মৃত্যুভয়

Send
আহমেদ আববাস
প্রকাশিত : ১৩:৫৩, এপ্রিল ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৬, এপ্রিল ৩০, ২০২০

কদিন ধরেই মা’র প্রেশারটা বেড়ে গেছে। বিছানা আঁকড়ে পড়ে আছে। ওষুধেও ঠিকমতো কাজ করছে না। ‘যাবো যাবো’ করে যাওয়াই হচ্ছে না। কখন কী হয়, এখন দেশের যে অবস্থা। কিছু হলে তো ডাক্তারও পাওয়া যাবে না। মরণ ছাড়া গতি নেই। একটু দাঁড়াতে পারলেই যে মা একাজ-ওকাজ ঘরের সবকাজ একহাতেই করে। বাড়তি কোনো কাজের মানুষ নেই। মা থাকে ফার্মগেট এলাকায়, ইন্দিরা রোডে।

কিন্তু এই শেওড়াপাড়া থেকে কীভাবে সেখানে যাওয়া যায়। মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ। তবু ভেবে কূল পায় না কোহিনুর। সারা ঢাকা শহরেই তো এখন অঘোষিত লকডাউন। কোনো গাড়ি-ঘোড়া চলে না। ভেতরে ভেতরে রিকশা চললেও রোডে উঠলে নানা কৈফিয়ত। কোথায় যাবে, কেন যাবে, কার কাছে যাবে—কতরকম প্রশ্নোত্তর।

তবু মা’কে দেখতে যেতে হবে। মুদি দোকানি স্বামী সোহেলের কাছে সাত বছরের জুয়েলকে রেখে কোহিনুর সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে। পাঁচ কিলোমিটার পথই তো, প্রয়োজন হলে সে হেঁটেই যাবে। ভেতর দিয়ে কিছুপথ রিকশা, কিছুপথ পায়ে হেঁটে এভাবে দুপুর বারোটার ভেতরেই সে ইন্দিরা রোডে পৌঁছে যায়।

আজ সকাল থেকেই নাকি মা’র শরীরটা একটু ভালো। তাই বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের কাজে হাত দেয়ার জন্যে তৎপর। কোহিনুর মা’র কর্মোদ্যোগ দেখে বলে, ‘তোমার শইল অহনতুরি বালা অয় নাই। আর তুমি কামে লাইগ্যা গ্যাছো।’

‘কী করুম, গরের অনেক কাম জমা অইয়া গ্যাছে। করতে তো অইব।’

কোহিনুর তার মা’কে বিশ্রামে রেখে সে-ই ঘরের জমিয়ে থাকা কাজে হাত দেয়। দুপুরের রান্না-বান্না করে বাবা-মাসহ সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করে। মধ্যাহ্ন ভোজের পর বাবা-মা’র সঙ্গে গল্প করতে করতে টিভি দেখতে থাকে। বিভিন্ন চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে নিচের স্ক্রলে লক্ষ করে—এই করোনাকালেও দেশের বিভিন্ন স্থানে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের লক্ষণ, উপসর্গ এবং ভয়াবহতার বিষয় বারবার টিভিতে প্রচারিত হলেও বিপথগামী মানুষের বিকার নেই।

গল্প-গুজবে সময় পার হয়ে বিকেল গড়িয়ে যায়। কোহিনুর ঘরে ফেরার জন্যে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। একাকি হেঁটে হেঁটে পথ চলতে হবে—সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ঝটপট ইন্দিরা রোড থেকে বেরিয়ে পড়ে।

সন্ধ্যালোক।

খামারবাড়ি এবং সংসদ ভবনের চওড়া হাইওয়ের ডানপাশ দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে কোহিনুর। পথে-ঘাটে জনমানব নেই বললেই চলে। তবে পথের দু’পাশের গাছপালা সতেজ সবুজে ভরে গেছে। রাস্তার পাশের সামান্য শূন্যস্থানও এখন সবুজে তৃণাবৃত।

মেয়েমানুষ। একাকি পথ চলতে একটু ভয় করলেও প্রকৃতির এমন অবারিত রূপ দেখে ভালো লাগে তার। ভাবতে থাকে, আগারগাঁও গেলেই রিকশা পাবে। ভেতরের রাস্তা দিয়ে সহজেই শেওড়াপাড়ার পথ ধরবে। কিন্তু আগারগাঁও ভেতরের রাস্তায় এসেও কোনো রিকশা পায় না কেহিনুর। নিরুপায় ও নিরালম্ব হয়ে আবার হাঁটতে থাকে।

সারাজীবন মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে সুমন। এমনকি এই ছোটো খুপরিমতো হোটেল করার পরও তার মা ভিক্ষে করে বেড়িয়েছে। তাই মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থেই হোটেলের নাম ‘মায়ের দোয়া হোটেল।’ দিনভর খোলা-বন্ধ চোর-পুলিশ খেলে খেলে সুমন তার ছোটো খুপড়িমতো ‘মায়ের দোয়া হোটেল’ বন্ধ করতে যাচ্ছিল। পথে একটি নিঃসঙ্গ মেয়েকে হাঁটতে দেখে সহযোগিতায় এগিয়ে যায়। সহানুভূতির সঙ্গে অভয় দিয়ে বলে, ‘আইয়েন, বয়েন, চা খান। যাওনের ব্যবস্থা একটা করন যাইব।’ বলে হোটেলের ঝাঁপ খুলে চা তৈরি করে দেয়।

চা পরিবেশনের পর কথা বলার ফাঁকে ঠাস করে হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ করে দেয় সুমন। মেয়েটি তখন খুকখুক করে কাশি দিয়ে বলে, ‘আটকাইলেন ক্যারে, আমার তো খুউব গলাব্যথা করতাছে। একটু গরম পানি অইব। শইলে একটু আত দিয়া দেহেনচে জ্বর আছেনি।’

মেয়েটির গায়ে হাত পড়তেই ছ্যাঁৎ করে ওঠে সুমন। ‘ওরে বাবা কী জ্বর!’

অস্ফুটে বেরিয়ে যায় তার মুখ থেকে বাক্যটি। মনে পড়ে টিভিতে প্রচারিত সংক্রমণের কথা। ঝাঁপ খুলে তাড়াতাড়ি কোহিনুরকে বের করে দিয়ে শুয়োরের মতন হাঁফাতে থাকে সুমন।

//জেডএস//

লাইভ

টপ