হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কিছু কথা

Send
প্রশান্ত মৃধা
প্রকাশিত : ১৩:২১, জুলাই ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৩, জুলাই ১৯, ২০২০

আমার যতদূর মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদের যে বইটি আমি প্রথম পড়ি তার নাম ‘নীল হাতি’। তখন সম্ভবত চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। এরপরে আবার যখন তার বই পড়তে শুরু করি, তখন নাইন-টেনে পড়ি, এবং সে সময় সম্ভবত ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ এই নামের একটি বই পড়ি, যেটাকে সাইন্স ফিকশনও বলা হয় সম্ভবত, আমার এখন আর ওইভাবে মনে নেই, কারণ সেটা পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার ঘটনা।

এরপরে তার সে সময়ে সবথেকে বিখ্যাত দুইটি বই পরপর পড়ি, একটি ‘নন্দিত নরকে’, আরেকটি ‘শঙ্খনীল কারাগার’। ইতোমধ্যে যেটা হতো—সে সময়ের পত্রিকাগুলো যে ঈদ সংখ্যা বের করতো তার প্রায় সবখানেই হুমায়ূন আহমেদের লেখা থাকতো। সেগুলোও পড়া হতো।

ওই সময়টাতে যে ব্যাপারটা ঘটে—আমি ছাপতে না দিলেও একটু একটু করে গদ্য লিখতে শুরু করি। তখন একাদশ শ্রেণিতে উঠবো উঠবো এরকম একটা সময়, তো সে সময়ে হুমায়ূন আহমেদের পড়া দুটো বই আমাদের ভেতরে এত বেশি প্রভাব বিস্তার করে যে, আমি লুকিয়ে হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’র কাহিনি অবলম্বনে একটি উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা করেছিলাম। এমনকি আমার ওই উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টায় যে চরিত্রগুলো ছিলো সেগুলোর নামও হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রের নামগুলোর কাছাকাছি ছিলো, এবং আমি সেই উপন্যাস-প্রচেষ্টার নাম দেই ‘নিন্দিত নরকে’, এবং আমিও হুমায়ূন আহমেদের মতো উত্তম পুরুষে লিখেছিলাম।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করা যায় প্রথম জীবনে হুমায়ূন আহমেদ দ্বারা আমি কীভাবে প্রভাবিত হয়েছি।

এরপর একসময় খেয়াল করলাম টেলিভিশনে শুক্রবারে নিয়মিত একটা নাটক হতো, তার নাম ‘এইসব দিনরাত্রি’। আমরা বেশ উৎসাহের সঙ্গে সেটা দেখতাম, আমার ধারণা এই নাটকটির বহুল দর্শকপ্রিয়তার হাত ধরেই পরবর্তীকালে হুমায়ূন আহমেদের কথাসাহিত্যিক, উপন্যাসিক, গল্পকার বা লেখক হিসেবে যে জনপ্রিয়তা, তার শুরু হয়। এর আগে ব্যাপারটা এরকম ছিলো না।

পড়ার ব্যাপারে আমার যা হয়, হাতের কাছে যা পাই, তাইই পড়ে ফেলি, অনেক সময় বাছ-বিচার করতে ইচ্ছে হয় না। এটা সত্য যে হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়তে টেলিভিশন নাটক দেখার মতই খুবই আনন্দ  পেতাম বলে তার লেখা প্রচুর বই পড়েছি। আমি একবার হিসাব করে দেখেছিলাম যে তার রচিত বইয়ের সিংহভাগই আমার পড়া। নাম ধরে ধরে বললেও আমি বলতে পারবো, এমনকি শেষ দিকের লেখাও যেগুলো আকৃতিতে বড়, সেগুলোও আমি পড়েছি, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’-এর পরের বইগুলোর কথা বলছি, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ তো প্রথমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতায়, পরে কয়েক কিস্তি ছাপা হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় এবং এর বেশ পরে বই আকারে বের হয়। তো ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘দেয়াল’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘বাদশাহ নামদার’, মানে যে বইগুলো একটু স্বাস্থ্যবান, খেয়াল করে দেখেছি সেগুলোও আমার পড়া।

কিন্তু পরবর্তীতে আরও পঠন-পাঠনের পর আমার যেটা মনে হয় সেটা হলো যে, কাহিনি-কথন পড়া খুব আনন্দদায়ক, কিন্তু এক নিশ্বাসে পড়ার মতো কাহিনি বলা আর উপন্যাস, এ দুটি কোনোভাবেই এক জিনিস নয়। আর এটাই আমার উপলব্ধি। আমি কিন্তু আকৃতি ছোট বা বড় নিয়ে কোনো কথা বলছি না। আকৃতি এখানে কোনো বিষয় নয়, তবে উপন্যাস বলতে আমরা যে শিল্পটি বুঝি, সেটি কেবলমাত্র একটি অসাধারণ কাহিনি, যা পড়ে আমরা আনন্দ পাই তা কেবল নয়, উপন্যাস হলো কাহিনির বাইরেও আরও অনেক কিছু। আর এই দিক থেকে বলতে গেলে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে কাহিনির বাইরে আর বিশেষ কিছু আছে বা তিনি করতে পেরেছেন বলে এখন আর আমার মনে হয় না। এমনকি যদি ‘নন্দিত নরকে’ বা ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নিয়ে কথা বলি, বলবো, সেসব অসাধারণ লেখা। যদি আমরা সেটাকে নভেলা বলি, ঠিক উপন্যাস নয়—আর সেদিক দিয়ে সেগুলো খুবই অসাধারণ, কিন্তু উপন্যাস বলতে যে জিনিসটি বুঝি সেটা আমি খুঁজে পাই না। তবে সেটা কিন্তু যায় আসে না একজন লেখকের। আর সঙ্গে সঙ্গে একথা বলার প্রয়োজন যে, হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস হিসেবে যে লেখাগুলো লিখেছেন এরকম হুমায়ূন আহমেদীয় লেখা কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এর আগে লেখা হয়নি, এবং এই লেখাগুলো পাঠকের মনেও প্রভাব বিস্তার করেছে।

এবার যদি হুমায়ূন আহমদের ছোটগল্পের প্রসঙ্গে আসি, তাহলে প্রথমে বলবো, পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষায় অনেক কাহিনি লেখা হয়েছে, সেগুলো পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে, কিন্তু অনেক সময় রবীন্দ্রনাথ কিংবা চেখভের সঙ্গে তুলনা করে আমরা সেগুলোকে ছোটগল্প বলি না। আর সেদিক থেকে, এই তুলনার মধ্যে গিয়ে আমার মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ খুব বড় মাপের ছোটগল্প লেখক। ছোটগল্প লেখার তার যে কৌশল তা অসাধারণ, আঁটসাঁট বুননে তিনি বেশকিছু ভালো ছোটগল্প লিখেছেন। ছোটগল্পের গদ্যের ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ একটিও বাহুল্য শব্দ ব্যবহার করেননি, সেটা আমার বলতেই হবে। তিনি তার ছোটগল্পে আঁটসাঁট বুননে ঠিক যে কথাটিই বলতে চান সে কথাটিই বলেন, তার মধ্যে কখনো কৌতুকপূর্ণ বাক্য থাকে, বাক্যের ভেতরে প্রচুর ইঙ্গিত থাকে যেটা তার উপন্যাস নামক যে দীর্ঘগল্পগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় না। বরং আমার ধারণা, সেগুলোর কাঠামো বা কায়দা কিছুটা এলিয়ে যেত, অপ্রাসঙ্গিকতা আসতো, কিন্তু তার ছোটগল্পের ক্ষেত্রে এটা কখনোই হয়নি। এখনো মনে আছে, প্রথম দিকে তার একটি বই পড়েছিলাম, সম্ভবত ‘নিশিকাব্য’ বা ‘শীত ও অন্যান্য গল্প’ সেখান থেকেই কয়েকটি গল্প আমাকে খুব আলোড়িত করে, এর পরে আমি তার ছোটগল্পের খুবই সমঝদার পাঠক হয়ে যাই, খুবই খেয়াল করে মনোযোগ দিয়ে আমি তার ছোটগল্প পড়েছি এবং পড়ি এখনো। আমার মতে শিল্পের নিরিখে তিনি বাংলা ভাষায় বেশকিছু সফল ছোটগল্প লিখেছেন। যদি নাম করে বলি—‘মৃত্যুগন্ধ’, ‘১৯৭১’—আমার ধারণা এই গল্পটিকেই পরবর্তীতে উপন্যাস আকারে লিখেছেন, যদিও এটা কেবল আমার ধারণা। তারপরে ‘চোখ’, ‘খাদক’, ‘জলিল সাহেবের পিটিশান’—যেটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলা গদ্যে অসাধারণ সংযোজন।

সে কারণে সব মিলিয়ে সাহিত্যের বিচারে আমার বলবো হুমায়ূন আহমেদ ছোটগল্প লেখক হিসেবে খুবই সফল।   

শ্রুতিলিখন : আশিকুর রহমান

//জেডএস//

লাইভ

টপ