দণ্ডকারণ্য

Send
মিলু শামস
প্রকাশিত : ২০:০০, এপ্রিল ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৬, এপ্রিল ২২, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য

ভোর রাতের দিকে আচমকা ঘটনা টের পায় মৃদুলা। বাড়ির সামনে বড় রাস্তায় ওঠার আগে যে মোড়, ঘটনাস্থল সেটাই। অদ্ভুত এক মোড়। চার দিকে চার রাস্তা তো গেছেই, মৃদুলার মনে হয় ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈঋত, ঊর্ধ্ব, অধঃ সবদিকে যাওয়ার আশ্চর্য এক জংশন যেন এই মোড়। এখানে দাঁড়িয়ে কেউ ঢ্যাঁরা পেটালে, এমনকি চিৎকার করলেও গোটা শহরেই যেন তা পৌঁছে যায়।

প্রতিদিনের অভ্যেসমত সেদিনও রাত জেগে বই পড়ছিলো মৃদুলা। গুন্টার গ্রাসের 'টিনড্রাম'-এর শেষ অধ্যায়ের শেষ লাইন কটাতে চোখ বুলিয়ে দ্রুত উঠতে গিয়ে চোখ আটকে যায় মোড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছে। ল্যাম্পপোস্টের পাশেই গাছ, বারো তলার জানালা দিয়ে তাই পরিষ্কার দেখতে পায় দৃশ্যটা। ফুলে ভরা একটি ডাল হঠাৎ কুচকুচে কালো সাপ হয়ে ঝুলে পড়ছে। চারদিক সুনসান। শান্ত ধ্যানমগ্ন রাতের পৃথিবীতে এটা কী ঘটল মৃদুলা বুঝতে পারে না। চোখ কচলে আবার দেখে। হ্যাঁ একটা কালো সাপই। ক’দিন আগে রামায়নটা আবার পড়ছিল। মাথার মধ্যে অরণ্য কাণ্ডের ক্যামিক্যাল রিয়্যাকশন? আপন মনে হেসে ফেলে মৃদুলা। কী জানি, হবে কিছু একটা। হাই তুলতে তুলতে বেডরুমের দিকে পা বাড়ায়।

সকালে ঘুম ভাঙে গৃহ সহকারী দীপার ডোর বেল বাজানোর শব্দে। রোজ ঠিক এ সময়ই বেল বাজায় সে। তাই পিপ-হোলে চোখ না লাগিয়েই দরজা খুলে পেছন ফেরে। দীপার চোখমুখে ছড়ানো উত্তেজনা টের পায় ও কথা বলতে শুরু করলে—

—ম্যাডাম খবর শুনছেন?

মৃদুলা থমকে দাঁড়ায়।

—কী?

—একটা নাহি আচানক জন্তু আইছে দ্যাশে। জন্তু কী ম্যাডাম?

—প্রাণী। মানে পশু।

মৃদুলা বিরক্তি নিয়ে বলে। সাত সকালে আলাপের আর বিষয় পাচ্ছে না। একটা জন্তু আইছে....। তো কী! মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? জন্তু তো আসতেই পারে। মনে মনে গজগজ করে মৃদুলা।

দীপা আবার হন্তদন্ত হয়ে বলে

—না ম্যাডাম, মোড়ে সবাই কওয়া-কওয়ি করতাছে। এইডা নাহি এক জাতের মানুষখাকী জন্তু। দূর থিকা মাইনষের গন্ধ পাইলেই খাইয়ালায়। ফেসবুকেও ছবি আইতাছে।

এবার বিরক্তি বাড়ে মৃদুলার। দীপাকে কিচেনে যেতে বলে নিজের ঘরে যায়।

ঘণ্টা দুই পর কাজ সেরে দীপা চলে যাওয়ার পর সেও বেরিয়ে পড়ে। অফিসে জরুরি মিটিং আছে আজ। বেরোনোর সময় চোখে পড়ে মোড়ের জটলা। দীপার ওই জন্তু নিয়েই কথা হচ্ছে, বুঝতে পারে। গা করে না মৃদুলা। কিন্তু কী আশ্চর্য, অফিসেও সবাই একই আলাপ করছে! এমনকি মিটিংয়েও এ প্রসঙ্গ উঠেছে। মেসেঞ্জারে নাকি এ বিষয়ে নানা ধরনের ভীতিকর তথ্য আসছে।

আজকাল অযাচিতভাবে অনেকে নানা ধরনের গ্রুপে অ্যাড করে নেয় আর অপ্রয়োজনীয় সব মেসেজ পাঠায় বলে মৃদুলা সবসময় মেসেজ চেক করে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে মেসেঞ্জারে সব মেসেজে চোখ বুলিয়ে নেয়। সবাই বলায় আজ অসময়ে নিজের মেসেঞ্জারে ঢুকে সে থ। সত্যিই তো অদ্ভুত জন্তু বিষয়ে নানা ধরনের তথ্য, সতর্কতা, করণীয় ইত্যাদি উপদেশে মেসেঞ্জার ভরা। তাজ্জব ব্যাপার! দীপার শুনে আসা কথাই সবাই বলছে!

বাসায় এসে একে ওকে ফোন করে। সবার মুখে এক কথা। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে অন্য দিনের মত বই নিয়ে বসতেই গতরাতের কৃষ্ণচূড়া গাছের ঘটনা মনে পড়ে। দ্রুত জানালার কাছে যায় মৃদুলা। আরে, টকটকে লাল ফুলে ভরা গাছটার অর্ধেকের বেশি ডাল কালো কুচকুচে সাপ হয়ে কিলবিল করছে! পরের রাতে একই দৃশ্য। আরও ডাল...! তার পরের রাতেও...।

এভাবে এক সপ্তার মধ্যে পুরো গাছ নিকষ কালো গুচ্ছ গুচ্ছ সাপের লিকলিকে জিভে ভরে যায়। আর মোড়ের গুজব দাউ দাউ আগুনের মতো ছড়িয়ে গেল দশ দিকে। অদ্ভুত জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই বিভিন্ন ধরণের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চলাফেরায় অভ্যস্ত হলো।

মৃদুলা প্রতি রাতে জানালা দিয়ে গাছের দিকে তাকায় আর বিস্মিত হয়ে ভাবে, একটি  শহরকে কত সহজে দণ্ডকারণ্যে পরিণত করা যায়!

//জেড এস//

লাইভ

টপ