হেলাল হাফিজের সাক্ষাৎকার

Send
.
প্রকাশিত : ১৮:০৫, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৩, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থান চলছে। এমন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা, যার প্রথম দুটি লাইন স্লোগানের মতো মানুষের মুখে মুখে—‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

কবিতাটি তখনকার কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস না পেলেও আহমদ ছফা’র কল্যাণে রাতারাতি এ-দুটি লাইনে ছেয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দেয়াল। এ দুটি লাইন গণঅভ্যুত্থানকে যেন বারুদের মতো উসকে দেয়। ফলশ্রুতিতে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যান এই কবিতার স্রষ্টা, কবি হেলাল হাফিজ। সিক্ত হতে থাকেন অজস্র মানুষের ভালোবাসায়। এবং অবিশ্বাস্যভাবে, এর পরপরই তিনি হয়ে যান নীরব। ১৯৬৯ থেকে ’৮৬, দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার ১ম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে। বাংলা কাব্যগ্রন্থের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত এই বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে না-গিয়ে বরং আবারো নীরবতা এবং তার প্রিয় আলস্যকেই প্রশ্রয় দিলেন কবি। কাটিয়ে দিলেন গুনে গুনে আরো ৩৪ টি বছর। ১ম বই প্রকাশের জন্য যা সময় নিয়েছিলেন, ২য় বইয়ের ক্ষেত্রে নিলেন তার দ্বিগুণ! অবশেষে নীরবতার অবসান ঘটিয়ে ২০১৯ সালের শেষে, ৩৪ বছর পর ঠিক ৩৪ টি কবিতা নিয়েই হাজির হলেন তিনি।

গত ৫ ও ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের অতিথি-কক্ষে চলা দীর্ঘ এক আলাপে কবি হেলাল হাফিজ খোলাসা করেন তার জীবনের নানা বিষয়াদি। বলেছেন বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের পাশাপাশি নিজের জীবনের দর্শন ও নানান অভিজ্ঞতার কথাও।

'বাংলা ট্রিবিউন'-এর হয়ে এই আলাপ চালিয়েছেন তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী, নির্মাতা শাহনেওয়াজ খান সিজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর. বিভাগের শিক্ষার্থী, তরুণ লেখক রেজওয়ান হাবিব রাফসান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাদিরা ভাবনা

শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিয়ে তো আর করলেনই না, এখন যদি কেউ প্রস্তাব দেয়, কী করবেন?

হেলাল হাফিজ : এখন? এখন বিয়ে-টিয়ে করাটা যে খুব অন্যায় হবে তা নয়। কিন্তু বিয়ে বলতে আমাদের মনে প্রথম যে ধারণা আসে, সে বয়স তো আর নাই।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : একজন সঙ্গী হিসেবে?

হেলাল হাফিজ : এই পড়ন্ত বেলায় মন তো চায় একজন বন্ধু পাশে থাকুক। যতটা না শারীরিক কারণে তার চেয়ে বেশি মানসিক।

 

নাদিরা ভাবনা : যেমন?

হেলাল হাফিজ : এই মনে করো চোখের সামনে একজন মানুষ আছে। ঔষধ খাবো, প্যাকেটটি এগিয়ে দিলো। পানি খাবো, গেলাসটি নিয়ে এলো। এই যা।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিকেলে চায়ে একসাথে চুমুক দেওয়া…

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, হ্যাঁ।

 

নাদিরা ভাবনা : এখন কি তার জন্য অনুতাপ হয়?

হেলাল হাফিজ : অনুতাপ না ঠিক, তবে এখন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি খানিকটা। একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু আমি, আমি তো আমার একাজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি একদম শৈশব থেকেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকে।

 

নাদিরা ভাবনা : মানে একদম ছোটবেলা থেকেই?

হেলাল হাফিজ : An Outsider!

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : মায়ের শাসন না পাওয়াটা কি আপনার বোহেমিয়ান জীবনের মূল কারণ?

হেলাল হাফিজ : না, না, না—আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে সেটা বাধ্যতামূলক। এইভাবে জীবনযাপনে আমি বাধ্য, আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : জীবনানন্দ দাশের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তার মা কুসুমকুমারি দাশের সান্নিধ্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তেমনি হেলাল হাফিজের কবি হয়ে ওঠার মূল কারণ কি তার মাতৃবিয়োগ?

হেলাল হাফিজ : আমার মনে হয় বিষয়টা এরকমই, মাতৃহীনতা। তোমাদের আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছি যে, আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এই মাতৃহীনতার বেদনা। এটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়েছে। আজকে যে হেলাল হাফিজকে দেখছো তোমরা, তার এই অবস্থানে আসা এবং তাকে তৈরি করার রাস্তাটা মাতৃহীনতার বেদনাই পরিষ্কার করে গেছে।

 

নাদিরা ভাবনা : আমাদের জীবনে এরকম হয় যে, আমরা যখন কারো দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হই, তখন বেদনা নতুন করে জেগে ওঠে।

হেলাল হাফিজ : আমি তো অনেক মেয়ের দ্বারাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, নিজেও করেছি অনেককে। অনেকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কী রকম? আমি ভেবেছি মেয়েটি বোধহয় আমাকে ভালোবাসে। আসলে তা নয়, সে আমার কবিতাকে ভালোবাসে। আমি সেটাকে মনে করেছি হয়তো আমাকে ভালোবাসে! ফলে এই মুগ্ধতার দেয়ালটা যখন উঠে গেছে তখন বিরহ ছাড়া আর কোনো উপায় আসলে থাকেনি।

আবার এর উল্টাও হয়েছে। মেয়েটি হয়তো আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু আমি ভাবছি, ও আমাকে আর কি ভালোবাসবে? ও তো আমার কবিতাই বোঝে না, কিংবা বুঝতে চেষ্টাও করে না। যে রকম হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর ক্ষমতাই ছিলো না যে তাকে বুঝবে।

খুব প্রতিভাবান মানুষ সে নারী হোক বা পুরুষ—প্রেমহীন সে থাকে কী করে! একজন লেখিকা আছেন না, সুইসাইড করলো?

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সিলভিয়া প্লাথ?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সিলভিয়া প্লাথ। কত সুন্দর মহিলা ছিলেন, ফুলের মতো। সে তো পুরুষকে ভালোবাসতেই চেয়েছিলো। প্রত্যাখ্যাত না হলেও হয়তো বনিবনা হয়নি এমন বেদনা থেকে একটি মেয়ে সুইসাইড করতে পারে? ভাবা যায়! ওর ছবি দেখলেই তো ইচ্ছে হয় প্রেম করি! প্রেম আসলে নারী-পুরুষের ব্যাপার না, মানুষের ব্যাপার। এটা আসার হলে এমনিই আসবে। জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না।

 

নাদিরা ভাবনা : আচ্ছা, আপনার কবিতা নিয়ে যদি কেউ গান করতে চায়?

হেলাল হাফিজ : হয়েছে তো।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : না মানে, আপনার কি কখনো শুধু গানের কথা ভেবে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি? যে রকমটা বব ডিলান, গুলজার বা শ্রীজাত করছেন?

হেলাল হাফিজ : না না না। আমি শুধু কবিতা নিয়েই থাকতে চেয়েছি আজীবন।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্ত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তার নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যদি সিনেমার চাইতে ভালো কোনো মাধ্যম তিনি পেতেন তবে সেই মাধ্যমকেই তিনি বেছে নিতেন। আপনি কেন কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্য কিংবা অন্য কোনো শিল্প-মাধ্যমের দিকে ঝুঁকলেন না? সব ছেড়ে কেন শুধু কবিতা নিয়েই থাকছেন?

হেলাল হাফিজ : কবিতা ছাড়া অন্য কোনো কিছু আসলে টানেনি তেমনভাবে। আমার মনে হয়েছে যে, জীবনে আমার অল্প কিছু যদি করার থাকে তাহলে হয়তো এই মাধ্যমটিতেই আমি পারবো। আর আমি সত্যিই খুব কম প্রতিভাবান, নিজের সম্পর্কে আমি উচ্চ কোনো ধারণা আসলে পোষণই করি না। সুতরাং আমি নিজের লাগাম নিজে টেনে ধরার এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবেই আত্মস্থ করেছি।

 

নাদিরা ভাবনা : এটাকে পরিমিতিবোধ বলবেন?

হেলাল হাফিজ : পরিমিতিবোধ, Exactly এই শব্দটা। পরিমিতিবোধ এবং কোথায় কখন কতটুকু থামতে হবে, অধিকাংশ বাঙালিই এটা জানে না। এখানে তোমরা বলতে পারো যে, আপনি কি একটু বেশিই থেমে গেছেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। আমি একটু বেশিই থেমে গেছি। এটার কারণ আমি কম প্রতিভাবান এবং আলস্য আমার অসম্ভব প্রিয়। এই দুটো মিলে এবং ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসা আমাকে অস্থির করে ফেলেছে একদম। আনন্দ যেমন দিয়েছে তেমনি আতঙ্কিতও করেছে যথেষ্ট। রাতের পর রাত আমার ঘুম হয়নি।

 

নাদিরা ভাবনা : নতুন বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তো দ্বিতীয় সংস্করণ চলে এসেছে। এই যে এত খ্যাতি, আপনার কথায় মানুষের ভালোবাসা…

হেলাল হাফিজ : এটা অসম্ভব বিক্রি হচ্ছে। অসম্ভব ভালো বিক্রি হচ্ছে।

 

নাদিরা ভাবনা : আমি কিন্তু আপনার বই দুটোর মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র দেখতে পাই। প্রথমটা ছিলো আমি জ্বলছি, ‘যে জলে আগুন জ্বলে।’ আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে আমি এখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি কিংবা আমি এখন কিছুটা স্তিমিত কিছুটা শান্ত, তাই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। ঠিক আছে না ব্যাখ্যাটা?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক আছে।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটা প্রকাশ করতে এত সময় নিলেন কেন?

হেলাল হাফিজ : ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করেছে যে, আরেকটা বই যদি প্রকাশ করি সেটা প্রথম বইয়ের ধার-কাছেও যেতে পারবে কি না। ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’র জন্য প্রায় ২০০ কবিতা থেকে ৩৪ টি কবিতা আমি বেছে নিয়েছি।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বইটা পড়েছি আমি। এক লাইনের কবিতাও আছে এতে। একরকম experiment-ই করলেন বোধহয়!

হেলাল হাফিজ : এই বইয়ে আমি দুটো বিষয়ে কাজ করতে চেয়েছি—একটা হলো বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে নেশা…

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্মার্টফোন?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। সেই স্মার্টফোনকে কাব্যাকারে মলাটবন্দি করতে চেয়েছি। এই বইটা পড়তে কারো ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু পড়ে সে আর বেরুতে পারবে না। একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবে। এবং একটু পরেই আবার সে প্রথম থেকে পড়তে শুরু করবে—এই হলো এক। আর একটা বিষয় যা করতে চেয়েছি—এই যে আমরা একটা অস্থির সময় পার করছি, সমাজে হানাহানি—দুর্নীতি, একটা মেয়ে ঘর থেকে একা বের হতে পারছে না, অসহনশীলতা, রাজনীতি বিপথে চলে গেছে, সেইখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’-তে কেবলই প্রেমের কথা বলেছি, কেবলই বিরহের কথা বলেছি, কেবলই ভালোবাসার কথা বলেছি। আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, প্রেমও প্রতিবাদের একটা ভাষা, প্রেম দিয়েও জয় করা যায়। আমার এই কোমলতায় কিছু মানুষও অনুপ্রাণিত বা প্রভাবিত হয় সেখানেই আমার সার্থকতা। চলমান সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনবরত আমি প্রেমের জয়গান গেয়েছি, বিরহের কথা বলেছি। বিরহ কিন্তু প্রেমেরই বড় অংশ, বিরহ মানুষকে নষ্টও করতে পারে আবার তৈরিও করতে পারে। বিরহ উপভোগের বিষয়।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটির আর কোনো বিশেষত্বের কথা কি জানতে পারি?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। একটা কবিতা আমার বাবার। কবিতাটির নাম পিতার পত্র—‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।’

একটি চিঠিতে এই কবিতাটি লেখার পর বাবা আরও লিখেছিলেন, ‘এই কষ্ট, এই বেদনা তুমি লালন করবে, শুশ্রূষা করবে এদের, এবং চেষ্টা করবে এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে।’ আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি, আর কিছু না। আব্বাকে সম্মান জানানোর জন্য ওনার এই কবিতাটি আমি ইনভার্টেড কমার ভেতরে আমার বইয়ে স্থান দিয়েছি। যেন একশো বছর পরে পাঁচজন লোকের হাতেও যদি এই বইটা থাকে, তারা যেন আমার পাশাপাশি আমার বাবাকেও পান।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : বাহ্, চমৎকার! আরেকটা প্রশ্ন করি?

হেলাল হাফিজ : নিশ্চয়ই। 

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : কবিতা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত বলে আপনি মনে করেন?

হেলাল হাফিজ : শুধু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যেই নয় বরং সমস্ত শিল্প মাধ্যমের মধ্যে—যেমন গান, চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস—সবচেয়ে উঁচু স্তরের শাখা হলো কবিতা। এখন ধরো একজন ঔপন্যাসিক তার কোনো বিষয় বোঝাতে, কোনো সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে উনি ৭ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু একজন কবির জন্য তা বোঝাতে দুটি পঙক্তিই যথেষ্ট। এজন্যই তুমি দেখবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্বরণীয় হয়ে আছেন প্রথমত কবিরা, তারপরে বিজ্ঞানী-সহ অন্য সবাই।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : Visual Poetry’র ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?

হেলাল হাফিজ : বুঝিনি। আবার বলো।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : আন্দ্রেই তারকোভস্কির মতো অনেক চলচ্চিত্রকারই তাদের সিনেমাতে Seen-এর পর Seen সাজিয়ে কবিতা বলে গেছেন, সেই Visual Poetry-কে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি যা লিখে প্রকাশ করছেন ওনারা তা Visually বলছেন। আপনার কবিতা বোঝার জন্য পাঠকের নির্দিষ্ট একটা ভাষায় পারদর্শী হওয়া আবশ্যক, কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। একেবারে বর্ণজ্ঞানহীন কোনো দর্শকের সঙ্গেও সিনেমা খুব সহজে Communicate করতে পারে।

হেলাল হাফিজ : আমি তো সেটাই বললাম, কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচুস্তরের শিল্পমাধ্যম। কবিতা না লিখেও একজন কবি হতে পারে। ভালো ছবি এঁকে, ছবি তুলে, ভালো রাজনীতি কিংবা সিনেমা করেও কবি হওয়া যায়। কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি। আর কবিতার ব্যাপারটা কি, ধরো প্রথমত বর্ণজ্ঞান থাকতে হবে। তারপর শুধু বর্ণজ্ঞান থাকলেই হবে না, ভালো লেখাপড়াও জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া জানলেই হবে না, আগ্রহ থাকতে হবে কবিতার প্রতি। এ কারণেই পাঠককেও অনেকটা তৈরি হয়েই নামতে হবে যে আমি কবিতা পড়বো। কবিতাকে বোধগম্য করা কবির একার কাজ নয় পাঠকেরও কিছু কাজ আছে।

 

নাদিরা ভাবনা : আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে যে, ‘Poetry is the mirror, where we can see the whole sky!’

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এবং সেটা এতই সংক্ষেপিত যে তোমাকে বারবার ঘোরে ফেলে দেবে।

 

নাদিরা ভাবনা : আমি নিজেও যখন লিখতে যাই তখন মনে হয় যে ‘এটা সম্ভবত বুঝবে না কেউ।’ একারণেই Elaboration হয়ে যায়। অথচ আপনার কবিতা এক লাইন পড়লেই বুঝে যাই তার Background-টা কী বা কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা।

হেলাল হাফিজ : এটা হচ্ছে মুন্সিয়ানা এবং এটা আমার কবিতার একটা বড় Plus Point. তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান ধরো, এতবড় গানের বইটা নিয়ে যদি বসো এবং প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ৩০০০ বা ৩৫০০ গান তুমি করলে। তুমি দেখবে একটি গানও তোমার বোধের অগম্য নয়। সবকটা গান মনে হবে যে, আরে এটা তো আমিও লিখতে পারি!

 

নাদিরা ভাবনা : আমারই কথা…

হেলাল হাফিজ : আমার কথা তো পরে, ওনার লেখা পড়ে মনে হবে যে আমি তো নিজেও এমন লিখতে পারি। একটা কঠিন শব্দ নাই, যুক্তাক্ষর যথাসম্ভব কম। তোমাকে খুঁজে খুঁজে যুক্তাক্ষর বের করতে হবে। মানে কতবড় প্রতিভাবান হলে এটা সম্ভব! বুঝতেই পারছো ব্যাপারটা। উনি নিজেই তো বলেছেন, ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ সহজ কথা বলাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনার সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, একজন আবুল হাসান হতে চেয়ে আপনি হেলাল হাফিজ হয়ে উঠেছেন, একজন কবির স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠার প্রথম ধাপ কি তবে অনুসরণ, অনুপ্রাণিত কিংবা ঈর্ষান্বিত হওয়া?

হেলাল হাফিজ : যেকোনো শিল্পীরই শৈল্পিক ঈর্ষা থাকতে হবে। নোংরা ঈর্ষা হলে হবে না।

 

নাদিরা ভাবনা : অনুকরণ না, তাইতো?

হেলাল হাফিজ : অনুকরণ, অনুসরণ কোনোটাই না। আমি তো বলেছিই যে, আমার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে একমাত্র আবুল হাসানকেই আমি ঈর্ষা করি। আর কাউকে ঈর্ষা করি না। তার মানে কী? সবচেয়ে বেশি ভালোওবাসি তাকে।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : শিল্প তো মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। কিন্তু তারপরেও এই সমগ্র পৃথিবীর এত এত মহান সব শিল্পী, শিল্পকর্ম, বিশ্বমোড়লদের প্রভাবিত করতে পারেনি বা পারছে না কেন? কেন পৃথিবীর সর্বত্র এখনো অন্ধকারের জয়?

হেলাল হাফিজ : না, এইখানে তোমার পুঁজিবাদের প্রভাব আছে। কারণ পুঁজিবাদ তো শিল্পের বিকাশ ঘটতে দেবে না।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : না, মানে ঠিক কী কারণে বব ডিলান বা জন লেননের গান কিংবা পৃথিবীর এত এত মহান শিল্পীদের শিল্পকর্মগুলোর মূলভাষ্য বিশ্বনেতাদের প্রভাবিত করতে পারছে না? ডোনাল্ড ট্রাম্পও তো দিনশেষে একজন মানুষ, কেন তাকে ডিলান কিংবা বব মার্লে ছুঁয়ে যায় না?

হেলাল হাফিজ : সব মানুষ আলাদা, সবার শিল্পবোধ এক নয়।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : সমসাময়িক কবিদের মধ্যে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে সম্ভবত পরিচিত আপনি। ওনার কবিতা নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

হেলাল হাফিজ : ইমতিয়াজ মাহমুদ আমার ভক্ত, আমিও তার ভক্ত। ওর লেখার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?

হেলাল হাফিজ : পারিবারিকভাবে তসলিমার সঙ্গে আমার খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো, একে তো মাটির টান, তার ওপরে অনুজ রুদ্র’র প্রেমিকা। ওদের মধ্যে এটা-সেটা নিয়ে সাংসারিক ঝামেলা লেগেই থাকতো, তখন আমিই যেতাম সেসব মেটাতে। এবং এই করতে করতেই আমি তসলিমার প্রেমে পড়ে যাই, তবে ব্যাপারটা একপাক্ষিক ছিলো। এইখানে তোমাদের বলে রাখি, আমার 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'র প্রথম যে কবিতা, ‘ব্রক্ষ্মপুত্রের মেয়ে’, সেটা কিন্তু তসলিমাকে ভেবেই লেখা। ওকে আমি ‘তনা’ নামে ডেকেছি।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনি বরাবরই বলেছেন যে, একজন প্রকৃত শিল্পী যদি হতে হয় তবে ক্ষমতা থেকে তার দূরে থাকাই ভালো।

হেলাল হাফিজ : আমি এটা সবসময়েই বলি। পাওয়ারের সঙ্গে কবির মেশা কখনো ঠিক না। কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা Sovereign identity. একটা সমাজ বা জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে, এটা সেই সমাজের কবিদেরকে দেখে বোঝা যায়। কবি হলো একটি সমাজের ব্যারোমিটার, সমাজটা কি নষ্ট-ভ্রষ্ট না কি ভালো, কতটুকু সভ্য আর উন্নত তা কবিদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সমাজের কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সমাজ দ্রুত গতিতে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কবি একটি জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন যেমন দেখাবে, তেমনি সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও সে চিহ্নিত করে দেবে। কোথায় ভুল-ত্রুটি হচ্ছে তা দেখিয়ে দেয়াও কবির দায়িত্ব। এর অর্থ এই না যে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। একজন কবির একটি রাজনৈতিক সংগঠন করার যাবতীয় অধিকার অবশ্যই আছে। নিশ্চয়ই করবে সে। কিন্তু আমার ধারণা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে একধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা Automatically-ই আরোপিত হয়ে যায়।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সক্রিয় রাজনীতিতে একধরনের সহিংস, কঠোর মনোভাব আছে যার প্রতি একজন শিল্পীর নরম মন সহজে সায় দিতে চায় না।

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই একজন কবির রাজনীতি থেকে একটু দূরে থাকতে পারাই ভালো। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তার রাজনৈতিক সংগঠন করারও সম্পূর্ণ অধিকার আছে। অবশ্যই আছে। সুকান্ত করেছে না? তারপরে ঐ যে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’ যিনি লিখলেন?

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : সুভাষ মুখোপাধ্যায়?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। উনি তো সক্রিয় রাজনীতিই করতেন। সুকান্ত করতেন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও। আমি এই যে বারবার বলছি, আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না। তুমি দশজন কবির বই নিয়ে বসো, সবচাইতে বেশি রাজনৈতিক কবিতা পাবে আমার লেখায়।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিল, আপনার ঘনিষ্ঠজন বলেই চিনি আমরা। উনিও কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন।

হেলাল হাফিজ : মাহবুবুল হক শাকিল—ও তো আমার কবিতা অসম্ভব পছন্দ করতো। এবং ময়মনসিংহ গেলে বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিলো। এবং শাকিলই আমার চোখের চিকিৎসার সময়ে শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করে পুরো বিষয়টা নিজে একক দায়িত্বে সামলিয়েছিলো। আমাকে সে বলেছে যে, আপা মানে নেত্রী তো আপনাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু আপনি এত দূরে দূরে থাকেন কেন? আমি তখন বলেছি যে, ভাই দূরে-কাছে তো ব্যাপার না। আমি আমার কাজ করছি, উনি ওনার কাজ করছেন।

তো আমি যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন ৪৫ বছর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা।

 

নাদিরা ভাবনা : নতুন কবি বা লেখকদের লেখা কি পড়েন?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সেটাই তো বেশি জরুরি। আমার সময়কে আমি কীভাবে ধরবো? আমার তো ৭২ বছর বয়স। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো বলে তোমার হয়তো আমাকে একটু কাছে বসতে দিয়েছো, নাহলে তো আমাকে কেউ ধারে কাছেও বসতে দেবে না। তাই না? আমি তোমাকে না পড়লে বুঝবো কীভাবে? কাছাকাছি থাকলে হয়তো একটু বন্ধুত্ব হতে পারে। কিন্তু এর বেশি তো আর সম্ভব না। তাহলে আমি আমার সময়কে বুঝবো কীভাবে? তোমার কবিতা পড়ে, গান শুনে কিংবা পেইন্টিং দেখেই তো বুঝতে হবে তোমাকে, তাই না?

 

নাদিরা ভাবনা : তার মানে নতুনদের ভালো লাগে। অনুপ্রাণিতও হন তাদের দ্বারা?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। হবো না কেন? কোনো ভালো লেখা পড়লে দারুণ লাগে। এইতো কিছুদিন আগে একটা মেয়ের লেখা দেখলাম Facebook-এ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নাই সেভাবে। আমিই তাকে Friend Request পাঠিয়ে বন্ধু হয়েছি। তাকে বলেছি যে আমার Inbox-এ কিছু লেখা দাও তোমার। আমি হাতের কাছে তরুণদের যত লেখা পাই, পড়ি। এখন হয়েছে কী! একটা কাল্ট বা ঘরানা মানে একটা স্বতন্ত্র ধারা জন্ম নিয়েছে, যা কিনা বছরে বছরে হবে না এমনকি যুগে যুগেও না। যেমন জীবনানন্দ দাশ একটা ঘরানা। রবীন্দ্রনাথ একটা ঘরানা।

 

নাদিরা ভাবনা : নজরুল?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নজরুলও একটা ঘরানা। কিছুটা ঘরানা আবুল হাসানও। আবুল হাসানের কবিতার কোনো নাম-টাম না থাকলেও বোঝা যাবে যে এটা আবুল হাসান।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : Signature?

হেলাল হাফিজ : Exactly, একজন কবির যে স্বাতন্ত্র্য, কবিসত্তা, এটা থাকা জরুরি।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্যার, জীবনে তো অনেক অনেক রূপসী নারীরই সান্নিধ্য পেলেন। একটা বিষয় জানতে চাই যে, একজন নারীর রূপ নাকি ব্যক্তিত্ব, কোনটা আপনাকে বেশি টানে?

হেলাল হাফিজ : দুটোই, আমি মনে করি যে দুটোই জরুরি। শুধু বাহ্যিক রূপ দিয়ে তো কোনোকিছু চিরস্থায়ী হবে না। এটার সঙ্গে যদি ভেতরের ভালো সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে ব্যাপারটা জমে আরকি। এটা কেবল নারী নয় বরং পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই।

 

নাদিরা ভাবনা : কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বোধহয় রূপের বিষয়টা একটু বেশিই জরুরি?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এটাও সত্য। কিন্তু এটাই সর্বেসর্বা না। এটাই সবকিছু না। আমি নিজেই তো একসময় সুদর্শন ছিলাম, কিন্তু এখন? তুমি আমার কবিতা ভালোবাসো বলেই আমার পাশে বসেছো, আমি যদি না লিখতাম তাহলে কেউই আমাকে এই বয়সে এতটা গুরুত্ব দিতো না। যাই হোক, কিছুদিন আগে ‘প্রথম আলো’ জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, আপনার এত এত নারী ভক্ত। তারা আপনাকে উপহার হিসেবে কী দেয়? উত্তর দিলাম, সবচেয়ে বেশি পেয়েছি চুমু। একসময় প্রচুর পেতাম। এখন তো পড়ন্ত বেলা, এখন মালা পাই, ব্রেসলেট পাই, ফুল পাই।

 

নাদিরা ভাবনা : চুমুও পান?

হেলাল হাফিজ : একেবারে যে পাই না তা না, তবে পাই। পাবার একটা জায়গা তো হলোই এখন! (ভাবনাকে ইঙ্গিত করে)

 

নাদিরা ভাবনা : তা তো বটেই।

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : এখন একজন মহান মানুষকে নিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, যাকে শুধু রাজনীতির ফ্রেমে আমরা আবদ্ধ রাখতে পারি না। উনি সার্বজনীন, উনি সবার। অন্তত একজন বাঙালি যদি হয়ে থাকি আমরা। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ, এ দুটো আপনার কাছে সমার্থক কিনা স্যার?

হেলাল হাফিজ : বাঙালি জাতির জন্য একজন মানুষ, কেবল একজন মানুষই স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেছেন, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আর কোনো বাঙালি বাঙালির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা চিন্তা করেনি। কোনো কবি করেনি, কোনো রাজনীতিবিদ করেনি, কেউ করেনি।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : একমাত্র বাঙালি...

হেলাল হাফিজ : একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছেন এবং তা শুধু দেখেনই নয় বরং সারাজীবনের সংগ্রাম দিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করেছেন।

 

রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বারবার জেল খেটেছেন…

হেলাল হাফিজ : তার সমকক্ষ আর কেউ নাই। কেউ নাই। এটা একদম বিনা বাক্যব্যয়ে মানে এই শব্দকে কোনোভাবেই Ignore করা সম্ভব না। এটা যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় সে হয়তো বাঙালিই না। করেনি যে তা নয়, অনেকেই করছে। কিন্তু সেটা খুবই অযৌক্তিক, খুবই অপরিশীলিত মনের পরিচয়। তার রাজনীতির বিরুদ্ধতা হতে পারে কিন্তু তার যে অবদান, কাজ…

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : তার বিরোধীতা করা সম্ভব না।

হেলাল হাফিজ : একদম।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : আপনার গুরুই বলা যায়—আহমদ ছফা—তার প্রভাব কেমন আপনার ওপরে?

হেলাল হাফিজ : ছফা ভাই অনেক অনেক আদর করতেন আমাকে। এবং আমার ঐ যে কবিতাটা যখন বেরুলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, তখন হুমায়ুন কবির নামে একজন কবি ছিলেন, বরিশাল বাড়ি তার। আমাকে নিয়ে ছফা ভাই আর হুমায়ুন ভাই গিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে। তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পরে দৈনিক বাংলা হয়। হাবীব ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছফা ভাই বললেন, এই যে হেলাল হাফিজ আর এই তার কবিতা। হাবীব ভাই কবিতাটি পড়ে আর আমার দিকে তাকান।

 

নাদিরা ভাবনা : বাচ্চা এই ছেলেটা করেছেটা কী?

হেলাল হাফিজ : যাইহোক, পরে হাবীব ভাই বললেন, ছফা ও তো বাচ্চা ছেলে কষ্ট পাবে, কিন্তু কবিতাটি আমি ছাপতে পারবো না। আমার চাকরি থাকবে না, এমনকি কাগজও বন্ধ করে দিতে পারে। সরকারি কাগজ তখন পাকিস্তানের। তবে এরপরেই বলেন তিনি যে, হেলালের আর কবিতা না লিখলেও চলবে, তার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে। এইতো এখনও কানে বাজে কথাটা। তখন ছফা ভাই এসে হুমায়ুন কবিরকে সাথে নিয়ে, ওনারা তখন লেখক-শিবির করতেন, বাম ঘরানার Underground সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন। দুই রাতে সমস্ত ক্যাম্পাসের দেয়াল ভরে গেলো এই কবিতার পঙক্তিতে।

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’

মাঝরাতে চিকা মেরে মেরে করেছিলো এসব। পুরো ক্যাম্পাস। কার্জন হল, আর্টস বিল্ডিং। তখন তো এতকিছু ছিলো না ক্যাম্পাসে। এই দুটিই বড়, মূল বিল্ডিং। সমস্ত দেয়ালে চিকা মারার এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন ছফা ভাই। উনি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের শিষ্য।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে তো উনি একটা বইও লিখেছিলেন, ‘যদ্যপি আমার গুরু’।

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। আচ্ছা শোনো, আমি আর কথা বলতে পারবো না, এই যে আমার কাশি হচ্ছে বারবার। তোমরা ৩ জন মিলে এটা গুছিয়ে লিখো আর কোনো তথ্যের যদি ঘাটতি পড়ে কিংবা কিছু নিয়ে কোনো দ্বিধা যদি হয় তবে আমাকে ফোন করো।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : স্যার, একটা শেষ প্রশ্ন করি?

হেলাল হাফিজ : আচ্ছা করো।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : পিডিএফ বনাম কাগুজে বই, কার পক্ষে আপনি?

হেলাল হাফিজ : অনেকের ধারণা যে বই বোধ হয় উঠে যাবে, বই থাকবে না। কিন্তু আমার মনে হয় বই থাকবে। কারণ বইয়ের কাগজের যে গন্ধটা লাগে নাকে এটা কিন্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী একটা ব্যাপার। এবং তুমি যতই অনলাইন পড়ো না কেন, এই যে বাইন্ডিং করা বই, এটা হাতে নিলে মনে হয় যেন লেখককেই ধরে আছো। এই স্পর্শ, আবেদনটা তুমি অন্য কোথাও পাবে না। আমাকে তো কত ছেলে-মেয়েই বলেছে যে, ঘুমানোর সময় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ তাদের বালিশের নিচে থাকে।

 

নাদিরা ভাবনা : আমারও তো থাকে।

হেলাল হাফিজ : এই যে দেখো জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। চিন্তা করো কেমন লাগে তখন? কথাটা কত মানুষ যে বলেছে আমাকে!

 

নাদিরা ভাবনা : ব্যাপারটা এমন না যে শুধু পড়েই রেখে দিলাম, একটা ঘোরের বিষয় আছে।

হেলাল হাফিজ : এজন্যই আমি ১৭ বছর অপেক্ষা করেছিলাম বইটার জন্য আর এই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ এটার জন্য ৩৪ বছর। এটা এমন না যে বেশি সময় নিয়ে বের করেছি বলে এটা সমকক্ষ তার, বরং আমি স্বীকারই করি যে এটা দূর্বল খানিকটা। ৩-৪ টা টিভি অনুষ্ঠান করেছি বইটা বেরুবার পরে এবং প্রতিটাতেই স্বীকার করেছি।

 

শাহনেওয়াজ খান সিজু : প্রথম বই সবসময়েই প্রিয়।

হেলাল হাফিজ : না না, যেটা বাস্তব সেটা তো বলতেই হবে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ যখন আমি লিখেছি, তখনকার সময় আর এখন কি এক? ঐ সময় আমি কোথায় পাবো? কবিতা তো আর হাওয়ায় হাওয়ায় হয়ে ওঠে না।

 

নাদিরা ভাবনা : এবার চা খাব।

হেলাল হাফিজ : শুধু চা কেন? তার আগে কাবাব-নান খাবো এবং আমি খাওয়াবো। চলো, এতক্ষণে ক্যান্টিন খুলে গেছে...

//জেডএস//

লাইভ

টপ