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য, আর কত কত কী ভ্রমণ! ভ্রমণে নানাভাবে নানারূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ইতালি থেকে ফ্রান্সে আসার সময় পর্বত, হ্রদ, নদী, শস্যক্ষেত্র, গ্রাম ইত্যাদির রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি, এসবকিছুকে কবির স্বপ্নের ধন বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি। সন্ধ্যায় একটি পাহাড়ের নীচে একটি হ্রদকে দেখে তাকে ‘অতি সুন্দর’ আর অবিস্মরণীয় মনে হয়েছিল তার কাছে। আরও কত-কী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। 

হিমালয় ভ্রমণের পর, মাঝে কয়েকবার শিলাইদহ ভ্রমণ করে, ১৮৭৮ সালে জাহাজে করে যান ইংল্যান্ড; কিন্তু তা ছিল উদ্দেশ্য-প্রণোদিত, শিক্ষাগ্রহণ-সংক্রান্ত। অবশ্য হিমালয় ভ্রমণের পর বালিগঞ্জ হেদুয়া প্রভৃতি অঞ্চলে তিনি বেড়াতে গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন গঙ্গার ধারে মুলাজোড় বাগানে। এসব ছিল নিছক বেড়ানোর জন্য গমন। কিন্তু ইংল্যান্ড ভ্রমণে এই প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ মুখোমুখি হলেন সমুদ্রের সাথে। কিন্তু ভ্রমণের প্রস্তুতি লগ্নেই বোম্বেতে হলো তার প্রথম প্রেমের উদ্ভাস, আত্মারাম পাণ্ডুরং-এর মেয়ে আনা তড়খড়-এর প্রেমে পড়লেন তিনি যদিও তা ছিল অদৃশ্য রসায়ণে জারিত। এবং প্রকৃত পথিকমন দিয়েই প্রেমকে চিরজীবনের প্রসাদ হিসেবে নিয়ে তিনি ছেড়ে গেলেন প্রেমিকাকে। এই প্রেমকে মনে রেখেছিলেন তিনি, একে তুলনা করেছিলেন ‘মনের বনে’ অফোটা ফুল ফোটার মতো, যা ঝরে যায় কিন্তু গন্ধ যায় থেকে।

সমুদ্রকে কল্পনায় যা তিনি মনে করতেন, বাস্তবে তার সাথে মিল খুঁজে পেলেন না; তীর থেকে যে-সমুদ্রকে মহান বলে মনে হতো, সমুদ্রের ভেতরে তা আর মনে হলো না তার। কিন্তু পথিকমনের রবীন্দ্রনাথ এরমধ্যেও খুঁজে পেলেন অনন্তের সন্ধিসূত্রগুলো: ‘যেমন সমুদ্র তেমনি সমুদ্রের উপরকার রাত্রি; স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া দুই অন্তহীনের সুন্দর মিলনটি দেখিতে থাকি, স্তব্ধের সঙ্গে চঞ্চলের, নীরবের সঙ্গে মুখরের, দিগন্তব্যাপী আলাপ চুপ করিয়া শুনিয়া লই।’ এই অনুভূতি শুধুই সম্ভব পথিকমনের দ্বারাই। পৃথিবীর আশ্রয় ও অনাশ্রয়-এর যে দুটো ভাগ, উভয়কেই গ্রহণের বিষয় তিনি ভাবলেন। জাহাজে তিনি আনন্দরূপকেও প্রত্যক্ষ করলেন। বিলাতে তিনি দেখলেন—তুষারছাওয়া সৌন্দর্য, পাহাড়, সমুদ্র, ফুলবিছানো প্রান্তর, পাইনবন, নীল সাগরের শৈলবেলা, সমুদ্র-অভিমুখে শূন্যে ঝুঁকে থাকা সমুচ্চ শিলাতট! এভাবেই ছোটো ও বড়ো ভ্রমণ তার হৃদয়কে খুলে দিল, জগৎ এসে কোলাকুলি করতে থাকল। চলবে

//জেডএস//

লাইভ

টপ