প্রজন্মের দায়

Send
সাবাব আশফাক ফাহিম
প্রকাশিত : ১৫:৫০, এপ্রিল ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০১, এপ্রিল ২২, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য

এম্বুলেন্স হর্ন বাজাচ্ছে। দ্রুত যেতে হবে। বিদায় পর্বটা তাই সংক্ষেপ করতে হলো। সাদাফ সাহেব মায়ের পায়ের কাছে থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,

'মা, আমি আসছি।'

আজ তিনি যাচ্ছেন ঢাকা মেডিকেলে। না। রোগী হিসেবে নয়। ডাক্তার হিসেবে। দেশে ডাক্তারদের নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে জানা স্বত্বেও সিধান্ত নিলেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই করোনা ইউনিটে ডিউটি করবেন। পরিবারের কথা ভেবে দেশ করোনামুক্ত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলেই নিজের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। পরিবারের সঙ্গে হয়তো এটাই তার শেষ দেখা। কষ্ট হচ্ছে সারার জন্য। মেয়েটার এখনো বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়াটাও বাকি। তা হয়তো আর হবে না। বছর তিনেক আগে বিয়ে করা খুশিকেও হয়তো বিধবা হতে হবে।

খুশি আর পাঁচটা বাঙালি বউয়ের মতোই বললো,

‘না গেলেও তো পারতে।’

সাদাফ সাহেব বিড়বিড় করে শুধু বললেন,

'বাবার মতো ভুল যেন না করি, সেই দোয়া করো।'

খুশি অবাক হলেও কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না।

সাদাফ সাহেব মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে চুমুতে চুমুতে কপাল ভরিয়ে ফেললেন। মেয়েকে রেখে মায়ের কাছে গেলেন। মা ছেলে একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন চোখ দিয়েই সব কথা সেরে ফেলছেন। দুজনেরই চোখ ছলছল করছে। মায়ের পা ছুয়ে সালাম করতে গিয়ে কিছু সময় মায়ের পায়ের কাছে বসে থেকে চলে গেলেন। সারাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন খুশি। এই কষ্টের আঁচ মেয়ের গায়ে যেন না লাগে।

'এখন কেমন আছেন, স্যার?'

'ভালো। তবে হালকা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।'

'সেকি, স্যার? এখনই অক্সিজেনের ব্যবস্থা করি?'

'না। যাদের ইমার্জেন্সি তাদের দাও এখন। আমার প্রয়োজন হলে জানাবো।'

'তবে...'

'তবে কিছুই না। যেটা বলি, করো। ভুলে যেও না, আমি তোমার সিনিয়র।'

'জ্বী, স্যার।'

'দেশের কী অবস্থা?'

'এখনো দিনে হাজারের উপরে পেসেন্ট, স্যার। তবে কিছু কমতে শুরু করেছে।'

সাদাফ সাহেব একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, 'ঠিক আছে। তুমি আসতে পারো।'

বাসার কেউ এখনো জানে না যে, ডাক্তার সাদাফ খান আজ করোনা পেসেন্ট সাদাফ। বারবার মনে হচ্ছে বাড়ি ফেরা আর হবে না। চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে এসেছিল। দূরে বাবার মতো কেউ। তিনি ডাকতে চাইলেন। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। লোকটা তার কাছেই এসে বলল, ‘বেশি কষ্ট হচ্ছে, বাবা?’

‘বাবা, তুমি? তুমি না...?’

‘হ্যাঁ, বাবা। তোকে নিতে এসেছি আমি।’

‘তার মানে আমি কি মরে যাচ্ছি, বাবা?’

‘এটা মৃত্যু নয়, বাবা। তোর আত্মত্যাগে যে আমার দায় মুক্তি।’

‘তোমার সেইদিনের একটি ভুলের দায় নিতে গিয়ে সারাকে হতে হবে অনাথ, খুশিকে বিধবা।’

‘বাবারে। আমি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যে অপরাধ করেছিলাম, তা ক্ষমার অযোগ্য। সেই অপরাধবোধ থেকেই তোকে দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগের কথা বলেছিলাম। আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। আমি ধরা পড়েছিলাম পাক বাহিনীর হাতে। খুব মার খেয়েও আমি মুখ খুলিনি। তবে যখন আমার নখ তুলে সুচ দিয়ে আঙুলের ডগায় খোঁচাতে শুরু করলো আর সহ্য করতে পারলাম না। বলে দিলাম সহযোদ্ধাদের কথা। কিছুদিনের মধ্যে আমি মুক্তি পেলাম। কিন্তু সহযোদ্ধা ভাইদের আর খোঁজ পেলাম না। দেশের সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণে আমি মরেও শান্তি পাইনি। তোর বাবাকে বিশ্বাসঘাতকার দায় থেকে মুক্ত কর, বাবা। দেশের জন্য আমি যেই আত্মত্যাগ করতে পারিনি সেই দায় তোকে মেটাতেই হবে।’

হটাৎ সাদাফ সাহেবের ভীষণ যন্ত্রণা শুরু হলো। পায়ের আঙুলের ডগা থেকে কেউ যেন সুচ ফুঁটাতে ফুঁটাতে শরীরের উপরের দিকে উঠছে। সাদাফ সাহেবের চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। প্রজন্মের দায় মনে হয় এবার ঘুচল।

//জেড এস//

লাইভ

টপ