সাদাত হোসাইনের সাক্ষাৎকার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শাহনেওয়াজ খান সিজু ও ওয়ালিদ প্রত্যয়
প্রকাশিত : ১৬:১৮, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৪, মার্চ ০২, ২০২০

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, উপস্থাপক এবং ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরবেলা শত ব্যস্ততার মধ্যেও এক দীর্ঘ টেলিকনফারেন্সে তিনি তার সাহিত্য-ভাবনার পাশাপাশি কথা বলেছেন বইমেলা, ব্যক্তিগত-জীবন ও সাহিত্য-জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে...

শাহনেওয়াজ খান সিজু : আপনি তো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আগামীতে সাদাত হোসাইনের ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতি নিয়ে কোনো বই কি আমরা আশা করতে পারি?

সাদাত হোসাইন : খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে আমার লেখালেখির মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর কেন যেন অদ্ভুতভাবে অনুপস্থিত। আমি নিজেও কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টায় নানা সময়ে ভাবতে চেষ্টা করেছি যে, কেন আমার লেখালেখির মধ্যে কোথাও জাহাঙ্গীরনগর নেই?

একটা হতে পারে যে, জাহাঙ্গীরনগরে থাকাকালীন সময়টা ছিলো আমার জীবনের সবচাইতে ডিপ্রেশনের, এটার পেছনে অনেক কারণ ছিলো। অন্য কোনোদিন বিস্তারিত বলবো এই নিয়ে। কিন্তু আমার শৈশবের নানাকিছু আমার লেখালেখিতে উঠে এলেও অদ্ভুতভাবেই জাহাঙ্গীরনগরের জীবন আমার লেখায় একদমই আসেনি, হয়তো ভবিষ্যতে আসবে। আমার মনে হয় যে, ছোটবেলার স্মৃতিগুলো যেমন একটা সময় পরে এসে আমাকে পুশ করেছে লেখায় আনতে, সেরকমই একটা সময় পরে গিয়ে হয়তো জাহাঙ্গীরনগরের স্মৃতিগুলোও উজ্জ্বল হয়ে উঠে আসবে আমার লেখায়।

 

সিজু : বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কি সংশ্লিষ্টতা ছিলো আপনার?

সাদাত : না, কেননা আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তখন এত বেশী ভয়াবহ হতাশাগ্রস্ত ছিলাম, এতো বেশি স্ট্র্যাগলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে যে অন্যকিছু ভাবার সুযোগই ছিলো না। তাছাড়া নানা কারণে ঐ সময়টায় আমি খুব জড়তায় ভুগতাম, খুব ইন্ট্রোভার্টও ছিলাম।

 

সিজু : কখনো কি গল্পকার ব্যতীত অন্য কিছু হবার ইচ্ছে হয়েছিলো আপনার? ধরুন অভিনয়, বা মডেলিং?

সাদাত : এগুলো ভাবার জন্য যে মানসিক প্যাটার্ন বা ভাবনার স্পেস দরকার তা আসলে ছিলো না আমার। আই কেম ফ্রম এ ভেরি মারজিনাল ফ্যামিলি, ঐ ধরণের কিছু ভাববার সুযোগও ছিলো না তখন। তবে ছোটবেলায় তো অনেকেরই অনেকরকম ইচ্ছে থাকে, কেউ খেয়া নৌকার মাঝি হতে চায় কেউবা আইসক্রিমওয়ালা। আমারও ছিলো। তারপর একটু বড় হবার পরে আমার মধ্যে যে স্বপ্নটা জন্ম নেয় তা হচ্ছে ক্রিকেটার হবো। এখানে একটা সিক্রেট বলে রাখি, আমি কিন্তু খুব চমৎকার ক্রিকেট খেলতাম। ব্যাটিং এ দূর্দান্ত ছিলাম।

 

সিজু :গান তো শোনেনই, কার গান ভালো লাগে?

সাদাত : আমার প্রিয় শিল্পী আসলে অনেকে, তবে ছোটবেলা থেকে নচিকেতার গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। নচিকেতার গান আমি খুবই পছন্দ করি, এছাড়াও সৈয়দ আবদুল হাদী আমার অসম্ভব পছন্দের শিল্পী, আমাদের অর্ণব আছে। অর্ণবের গান ভালো লাগে।

 

সিজু : নতুন কোনো নির্মাতা যদি আপনার কোনো গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে চায় কিংবা আপনাকে দিয়ে কোনো চিত্রনাট্য করাতে চায় সেক্ষেত্রে আপনি কী করবেন?

সাদাত: এটা নিয়ে বলি, আমার লেখা গল্প নিয়ে কাজ করার প্রচুর অফার আসে আমার কাছে। কেউ সিনেমা কেউবা নাটক বানাতে চায় কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কাউকে অনুমতি দেইনি। এর কারণ হচ্ছে আমার একটা ভয় হয়, ভয় কীসের? ধরো তুমি একটা গল্প যখন লিখছো মাথায় কিন্তু অটোম্যাটিকালি একটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন কাজ করে। ধরো, আমি একটা নদীর বর্ণনা লিখছি, আমার মাথায় কিন্তু একটা নদীর দৃশ্য ভেসে ওঠে, লেখার প্যাটার্নটা কীরকম হয় তোমাকে বলি, এটা আমাদের ইউনিভার্সিটিতে ভাষাতত্ব পড়েছিলাম। নোম চম্‌স্কি’র নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছো? আমি যদি ভুল না করি, তাইলে নোম চম্‌স্কি’র কিছু আলাপ এ বিষয়ে আমার পড়া ছিলো ইউনিভার্সিটিতে। এছাড়া সুইস ভাষাতাত্বিক ফার্ডিনান্ড সস্যর (Saussaure)-এর আলোচনা ছিলো, সেখানে ‘সিগনিফায়ার এবং সিগনিফাইড’ এই মুহূর্তে নিশ্চিত হতে পারছি না, তবে সেটাতে একটা বিষয় এমন ছিলো যে, একটা শব্দ কিংবা ভাবনা/কনসেপ্ট আমাদের ভেতরে ইমেজ তৈরি করে। সাউন্ড-ইমেজের সঙ্গে আমাদের ভাবনা বা ইম্যাজিনেশন সম্পর্কিত। শব্দ শোনামাত্র আমরা কিন্তু সেটার ইমেজ ভিজ্যুয়ালাইজ করি। লেখক হিসেবে আমি আবার সেটা প্রকাশ করি। আমার কাছে অনেকটা রি-ইনকারনেশন। ব্যাপারটা হচ্ছে এই, আমি যখন কোনো নারীর বর্ণনা দেই, তার মানে সেই নারীকে কিন্তু আগে আমি ইমাজিন করে নিয়েছি যে নারীটা দেখতে এমন। আমি যখন কোনো গল্পের প্লট লিখেছি তখন কিন্তু আমার মাথায় প্রথমে সেই গল্পের যা ভিজ্যুয়াল আসছে সেটা যদি অন্য কেউ করতে যায় তখনই আমার মধ্যে ভয়টা জন্ম নেয়। যেমন, আমি তোমাকে বলি, হাসিবুর রেজা কল্লোল, ‘সত্বা’ নামে একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন। কল্লোল ভাই কিন্তু গত ২ বছর ধরে একটা স্ক্রিপ্টের জন্য আমাকে পুশ করছেন এবং আমি একটা স্ক্রিপ্টের ২২ সিকুয়েন্স লিখে এরপর আর লিখতে পারিনি এবং সেটা নিয়ে আমার প্রতি কল্লোল ভাই-এর এক ধরনের মন খারাপও আছে। তবে হ্যাঁ, কল্লোল ভাইকে একটা স্ক্রিপ্ট আমি দেবো সেটা এই কারণে যে, তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বেশ আন্তরিক, উনাকে আমি পছন্দ করি এবং উনার ভিজ্যুয়াল সেন্স বেশ ভালো। এছাড়াও ফাখরুল আরেফিন ভাই, উনাকে চেনো নিশ্চয়ই?

 

সিজু : হ্যাঁ, এইতো কদিন আগেই ‘গন্ডি’ নামে একটা সিনেমা মুক্তি পেলো তার।

সাদাত : এই ‘গন্ডি’ সিনেমার সংলাপ নিয়ে তিনি অনেকদিন ধরেই আমাকে ধরেছেন কিন্তু আমি সেটাও পারিনি। তিনি আরেকটা সিনেমা নিয়ে আমাকে গতবছরই বলে রেখেছিলেন যে, স্ক্রিপ্টটা তোমাকে করে দিতে হবে, সেটাও হয়ে ওঠেনি। তবে আরেফিন ভাইয়ের সঙ্গেও আমি কাজ করবো কিন্তু সেটার জন্য আমার আরও সময় লাগবে। এর বাইরেও বাংলাদেশের অনেকেই আমাকে নিয়মিত নক করে স্ক্রিপ্ট কিংবা গল্পের জন্য।

 

সিজু : প্রত্যেক গল্পকারই যখন একটা গল্প ভাবে তখন সেটা হয় তার নিজের মতো, কিন্তু একজন ফিল্মমেকার যখন সেই গল্পটা নিয়ে সিনেমা বানাতে যায় তখন সেই গল্পটা নির্মাতা নিজের মতো করেই তো বলতে চাইবে, তাইনা?

সাদাত : আমি তোমাকে মজার একটা ঘটনা বলি, অমিতাভ রেজা ভাই যে সিনেমাটা বানাচ্ছেন এখন‘রিকশা গার্ল’, সেই রিকশা গার্লের গল্পটা অমিতাভ ভাই প্রথমে আমাকে বলেছেন, এবং এরপর তিনি আমাকে বললেন যে, সাদাত তুমি এটার একটা সিনোপসিস লিখে দাও। এমনকি অমিতাভ ভাই আমাকে রেগুলার ফোন দিতেন যে, সাদাত কী অবস্থা, কী অবস্থা? কিন্তু আমি সেটা লিখতে পারছিলাম না। মানে উনি প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে আপডেট জানতে চাইতেন, কিন্তু আমি কেন যেন পারছিলাম না, এরপরেও একটা রাইটআপ উনাকে আমি লিখে দিয়েছি, যা নিয়ে আমি নিজেও সন্তুষ্ট নই। হয়-না যে, ভেতর থেকে ফিলটা পাচ্ছিলাম না। এরপর ধরো ফারুকী ভাই আমাকে ডাকলেন একবার, অনেক কথা হলো তার সঙ্গে এরপর উনি আমাকে বললেন যে, সিনেমার ক্ষেত্রে কিন্তু ডিরেক্টরই গড, তুমি জানো সেটা। সিজু তুমি যে কথাটা একটু আগে বললে, ফারুকী ভাইও কিন্তু একই কথা বলেছিলেন আমাকে। তখন আমি ফারুকী ভাইকে বলছি, ভাই আমার পক্ষে এটা খুবই ডিফিকাল্ট, আসলে আরেকজনের জন্য স্ক্রিপ্টিং এর কাজ করা। আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে আবার ব্যাপারটা উল্টো, আমার সিনেমা বা আমার কাজের ক্ষেত্রে অন্য কেউ ইন্টারফেয়ার করলে আমি সেটা নিতে পারি না। ঠিক এই কারণেই অমিতাভ ভাই কিংবা ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েও আমার দ্বারা তা হয়ে ওঠেনি। খুবই বিনয়ের সঙ্গে আমি সুযোগ ছেড়েছি। এগুলোর বাইরেও অনেকে চেয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। 

 

ওয়ালিদ প্রত্যয় : এবার সাহিত্য নিয়ে কিছু আলাপ করতে চাই। বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত জীবনযাপনকে পুঁজি করে গল্প ফাঁদার পরিমাণটা কেন যেন তুলনামূলকভাবে বেশি। লেখকরা এই একটা ব্যাপার নিয়ে কেন এতো আগ্রহী বলে আপনি মনে করেন?

সাদাত : এর কারণ আর কিছুই না, কারণ হচ্ছে লেখকদের মধ্যে বেশীরভাগই আসলে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ। যে বাস্তবতা থেকে তুমি উঠে এসেছ সেই বাস্তবতার গল্পই তো তুমি বলতে চাইবে, তাই না? এটাকে যে পুঁজি করে লেখা সেই পক্ষে মতামত না দিয়ে আমি বলবো, তাদের লেখায় স্বতস্ফুর্তভাবেই মধ্যবিত্ত জীবনের কাহিনি চলে এসেছে। এবং সেটাই তারা বলে যেতে চান। এখনও অনেকে তাই করছেন, স্বতস্ফুর্ততা এখানে একটা বড় ইস্যু। আমার নিজের লেখাতেই যেমন গ্রামের গল্প, প্লট, চরিত্র নিয়ে খেলতে আমি পছন্দ করি, কেননা আমি সেই সমাজ থেকেই উঠে আসা মানুষ।

 

সিজু: লেখালেখির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের ভয় কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব কি আপনি বোধ করেন?

সাদাত : হ্যাঁ লেখালেখির ক্ষেত্রে এটা আমি বোধ করি।

 

সিজু : একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে প্রচ্ছদশিল্পী চারু পিন্টু’র সঙ্গে বইমেলায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা তো জানেন নিশ্চয়। স্মোকারদের জন্য বইমেলায় আলাদা ‘স্মোকিং জোন’ করা এবং বইমেলা চত্বরে ‘পাবলিক টয়লেট’ বাড়ানোর বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

সাদাত : পাবলিক টয়লেটের বিষয়টা নিয়ে কিছুদিন আগেই আমি আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে আলাপ তুলেছিলাম। কথা হচ্ছে, এতবড় একটা জাতীয় আয়োজন, বিশেষ বিশেষ দিবসে যেখানে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না, সেখানে পাবলিক টয়লেটের অপ্রতুলতা খুবই বিব্রতকর একটা বিষয়। বইমেলায় পাঠকদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশী, তাদের জন্যেও বিষয়টা খুব সেন্সিটিভ। ওপার বাংলার বইমেলাতে ২০১৬ সাল থেকেই যাই আমি, এবারও গেছিলাম। তুমি যদি সেখানে যাও, অবাক হবে, কী চমৎকার গোছানো সবকিছু। পর্যাপ্ত টয়লেটের পাশাপাশি যথেষ্ট পরিষ্কারও সেসব। একটা সোসাইটির রুচি কিন্তু তাদের টয়লেটের ভেতরের অবস্থা দিয়েই বোঝা যায়, তাই মেলা কমিটির প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে যেন আগামী বছর থেকে এই বিষয়টার দিকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নজর দেন। আর স্মোকিং-এর যে ব্যাপার, স্মোকার না হওয়া সত্বেও সেটার বিষয়ে আমি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। তবে একইসঙ্গে এটাও বলতে চাই যে বইমেলায় লক্ষ লক্ষ বই এবং দাহ্য পদার্থ থাকে, যদি একটা ছোট্ট কারণে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তার ইম্প্যাক্ট কিন্তু অসম্ভব বাজে হবে। তবে মেলা কমিটি যদি প্রাঙ্গনের বাইরে স্মোকারদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করেন সেটা সবার জন্যই ভালো হবে। পাশাপাশি স্মোকারদের প্রতিও আমার অনুরোধ থাকবে তারা যেন মেলাপ্রাঙ্গণের ভেতরে কোনোরকম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্ম না দেন।

সিজু : প্রতিবছর এত এত বই বের হচ্ছে আপনার, দুই বাংলাসহ সারা বিশ্বের বাঙ্গালীদের মধ্যেই তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কখনো প্রশংসা কখনো বা সমালোচনারও শিকার হতে হচ্ছে আপনাকে, যার উদাহরণ আপনার কিছু ফেসবুক পোস্ট, দেখা যায় অনেকক্ষেত্রেই আপনি আপনার সমালোচকদের কথা ভীষণভাবে আমলে নিয়ে ইমোশনাল কথাবার্তা বলেন।

সাদাত : সাহিত্যিক কিংবা শিল্পী মাত্রই অনুভূতিশীল একজন মানুষ, সেই মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। প্রায় প্রতিনিয়তই আমাকে অসংখ্য মানুষের অযৌক্তিক সমালোচনা এবং মিথ্যাচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই যে 'মুদ্রণ জনিত মিথ্যাচার'-এর প্রসঙ্গটা তুললে তুমি, এটা কিন্তু কোনভাবেই সহ্য করার মতো কোনো বিষয় না। গত বইমেলার আগেও একইরকম আলাপ উঠেছিলো, তখন আমি চুপ ছিলাম। কিন্তু এবার আর পারিনি। কথা আমাকে বলতেই হয়েছে। যদি ১০০০ জন মানুষ আমাকে নিয়ে মিথ্যাচার করে আমি হয়তো এক জনের কথার জবাব দিয়েছি। তুমি কিন্তু বাকি ৯৯৯ জনের ক্ষেত্রে আমার চুপ থাকার দিকে ফোকাস দিচ্ছো না, ফোকাস দিচ্ছো ঐ এক জনের কথার জবাবেই। একসময় আমার খুবই খারাপ লাগতো এসব শুনলে, এখন আর তেমন হয় না। আমি এই অ্যাডাপ্ট করতে শিখছি। যথেষ্ট শক্ত হয়েছি আমি, তবুও দিনশেষে এতসব ঝুঁট-ঝামেলা সামলানোর পরে কতবারই আর সহ্য করা যায় এসব?

 

সিজু : আপনার কথামতে মানিক বন্দোপাধ্যায় আপনার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন, আমরা যতটুকু জানি তিনি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ লেখার আগে প্রায় ৬ মাস পদ্মা পাড়ের জেলেদের সঙ্গে কাটিয়ে এসেছিলেন। আপনার কোনো লেখার ক্ষেত্রে এরকম কোনো অভিজ্ঞতা কি হয়েছে? 

সাদাত : নৃতত্ববিজ্ঞানের কিছু টার্ম আছে, যা আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়ার সময়ে জেনেছিলাম। এর মধ্যে একটা হচ্ছে ‘এথনোগ্রাফিক রিসার্চ’। অর্থাৎ উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে থেকে, তাদের মাঝে দীর্ঘদিন বসবাস করে, তাদের জীবন-যাপন, নর্মস, ভ্যালুস, বিলিভস, কালচারটাকে বোঝা। কোনো একটা এলাকা বা সমাজের বাস্তবতাকে জানতে হলে সেই সমাজের সংস্কৃতি ও মানুষদের জীবনযাপন নিয়ে বাস্তবিক স্টাডি করতে হয়। কলোনিয়াল যুগে ব্রিটিশরা যখন এসেছিলো সাম্রাজ্য গড়তে তারাও একইরকম স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করেছিলো, সবার আগে তাদের জানতে হয়েছিলো উদ্দিষ্ট পেরিফেরির মানুষের জীবনাচার। একটা ডিসিপ্লিন হিসেবে এন্থ্রোপোলজির জন্মও কিন্তু সেখান থেকেই। এমনকি আমাদের ভারতবর্ষের মানুষজনের সাইকোলজি, সংস্কৃতি এবং সমাজবাস্তবতা বুঝতে গিয়েও কিন্তু নানা ডিসিপ্লিন তৈরি হয়েছে। আর এটা না-হলে এত দীর্ঘসময় ধরে তাদের পক্ষে দেশ শাসন করা সম্ভব হতো না। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ মূলত একধরণের ‘এথনোগ্রাফিক রিসার্চ’- যা নৃতাত্বিক গবেষণা সম্পদ, যা তিনি সাহিত্যাকারে রচনা করে গেছেন। এখন আমার লেখালেখির বিষয়ে বেশীরভাগ মানুষের যা প্রতিক্রিয়া, আমার লেখায় রুরাল জীবনযাপনের বাস্তবতা প্রখরভাবে দৃশ্যমান। এর কারণ হলো আমি আমার জীবনের প্রথম কুড়ি বছর কাটিয়েছি গ্রামে, আমার পরিবার ও গ্রামের মানুষজনদের সঙ্গে। এক্ষেত্রে আমাকে বাংলার গ্রাম্য সমাজকে আর নতুন করে স্টাডি করতে হয়নি। কেননা আমি সেই সমাজ থেকেই উঠে আসা মানুষ। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার লেখায় বারংবার সেই সমাজের বাস্তব চিত্র ভেসে উঠেছে। স্বতস্ফূর্তভাবে আমি আমার নিজের ভাবনা নিজের বিশ্বাসকেই তুলে ধরতে চেয়েছি আমার সাহিত্যকর্মে। এছাড়াও আমার যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত পড়াশোনা থেকে লব্ধ করা জ্ঞান আমাকে আমার লেখালেখিতে সহায়তা করে যাচ্ছে।

 

সিজু : সাদাত হোসাইনের মধ্যে কোন লেখক বা কবির প্রভাব সবচাইতে বেশী?

সাদাত : নির্দিষ্ট করে কারো কথা বলাটা মহা মুশকিল, কেননা আমি স্বকীয়তায় বিশ্বাসী। অনেকেই অনেককে অনেকভাবে প্রভাবিত করে থাকেন তাই স্পেসিফিকভাবে বলা সম্ভব না।

 

সিজু :ওপার বাংলায় আপনার একটা সাক্ষাৎকার পড়ে জানলাম, শাহাদুজ্জামানের লেখার ভক্ত আপনি। শাহাদুজ্জামান যেমন জীবনানন্দ দাশ, কর্ণেল তাহের, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর জীবন-সাহিত্য নিয়ে কাজ করেছেন। আপনার কাছ থেকে এরকম কিছু কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কোনো কাজ কি আমরা আশা করতে পারি?

সাদাত : এটার জন্য আমার প্রিপারেশন দরকার। আমি কেবল লিখতে শুরু করেছি। মাত্র কয়েক বছরের যাত্রা আমার। ফলে আমাকে সময় দিতে হবে। আমি চেষ্টা করছি অন্যভাবে আমার ভাবনাকে তুলে আনতে, আমার কিছু লেখায় ইতিমধ্যেই আমি চেষ্টা করেছি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে আনতে। তবে আয়োজন করে লেখাটা হয়ে ওঠেনি এখনো, আশা করি আগামীতে হবে।

 

সিজু : এবারের বইমেলাতে আরিফ আজাদ, আয়মান সাদিক, তৌহিদ আফ্রিদি, সালমান মুক্তাদিরসহ ইউটিউবার কিংবা সো-কল্ড ফেসবুক সেলেব্রিটিদের এরকম অনেক বইই তুমুল বিক্রি হচ্ছে, এ বিষয়ে আপনি কী ভাবছেন?

সাদাতসাহিত্য বলতে তোমার বোঝাপড়াটা কী? এটা আগে জানা দরকার। তারা যা লিখছে সেটিকে তোমরা বলছো সাহিত্যের অন্তর্গত নয়। মোটেভেশনাল বা ট্রেইনিং রিলেটেড। এখন তুমি যদি বলো, তারা সাহিত্যের ক্ষতি করছে, বিষয়টা হাস্যকর না? যেটাকে তুমি সাহিত্য বলেই স্বীকার করছো না, বা আদতেই প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত ভাবনায় যা সাহিত্য নয়, তুমি তাকে সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর কেনো বলছো? তার মানে তুমি এমন সাহিত্য রচনা করছো, যার জন্য আলাদা ইনডেমনিটি দরকার? এতোই দুর্বল তোমার সাহিত্যের শক্তি যে, তাকে বাঁচাতে আশেপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা দরকার? হায় কপাল! এই যদি হয় অবস্থা! সাহিত্যের নিজের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে টিকে থাকার শক্তি থাকবে না? এতোই দুর্বল সে! আফসোস! শোনো, অনেকেই ভাবেন যে তমুকের লেখা প্রকাশ না হলে বোধহয় লোকে আমার লেখা পড়বে, এই বিষয়টা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করার মতো একটা বিষয়। যে পাঠকেরা সালমান মুক্তাদির কিংবা আয়মান সাদিকের লেখার ভক্ত তারা কিন্তু কখনোই শাহাদুজ্জামানের বই কিনবে না। সারা পৃথিবীতেই মোটিভেশনাল স্পিকারদের লেখার একটা বাঁধা-ধরা বিশাল পাঠক আছে, যেমন শিব খেরা’র ‘তুমিও জিতবে’ সবসময়ের বৈশ্বিক বেস্টসেলার। এখন এটার জন্য সাহিত্য ধ্বংস হয়ে গেছে? কোনো সাহিত্যিক বলেছে, এই বই প্রকাশ করা যাবে না? এখন কে কী লিখবে আর কে কী পড়বে সেটা ঠিক করার তুমি কে? যে তুমি বাকস্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় সেন্সরশীপের বিরুদ্ধে কথা বলছো সেই তুমিই আবার সালমান মুক্তাদির কিংবা আয়মান সাদিকের লেখার ক্ষেত্রে একইরকম মনোভাব প্রদর্শন করছো। এটা কি হিপোক্রিসি না? যে যার মতো লিখে যাবে এটাই তো হবার কথা ছিলো, লেখার মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়াটা কোন ধরণের প্রগতিশীলতা?

 

সিজু : এবার শেষ প্রশ্ন করতে চাই। একজন গল্পকার হিসেবে যাপিত জীবনের এই পর্যায়ে এসে এতসব প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মাঝে আলাদীনের প্রদীপ হাতে পেলে নিজের জন্য কোন ৩টি জিনিস চেয়ে নেবেন?

সাদাত : আমাকে বিব্রত করা অত সহজ কাজ না। প্রথমত আমি ‘বিশ্বকাপ জয়ী’ ফুটবলার লিওনেল মেসি হতে চাই। দ্বিতীয়ত আলাদিনের জাদুর গালিচায় করে সারা পৃথিবী ঘুরে দেখতে চাই। এরপর আপাতত আর মাথায় আসছে না। পরে কখনো বলবো।

//জেডএস//

লাইভ

টপ