রোগের পাপতত্ত্ব, ঐশ্বরিক মেডিসিন এবং রোগীর অপরাধ

Send
শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ১২:০৫, মে ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৬, মে ২১, ২০২০

পাপ এবং অপরাধের মধ্যে পার্থক্য কী? ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়া পাপ আর রাষ্ট্র অথবা সমাজের অবাধ্য হওয়া অপরাধ। মানুষের পাপের শাস্তি ঈশ্বর ইহকাল এবং পরকাল দুই জায়গাতেই দিয়ে থাকেন, কিন্তু অপরাধের শাস্তি শুধুমাত্র ইহকালীন। অপরাধের শাস্তি মানুষ মানুষকে দিয়ে থাকে। যদিও শাস্তি বিধানের বিভিন্ন রকম সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আছে। যেমন—বিচার বিভাগ, সালিশ ইত্যাদি। তবে রাষ্ট্র ও সমাজভেদে অপরাধের সংজ্ঞা এবং শাস্তি ভিন্ন হয়। একই রকম অপরাধের জন্য আদিম সমাজের শাস্তি এবং আধুনিক সমাজের শাস্তি এক রকম নয়। আবার একই কাজ এক দেশে অপরাধ বলে বিবেচিত হলেও আরেক দেশে তা অপরাধ নয়। আমরা এখানে শুধু রোগের পাপ অথবা পাপের রোগ, রোগীর অপরাধ এবং ঐশ্বরিক মেডিসিন নিয়ে আলোচনা করবো। 

রোগের পাপতত্ত্ব

আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে রোগের পাপতত্ত্বে প্রধানত তিনটি ধারা আছে (১) সব ধরনের রোগ-ব্যধিই আসলে পাপের কুফল অথবা শাস্তি (২) রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর প্রতি মানুষের বিশ্বাসের পরীক্ষা নেন (৩) বালা-মছিবত কিংবা রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে ঈশ্বর পৃথিবীতে ডিসিপ্লিন রক্ষা করেন। 

উপরোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি জানি। কারণ এখনো বিভিন্ন দেশের, সমাজের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ বিশ্বাস করে যে, সব ধরনের রোগ-ব্যধিই আসলে পাপের ফল। ছোট অসুখ ছোট পাপের, বড় অসুখ বড় পাপের ফল। পাপ করলে মৃত্যুর পরে তো শাস্তি হবেই, তবে পৃথিবীতে জীবিত অবস্থায়ও ঈশ্বর সরাসরি শাস্তির বিধান করেন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে স্পষ্টতই বলা আছে, কোনো সমাজে যদি অল্প কিছু মানুষ পাপাচারে লিপ্ত হয়, তাহলে শুধুমাত্র ঐ অল্প কিছু মানুষকেই কোনো না কোনো রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে শায়েস্তা করা হয়। আর যদি কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ ভীষণ কোনো পাপাচারে-ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়, তখন ঈশ্বর সরাসরি কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেন, ভয়ংকর কোনো মহামারি, মহাপ্লাবন, ভুমিকম্প এমনকি আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে পুরো জনগোষ্ঠীকেই শাস্তি দেন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে এ ব্যাপারে পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। আদিম সমাজের প্যাগান ধর্মগুলো থেকে শুরু করে সেমেটিক কিংবা আব্রাহামিক ধর্মগুলোতেও বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে এসব বলা হয়েছে। লুৎ সম্প্রদায়ের ব্যাভিচার এবং শাস্তি, বনী ইসরাইলদের অবাধ্য হবার ঘটনা এবং তাঁর শাস্তি, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধার্মিকেরও রোগ-ব্যাধি হতে পারে, কারণ রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে ঈশ্বর তাঁর প্রতি বিশ্বাসের পরীক্ষা নেন। এমনকি এই পরীক্ষায় কারো মৃত্যুও হতে পারে।

তত্ত্ব তো আছেই, তবে তা শুধু কিতাবে থাকলে হবে? প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে না? তাই আমাদের দেশে উইন্টার এবং স্প্রিং সেমিস্টারে (শীত-বসন্ত মৌসুম) ইভিনিং ক্লাসে (ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে) মাওলানারা পাপের ইহকাল এবং পরকালের শাস্তি সম্পর্কে বেশ জোরালোভাবে বয়ান করেন। আজকাল অনলাইনেও এসব বিষয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। গুগল, ফেইসবুক, ইমেইল, ইউটিউবে এ বিষয়ক অজস্র ডিজিটাল কন্টেন্ট (ভিডিও) পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক-কালে, এসব বিষয়ের বহুল প্রচারিত বয়ান হচ্ছে ‘চীনের বিরুদ্ধে আল্লাহ নারাজি হয়েছেন, তাই নাকি তিনি চীনাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য এই ভাইরাস পাঠিয়েছেন। একই কারণে ইতালি, স্পেন, বৃটেন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি, নাসারা, খ্রিস্টানদের সাইজ করা হচ্ছে।’  

বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে, এই ভাইরাস ঈমানদার মুসলিমদের কোনো ক্ষতি করবে না। এই ভাইরাস আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে অমুসলিম, ইহুদি, নাসারা, খ্রিস্টান এবং কাফেরদের জন্য গজব হিসেবে এসেছে। সুতরাং মুসলমানদের ভয়ের কিছু নেই। ফলে মুসলিমরা মসজিদে বেশি বেশি গিয়ে নামাজ-কালাম পড়া শুরু করলেন।

অন্যদিকে এমন কাজ শুধু বাংলাদেশের মাওলানারই করেছেন, তা নয়। স্পেনের খ্রিস্টান পাদ্রিরা বলেছেন, যিশুর প্রার্থনা বেশি বেশি করতে হবে, গির্জায় যেতে হবে, পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তাহলে করোনা ভাইরাস কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ তারাও বিশ্বাস করেন, ‘রোগ-ব্যাধি পাপের কুফল এবং শাস্তি। ঈশ্বর অখুশি হলে এসব রোগ-বালাই শাস্তিস্বরূপ আসে।’ ভারতসহ, নেপাল এবং বাংলাদেশের সনাতন ধর্মের পুরোহিতরা তাঁদের ভগবান এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার প্রতি বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। তাঁদের সব কথার সারাংশ হচ্ছে, করোনা ভাইরাস এসেছে পাপের ফল হিসেবে। যারা নিষ্পাপ তাদের কোনো ভয় নেই। প্রত্যেক ধর্মের পুরোহিতরা নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থের ভিত্তিতে তাদের ধর্মের অনুসারীদের প্রায় একই রকম বয়ান করেছেন। এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম বৌদ্ধ ধর্ম। বৌদ্ধ ধর্মে ‘পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক’ নেই। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্মের মঙ্করা (পুরোহিত) করোনা ভাইরাস নিয়ে ‘পাপের ফল’ জাতীয় কোনো কথাই বলেননি।    

রোগের পাপতত্ত্বের গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ স্টান্ডার্ড প্রচারণার কারণে মানুষ হঠাৎ করেই অতিধার্মিক হয়ে গেল। মানুষ জেনে অথবা না জেনে কত রকম পাপ করে, তাই ভয়ে অস্থির হয়ে গেল। তাই কম পাপী বেশি পাপী সবাই পাল্লা দিয়ে ধর্মচর্চা বাড়িয়ে দিল। এমনকি ফেইসবুক টুইটারে ক্ষমা প্রার্থনামূলক পোস্ট/স্ট্যাটাসে সয়লাব হয়ে গেল। যত শেয়ার তত পূণ্যের প্রতিযোগিতা! রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অধিকাংশ দেশে শপিং সেন্টার, রাজনৈতিক জনসমাবেশ কিংবা প্রার্থনালয়ে সব ধরনের গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হলো। লকডাউন ঘোষণা করা হলো। সবাই কম বেশি শুনতে চাইলেও ধার্মিকরা শুনতে রাজি হলেন না।

ঐশ্বরিক মেডিসিন

কারণ তাদেরকে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছিল না। কেউ বোঝাতে চেষ্টা করলে তারা বরং বলতেন, ‘ভাইরাস কি ঈশ্বরের চেয়ে বেশি শক্তিশালী? রোগ দিয়েছেন যিনি, সুস্থ করবেনও তিনি। ঈশ্বর সহায় থাকলে কিছুই হবে না।’ এই জাতীয় প্রচারণা চালাল। তাদের মতে, পাপের ফলে রোগ হলেও, পুণ্যের মাধ্যমে আরোগ্য লাভের উপায়ও তো আছে। এটাই হচ্ছে—ঐশ্বরিক মেডিসিন। সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মেডিসিন। ঈশ্বরের সন্তুষ্টি লাভের দাওয়াই হচ্ছে একমাত্র প্রার্থনা। ডাক্তার হচ্ছেন—পীর-আউলিয়া, ধর্মযাজক কিংবা পুরোহিত। হাসপাতাল হচ্ছে—উপাসনালয়, ঔষধ হচ্ছে—দোয়া-খায়ের, মন্ত্র-তন্ত্র, পানি-পড়া, তাবিজ-কবজ, গরু কিংবা উটের প্রস্রাব ইত্যাদি। এমনকি আকাশে ‘সুরাইয়া’ নামক এক তারকার উদয়ের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস দূরীকরণের উপায়ের কথাও জানা গেছে।

এক পর্যায়ে স্পেনে গীর্জা থেকে, বাংলাদেশের ইসকন মন্দির থেকে, এবং মালয়েশিয়া, ভারত এবং পাকিস্তানে তাবলীগ জামাত থেকে ব্যাপক হারে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে ধার্মিকরা একটু ব্যাকফুটে চলে যান। নজিরবিহীনভাবে সমগ্র পৃথিবীতে একসঙ্গে সকল উপাসনালয় বন্ধ হয়ে গেল। স্পেনের পাদ্রিরা চুপ মেরে যায়। ঢাকার ইসকন মন্দিরে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। পুরোহিতরা টু শব্দটিও করলেন না।

রোগীর অপরাধ

রোগের পাপতত্ত্বে ঈশ্বর শাস্তি বিধান করেন। কিন্তু রোগ যদি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়? তাহলে রোগ-ব্যাধির ভোগান্তির চেয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের নিপীড়ন অনেক বেশি বেড়ে যায়। ১৮৯৭ সালে বৃটিশ ভারতে মহামারি রোগ-ব্যাধি আইন নামক একটি আইন পাশ করা হয়। যে আইনের মাধ্যমে কলেরা, প্লেগ এবং গুটিবসন্তের রোগীদেরকে বাড়ি থেকে পুলিশ দিয়ে ধরে আনতো। এই প্রথম রোগ কিংবা রোগীকে ক্রিমিনাইলাইজড করা হলো। আমাদের দেশে কাউকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেলে (সেটা যে কারণেই হোক) তার বহুবিদ সামাজিক কুপ্রভাব আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ভয়ংকর সামাজিক সমস্যা তৈরি করে। ‘সোশ্যাল আইসোলেশন’ তখন ‘সোশ্যাল এক্সক্লুশন’ সৃষ্টি করে। ঘরে ঘরে মানুষ বয়কটের শিকার হতে থাকে। মহামারিতে একজন রোগী একই সঙ্গে তখন ধার্মিকের চোখে পাপী এবং রাষ্ট্র ও সমাজের চোখে অপরাধী হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকেই উদাহরণ দেয়া যাবে। মার্চ মাসের প্রথম দিকে ইতালি থেকে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশে আসলেন। তাদেরকে হাজি ক্যাম্পে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তারা সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন। মিডিয়া সরগরম হলো, পরবর্তীকালে সেই সব প্রবাসীদের অনেককেই পুলিশ দিয়ে ধরে আনা হয়েছে। কিন্তু একজন সম্ভাব্য করোনা রোগীকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে গেল, তখন সমাজের লোকেদের কাছে কী বার্তা পৌছাল? উক্ত ব্যক্তি নিশ্চয়ই ভীষণ বিপদজনক। তাই তাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমজনতার মধ্যে এক ধরনের পারসেপশন জন্ম নিল। সেই পারসেপশনই সোশ্যাল স্টিগমা তৈরি করল। সোশ্যাল সাইকোলজিতে বলা হয়, স্টিগমার কারণে মানুষ হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। কারণ রোগ-বালাইয়ের স্টিগমা তৈরি হয় মূলত ভীতির কারণে।

এটা কতটা ভয়ংকর কিংবা অমানবিক হতে পারে, তার কয়েকটা নমুনা দিচ্ছি : এক. নারায়ণগঞ্জে একজন ডাক্তার হাসপাতালে করোনা ইউনিটে কাজ করতে গিয়ে নিজে আক্রান্ত হন। তাই নিজ বাড়িতেই তাঁকে আইসোলেশনের থাকার কথা বলা হয়েছে। সেই খবর পাড়া-প্রতিবেশিরা জেনে গেলে, তাকে এলাকা থেকে উচ্ছেদ করার জন্য বাড়িতে আক্রমণ করা হয়। দুই. নারায়ণগঞ্জেই দীর্ঘদিনের পুরানো সাত বন্ধু মিলে একটা এপার্টমেন্ট বাড়ি বানিয়েছেন, তারা সেখানে থাকেন। তাদের একজন করোনা আক্রান্ত হলে বাকি ছয় বন্ধুরা কেউই তাকে হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করেনি। অবশেষে সেই হতভাগা মানুষটি নিজ বাড়িতে সিড়িতেই মরে পড়ে থাকলেন। তিন. করোনা উপসর্গ দেখা দিলে সন্তানরা মিলে মাকে সখিপুরের জঙ্গল-পাহাড়ে ফেলে দিয়ে এসেছে। চার. করোনা ভাইরাসে কেউ মারা গেলে জানাযা, দাফন-কাফন, দাহ-সৎকার করতে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ. মরদেহ বহনের জন্য মসজিদ থেকে খাটিয়া দেওয়া হয়নি। ছয়. এমনকি সরকারি গোরস্থানে কবর দিতে দিচ্ছে না। সাত. করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে ভাড়াটিয়াকে রাতের বেলা মারধোর করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। আট. জীবন রক্ষাকারী ডাক্তার, নার্স, পুলিশদের বাসা ভাড়া দিচ্ছে না। নয়. করোনা রোগীদের এমনকি পুড়িয়ে মারার হুমকি দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিশেষ করে ইরান, ইরাক এবং সৌদি আরবে করোনা রোগীদেরকে পাপী মনে করা হচ্ছে। তাই কেউ করোনা আক্রান্ত হলে এম্বুলেন্স ডাকে না। কারণ বাড়িতে এম্বুলেন্স এলে পাড়া-প্রতিবেশিরা জেনে যাবে। তার মানে ঐ বাড়িতে পাপীরা থাকে। কী ভয়ংকর সমস্যা! নারীরা করোনা আক্রান্ত হলে তো দুর্ভোগের আর সীমা নেই। ভয়ংকর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে করোনায় আক্রান্ত নারীদেরকে আইসোলেশনে থাকতে দিতে রাজি হয় না। এমন কি এখন অন্য কোনো রোগের ক্ষেত্রেও তারা এম্বুলেন্স ডাকতে সাহস পাচ্ছে না। যাদের দ্রুত অক্সিজেন দরকার, তারা এম্বুলেন্সের অভাবে মারাই যাচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো আধুনিক সমাজে সোশ্যাল স্টিগমার বর্ণবাদীরূপ দেখা যাচ্ছে। চাইনিজদেরকে গালি দেয়া হচ্ছে, এমনকি মারধোর করা হচ্ছে। ভারতে মুসলিমদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে। কারণ সেখানে প্রথম আউটব্রেক হয়েছে দিল্লির এক তাবলীগ জামাতের মারকাজ থেকে।

পুশ্চ

পৃথিবীতে নানাবিধ রোগ-ব্যাধির জন্য মানুষ কি কোনোভাবেই দায়ী নয়? মানুষ কি পরিবেশ ধংস করেনি? অন্যান্য প্রাণিদের জন্য, এমন কি এক দেশের মানুষ অন্য দেশের মানুষের জন্য নিজেদেরকে দানবে পরিণত করেনি? ১৪৯৩ সালে স্পেনীয়রা দক্ষিণ আমেরিকা দখল করে ইনকা সভ্যতা ধ্বংস করেনি? গণহত্যা চালায়নি? স্পেনীয়দের কারণে দক্ষিণ আমেরিকার ৯৫% মানুষ গুটিবসন্তে মারা যায়নি? প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যরা ইউরোপে এক ধরনের বার্ডস ফ্লু নিয়ে যায়, যেটা স্প্যানিশ ফ্লু হিসেবে পরিচিত। যাতে ৫০ কোটি মানুষ মারা যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপে ভয়ংকর মহামারি প্লেগ দেখা দেয়। কারণ মানুষ মনে করতো কালো বিড়ালের মাধ্যমে শয়তান কিংবা অপ-আত্মা আসে। তাই সাদা-কালো সব বিড়ালই হত্যা করার ফলে ইদুরের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। সেই সুযোগে প্লেগ এসে লাখ লাখ মানুষ মেরে গিয়েছে। এক সময় বাংলাদেশের মানুষ মনে করতো, খোড়া কুকুরের পিঠে চড়ে ওলাবিবি (কলেরা) আসে। সুতরাং সুস্থ কিংবা খোড়া কুকুর অধিকাংশই নিধন করেছিল। ফলে কলেরার মহামারি হলো। কারণ আমাদের দেশে স্যানিটারি ব্যবস্থা ভালো ছিল না। মানুষ যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করত। মানুষের বিষ্ঠা খেয়ে কুকুর পরিবেশের ভারসাম্য কিছুটা হলেও বজায় রাখত। কিন্তু যখন কুকুরই নাই, তখন কলেরার রাজ্যে মানুষ অসহায় হয়ে গেল। করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যে প্রায় তিন লাখ মানুষের জীবন কেঁড়ে নিয়েছে। এই জিনিস কবে যাবে তা কেউ জানে না, না-কি এইডসের মতো শক্ত আসন পেতে বসবে? এইডসে এখন পর্যন্ত তিন কোটি মানুষ মারা গেছে। কলেরা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা তো আছেই। একটি পৃথিবী সকলের জন্যে সকলের যত্নে। সুতরাং মানবজাতি যদি পৃথিবী এবং তাঁর অন্যান্য প্রাণিদের ক্ষতিসাধন করা বন্ধ না করে, তাহলে একের পর এক মহামারি আসতেই থাকবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ
X