X
সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪
৯ আষাঢ় ১৪৩১

মাঠ প্রশাসনে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের লাগাম টানবে সরকার

শফিকুল ইসলাম
০৪ মে ২০২৪, ২৩:৫৯আপডেট : ০৫ মে ২০২৪, ১৫:৫৯

মাঠ প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছে সরকার। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় প্রজাতন্ত্রের কয়েকজন কর্মচারীর আচরণ ও ব্যবহারে বিব্রত পুরো প্রশাসন। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্ম নিচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ভালো যেকোনও উদ্যোগ কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে নষ্ট হোক, সরকার তা হতে দেবে না। তাই যেকোনও উপায়ে হোক সরকার এবার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশি মনোযোগী। তাই এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের ওপর মহল কিছুটা কঠোর হওয়ার পরিকল্পনা করছে।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় কমিশনারদের সমন্বয় সভায় বলা হয়, মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যেন উপজেলা বা জেলা প্রশাসনে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সংযত ও মানবিক আচরণ করেন। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) আচরণ নিয়ে ওই সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে বিভাগীয় কমিশনারদেরও নিয়মিত তদারকি বা কাউন্সেলিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইদানীং মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে, এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের এমন আচরণে সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ ম্লান হয়ে যাচ্ছে, যা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। গত মাসে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪১তম বিসিএস উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে খোলাখুলিভাবে বিষয়টি অবহিত করেছেন কয়েকজন বিভাগীয় কমিশনার। তারা নিয়োগপ্রাপ্ত নবীন কর্মকর্তাদের বলেছেন, প্রজতন্ত্রের কর্মচারীরা দেশের সাধারণ মানুষের সেবক, এটি মনে রেখেই যেন দায়িত্ব পালন করেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা এখন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নিজেদের ক্ষমতাবান ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় তারা আর ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে পারছেন না। অনেক কর্মকর্তা তো প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন, চাকরি ছেড়ে মাঠের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবেন। অনেকে এলাকার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করছেন আগামী দিনের ফায়দা লোটার অভিপ্রায়ে। অনেকে তো স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও আমলে নিতে চাইছেন না। এসব কারণে সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহারের ঘটনা বেড়েই চলছে।

সংবাদমাধ্যমে এসব ঘটনা উঠে আসায় সরকারকেও বিব্রত হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই সরকারের নীতিনির্ধারকরা মাঠ প্রশাসনে বিতর্কিত ঘটনা রোধে অতি উৎসাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার পথে এগোচ্ছেন। তারা প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড সুদৃঢ় রাখতে যেকোনও পদক্ষেপ নিতে চাইছেন।

নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় শেরপুরের নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা সাদিয়া উম্মুল বানিন, একই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিহাবুল আরিফ, লালমনিরহাট সদরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল নোমান, মানিকগঞ্জের সিংগাইয়ের ইউএনও রুনা লায়লা, বগুড়ার আদমদিঘী ইউএনও সীমা শারমীনের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এসব কর্তাব্যক্তির আচরণে সরকার বিব্রত বলে জানা গেছে।

এর আগে খুলনা, জামালপুর ও কুড়িগ্রামের ডিসিদের আচরণেও সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না নির্বাহী বিভাগ। ফলে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে তৎপর হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মনে করে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ খুবই দুঃখজনক। জনগণকে সেবা দিতে তাদের আন্তরিক হতে হবে। সব নাগরিকের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে চাকরিবিধি অনুসরণ করে কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না। এর বাইরে কেউ যদি শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করেন, তাহলে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। এরপরও কেউ যদি কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, তাহলে তাদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার নৈতিক সুযোগ নেই। চাকরিবিধি অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা ও বিভাগীয় সংশোধনের বিষয়ে জোর দিতে হবে। কোনও ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করা যাবে না।

গত ৫ মার্চ একটি প্রকল্পের তথ্য চেয়ে শেরপুরের নকলা ইউএনও কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানা। এ সময় আবেদন প্রাপ্তিস্বীকার অনুলিপি চান তিনি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী এ ধরনের আবেদন বৈধ ও যৌক্তিক হওয়ার পরও এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন নকলা ইউএনও ৩৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা সাদিয়া উম্মুল বানিন। অসদাচরণের অভিযোগে ইউএনওর নির্দেশে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিহাবুল আরিফ ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে রানাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। পরে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে তথ্য কমিশন স্বপ্রণোদিতভাবে অনুসন্ধান করে। ঘটনাটি সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। যদিও গত ১৫ এপ্রিল শিহাবুল আরিফকে জামালপুর সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারকারী দ্বারা অপরাধের তুলনায় বদলি যথেষ্ট পরিমাণের শাস্তি নয় বলে মনে করেন সুশীল সমাজের অনেকে।

চলতি বছরের ১৪ মার্চ লালমনিরহাটের সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল নোমানের হাতে ভূমি অফিসে গিয়ে হেনস্তা হতে হয় স্থানীয় পাঁচ সংবাদকর্মীকে। জমি খারিজসংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে নোমান তাদের তালাবদ্ধ করে রাখেন। এ ঘটনাও সরকারকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দেয়। পরে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার হাবিবুর রহমান নোমানকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় বদলি করে বিতর্কের অবসান ঘটান।

গত বছর মানিকগঞ্জের সিংগাইয়ের ইউএনও রুনা লায়লাকে ‘স্যার’ না বলে ‘আপা’ সম্বোধন করায় পুলিশ দিয়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীকে পেটানোর ঘটনা ঘটান। ইউএনও কার্যালয়ের বাগানের ফুল ছাগল খেয়ে ফেলায় ছাগলের মালিককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করে সমালোচনায় পড়েন বগুড়ার আদমদিঘী ইউএনও সীমা শারমীন। এ ছাড়া খুলনা ও জামালপুরের ডিসিদের নিজ অফিসের নারী কর্মচারীর সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলকে লজ্জায় ফেলে দেয়।

জনপ্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উপসচিব পদে পদোন্নতির অন্তত তিন বছর পর জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়ন করা হতো। প্রশাসনে চাকরির সময়সীমা ১৫ থেকে ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাদের ডিসি পদে পদায়ন করা হতো। আবার কমপক্ষে ১১ থেকে ১২ বছর চাকরি করার পর পদায়ন করা হতো ইউএনও পদে। কিন্তু বর্তমানে মাঠ প্রশাসনে চাকরির ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে অনেকেই ইউএনও হয়ে যাচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেকে ডিসির দায়িত্ব পাচ্ছেন। এভাবে পরিণত হওয়ার আগেই অধিকাংশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পেয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্কিত ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা বলে কোনও শব্দ নেই। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনমানুষের সেবা দেওয়াই প্রধান কাজ হওয়া উচিত। নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোই উচিত। কেউ যদি রাজনীতি করতে চান, তাহলে চাকরি ছেড়ে সরকারের বিদ্যমান আইন ফলো করেই করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ সংবিধান পরিপন্থি তো বটেই, সেই সঙ্গে তাদের চাকরিবিধিরও পরিপন্থি। ইদানীং এদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এটি এখনই ঠেকানো প্রয়োজন।

অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন, প্রজাতন্ত্রের সব কর্মকর্তা খারাপ নন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অন্যায়ের জন্য তাদের কোনও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। এটি পরবর্তী অন্যায় করার ক্ষেত্রে তাকে উৎসাহিত করে। মফস্বলে ট্রফি ভাঙা ইউনওকে বদলি করে ঢাকায় এনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত হবে না। প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারী দেশের সব সাধারণ নাগরিককে সেবা দিতে বাধ্য। এর ব্যত্যয় ঘটার কোনও সুযোগ নেই। সাধারণ নাগরিকদের সেবা দিতে মাঠ প্রশাসনের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। সচিবালয় থেকেও বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনারদেরও মাঠ প্রশাসনে নজর রাখতে বলা হয়েছে।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
আজ খুলছে অফিস আদালত, চলবে নতুন সময়সূচিতে
কাঁচা চামড়ার কদর এবার কিছুটা বাড়বে
সাত সচিবের দফতর বদল
সর্বশেষ খবর
খিলগাঁওয়ে ট্রেনে কাটা পড়া শিশু রাবিয়া মারা গেছে
খিলগাঁওয়ে ট্রেনে কাটা পড়া শিশু রাবিয়া মারা গেছে
শেষ মুহূর্তের গোলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন জার্মানি
শেষ মুহূর্তের গোলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন জার্মানি
সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা 
সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা 
ওসিকে ধাক্কা দিয়ে চাকরি হারালেন সেই এএসআই
ওসিকে ধাক্কা দিয়ে চাকরি হারালেন সেই এএসআই
সর্বাধিক পঠিত
ভারত, অস্ট্রেলিয়া, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ
ভারত, অস্ট্রেলিয়া, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ
হিজবুল্লাহ’য় যোগ দিতে ইচ্ছুক ইরান-সমর্থিত হাজারো যোদ্ধা
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধহিজবুল্লাহ’য় যোগ দিতে ইচ্ছুক ইরান-সমর্থিত হাজারো যোদ্ধা
খালেদা জিয়ার হার্টে পেসমেকার লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে: আইনমন্ত্রী
খালেদা জিয়ার হার্টে পেসমেকার লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে: আইনমন্ত্রী
ইসরায়েলি বন্দরে চারটি জাহাজে হামলার দাবি হুথিদের
ইসরায়েলি বন্দরে চারটি জাহাজে হামলার দাবি হুথিদের
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে বিশেষ ট্রেনটি বন্ধ হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি 
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে বিশেষ ট্রেনটি বন্ধ হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি