দেবেশকে নিয়ে ব্যক্তিগত

Send
শঙ্খ ঘোষ
প্রকাশিত : ১২:৫০, মে ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩, মে ২২, ২০২০

আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় বিষয়ে কোনো বিধিবদ্ধ লেখা নয় এটি। তেমন-কোনো লেখার সামর্থ্যও আমার নেই। যে ব্যক্তি-দেবেশকে গত ষাট বছর ধরে অল্পবিস্তর জানি তার বিষয়ে সামান্য কয়েকটি কথা রইল এখানে, চোদ্দ বছর পর পর পাঁচটি অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কথা।

 

১৯৫৪

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি যখন, সহপাঠিনী হিসেবে বেশ কয়েকজনের আবির্ভাব হলো জলপাইগুড়ি থেকে। গল্পসূত্রে তাদের প্রিয় এক বন্ধুর নাম জানলাম দিনেশচন্দ্র রায়, পরের বছর তার সঙ্গে না কি আমাদের দেখা হবার সম্ভাবনা। তার ধীমত্তা এবং বাকচাতুর্য, এমনকী তার রূপেরও অনেক প্রশস্তি শুনে প্রায় ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ছিলাম। তারপর একদিন সেই দিনেশ এসে পৌঁছল কলকাতায়, ১৯৫৪ সালে। আর মনে হলো আমাদের অনেকদিনের জানাশোনা, নিবিড় একটা বন্ধুতা হলো সঙ্গে সঙ্গে।

অনেকরকম কথার মধ্যে দিনেশ তখন কেবলই বলত তার ভাইবোনদের গল্প। যখন বলত, চোখেমুখে তার এতটাই স্নেহ উপচে পড়ত যে বুঝতাম কতটাই তার পরিবার-অন্ত প্রাণ। সবচেয়ে বেশি করে বলত তার এক গুণী ভাইয়ের কথা। শুধু স্নেহ নয়, তার বিষয়ে বলতে গিয়ে ওর স্বরে জেগে উঠত একটা শ্রদ্ধাও। বলত, ছোটোবেলা থেকেই সে একজন আদ্যন্ত কমিউনিস্ট কর্মী, ছোটোবেলা থেকেই সে রীতিমতো লেখক। এসব কথা যখন শুনছি তখন সে-ভাইয়ের বয়স আঠারো, কিন্তু কর্মী হিসেবে লেখক হিসেবে যেসব ভাষা তখন ব্যবহার করত দিনেশ, তাতে তাকে মনে হতে পারত পূর্ণবয়স্ক এক মানুষ। হয়নি যে তা, সেটা তার আরেক রকম বর্ণনার ফলে। দিনেশের সেই ভাই দেবেশের নাম যে-মুহূর্তেই মনে পড়ে আমার—আজও পর্যন্ত—তখনই তাকে এক ঝলক দেখতে পাই সেই বর্ণনারই ছবিতে।

দেবেশের এই না-দেখা ছবিটাই বারে বারে আমার মনে পড়ে কেন, সেকথা ভেবেছি কখনো কখনো। ওর ওই ছটফটে চঞ্চলতা, কৌতুকোচ্ছলতা, আর সেইসঙ্গে ওর ভিতরকার কবিতাপ্রিয়তা ছাড়াও আরও একটা দিক আমার কাছে ফুটত ওই ছবিতে—ওর পারিবারিকতা। পরে যখন দীর্ঘকাল জুড়ে দেখলাম ওকে সামনাসামনি, তখন মনে হলো এই পরিব্যাপ্ত পারিবারিকতা ওর চরিত্রের একটা বড়ো ধর্ম। সে-পারিবারিকতা নিজেরই পরিবার থেকে শুরু বটে, কিন্তু সেই একই পারিবারিকতায় সে জড়িয়ে নিতে চায়, নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, তার পরিচিত মণ্ডলের মধ্যেও। নিকট আত্মবন্ধনে সে-মণ্ডল তো বটেই, তার রাজনীতির কাজও হয়ে উঠতে পারে একটা পারিবারিক বৃত্তে সম্পূর্ণভাবে তাকে মিলিয়ে নেওয়া।

পরের বছরেই, ১৯৫৫ সালেই, দেবেশের লেখা নিয়ে দিনেশের অগ্রিম প্রশস্তির যাথার্থ্য টের পাওয়া গেল ‘দেশ’ পত্রিকার একটি গল্পের মধ্য দিয়ে, ‘হাড়কাটা’ তার নাম। সেই প্রথম ওর লেখা পড়া। এক কসাইকে নিয়ে লেখা সেই গল্প যে বিষয়গত বিশিষ্টতাতেই মনে ধরেছিল তা নয়, টান দিয়েছিল তার লিখনরীতিও—যে রীতি স্বভাবতই অনেক পাল্টেওছে পরে। অনেকদিন পরে সে-লেখা আরেকবার পড়তে গিয়ে বুঝতে পারি টানটা লেগেছিল কোথায়, কোন্ অনুপুঙ্খের কবিদৃষ্টিতে : ‘লোকে বলে পাঁঠা কাটতে-কাটতে পাঁঠার রক্তও এসে মিশেছে নানকুর চোখে। তাই ওর চোখ এত লাল। কপালের ওপর অজস্র দাগ, মনে হয় একটা কাল আবলুশ গাছের ওপর একটা বন্য বাঘ শিকার না পেয়ে হিংস্রভাবে থাবা মেরে মেরে গাছটার সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করেছে। সর্বাঙ্গের হাড়গুলো কোনোরকম মাংসল প্রতিবন্ধকতা না পেয়ে ওর শরীরটাকে জ্যামিতিক কোণ-উপকোণের একটা উদাহরণমালা তৈরি করে তুলেছে।’

দু’তিন বছরের মধ্যে আরো দুটি স্মরণীয় গল্প লিখে ‘আহ্নিকগতি ও মাঝখানের দরজা’ আর ‘দুপুর’ তখনকার লেখকসমাজের চোখের মণি হয়ে উঠল দেবেশ, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলল ছোটোগল্পে একটা নতুন রীতির আন্দোলন। পরে অবশ্য তার মনে হয়েছিল এ-আন্দোলনে বড়ো কম জিনিস নিয়ে বেশি দাবি করা হয়েছিল। কথনের একটা আধুনিকতা সত্ত্বেও একটা নাটুকেপনার সীমাবদ্ধতা রয়ে গিয়েছিল সেখানে। নিজেকে এগিয়ে নেবার জন্য এই মনে হওয়াটা তার পক্ষে অনিবার্য ছিল, তবে আমাদের মতো পাঠকের কাছে সেই সময়টার থরথরে উত্তেজনাটা স্মরণীয় হয়ে আছে তাজা একটা আবির্ভাবের জন্য, অল্প কিছু পরেই ‘নিরস্ত্রীকরণ কেন’ বা ‘উদ্বাস্তু’র মতো গল্পের জন্য। ততদিনে জেনে গেছি দেবেশ ঘোরতর রাজনীতির মানুষ। কিন্তু রাজনৈতিক গল্প-উপন্যাস বলতে যা বোঝাত তখন, তার সঙ্গে ওর গল্পের কিছুমাত্র মিল নেই। রাজনৈতিক আখ্যানের যে নতুন একটা সংজ্ঞা তৈরি হয়ে উঠবে তার হাতে, তখনও সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।

 

১৯৬৮

লক্ষ্মীপুজোর আগের রাতে জলপাইগুড়ি পৌঁছেছি সেবার। শেষ রাতে এল বান। তিস্তার বাঁধ ভেঙে গ্রামশহর ভাসিয়ে দিচ্ছে জল, শহরের উঁচু জায়গাতেও উঠে আছে দশ-বারো ফুট। অনেক প্রাণহানি চারদিকে, আর আমরা একটা দোতলা ঘরে বন্দী হয়ে আছি অনেকে।

দুদিন পরে নামল জল। বাইরের সঙ্গে অন্দর মিলেমিশে গেছে পলিমাটিতে। ত্রাণ ছাড়া খাবার জুটবে না কারো। শিলিগুড়ি থেকে আসতেও শুরু করেছে সেই ত্রাণ। সাধারণ মানুষের তৎপরতায়। কিন্তু বন্ধ হলো তা হঠাৎ। বিশৃঙ্খলার অজুহাত দেখিয়ে তা আটকে দিল সরকার।

বিশৃঙ্খলা তাতে যে কমল তা নয়। সেই অব্যবস্থার মধ্যে হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম, ত্রাণ প্রসঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে মিলিটারির বন্দুকের সামনে বুকের জামা খুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে দেবেশ, বলছে : ‘মারুন এইখানে, যদি সাহস থাকে।’ দেবেশ যাকে রাজনৈতিক দৈনন্দিনতা বলে জানে, তার টানেই তার এই ছুটে যাওয়া, এই বন্দুকের সামনে দাঁড়ানো। একা দেবেশ? হ্যাঁ, সে-মুহূর্তে একাই।

একটা লাইন ভেসে এল মনে। ‘ভাবি, একা বাঁধ দেবে? সে কি কখনোই হতে পারে?’ আরুণির গল্পটা মনে পড়ল আমার, কদিন পরে যা আকার পাবে একটা কবিতায়।

দেবেশই সেদিন এনে দিয়েছিল সেই ধুলাশহরে আরুণির ছবি।

 

১৯৮২

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে একবার ঠিক হলো, প্রতি সপ্তাহে ছেলেমেয়েদের সামনে কোনো লেখক এসে কিছু কথা বলবেন তাঁদের সৃষ্টিকাজ নিয়ে। সমালোচকেরা বা অধ্যাপকেরা তো কতই বলেন সেসব কথা। কিন্তু যিনি নিজেই স্রষ্টা, তাঁর কাছ থেকে তাঁর সৃষ্টির ইতিহাস বা সৃষ্টির প্রক্রিয়া জানতে পারাটা নিশ্চয় একেবারে অন্যরকম একটা স্বাদ দিতে পারে? পরিকল্পনাটায় সবারই বেশ উৎসাহ হলো।

প্রথম দিনেই ধরে আনা গেল সমরেশ বসুকে। ক্লাসঘরের মধ্যে আয়োজন। কিন্তু আমরা অনুমান করতে পারিনি ও-রকম একটা জনবিস্ফার ঘটতে পারে শুধুমাত্র সাহিত্যালোচনা শুনবার জন্য। ঘরের মধ্যে ঠাসাঠাসি ভিড়, বারান্দা উপচে পড়ছে, সিঁড়ি জুড়ে পিণ্ড পাকিয়ে আছে নানারকমের মানুষজন।

পরের সপ্তাহেই ডেকেছিলাম দেবেশকে। এবারে যে ঠিক ও-রকম উন্মাদনা হবে না, সেটা জানাই ছিল। নিছক সাহিত্যপিপাসুরাই থাকবে এবার, জনসভা না হয়ে যথার্থ সাহিত্যসভাই এবার হবে।

যে-ঘরে আলোচনার কথা, তিনটে পর্যন্ত সে-ঘরেই আমার ক্লাস। ক্লাসশেষে ছেলেমেয়েরা ওইখানেই অপেক্ষায় থাকবে সেমিনারের জন্য। ক্লাস থেকে বেরিয়ে আমার বসবার ঘরে যাবার পথেই দেখছি মধ্যবর্তী ঘরে অন্য কয়েকজন অধ্যাপকের সঙ্গে গল্পে মশগুল দেবেশ। কাছে গিয়ে বলি : ‘একটু বোসো, শুরু হবে এখনই।’

কিন্তু কাকে নিয়ে শুরু হবে? নিজের ঘরে পৌঁছতেই খবর পাই, ক্লাসঘর ফাঁকা। বারান্দা জুড়ে কয়েকবার ঘোরাফেরা করতে হলো ছেলেমেয়েদের খোঁজে। কয়েকজনকে ধরে আনতে হলো ক্যান্টিন থেকে। কাজচালানো একটা সমাবেশ হবার পরে দেবেশের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। অনুদ্বিগ্ন শান্ত স্বরে বলি : ‘চলো তবে—’

গল্প ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায় দেবেশ। আর উঠেই, প্রথম কথা বলে : ‘আপনি এত দুশ্চিন্তা করছেন কেন? আমার কথা শুনতে কি রাশি রাশি লোক জমে যাবে? আমাকে কে চেনে? চলুন তো—’

সবাই মিলে চলতে থাকি ক্লাসঘরের দিকে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি তখন স্তম্ভিত। এ-ঘরের পাশ দিয়ে যতবার চলাচল করেছি, একবারও তো সেদিকে মুখ ফেরায়নি দেবেশ! ছেলেমেয়েরা ঘরে আছে কি নেই, এ নিয়ে কেউ তো কোনো কথা বলেনি তার সঙ্গে! আমার উদ্বেগ যথাসাধ্য গোপন রাখবারই তো চেষ্টা করেছি আমি! কী করে তবু সবটাই বুঝতে পারল দেবেশ?

তখনই মনে হলো ওর দৃষ্টিশক্তির কথা। আমরা যতটুকু দেখি, ঠিক ততটুকুই দেখি। কিন্তু একটা বিন্দুর পাশে আরো অনেকগুলি বিন্দু অনেকগুলি পরিপার্শ্ব একঝলকে দেখতে না পেলে তিনি আর ঔপন্যাসিক হবেন কী করে? আমি ভাবছি নিজেকে গোপন করছি, কিন্তু ঔপন্যাসিকের চোখ দিয়ে সেই গোপনের আচ্ছাদনটুকু ভেঙে অন্তস্তল পর্যন্ত তো দেখে নিচ্ছে দেবেশ!

স্তম্ভিত হবার অবশ্য আরো একটা কারণ ছিল সেদিন। সর্বজনপ্রিয় কোনো কথাশিল্পী নন তখন দেবেশ, তাঁর ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ও বেরোয়নি তখনও। কিন্তু দু-বছর হলো বেরিয়ে তো গেছে ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’র মতো আশ্চর্য বইখানা, যে-বইয়ের পর তার স্বাতন্ত্র্য আর উচ্চতা বুঝতে ভুল হবার আর কথা নয়। কীভাবে লেখা হলো সেই চ্যারকেটুর কথা, তা জানবার আগ্রহ হবে না ছেলেমেয়েদের?

না, সেকথা অবশ্য সেদিন বলেওনি দেবেশ। নিজের উপন্যাসের বৃত্তান্ত না বলে ঘণ্টাখানেক জুড়ে সে বলেছিল বাংলা উপন্যাসের বৃত্তান্ত। পশ্চিমি একটা আদলকে সামনে রাখার ফলে কীভাবে আমাদের একেবারে নিজস্ব ঘরানার সম্ভাবনাটা লুপ্ত হয়ে গেল ভুল আধুনিকতার মধ্যে, দেবেশ সেদিন বলে গেল তার ইতিহাস। সে কি তবে ভুলে গেল আমাদের ধার্য-করা বিষয়? ভোলেনি বলেই মনে হয়। কেননা দেখার বা বিশ্লেষণের ওই ইতিহাসটাই ছিল তার নিজেরও উপন্যাসচর্চার ইতিহাস। শিল্পে একটা অন্তর্ঘাতের কথা প্রায়ই বলে দেবেশ। নিজেরই সৃষ্টিইতিহাসে সেই অন্তর্ঘাতের একটা প্রচ্ছন্ন ধারণা দেবার জন্যই ‘নিজেকে আড়াল করে’ পুরানো অন্তর্ঘাতের চেহারাটাকে সে মেলে ধরতে চেয়েছিল শ্রোতাদের সামনে। এ ছাড়া আর পথ ছিল না তার। নৈর্ব্যক্তিকতার শিল্পাদর্শে অজ্ঞাতবাসটা যেখানে জরুরি, প্রত্যক্ষে থেকেও এ-বর্ণনা তেমনই এক অজ্ঞাতবাস।

সভা পরিচালনার দায়িত্বে ছিল বিভূতি, অভ্র রায়। উচ্ছ্বসিত মন্তব্যে সে বলেছিল সেদিন : এমন একটা ভাষণ শুনতে পাওয়া এক-জীবনের সৌভাগ্য। এ এক অভিজ্ঞতা, এক দিগদর্শন।

সেও ছিল অনুগামী এক কথাসাহিত্যিক।

 

১৯৯৬

সকালবেলায় হঠাৎ একটা ফোন এল। দেবেশের গলা। একটু অনিশ্চিত, একটু থমথমে ভাব। বলল : ‘রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে না “আগমন”? এখনই সেটা খুব পড়তে ইচ্ছে করছে, কিন্তু হাতের কাছে পাচ্ছি না।’

‘পাঠিয়ে দেব কাউকে দিয়ে?’

‘না, না, পাঠাতে হবে না। একবার শুনলেই হবে। একটু পড়ে শোনাবেন?’

‘খেয়া’ নয়, ‘সঞ্চয়িতা’ থেকেই তখন পড়ে শোনাতে থাকি কবিতাটি। অন্ধকার রাত্রে আমরা ভাবছি আসবে না কেউ আজ। দু-একজনে বলেছিল আসবে মহারাজ, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করিনি সেটা। শব্দ হলো দরজায়, আমাদের আলস্য তবু কাটে না। দু-একজনে বলেছিল দূত এসেছে, কিন্তু আমরা বলি : বাতাস বুঝি হবে। আমাদের সমস্ত অনিশ্চয়তার অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তবু দুয়োরে এসে পৌঁছন দুঃখরাতের রাজা, আমরা তবুও অপ্রস্তুত! ‘হায় রে ভাগ্য হায়রে লজ্জা—কোথায় সভা কোথায় সজ্জা!’

পুরো কবিতাটা শুনবার পর দেবেশ এ-কবিতার আবেগসৌন্দর্য নিয়েই দু-চার কথা বলতে লাগল, কিন্তু আমি ভাবছি আজ এই মুহূর্তেই এভাবে এটা ওর শুনতে ইচ্ছে হলো কেন।

সময়টা ছিল দেশের রাজনীতির পক্ষে বলবার মত একটা সময়। নতুন রকম একটা সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে গোটা দেশ। ভারতের ইতিহাসে সেই প্রথম আমাদের গোটা দেশের দায়িত্বভার অর্পিত হতে চলেছে একজন কমিউনস্টি নেতার ওপর। কিন্তু নিতে পারবেন কি তিনি দায়? দল থেকে সম্মতি কি মিলবে? পুরো মন্ত্রিসভা তো দলের নয়—এমন আংশিকভাবে দায় নিয়ে কি সত্যি সত্যি কোনো কাজে লাগতে পারবেন নেতা? না, দলীয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত হলো, এভাবে নেওয়া যায় না দায়।

ভুল হলো কি সিদ্ধান্তটা? এ নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। কেউ কেউ পরে বলবেন, শুধু ভুল নয়, এ এক ঐতিহাসিক ভুল। মস্ত বড়ো সুযোগ এসে দাঁড়িয়েছিল দুয়োরে, দু-একজনে বলেছিল ‘দূত এল-বা তবে’, কিন্তু ‘আমরা হেসে বলেছিলেম, “বাতাস বুঝি হবে”।’

বুঝতে পারলাম কেন এখনই এ-কবিতা শোনাটা দেবেশের পক্ষে এতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। ‘দূত এল-বা তবে’-র প্রত্যাশা ভেঙে গিয়েছে ‘বাতাস বুঝি হবে’র অবিশ্বাসে—এই বেদনার একটা প্রতিচ্ছবি নিশ্চয় সে খুঁজছিল ওই মুহূর্তেই রবীন্দ্রনাতের কবিতাটিতে। দেবেশের রাজনীতি কীভাবে প্রতিমুহূর্তেই থাকে কবিতার সঙ্গে বা শিল্পের সঙ্গে জড়ানো, আবার তার কবিতাপড়াও কীভাবে প্রতিমুহূর্তেই জড়িয়ে থাকে তার অনুভূত এক রাজনীতিতে, তার সমস্ত সত্তায়, এর একটা মায়াময় উদাহরণ হয়ে সেই সকালটা স্থায়ী হয়ে থেকে গেল আমার মনে।

 

২০১০

আগের চেয়ে অনেক কম দেখাশোনা হয় আজকাল, ফোনের সংলাপও কালেভদ্রে। এমন সময়ে, এপ্রিলের মাঝামাঝি একদিন অগ্রিম খবর দিয়ে দেবেশ এসে হাজির। সঙ্গে তার নববর্ষে বেরুনো ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’। হাতে নিয়ে আনন্দে ভরে যায় মন।

যেমন প্রায়ই করে থাকে দেবেশ—বছরের পর বছর ধরে নানা সময়ে নানা জায়গায় ছাপা হতে থাকে কিছু আখ্যান, কার্যত যা একই মহা-আখ্যানের অংশ মাত্র। অংশকে পূর্ণ মনে হতেও কোনো বাধা নেই, পুরোনো অর্থে এ কোনো ধারাবাহিক রচনাপ্রকাশ নয়। অংশ আর পূর্ণ হাত-ধরাধরি করে চলতে চলতে কোনো একটা সময়ে এসে পৌঁছয়। ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’ তেমনি এক মহা-আখ্যান। এর সূচনাসময় থেকেই নানা কারণে আমরা ভরপুর ছিলাম ঔৎসুক্যে—এতদিনে তবে বই হয়ে বেরুল সেটা। হাজার পৃষ্ঠারও বেশি সেই বই। প্রায় চার দশক আগে আমার টেবিল থেকে ‘মানুষ খুন করে কেন’ নামের উপন্যাসটি হাতে তুলে নিয়ে সন্দীপন বলেছিল ‘বই, এত বড়ো হয়?’ তার দ্বিগুণেরও বেশি আয়তনের এ-বই দেখলে কী বলত সে!

কিন্তু শুধু সেজন্য নয়, ‘মানুষ খুন করে কেন’র কথা মনে পড়ল আরো একটা কারণে। তার আয়তনে আমারও বিস্ময় দেখে দেবেশ বলেছিল তখন : অনেকটা ফেলে দিতে হয়েছে, অনেকবার লিখতে হয়েছে ফিরে ফিরে। অনেক ফেলে দেওয়া? অনেকবার লেখা? এত সময় পায় কখন, এত ধৈর্যই বা পায় কোথায়? পরিবার নিয়ে, বন্ধুবান্ধব নিয়ে, সাহিত্যজগৎ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে সবসময়েই তো হৈ হৈ করে চলেছে দেখতে পাই। তার মধ্যে কখন ও করে এত পরিশ্রম? এর মধ্যে প্রায় একটা অলৌকিকতা আছে। ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’ বিষয়েও একটু লাজুকভাবে বলে : ‘আরো বড়ো হবার কথা, কিন্তু থামিয়ে দিতে হলো।’ তার মানে, একেবারে শেষাংশে ‘যোগেনের নভেল ত্যাগ’ যেন লেখকেরই নভেল ত্যাগ, যেন বলে ওঠা : ঢের হয়েছে, আর নয়। এত পরিশ্রমের মধ্যে একটা খেলাচ্ছলও আছে ওর।

এখনও পর্যন্ত ঐতিহাসিক ওই মহাগ্রন্থের পূর্ণ সমাদর হতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না, আমাদের স্বাধীনতা-ইতিহাস-পর্বের মস্ত এক উপেক্ষিত অধ্যায় গাঁথা হয়ে আছে এখানে। যাঁরা শুধু ইতিহাসচর্চাই করেন, তাঁদেরও পুরো মন আজও নিবিষ্ট হয়নি এই অধ্যায়ের দিকে। সেই অধ্যায় থেকে, এখানেও আছে ঔপন্যাসিকের ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এক ‘অপর’-এর সন্ধান। ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’ বা ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-র ‘অপর’ থেকে তা স্বতন্ত্র, তবু সংযুক্ত। অনেকদিন আগে দেবেশ বলেছিল : ‘একজন ঔপন্যাসিক লিখতে চাইছে ব্যক্তির ঐতিহাসিকতা। ব্যক্তির ইতিহাস মানে ব্যক্তির জীবন নয়। সেই জীবন যে-ইতিহাসের অংশ সেই ইতিহাসে সেই ব্যক্তিকে স্থাপন করাই উপন্যাসের কাজ।’ সেই কাজটাই আছে তার এখনও পর্যন্ত শেষ এই মহা-উপন্যাসে, যার শেষ কটা লাইন হলো : ‘যোগেন নিজেকে দেখতে চায়, ভারতবর্ষ নামে হাজার-হাজার বছরের ধ্যানের একমাত্র প্রতিনিধি সে, এক শূদ্র। চলেছে পাকিস্তানে। সেই ধ্যানের স্বদেশকে সত্য রাখতে।/ শূদ্র ছাড়া সে-দায় আর কে নেবে?’

তার পুরোনো বৃত্তান্তগুলির সঙ্গে এইভাবে মিলে যায় যোগেন মণ্ডলের বৃত্তান্তও, আর উপন্যাসের এই শেষ বাক্য আমাদের এগিয়ে নিতে চায় ভাবীকালের কোনো ভারতস্বপ্নে।

সেই স্বপ্ন হাতে তুলে দিয়ে দেবেশ বিদায় নিয়েছিল সেদিন।পুনর্মুদ্রণ

//জেডএস//

লাইভ

টপ