বইমেলায় লিটলম্যাগ ও আমরা

Send
ওবায়েদ আকাশ
প্রকাশিত : ১৬:৪৩, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৪, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০

বইমেলার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়ে গেছে। যার মধ্যে লিটলম্যাগ অন্যতম। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের একটা কনসেপ্ট আছে, কমিটমেন্ট আছে। সেটা অতীতে যেমন ছিল ভবিষ্যতেও তেমন হওয়া উচিত। তবে সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমিটমেন্ট পাল্টাতে পারে, এটাও স্বাভাবিক।

লিটলম্যাগের বেসিক কিছু জায়গা আছে। যেমন—সরাসরি কথা বলা, মুক্তচিন্তা, স্বাধীনতা, ডিফারেন্ট কিছু বলা, এসব লিটল ম্যাগাজিনের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য সবসময়ই থাকা উচিত।

মেলার প্রথম দিকে তো লিটলম্যাগের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। এমনকি ১৯৯৯/২০০১ সাল নাগাদ লিটলম্যাগ নিয়ে কাউকে মেলায় বসতে দেখিনি। তখন বহেরা তলায় আমি আমার ছোট ভাইকে নিয়ে একটা চৌকি বসিয়ে দিলাম। চৌকির উপরে আমরা লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে বসতাম, আমার ‘শালুক’ আর সরকার আমিনের ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’ নিয়ে। শুরুটা ঠিক এভাবেই। 

আরও একটা ছেলে বসতো, তবে তার কোনো পত্রিকা ছিল না, সে বিভিন্নজনের পত্রিকা এনে বিক্রি করতো। সে বাণিজ্যিক মন-মানসিকতা নিয়ে বসতো। কিন্তু আমাদের কোনো বাণিজ্যিক মানসিকতা ছিল না। আমরা যখন বসলাম তখন দেখা গেছে মফস্বল কিংবা ঢাকায় যারা লিটল ম্যাগাজিন চর্চা করতো, তারা তাদের লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এর স্টলে পাঠাতো, তখন আমরা সেটা বিক্রি করে দিতাম।

‘শালুক’ লিটলম্যাগের একটা প্রদর্শনীর জায়গা হয়ে উঠেছিল যে, এখানে আসলেই সব লিটল ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। এরপর ২-৩ বছর পর সেখানে ‘শুদ্ধস্বর’ বসার আগ্রহ প্রকাশ করে। এভাবে ধীরে ধীরে বহেরাতলা জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠলো।

তারপর অনেকেই আমাদের জিজ্ঞস করতো এখানে কীভাবে স্টল পেতে হয় বা কীভাবে বসতে হয়, বসার কোনো সুযোগ আছে কিনা। আমি বললাম, অবশ্যই বসার সুযোগ আছে। তখন তৎকালীন বাংলা একাডেমির ডিজি মহোদয়কে (২০০৫/২০০৬ সাল হবে) লিটলম্যাগ নিয়ে কিছু প্রস্তাব দিলাম।

আমি তাকে বললাম, ‘এখানে আমাদের মতো আরও অনেকেই লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে বসতে চায়, যদি আপনি এই দায়িত্বটা নেন যে, এখানে লিটল ম্যাগাজিনের স্টল বরাদ্দ দেবেন এবং কর্তৃপক্ষ এটার দায়িত্ব নেবে। নামমাত্র টোকেন-মূল্য নিয়ে আপনারা স্টল বরাদ্দ দেবেন, এবং এই বহেরা চত্বরকে ‘লিটল ম্যাগাজিন চত্বর’ নামে ঘোষণা করবেন।’ ডিজি মহোদয় আমার কথা রাখলেন। আমার সঙ্গে ছিলেন সরকার আমিন, শুদ্ধস্বরের সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন। পরে ধীরে ধীরে প্রায় দেড়শোর মতো স্টল অংশগ্রহণ করতে শুরু করলো।

বাংলা একাডেমি বইমেলার বৃহৎ অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসায় দেখলাম ওখানে আর লিটলম্যাগ জমছে না। তখন দাবি তুললাম লিটল ম্যাগাজিন চত্বরটাও উদ্যানে নেওয়া হোক। কিন্তু  একটা গ্রুপ বলল, বহেরা তলায় থাকা আমাদের ঐতিহ্য, এটাকে আমাদের রক্ষা করতেই হবে।

যেহেতু মেলা এখানে নেই, সুতরাং এখানে ঐতিহ্য রক্ষার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আর ঐতিহ্য রক্ষা মানে এই নয় যে, নতুনকে অস্বীকার করা, যেখানে পুরো মেলাই চলে গেছে, এখানে লিটল ম্যাগাজিন পড়ে থাকার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। 

গত বছরের আগের বছর বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব জালাল ভাইকে প্রস্তাব করলাম, বহেরা তলা থেকে চত্বরটা উদ্যানে নিয়ে যেতে। তিনি আমার কথা রাখলেন এবং উদ্যানে চত্বরের জন্যে কাজও শুরু করলেন। কিন্তু ঐ গ্রুপটা ডিজি মহোদায়কে গালাগালি করতে লাগলো, উদ্যানে যারা আছে তারা লিটল ম্যাগাজিন বোঝে না, সাহিত্য বোঝে না। অথচ যারা এই দাবি করতো তাদের কেউই লিটল ম্যাগাজিন করতো না, এর সঙ্গে সম্পৃক্তও ছিল না। এ বছর তারাই এখানে আসার প্রয়োজন অনুভব করল। যেহেতু বহেরা তলায় লোকজন যাচ্ছে না, এটা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা ভাবল আমাদের এইপাশে আসা উচিত। তারা আন্দোলন শুরু করলো, স্বাক্ষর চাওয়া শুরু করলো, বিভিন্নজন একত্রিত হয়ে ডিজি মহোদয়ের কাছে গেল। তারা আমার কাছেও এসে স্বাক্ষর চাইলো, তখন আমি বললাম, 'এটা স্বাক্ষর চাওয়ার বিষয় না, এটা তো চলেই আসছিল উদ্যানে, আজকে কেন আপনারা এটার পক্ষে কথা বলছেন?' যেহেতু প্রস্তাবটা আমি নিজেও সমর্থন করি, তাই স্বাক্ষর করে দেই।

আর এবারের সম্মিলিত উদ্যোগে লিটল ম্যাগাজিন উদ্যানে চলে আসে। এখন মনে হয় প্রাণ ফিরে পেয়েছে, যদিও কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, এটা দুই এক বছরের মধ্যেই চলে যাবে।

এখানে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর যদি ২-৩ বছর চলতে থাকে আরো জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে।

কিন্তু কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। লিটল ম্যাগাজিন নয় কিংবা সে সম্পর্কিত পত্রিকাও নয়, এরকম জঞ্জালপূর্ণ পত্রিকাকে স্টল দেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে বলেছি। তারা জানালো, 'আমরা আসলে অসহায়, স্টলের জন্য মন্ত্রী পর্যন্ত ফোন করেন, অমুক ফোন করে, তমুক ফোন করে। তখন বাধ্য হয়ে আমাদেরকে স্টল দিতে হয়।

আমি বরাবরই বলে আসছি সত্যিকার অর্থে যাদের লিটল ম্যাগাজিন রয়েছে তাদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হোক, এতে করে চত্বরটা আরো বেশি জমবে এবং এতো ছোট ছোট স্টল না দিয়ে আরো বড় বড় স্টল দিতে পারত।

বাংলা একাডেমি একটা নিয়ম করেছে যে, এখানে শুধু লিটল ম্যাগাজিন থাকবে এবং লিটল ম্যাগাজিনের লেখক-কর্মীদের বই থাকবে। যেটা কলকাতাও আমি দেখেছি। এখানে দেখলাম বাচ্চাদের বই, বা অন্য বই, সবকিছু বিক্রি হচ্ছে। এটা আমি মোটেও পছন্দ করি না।

স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রে আরো বেশি কঠোর হতে হবে। সত্যিকারের লিটল ম্যাগাজিন এখানে বসুক— এক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা চাইলে আমরাও সহযোগিতা করবো।

শ্রুতিলিখন : আজাদ হোসেন

//জেডএস//

লাইভ

টপ