মড়ক-মহামারিইতিহাস, সাহিত্য ও জীবনধারা

Send
মোস্তফা তারিকুল আহসান
প্রকাশিত : ১৩:২৭, মে ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৯, মে ১৪, ২০২০

মহামারি শব্দটির মধ্যে এর ব্যাপকতা লুকিয়ে আছে। মারির সঙ্গে নানা অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে মানুষের জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে বলেই একে মহামারি বলা হয়। তবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটা খুব পরিচিত ও নিয়মিত ঘটনা; ইতিহাস, সাহিত্য ও জনজীবন বা জনস্বাস্থ্য নিয়ে যাদের আগ্রহ তারা জানেন যে পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে মানব জীবনের সঙ্গে মহামারির যোগ। আর আশ্চর্যজনকভাবে এটা শুরু হয়েছিল চীনে। সব ইতিহাস স্পষ্ট না হলেও এটা ঠিক যে, কিছু সময় পর পর মানুষের ওপর এই অমানবিক দুর্যোগ নেমে এসেছে। প্রথমত মানুষের এই সংক্রমণ  সর্ম্পকে কিছু জানার মতো জ্ঞান না থাকার কারণে আর চিকিৎসা-ব্যবস্থার কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার না হওয়ার কারণে অজস্র মানুষ মারা গেছে। তখন এসবকে ঈশ্বরের অভিশাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ওল্ড টেস্টামেন্টেও এভাবে উল্লেখ রয়েছে। 

এখনকার মতো একটি মহামারি সামান্য সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লেও তখনকার দিনে ধীরে ধীরে এটা ছড়িয়েছে। বিশেষত ঔপনিবেশিকতার যুগে ইউরোপীয় উপনিবেশের বিস্তারে এক মহাদেশের মহামারি অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন পৃথিবীতে এ সম্পর্কে কথা বলার কেউ ছিলো না, কীভাবে এটা ছড়ায় তাও কেউ জানতো না, শুধু মানুষ মারা যেত অঘোরে। আর মহামারির পরে মন্দা, মন্দার পরে দুর্ভিক্ষ ছিলো স্বাভাবিক ঘটনা আর এর ফলাফল হলো অগনিত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু। বস্তুত, মানুষ অসহায় ছিল প্রকৃতির কাছে, এই মহামারির কাছে। এখন বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির দাবি করলেও মানুষ করোনা ভাইরাসের কাছে কতটা অসহায় তা বোঝা যায়। লক্ষ করা গেল যে সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকায় মৃত্যু-সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

পৃথিবীতে মহামারি এসেছে ধারাবাহিকভাবে। সব ইতিহাস আমাদের অভিজ্ঞানে নেই; নেই এর বিস্তারের ইতিহাসও। এ নিয়ে নানা গুজব ও ক্যারিকেচার তৈরি হয়েছে। আগে সাধারণ মানুষ নিজেদের জ্ঞানের বা বিদ্যার কারণে এর সঙ্গে দেব-দেবী ও ডাইনির সম্পৃক্ততা খুঁজেছেন; প্রাকৃতিক নানা জিনিসপত্র খেয়েছেন এর থেকে বাঁচার জন্য। এখন ক্যারিকেচার অন্য ধরনের। এখন যেমন বলা হচ্ছে চীনের উহান প্রদেশে বাদুড়ের মাধ্যমে মানব দেহে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রথমে উহানে এবং সেখান থেকে গ্লোবালাইজেশনের কারণে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে করোনা নিয়ে। এর লক্ষণ নিয়ে নানা রকম তথ্য দিচ্ছে এর প্রতিকার নিয়ে নানা গল্প-গুজব ছড়িয়ে পড়ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে নানা খবর যার অনেকটার কোনো ভিত্তি নেই। গুজব ছড়িয়ে পড়ছে, প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়ে পড়ছে মুখে মুখে ও ইন্টারনেটে। উহান থেকে ছড়ানো কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে মার্কিন মুলুকে বা অন্য প্রান্তে যা বলা হয়েছে তা বিস্ময়কর। বিস্ময়কর সব তথ্য ছড়াচ্ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প প্রথমে একে চীনা ভাইরাস নাম দিয়েছিলেন এবং তার দাবি এটা তারা গবেষণাগারে তৈরি করে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। চীনও পাল্টা অনেক কথা বলেছে। যেমন চীনে থাকা আমেরিকান সেনাদের দ্বারা এটা ছড়িয়েছে। তবে আমেরিকার সাথে অন্য দেশও চীনাদের ওপর নানা অভিযোগ করেছে। তারা চীনকে এটা ছড়ানোর অভিযোগ তদন্ত করতে বলেছে। বোঝা যায় উন্নত বিশ্বের গুজব বা প্রপাগান্ডার ধরন আলাদা তবে তা প্রাচীন বা মধ্যযুগের মতোই। তখন মহামারিকে মড়ক বলা হত। মড়ক মানে বেঘোরে প্রাণ যাওয়া। এক শ্রেণির প্রাণি যেমন হঠাৎ করে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে মরতে থাকে। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র আবিষ্কারের আগে বা সরকারি উদ্যোগ গৃহিত হবার আগে একে মড়ক বলা হত। বিশেষ করে বাংলা অঞ্চলে। এর কারণ তখন মানুষ মারা যেত এবং সরকারিভাবে বা অন্য কোনোভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিলো না। জনসচেতনতা বা জনকল্যাণকামিতাও লক্ষ করা যায়নি। তবে মানুষের মধ্যে ভীতি, গুজব, বিশ্বাস, প্রচার-প্রচারণা ছিল; যার মূল ভিত্তি ছিল অজ্ঞানতা।

প্রাচীনকালের মহামারিতে রোগ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টা এত ব্যাপক ছিল না। মূলত ১২০০০ বছর আগে মানুষ তাদের বন্যজীবন থেকে কৃষিসভ্যতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তখন থেকে তারা নানারকম প্রাণি পুষতে শুরু করে গৃহপালিত হিসেবে। গরু ছাগলের পাশাপাশি পশু পাখি বাড়িতে রাখার সংস্কৃতি চালু হয়। ধারণা করা হয় যে রোগ-জীবাণু সেসময় থেকে ব্যাপকহারে বাড়তে শুরু করে। পশু বা প্রাণির জীবাণু তাদের নিজেদের জন্য সাধারণত ক্ষতিকর হয় না। যাহোক, আমরা দেখি যে সারা পৃথিবীতে ধারাবাহিকভাবে মহামারি বা মড়ক ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারির সব ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে যা পাওয়া যায় সেটাও বেশ বিস্তৃত বলে মনে হয়। মোটামুটি বিশটি মহামারির ইতিহাস জানা যায়। এক হিসেবে বরফসমৃদ্ধ অঞ্চল বাদে প্রায় সব জায়গাতে মহামারি হয়েছে। আগেই বলেছি ৫০০০ বছর আগে চীনে প্রথম মহামারি হয়। চীনের হামিন মানঘা সাইটে বিভিন্ন বয়সের মৃত মানুষের হাড়গোড় পাওয়া গেছে। ১৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০ খ্রিস্টাব্দে রোমে স্মল পক্স মহামারিতে বহু মানুষ মারা যায়। ২৫০ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রিয়ানের মহামারী রোমান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়। পঞ্চম শতাব্দীতে যুদ্ধ ও মহামারি পরাক্রমশালী পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যকেই শেষ করে দেয়। পরে ষষ্ঠ শতাব্দির প্রথমে রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশের সম্রাট জাস্টিনিয়ান ওয়ান রোমান সাম্রাজ্যকে আবার প্রতাপশালী অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন, বিউবনিক প্লেগে তাঁর মৃত্যু সেই সম্ভাবনাকেও নষ্ট করে দেয়। পরবর্তী দুই শতাব্দিতে বিউবনিক প্লেগে মারা যায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। এটা সে সময়ের জনসংখ্যার ২৬ শতাংশের মতো। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ‘দি ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত মহামারিতে পৃথিবীর জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয় এই রোগের উৎপত্তি এশিয়ায় এবং পরবর্তীকালে তা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়া থেকে সিল্ক রুট হয়ে এই রোগ ক্রিমিয়া পর্যন্ত পৌছায়। বণিকদের জাহাজে কালো ইঁদুর বা মাছির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় বলে ধারণা করা হয়। এর জীবাণুর নামকরণ করা হয় ইরসিনিয়া পেস্টিস। ১৭ শতক পর্যন্ত পৃথিবীর জনসংখ্যা আর আগের মতো বেড়ে উঠতে পারেনি এই মহামারির কারণে। এই প্লেগের কথা ইউরোপীয় কথাসাহিত্যে  উল্লেখ আছে। গোটা ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এটা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ব্রিটেনের সামন্ত ব্যবস্থা-এর কারণে বিপর্যস্ত হয়। গ্রীনল্যান্ডের প্রতাপশালী ভাইকিং জলদস্যুরা এই মহামারির ফলে সমুদ্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। পঞ্চদশ শতাব্দির শেষভাগে, ক্যারিবিয়ান দীপপুঞ্জে স্প্যানিশ বণিকেরা নিয়ে আসে ভয়ংকর স্মলপক্স, বিউবনিক প্লেগ ও হামের মতো জীবাণু। ইউরোপিয়ানরা এইসব রোগ প্রতিরোধ করতে সমর্থ হলেও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মানুষের এই রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিলো না। এর ফলে প্রায় ৯০ ভাগ আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই রোগে মৃত্যুবরণ করে। ঔপনিবেশিক শক্তি গোটা আমেরিকা মহাদেশে শুধু যুদ্ধাস্ত্র দিয়েই হত্যাযজ্ঞ করেনি, রোগ বালাই দিয়েও তাদের ওপর প্রভুত্ব করেছে। ১৫২০ সালে ইউরোপিয়ানদের সাথে আসা একজন আফ্রিকান দাস স্মলপক্স নিয়ে এলে গোটা এজটেক সাম্রাজ্যে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দিতে ইউরোপিয়ানদের বয়ে আনা জীবাণুর কারণে আমেরিকা মহাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। আদিবাসীদের এই গণহারে মৃত্যু গোটা আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপিয়ানদের আধিপত্যকে শক্ত ভীতের ওপর দাঁড় করায়। এরপর ১৬৬৫ সালের দিকে ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন’-এ এই শহরের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মানুষ মারা যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক থাবা বিস্তারের ফলে গোরা সৈনিকদের মাধ্যমে ভারতবর্ষে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। ভারত ছাড়াও স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায় অর্থাৎ ব্রিটিশ কলোনিতে দেড়শ বছরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ কলেরায় মারা যায়। ১৮৫৫ সালের দিকে চীন, হংকং ও ভারতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্লেগে মারা যায়। ১৯১৮ সালে শুরু হয় স্প্যানিশ ফ্লু। এই মহামারিতে পৃথিবীতে মারা যায় ৫ কোটি মানুষ। এছাড়া রাশিয়া মহামারি, এশিয়ান ফ্লু, পরবর্তীকালে এইডস, সোয়াইন ফ্লু, সার্স, মার্স, ইবোলা আমাদের সামনে মহামারির উদাহরণ। এভাবে সারা পৃথিবীতে ধারাবাহিকভাবে মানুষ মারা গেছে, যার বড় একটা কারণ ছিলো রাজনৈতিক।

বিজ্ঞানীরা এখন বলেন যে ক্ষুদ্র অনুজীবের মাধ্যমে এই এপিডেমিক তৈরি হয় এবং এর বিস্তৃতি হয় হু হু করে। আজ থেকে সাড়ে তিনশ বছর আগে এন্থনি ফন লিউয়েনহুক প্রথম অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে কাচের পাত্রে কিলবিল করা এই অণুজীব আবিষ্কার করেন। প্রথমে ব্যাকটেরিয়া পরে আবিষ্কৃত হয় ভাইরাস। মানব দেহের ফসিল গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা অনেক রোগের কারণ খুঁজে পেয়েছেন। যক্ষ্মা বা টিউবারকুলোসিস রোগের জীবাণু খুঁজে পাওয়া গেছে মানব ফসিল থেকে। এটা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, মহামারি এখন যেভাবে হয় তা আগেও সেভাবে হয়েছে নিয়মিতভাবে। এবং মানুষ এর কারণ ও প্রকৃতি বা এর নিরাময় বিষয়ে কিছুই জানতো না। সাধারণ মানুষ তখন তার বিশ্বাসের ওপর ভর করে একে দেব-দেবীর অভিশাপ বলেছেন; এভাবে আমাদের বাংলায় এসেছেন ওলা দেবী, শীতলা বা অন্য নামে। এই রোগের প্রার্দুভাবে বা এর প্রভাবে জনজীবনে নানা রকমের গল্প প্রচলিত ছিল যার বেশিরভাগ ছিল নানা বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সমাহার। সেটাকে ওরাল লোর বা মৌখিক সাহিত্য বলা হয়। যেমন মৃত পুরীতে একজন বেড়াতে গেল। তাকে লেবুর শরবত পান করানোর জন্য মহিলা বাড়িতে বসে হাত দিয়ে বহুদূরের লেবু গাছ থেকে লেবু পেড়ে তাকে শরবত খেতে দিচ্ছেন। অর্থাৎ মড়কের পর এরা সব ভূত বা ডাইনি হয়ে গেছে। বাংলায় মারি মন্বন্তর যেমন অধিক হয়েছে এই ওরাল লোরেরও তত বিস্তৃতি হয়েছে। পরে আমরা সাহিত্যে বিশেষ করে কথাখ্যানে এটা বেশি করে পাই। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে কলেরা, যক্ষ্মা, গুটি বসন্ত, হামে; যারা বেঁচে থাকছে তারা এ নিয়ে নানা কথা বলছেন, এই সব কথা ছড়িয়ে পড়েছে নানা জনপদে। সেই সব গাথা হিসেবে পরে সংগ্রহ করেছেন অনেকে। প্রাকৃতিকভাবে বা তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে এর থেকে রক্ষা পাবার যে নানাবিধ তরিকা আবিষ্কার করেছিল সাধারণ মানুষ তারও ইতিহাস পাওয়া যায়।

আমরা ছোটবেলায় ১৯৭৫ বা ১৯৭৬-এর দিকে হবে, তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, প্রথম টিকা দেবার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। স্কুলে গিয়েই জানা যায় যে টিকা দিতে আসছে একদল লোক। সঙ্গে সঙ্গে সুযোগমতো বুদ্ধিমানেরা স্কুল পালাতে শুরু করে। তবে একসময় সবাইকে টিকা দিতে হয়েছে। আমরা দুবার দিতে বাধ্য হয়েছি। সম্ভবত গুটিবসন্ত ও হামের টিকা। অবিভক্ত বাংলায় মহামারির চেয়ে মন্বন্তর নিয়ে সাহিত্যে বেশি প্রসঙ্গ দেখা যায়। ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে যত গভীরভাবে আমরা মহামারির ছবি দেখি বাংলা সাহিত্যে তেমন নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী এদের লেখায় মহামারির প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। আমাদের মহৎ কোনো উপন্যাস এ বিষয়ে চোখে পড়ে না। তবে সুযোগ ছিল। মার্কেসের ‘লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা’ এ বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এটা মূলত ফ্লোরন্টিনো ও ফারমিনা দাসার প্রেমের গল্প হলেও কলেরা মহামারিকে মার্কেস গভীরভাবে বর্ণনা করেছেন। ফিওদোর দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসেও মহামারির উল্লেখ পাওয়া যায়।

গত দু’মাস ধরে আমরা পৃথিবীর অন্য দেশের মতো মহামারির কবলে আছি। করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশে বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনে যে অবর্ণনীয় কষ্ট নেমে এসেছে তার খবর সবাই জানেন। অভাব, মৃত্যু, ত্রাণের মালামাল চুরি, গার্মেন্টস কর্মীদের জীবন নিয়ে টানাহেচড়া, লকডাউন মানা না-মানা, করোনা রোগি নিয়ে নানা গল্প, করোনায় মৃত মানুষের লাশ দাফন নিয়ে নানা কাহিনি, রাজনৈতিক নেতা ও আমলাদের মুখোমুখি অবস্থান, লেখকদের অলস সময়ে ফেসবুক লাইফ; সব মিলিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার কোনো তুলনা হয় না। এরকম অব্যবস্থাপনা পৃথিবীর কেউ দেখাতে পেরেছে কিনা আমাদের জানা নেই। সাধারণ কর্মহীন নিরাপত্তাহীন, চিকিৎসাহীন মানুষের জীবনে যা ঘটে চলেছে তা আমাদের সার্বিক দেউলিয়াপনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এর মধ্যে জনসংস্কৃতির যাবতীয় বৈশিষ্ট্যও অক্ষুণ্ন আছে। সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সব বাঁধা অতিক্রম করে কাজ করার চেষ্টা করছে। লকডাউন তারা মানতে পারছে না পেটের জন্য। তাদের নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ লুট হয়ে যাচ্ছে। এই মহামারির সময়ে নেতারা নিজেদেও আখের গোছানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এই সব নিয়ে হয়তো ক্লাসিক সাহিত্য লিখিত হবে, আমরা তার অপেক্ষায় আছি।

//জেডএস//

লাইভ

টপ