জাদুবাস্তবতা । ফ্রানৎস রোহ । পর্ব-১

Send
অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০০:০১, এপ্রিল ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০১, এপ্রিল ১৭, ২০২০


[অভিব্যক্তিবাদের পরে অর্থাৎ উত্তর-অভিব্যক্তিবাদ (পোস্ট-এক্সপ্রেশনিজম) কালে চিত্রকলা বিমূর্ততার শৈলী থেকে সরে সাধারণ বাস্তবতার পথে ফিরে আসতে শুরু করলে, সেই ফিরে আসার জয়গান গেয়ে ১৯২৫ সালে ফ্রানৎস রোহ একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই প্রবন্ধের শিরোনামে জন্ম নিয়েছিল ‘জাদুবাস্তবতা’ শব্দটি। শিরোনামে বলছি এ কারণে যে, প্রবন্ধের অভ্যন্তরে লেখক একবারও ‘জাদুবাস্তবতা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, শুধু শিরোনামেই একবার তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। প্রবন্ধটিতে লেখক জাদুবাস্তবতা নামের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তিবাদ-উত্তর চিত্রকলায় বস্তু-ঘনিষ্ঠ বাস্তবতা চর্চার প্রশংসা করেছিলেন, যা আমাদের এখনকার সময়ের জাদুবাস্তবতা বিষয়ক ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো। আমরা বরং এখন জাদুবাস্তবতা বলতে বুঝি বস্তু-ঘনিষ্ঠতা থেকে শৈল্পিক বাস্তবতার সরে যাওয়ার কলাকৌশল। ফ্রানৎস রোহ ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন কীভাবে ১৯২০-এর দশকে অভিব্যক্তিবাদ-উত্তর চিত্রকলা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার দিকে ফিরে এসে এক অভিনব আনন্দ সৃজনে সক্ষম হয়েছিল এবং একই সাথে এক্সপ্রেশনিজমে সৃষ্ট আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোও ধারণ করতে পেরেছিল। বর্তমান সময়ের পাঠকগণ যারা সাহিত্যসমালোচনার জ্ঞান থেকে ‘জাদুবাস্তবতা’র ধারণা নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে জাদুবাস্তবতা বিষয়ে জানতে চান তারা স্বাভাবিকভাবেই এ প্রবন্ধ পড়ে যথেষ্ট হতাশ হবেন, কারণ এখানে সাহিত্যের জাদুবাস্তবতার ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সরাসরি একটি বাক্যও নেই। তারপরও ‘জাদুবাস্তবতা’র তাত্ত্বিক ধারণা লাভে আগ্রহী পাঠকগণের অনেকের মনে এমন একটি কৌতুহল থাকতে পারে যে—‘দেখি না, যে-প্রবন্ধটির নাম ধরে জাদুবাস্তবতা শব্দটির সৃষ্টি হয়েছিল সেটিতে কী লেখা আছে।’ তাদের জন্যই মূলত প্রবন্ধটি বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা।

জার্মান ভাষায় লিখিত ফ্রানৎস রোহর এই প্রবন্ধটির মূল শিরোনাম ছিল Nach-Expressionismus, Magischer Realismus: Probleme der neuesten Europaischen Malerei. ১৯২৭ সালে মাদ্রিদ থেকে প্রকাশিত দার্শনিক ওরতেগা ই গাসেত (Ortega Y Gasset) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রিভিসতা দে অক্সিদেন্তে (Revista de Occidente) পত্রিকায় প্রবন্ধটির স্প্যানিশ অনুবাদ প্রকাশিত হয়। স্প্যানিশ অনুবাদে প্রবন্ধটির নাম ছিল Realismo magico: Problemas de la pintura europea mas reciente. মূল প্রবন্ধটি জার্মান ভাষায় লিখিত হলেও আশ্চর্যজনকভাবে প্রবন্ধটি এই স্প্যানিশ অনুবাদেই ব্যাপকভাবে দুনিয়া জুড়ে প্রচারিত হয়। রোহ ১৯২৫ সালের পরে এ বিষয়ে আরও একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন Ruckblick auf den Magischen Realismus নামে। রোহর এই দুই প্রবন্ধের স্প্যানিশ অনুবাদ একত্র করে ১৯২৭ সালে একটি বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। বইটির নাম ছিল Franz Roh, Realismo magico, post expressionismo: Problemas de la pintura europea mas reciente. এই বই থেকে নিয়ে Realismo magico: Problemas de la pintura europea mas reciente প্রবন্ধটি Magic Realism: Post-Expressionism নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন টেক্সাস ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপিকা ও চেয়ারম্যান ওয়েন্ডি বি. ফ্যারিস (Wendy B. Faris)| ওয়েন্ডি বি. ফ্যারিসের ইংরেজি অনুবাদ থেকে ‘জাদুবাস্তবতা’ নামে ঐতিহাসিক এই প্রবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো।—অনুবাদক]

নবরূপে আবির্ভূত বস্তুনিচয়

জগতের বস্তুপ্রপঞ্চের মধ্য থেকে কোন বস্তুনিচয় শিল্পীর মনোযোগ আকর্ষণ করলো সেটি খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেই বস্তুনিচয়ের দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পধারার বিভিন্ন বিকাশস্তরকে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। শিল্পের জন্য বস্তুকে নির্বাচন করাই তো সৃষ্টির প্রথম ধাপ। তাই শিল্পের ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে চাইলে একজন গবেষক কোনো নির্দিষ্ট যুগের শিল্পের জন্য নির্বাচিত প্রিয় বস্তুগুলো কী তার একটি তালিকা প্রণয়ন করেই কাজ শুরু করতে পারেন। সাথে যে বস্তুগুলো প্রিয় নয় সেগুলোর উল্লেখও বাদ দেয়া যাবে না, কারণ প্রিয় তালিকায় সেগুলো না থাকারও অর্থ আছে। এ কাজের মধ্য দিয়ে আমরা কোনো শিল্পের যুগভিত্তিক বৈশিষ্ট্যরীতির বুনিয়াদি তথ্যগুলো পাবো। বৃহত্তর গবেষণার জন্য কার্যকর প্রাথমিক তথ্য হিসেবেই অবশ্য এর মূল ব্যবহার হবে। শিল্পের বস্তু নিয়ে গবেষণায় গবেষক আরো এক পথে আগাতে পারেন। এই পথে বস্তুর তালিকা বা পরিসংখ্যান মুখ্য নয়। শিল্পের বিষয়বস্তুই এ পথে একটু ভিন্ন ধারায় দেখা যেতে পারে, যেমন দেখা যেতে পারে বুড়ো মানুষের মাথা আঁকতে প্রসিদ্ধ কোনো এক যুগের শিল্পীরা মাথাগুলোর কোন দিকটা এঁকেছিলেন—মাথাগুলোর চামড়া ঝুলে পড়া বা কুঁকড়ে যাওয়ার অবস্থাটা, না কি মাথাগুলোর রক্তশূন্য ফ্যাকাশে ভাবটা। এই গবেষণার কোনোটিই শিল্পের আঙ্গিক (Form) সংক্রান্ত নয়। আঙ্গিকের কাজগুলো পরে আসে এবং বিষয় ধরে ধরে আঙ্গিকের পূর্ববর্তী স্তরগুলো পুনর্বিন্যাস করা যায়। আবার শিল্পের বস্তু শিল্পের পদ্ধতির ওপর এক অব্যাখ্যেয় নিয়ন্ত্রণও সংরক্ষণ করতে পারে। আঙ্গিক সংক্রান্ত এ বিষয়গুলো আমাদেরকে শিল্প ইতিহাসের এক অজ্ঞেয় জগতে নিক্ষিপ্ত করে। 

এই প্রবন্ধে আমরা খুব সংক্ষেপে দেখাতে চাই ইতিহাসের সেই সময়বিন্দু, যেখান থেকে শুরু করে চিত্রকলা তার আধেয় বস্তুর মাধ্যমে অভিব্যক্তিবাদের বলয় থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়েছে। আমরা জানি যে, ইমপ্রেশনিজমের প্রতিক্রিয়ায় অভিব্যক্তিবাদ মারাত্মকভাবে ঝুঁকে পড়েছিল অবাস্তব, অপার্থিব ও অচেনা দূরের বস্তুনিচয়ের দিকে। দৈনন্দিন সাদামাটা বস্তুগুলোকেও এমনভাবে উপস্থাপনা শুরু হয়েছিল যাতে সেগুলোতে পরিচয়ের চিহ্ন লেগে না থাকে, যাতে সেগুলোত অপরিচয়ের আজবত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। যে বস্তুগুলোর সাথে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার কোনো গন্ধ এযাবৎ ছিল না সেগুলো হঠাৎ করে ধার্মিকতার বা আধ্যাত্মিকতার সাহসী সব প্রতীক বহন করতে শুরু করলো। একটি শহরের ছবি আঁকা হলে সেখানে দেখা গেল যে, ছবিটা শহর দেখাচ্ছে না বরং আগ্নেয়গিরির লাভার এক ধ্বংসযজ্ঞ দেখাচ্ছে যেন, এবং ছবিটি আঙ্গিকের কোনো খেল কিংবা কিউবিজমের কোনো আলোড়িত প্রকাশমাত্র নয়। ছবিটি যদি যৌনাবেদনের হয় সেখানে দাপিয়ে বেড়ালো বুনো ইন্দ্রিয়কামুকতা। ছবিটি যদি কোনো শয়তান গোছের মানুষের হয় দেখা গেল তার মাথায় একখানা নরখাদকের মুখ। ছবিটি যদি প্রাণিজগতের হয়, তাহলে দেখা গেল সেখানে আছে কোনো নীল রঙের স্বর্গীয় ঘোড়া বা কোনো স্বর্গীয় কামধেনু। ছবিগুলো এভাবে তাদের আধেয় পরিচিত বস্তুর মধ্য দিয়েই আমাদের নিয়ে গেল কোনো এক অপরিচয়ের অপার্থিবতার দিকে। দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রকৃতির রঙছটার বাহার তুলে ধরতে গিয়ে দেখা গেল ছবিটি এমনভাবে আঁকা হয়েছে যে, ব্যবহৃত রঙের তীব্রতায় মানুষগুলো যেন সেখানে কাগজের শিখা হয়ে জ্বলছে। তার চেয়েও অদ্ভুতভাবে মার্ক শাগালের (Marc Chagall) ছবিতে দেখা গেল জীবজন্তুরা আসমানে হাঁটে। ছবিতে উপস্থিত দর্শকের স্বচ্ছ মস্তিষ্কের ভিতর দিয়ে ভাসতে দেখা গেল গ্রাম ও শহরের দৃশ্য। দেখা গেল সোডার বোতল উপচে ছিটকে পড়া কর্কের মতো ফেটে পড়ছে তপ্ত ও ক্রুদ্ধ মানুষের মাথা। রঙের এক ঝড়ো তাণ্ডব যেন চিত্রের সকল বস্তুকে বহ্নিশিখায় পর্যবসিত করে তুললো। ছবিগুলোতে দূরের দৃশ্যরেখা রহস্যজনকভাবে মনে হলো যেন দর্শকের সবচেয়ে কাছে রাখা হয়েছে।  

এক্সপ্রেশনিস্ট বা অভিব্যক্তিবাদী এই ধারার ছবিগুলোর নামেও সেগুলোর এরূপ পরিচয় বহন করতো। এই ধারার কয়েকটি ছবির নাম যেমন : ‘কেয়ামত’, ‘অনল’, ‘ঝড়’, ‘ঊষালোক’ ইত্যাদি। নামগুলোই বলে দেয় এ সময়ের ছবির আধেয় বস্তু কেমন ছিল।

আমরা এই বইয়ের শেষে মুদ্রিত ছবিগুলোর দিকে একবার চোখ বুলাই।[১] এগুলোর দিকে তাকালে আমাদের মনে হবে যে, অভিব্যক্তিবাদের অবাস্তব ও অলৌকিক দুনিয়া পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে এবং আমাদের সত্যিকারের চেনা দুনিয়া ছবির রাজ্যে আবার ফিরে এসেছে। একটি নতুন দিনের সূচনা হয়েছে। এ নতুন দুনিয়া আমাদের পুরনো চেনা দুনিয়া হলেও আমরা এর দিকে বিস্ময়ের চোখে তাকাচ্ছি। এ বিস্ময় এ কারণে নয় যে, আমরা একটি স্বপ্নের অলৌকিক জগৎ কেবল পার করে এসেছি। এমনকি এই নতুন জগতে অতিন্দ্রীয় ও আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়াদিও নেই যে আমরা এর দিকে বিস্ময়ের সাথে তাকাবো। বরং চিত্রশিল্পের এ নতুন জগতের সবকিছুই একেবারে দৈনন্দিন পরিচয়ের জগৎ এবং এখানে দৈনন্দিন সাদামাটারই এক জয়গান। এ জগতে Georg Schrimpf (1889–1938)-এর চিত্রে আমরা ঈশ্বরের মাতৃদেবীর (মা মেরী) পরিবর্তে বরং পবিত্রতা ঘোষিত হতে দেখি এক রাখালরানীর। এখানে চিত্রকর George Grosz (1893–1959) কিংবা চিত্রকর Otto Dix (1891–1969)-এর শিল্পকর্মে অচেনা নরক জগতের বিভীষিকার পরিবর্তে বরং দেখি আমার চেনা সময়ের ভীতির রূপ। মনে হচ্ছে অতিন্দ্রীয়তার পাগলা ঘোড়া এবং অশরীরী ভূতের রাজ্যের পরিক্রমা চিত্রশিল্প থেকে স্থায়ীভাবে বিদায় নিয়েছে। পার্থিব সাধারণ বস্তুর প্রতি এক অফুরান ভালোবাসা এবং সাধারণ বস্তুর খণ্ডিত ও সীমিত রূপের প্রতিই এক শৈল্পিক আনন্দের জাগরণ ঘটেছে। বলা যায় শিল্পরাজ্যের সব হৈচৈ ছাপিয়ে গভীর এক নীরব প্রশান্তি ও মননশীলতার জয় হয়েছে। এ নীরবতা এক নতুন যাত্রা, এক নতুন উড্ডয়নের সূচনা। শিল্পের সে উড্ডয়নে সাথে আছে পরীক্ষিত জ্ঞান ও বাস্তব ভিত্তি। মানবতা মনে হচ্ছে দুলছে। ঠিক করতে পারছে না স্বপ্নরাজ্যে থাকবে নাকি বাস্তবতার পথে চলে আসবে। এ দোদুল্যমানতা শিল্প-ইতিহাসের জীবনের ইঙ্গিতবাহী স্পন্দন, এ স্পন্দন না থাকলে আত্মা ও আধ্যাত্মিকতার অবসান বোঝায়।   

বিশেষ করে প্রতিক্রিয়াশীলরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছে সাদামাটা বাস্তবতার রাজ্যে শিল্পের এ ফিরে আসার মধ্য দিয়ে শিল্পে আত্মার মৃত্যু ঘোষিত হয়েছে। আবার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে বাস্তববাদীরা বাস্তবতার এই নতুন রূপকে এখনো বুঝতেই পারেননি। অভিব্যক্তিবাদ-বিরোধী বাস্তববাদীদেরকে বাস্তবতার এই নতুন রূপ মারাত্মকভাবে বোকা বানিয়েছে এবং তারা বাস্তবতার এ রূপকে অভিব্যক্তিবাদের মতোই অযথার্থ মনে করছেন। শিল্পে সাধারণ বাস্তবতার অভিষেক ঘটানোর এই নতুন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে পূর্বে উদ্ভাবিত শিল্পরীতি থেকে আহরিত অনেক কারিগরি, সেই সকল কারিগরি যা সাধারণ বস্তুর মাঝে সৃষ্টি করতে পারে গভীর অর্থের বাঙ্মময়তা। এই নতুন ধারায় রয়েছে এমন এক রহস্যাবৃত শক্তি যা সরল ও সাধারণ বস্তুগুলোর এতদিনের নিরাপদ ও নীরব প্রশান্তির নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে সেখানে এক রহস্যময় বাঙ্মময়তা সৃষ্টি করে। এ রীতির চিত্রগুলোর কোনোটিতে আছে বিশাল কতিপয় বপু যারা বড় বড় ব্লকের ভার নিয়ে ছোট্ট একটি লনে পড়ে আছে। বস্তুগুলোতে কোনো গতি বা নড়াচড়ার প্রকাশ নেই সত্ত্বেও তারা আশ্চর্যজনকভাবে জীবন্ত। ছবির প্রতি বিন্দুতে রয়েছে এক অদ্ভুত রহস্যময়তার পাঠযোগ্য উপস্থিতি।

এ রীতিতে ছবিগুলোর হাত, মাথা, ধড়—এমন প্রতিটি বস্তু জীবনের অন্তস্থ আলোড়ন, স্পন্দন ও স্বতস্ফূর্ত সুখদ চেতনার স্ফুলিঙ্গকে বাঙ্মময় করে তোলে। এর প্রকাশে কোনো দ্বিধাগ্রস্ততা বা স্নায়বিক আতঙ্কের স্থান নেই। দ্বিধাহীন, শঙ্কাহীন, প্রাণবন্ত জীবনই আমরা মনে করি সুশীল, সংযত ও দৃঢ়চেতা জীবন। আমরা অতীতে কী জাতীয় নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা, গাছ-পাথর, জন্তু-জানোয়ার চিত্রশিল্পে উৎপাদন করেছি তার বয়ান আশা করি এখানে দরকার নেই।

শিল্পের প্রাথমিক পর্বের যা কিছু অভিব্যক্তিবাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত তার সাথে শিল্পের এই নতুন ধারা যায় না। শিল্পের এ নতুন আন্দোলন হলো পুরনোকে অপসারণের ও শুদ্ধিকরণের। এ আন্দোলনের সৌভাগ্য ছিল যে, শুরুতেই সে পেয়েছিল শিল্প জগতের এক বিপ্লবকে (দাদাবাদ ও অভিব্যক্তিবাদ) যে বিল্পবের জন্ম হয়েছিল শিল্পের জন্য নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে। শিল্পের এই নতুন রাস্তা বা ধারা কি পারবে সাধারণ মানুষ আর শিল্পের ভেঙে যাওয়া সম্পর্ককে আবার জোড়া লাগাতে? এ প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে জমা থাকলো। ইতিহাস অবশ্য বলে যে, সমাজের নিম্নস্তরের মানুষগুলোকে সব সময় যুক্তি ও চিন্তাসম্মত ছবিগুলোই বেশি ছুঁয়ে যায়, উচ্চাভিলাষী ও আসমানি ওহির মতো নাযিল হওয়া ছবিগুলোর চেয়ে। উনবিংশ শতকের জার্মানির বিদামাইয়ার (Biedemeier)  শিল্পরীতির সনাতন জৌলুসের স্নিগ্ধতা মার খেয়েছিল রুচিহীন বুর্জোয়া রীতির কাছে। এ থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে মননশীল শিল্পরীতি সমসাময়িক রুচির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে প্রয়শই বিপন্ন হয়।   

চলবে


[১] যে স্প্যানিশ বই থেকে প্রবন্ধটি নেয়া হয়েছে সেটির শেষে ৯০ টি ছবি মুদ্রিত রয়েছে। প্রথম দিকের কয়েক পৃষ্ঠায় পাশাপাশি রয়েছে অভিব্যক্তিবাদী ও জাদুবাস্তব ছবি যাতে দুয়ের পার্থক্যটা তুলনার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ