হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার

Send
অনুবাদ : আদিত্য শংকর
প্রকাশিত : ১৪:৪৬, জুলাই ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫২, জুলাই ২৮, ২০২০

জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি তার প্রথম উপন্যাস ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’-এর প্রকাশনার ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে কিয়োডো নিউজে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ ও তার লেখার বিবর্তন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে হিংস্রতার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। মুরাকামির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাহিত্য সমালোচক ইয়ুটাকা ইয়ুকাওয়া এবং কিয়োডো নিউজের ফিচার লেখক এটসুরো কয়ামা।৪০ বছর ধরে আপনি লেখালেখি করছেন। এটা আপনার জন্য একটি বড় অর্জন, তাই নয় কি?

হারুকি মুরাকামি : ঠিক ৪০ বছর আগে, মে মাসে আমি ‘গুঞ্জ এওয়ার্ড ফর নিউ রাইটার্স’ সম্মাননা পাই। আমার যতটুকু মনে পড়ে, মে মাসের ৮ তারিখে টোকিও’র সিম্বাসি এলাকার ডাই-ইচি হোটেলে সম্মাননা প্রদানের অনুষ্ঠানটি হয়েছিলো। প্রতি ১০ বছরে আমি টার্নিং পয়েন্ট পেয়ে থাকি। প্রতিটি টার্নিং পয়েন্টে আমার লেখার ধরন এবং গল্পের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে। প্রতিবার নতুন একটি লক্ষ্য থাকে, যার কারণে লেখালেখিতে আমি কখনই অবসাদ বোধ করি না। আমি এটাকে ভালোই মনে করি।

 

সম্প্রতি আপনার নতুন উপন্যাস ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ পেপারব্যাক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আপনার নতুন উপন্যাসটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুরাকামি : উপন্যাসটি শুরু করেছিলাম একটি শিরোনাম দিয়ে। যা অবশ্যই মোজার্টের অপেরা ‘ডন জোভানি’ থেকে নেওয়া, কিন্তু ‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এর শব্দগুলোর এক অচেনা ক্লান্তিহীন প্রতিধ্বনিই আমাকে আকৃষ্ট করেছিলো এবং আমি ভাবলাম, আমি এই শিরোনামেই জাপানের আবহ ধরে রেখে যদি একটা গল্প লিখতে পারি, ব্যস এভাবেই শুরু।

 

তাহলে এটা কেবল শিরোনাম থেকেই শুরু হয়েছে?

মুরাকামি : একই ঘটনা ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এর ক্ষেত্রেও হয়েছিলো। আমি প্রথমে শিরোনাম নিয়ে ভাবি। এরপর গল্পটা কেমন হবে তা নিয়ে ভাবি, তারপর লেখা শুরু করি। এ কারণে লিখতে আমার এতো সময় লাগে। কিন্তু ‘নরওয়েজিয়ান উড’ এর ব্যতিক্রম ছিলো, এটা লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিরোনাম নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি।

 

আমার মনে পড়ে, ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর ক্ষেত্রে আরেকটি সম্ভাব্য শিরোনাম ছিলো ‘দ্য গার্ডেন ইন দ্য রেইন’…

মুরাকামি : আর ‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এর জন্য আমি ভাবলাম, উয়েদা আকিনারির (১৮ শতকের লেখক) ‘নিশে নো ইনিশি’র (ফেট ওভার টু জেনারেশনস) গল্পের কিছু উপাদান যদি দিতে পারি।

 

আপনি মনে হয় ‘হারুসামে মোনোগাটারি (বসন্তকালীন বৃষ্টির গল্পসমগ্র)’ থেকে একটি গল্পের কথা বলছেন, যেখানে কবর থেকে ‘সকুশীনবুতসু (বৌদ্ধ মমি)’ তোলার কথা বলা হয়েছে। সেটা নয় কি?

মুরাকামি : উত্তরপূর্ব তোওহোকু অঞ্চলে ভ্রমণের সময়ে আমি অনেক মমি দেখেছি। কিয়োটোতে থাকাকালীন সময়ে একটি বইয়ের দোকানে একটা বই পড়েছিলাম। সেখানে কীভাবে মমি বানানো হতো তা ব্যখ্যা করা হয়েছিলো।

 

উয়েদার গল্পগুলো নিয়ে আরও একটি গল্পসমগ্র ছিলো ‘উগেতসু মনোগাতারি (জ্যোৎস্না ও বৃষ্টির গল্পসমগ্র)’, যা ‘কাফকা অন দ্য শোর’ বইয়েও উঠে এসেছে, তাই না?

মুরাকামি : আমার কাছে আকিনারির গল্প ভালো লাগে। বিশেষ করে ‘নিশে নো এনিশি’ গল্পটা। গল্পটার মানে হলো, একজন মমিকৃত বৌদ্ধ ভিক্ষুককে কবর থেকে তুলে এনে জীবন দান করার পর দেখা যায়, বৌদ্ধ ভিক্ষুকটি কোনো কাজে আসার মতো মানুষে পরিণত হওয়া। উয়েদা আকিনারি দুনিয়াকে নিয়ে বিদ্রূপ করতেন তাই তিনি এমন গল্প লিখতেন। যা কিনা স্বাভাবিক অতিপ্রাকৃতিক গল্পের মতো হয় না।

 

হুমমম, বুঝলাম।

মুরাকামি : আমার বাবার বাড়ি হচ্ছে কিয়োটো শহরের জোডো-শু (প্রকৃত গ্রামের স্কুল বলতে যা বোঝায়)-এর একটি বৌদ্ধ মন্দিরে। বাবা যেদিন মারা যান, মন্দিরের পুরোহিত বৌদ্ধসূত্র পাঠ করছিলেন। ওনার সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে জানতে পারলাম যে, এই মন্দিরের নিচে আকিনারির সমাধি আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, সমাধিটি দেখাতে পারবেন কিনা। তিনি নিয়ে গেলেন। সমাধির উপর কাঁকড়া খোঁদাই দেখে আমি এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আকিনারি মানববিদ্বেষী ছিলেন। তাই তার শেষ ইচ্ছে ছিলো, এমন কিছু দিয়ে তার সমাধি খোঁদাই হোক, যা কিনা পাশ দিয়ে হাঁটে।

 

গল্পটা অনেক সুন্দর।

মুরাকামি : মন্দিরটি আকিনারির শেষ বয়সেও, তার দেখাশুনা করেছিলো।

 

আপনার ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ উপন্যাসের সঙ্গে আকিনারির ‘নিশে নো ইনিশি’-র সাথে একটু মিল পাওয়া যায়। ‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এর নায়ক যখন তার বাড়ির ঝোপের নিচে গর্ত খোঁড়াচ্ছিল, তখন পুরাতন একটি গর্ত তার সামনে চলে আসে।

মুরাকামি : আমার গল্পের বিষয়সমূহ আসলে আমাদের অবচেতন মনকে দেখার জন্য প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আমরা যখন আমাদের চেতন মনের খুব গভীরে যাই, তখন আমরা একদম শেষ দিকে, খারাপ জীবে পরিপূর্ণ এক অদ্ভুত জগতে যাওয়ার পথ খুঁজে পাই। সবশেষে, সেই অন্ধকার জগৎ থেকে আমরা ফিরে আসার জন্য আমাদের সহজাত বুদ্ধির উপর নির্ভর করি, তাই না? আমাদের সচেতনতার দিকগুলোকে ধারালো করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকে না এবং আমরা আমাদের সহজাত বুদ্ধির কাছে আত্মসমর্পন করি। আমরা লজিক বা পূর্বের উদাহরণের ওপর নির্ভর থাকতে পারি না, কারণ, একভাবে এটা খুবই বিপদজনক।

‘অ্যা ওয়াইল্ড শীপ চেস’ গল্পে ‘শীপ ম্যান’ ছিলো। ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকেল’-এ কুয়োর ওপাশের দুনিয়া ছিলো। ‘হার্ড-বোয়েল্ড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’-এ ‘ইনকিলিংস’ ছিলো। আর এখন আমাদের আছে ‘দ্য কমেন্ডেটর’।

 

কমেন্ডেটরকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তার আবির্ভাবের জন্য আমি খুব করে বইটা পড়েছি। যেহেতু তার আকার প্রায় ৬০ সেন্টিমিটারের মতো, তাকে খুব চোখে পড়ার মতো লেগেছিলো।

মুরাকামি : যদি সে অতিকায় হতো তাহলে তার সাথে কাজ করাটা কঠিন হতো এবং তাকে দেখতেও ভীতিকর লাগতো। যেহেতু সে ছোট আর আঁটোসাঁটো, তাই সে সহজেই আমাদের মনে ধরে যায়। সবকিছুই যেন আনুপাতিকভাবে ছোট হয়ে যায়। দৈনন্দিন জীবনে তার উপস্থিতি আছে কিন্তু আলাদাভাবে।

 

কেএফসির মাসকট কর্নেল স্যান্ডার্স এবং জনি ওয়াকারের মতো ‘কাফকা অন দ্য সোর’-এ অ-মানব আছে। কিন্তু এবারই মনে হয় প্রথম যে, অ-মানব চরিত্রটি গল্পের সঙ্গে সঙ্গে অনেকবার উপস্থাপিত হয়েছে।

মুরাকামি : হ্যাঁ, এটা সত্য যে, কমেন্ডেটর ছাড়া অন্য অ-মানব চরিত্রদের, গল্পের প্রয়োজনে এতোবার উপস্থাপন করা হয়নি।

 

কমেন্ডেটর নিজেকে একটি ‘আদর্শ’ হিসেবে পরিচয় দেয়। সহজ করে বললে, একটি ধারণা।

মুরাকামি : তা ঠিক। কিন্তু আমি মনে করি না যে, এই একটি কথা দিয়েই তাকে বোঝানো হবে। উপন্যাসটি লেখা শেষ করার পর আমি এটা নিয়ে ভেবেছিলাম, আমি মনে করি যে, কমেন্ডেটর হলো প্রধান চরিত্রের কতগুলো ভিন্ন সত্তার মিশ্রণ। আমার এটাও মনে হয় যে, সে হলো প্রতিটি চরিত্রের প্রতিরূপ অথবা এমনও হতে পারে যে, সে হলো অতীতের কোনো বার্তাবাহক। যাই হোক, এগুলো আমার মতে সম্ভাব্য চিন্তা, যদিও এই ধারণাগুলো সঠিক কিনা তা আমি নিজেও নিশ্চিত নই। তাই, আমি এটা পাঠকের উপর ছেড়ে দিচ্ছি।

 

আপনি এটাও লিখেছেন যে, কমেন্ডেটর এক প্রকারের প্রাকৃতিক ধারণা।

মুরাকামি : আমি এটা বলবো না যে—সে ভালো, এমনকি এটাও বলছি না যে, সে খারাপ। আমি তাকে একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে মনে করি, যে কিনা সেসব মূল্যবোধের উর্দ্ধে গিয়েছে। সে সবার কাছে দৃশ্যমান নয়। তবে যারা তাকে দেখতে পারে, তাদের কাছেই দৃশ্যমান হয়।

 

ভাষাগত দিক থেকে দ্য কমেন্ডেটরের বাচনের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সে বলে ‘আরানাই’ (ইংরেজি বইতে একে ‘না’ শব্দে অনুবাদ করা হয়েছে, কিন্তু জাপানিজ ভাষায় ‘আরু’ মানে ‘হয়’ এবং ‘নাই’ মানে ‘নয়’, এই দুটি শব্দ মিলে উৎপত্তি হয়েছে। এমনকি সে যখন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে তখন সে সবসময় ওই মানুষকে ‘সকুন’ (ইংরেজি অনূদিত বইয়ে ‘আমার বন্ধুরা’) হিসেবে অভিহিত করে।

মুরাকামি : ওই শব্দগুলো সঠিকভাবে অনুবাদ করার সময় অনুবাদকদের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে।

 

গল্পের নায়ক, যাকে কিনা ‘আমার বন্ধুরা’ হিসেবে অবহিত করা হয়, সে মনে করে যে, কমেন্ডেটরের পুরুষ এবং বচন সম্পর্কে কোনো ধারণা বহন করে না, এবং ‘আরানাই’ হচ্ছে ‘আরু’র নেতিবাচক শব্দ যা ইঙ্গিত দেয় যে, কমেন্ডেটর হলো একটি ধারণাগত সত্তা।

মুরাকামি : এটা সত্য। এমনকি এটাও মনে হয় যে, এটা জার্মান দর্শনের অনুবাদের মতো মনে হয়। জার্মান ভাষায় ‘আরানাই’ শব্দটি মনে হবে ‘নিট শায়েন’ (হবে না)। আমি বহু বছর ধরে অনুবাদ করে আসছি, তাই শব্দকে নানাভাবে ব্যবহার করাটা আমার কাছে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই সেসব শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবে আমার মনে আসবে। শব্দের প্রতিধ্বনিও আমার আছে গুরুত্বপূর্ণ। সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে।

 

আপনি অনেক অনুবাদ করেন এবং প্রায় সময়ই  বিদেশে যাওয়া আসা করেন। আপনি বিদেশেও অনেক বছর থেকেছেন। তারপরেও আপনার সকল উপন্যাসের স্থান জাপান, এমনকি ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ও এর ব্যতিক্রম নয়।

মুরাকামি : আমি যেহেতু ‘ভেতর’ এবং ‘বাহির’-এর মধ্যে বিনিময় করতে পছন্দ করি, তাই এমন হয়েছে। এই উপন্যাসের কমেন্ডেটরের কথাই ধরুন—যাকে কিনা পশ্চিমা মানুষের মতো হবার কথা ছিলো—সে কিনা প্রাচীন আসুকা আমলের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতকের জাপানিজ পোশাক পরে আবির্ভূত হয়েছে। এই অনৈক্যের কারণে পাঠক মুগ্ধ হবেন, এমনকি কৌতূহলীও হবেন। সে যদি ডন জোভানির মতো পোশাক পরত তাহলে আর গল্প হতো না।

 

এটা খানিকটা সত্য।

মুরাকামি : আমি যখন লেখালেখি শুরু করেছিলাম তখন অনেক উপন্যাসই বিদেশের পরিবেশ নিয়ে লেখা হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে সেগুলো তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি। বরং ব্যাখ্যা বিনিময় বা আত্মিক অদল-বদলের কাজটি একজন কীভাবে করবে, এটাই আমাকে আকর্ষিত করতো। প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য শৈলী নিয়ে এ কাজটি করা খুব কঠিন ছিলো, তাই সাহিত্যিক অভিধানকে পুনর্বিন্যাস করার প্রয়োজন ছিলো।

 

এবং যে কাজগুলো জাপানের পরিবেশে হয়েছিলো, পরবর্তিতকালে সেগুলো বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মুরাকামি : আমি মনে করি, এটা আসলে ‘চিন্তা’ বা ‘ধারণা’-কে প্রকাশ করে। কমেন্ডেটর প্রাচীন জাপানিজ পোশাক পড়ে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও ওখানে মানিয়ে যেতে পারবে। অন্যদিকে আপনি সেই একই ধারণা চিন্তা করেন কিন্তু একটি দেশের ভাষার শব্দকোষের কারণে ধারণাটার ব্যাখাই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। আমি যখন লিখি তখন আমি চিন্তা করি আমার ধারণা কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং খানিকটা মিলে যায়।

 

উপন্যাসের শিরোনাম বলে দেয়, কমেন্ডেটরকে এই উপন্যাসে মারা হয়। ‘ডন জোভানি’ অপেরার শুরুতে কমেন্ডেটর মারা যায় এবং আপনার উপন্যাসেও সে আবার খুন হয়।

মুরাকামি : আমার মনে হয় এবারই প্রথম ‘kill’ শব্দটি আমি আমার কোনো বইয়ের শিরোনামে ব্যবহার করেছি। ‘নরোয়েজিয়ান উড’-এর কথাই ধরুন, এই উপন্যাসে কিছু চরিত্রই আছে যারা কিনা আত্মহত্যা করে।। কিন্তু এরা নিজেদেরই হত্যা করছে। সেই গল্পে মৃত্যু, আসলে খুনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অর্থ আছে।

‘হার্ড-বয়েল্ড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ ‘দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ প্রবেশ করা আর মরণ একই কথা। ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এর নায়ক যখন গভীর বনের মধ্যে হাঁটছে, তখন সে কিন্তু মৃত্যুপুরীর মধ্য দিয়েও হাঁটছে।

 

 ‘১ কিউ ৮৪’ উপন্যাসে, একটি কাল্ট দলের নেতা, তাকে খুন করতে উপন্যাসের নায়িকা আওমামের প্রেমিক ট্যাংগোকে বাঁচানোর উদ্দ্যেশে প্ররোচনা দিয়েছিলো। ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ উপন্যাসেও মারিয়া নামের হারিয়ে যাওয়া একটি মেয়েকে বাঁচানোর জন্য কমেন্ডেটর নায়ককে প্ররোচনা দিয়েছিলো তাকে খুন করার। আর নায়কও সাধারণ ছুরি দিয়ে তার ছোট হৃদয়ে ছুরিকাঘাত করে মেরে ফেলে।

মুরাকামি : অবশ্যই আমি এগুলো গল্পে উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু খুনের সময় শরীরে যা অনুভূত হয় তা গুরুত্বপূর্ণ। ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এ জনি অয়াকার স্ক্যাল্পেল দিয়ে বিড়ালটিকে মেরেছিলো। ফালা ফালা করে কাঁটার অনুভূতিটা গুরুত্বপূর্ণ যতক্ষণ না পর্যন্ত তা বাস্তবিক মনে হয়।

 

আপনি কি আরেকটু বুঝিয়ে বলবেন?

মুরাকামি : পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় যে, হত্যাকাণ্ড থেকে নতুন কিছুর জন্ম দেয়। পিতৃহত্যা নিয়ে অনেক পৌরাণিক গল্প আছে। কাউকে মেরে কোনো প্রাণী নব জীবন পায়। এরকম গল্প অনেক পুরাণে আছে। এই ধরুন, দেহাবশেষ থেকে নতুন কুঁড়ির জন্ম হয়। এরকম অনেক গল্প জাপানের ‘কোজিকি (প্রাচীন বিষয়ের দলিল)’-এ আছে।

 

তাহলে এটা হচ্ছে মৃত্যু এবং পূর্ণজন্ম নিয়েই?

মুরাকামি : বাস্তবে আমরা রক্ত-মাংসে গড়া মানুষকে হত্যা করতে পারি না। কিন্তু ‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এর মতো গল্পের মাধ্যমে মানুষ হত্যা বা খুনের অভিজ্ঞতা নিতে পারে। গল্পের এটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, আর বিশেষ করে এই গল্পটায় কমেন্ডেটরকে হত্যা করাটাই একটা ধারণা হিসেবে মূর্তিমান হয়, যা কিনা প্রতীকী কাজ হিসেবে প্রয়োজন।

 

এরকম ঘটনা কি আপনার অন্যান্য গল্পেও আছে?

মুরাকামি : আমি যখন থেকেই উপন্যাস লেখা শুরু করি আমার একটাই উদ্দেশ্য ছিলো যে, আমি আমার শব্দ দিয়ে পাঠকদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটাবো। যেমন, অনেক পাঠকই আমাকে বলেছেন যে, তারা ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ উপন্যাস শেষ করার পর বিয়ার পান করতে চেয়েছিলেন। পাঠকের এমন প্রতিক্রিয়া পেয়ে লেখক হিসেবে আমার খুব ভালো লেগেছে।

 

‘নওরোজিয়ান উড’-এ কি একই রকম ঘটনা?

মুরাকামি : ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর ক্ষেত্রে আমি রতিক্রিয়া করার সময় যে শারীরিক অনুভূতি পাওয়া যায় তা বাস্তবিক করার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। এটার জন্য আমাকে অনেকেই অপছন্দ করেছে, এমনকি আমি অনেকের সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু পাঠকের কাছে সেই অনুভূতিগুলো বাস্তবিক করাটাই আমার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এটা ছাড়া আমি গল্প লিখতে পারতাম না। আমি মনে করি যে, আমার অনূদিত রেমন্ড কার্ভারের গল্পগুলো ছাড়া, এখানে খুব কম জাপানিজ উপন্যাস আছে যা কিনা শারীরিক অনুভূতিকে বাস্তবিকভাবেই বর্ণনা করে। আমি এদের থেকে অল্প অল্প করে শিখেছি।

 

‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এ ছুরি দিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত কমেন্ডেটরের রোগা শরীরকে ভেদ করতে থাকে যতক্ষণ না সেটা তার পিষ্ঠদেশে দেখা না যায়। তার সাদা কাপড় এবং নায়কের হাত সম্পূর্ণ রক্তে ভেজা ছিলো।

মুরাকামি : আমি মনে করি, গল্পের মাধমে ছুরি ধরার শারীরিক অনুভূতি, একটা মানুষকে ছুরিকাঘাত করা এবং রক্তের ছিটা মুখে পড়ার অনুভূতি পাঠকদের কেবলমাত্র উদ্দীপনা যোগায়। বাস্তবিক বিষয়গুলোর বর্ণনার মাধ্যমে কিছু বস্তুকে জীবন্ত করে তোলা যায়।

 

উপন্যাসের নায়ক একজন চিত্রশিল্পী যে কিনা তৈলচিত্র আঁকে।

মুরাকামি : আমি কখনো তৈলচিত্র আঁকিনি। আমি কেবলমাত্র পেইন্টিং সম্পর্কিত কিছু বই পড়ে উপন্যাসটি লিখেছি। উপন্যাসে ছবি আঁকার বর্ণনা নিয়ে আমি চিত্রশিল্পীদের প্রশ্ন করেছিলাম। তারা কোনো ভুল খুঁজে পায়নি। আমি মনে করি, শূন্য থেকে কোনো কিছু সৃষ্টি করার শক্তি পেইন্টিং এবং গল্প এই দুটোরই আছে।

 

গল্পের নায়ক যে বাড়িতে বাস করত, যা এক সময় জাপানের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী তোমোহিকো আমাদার ছিলো। তিনি যখন ভিয়েনায় পড়তেন, তখন নাৎসি বাহিনি কর্তৃক অস্ট্রিয়া জার্মানীর বর্ধিত অংশ হয়েছিলো। প্রায় একই সময়ে আমাদার ছোট ভাই সুঘুহিকো, নানজিং পতনের কারণে শুরু হওয়া দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের সময়ে সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিল। দুটো অভিজ্ঞতাই উপন্যাসে লেখা হয়েছে।

মুরাকামি : নায়ক যেখানে বাস করে, সেখান থেকে যখন কমেন্ডেটরকে কবর থেকে তোলা হলো ঠিক সেই সময় থেকে গল্পের প্লট এগিয়ে যেতে থাকে। এই গল্পটাই হচ্ছে অতীতকে খোঁড়া এবং পুনরায় জীবন দেওয়া।

 

আপনি বলেছিলেন যে, কমেন্ডেটর হলো অতীতের কোনো বার্তাবাহক।

মুরাকামি : আপনি কোনো কিছু ঢাকবার জন্য যত গভীর করে গর্ত খোদাই করুন না কেনো, একটা সময় সেটা গর্ত থেকে বের হয়ে আসবে। আমরা ইতিহাসের উপর ভর করে বেঁচে আছি। আমরা ইতিহাস ঢাকতে যত চেষ্টা করি না কেনো, তা একদিন প্রকাশ পাবে। আমি মনে করি, ইতিহাস হচ্ছে কতগুলো স্মৃতির সমষ্টি যার ভার আমাদের বহন করতে হবে।

 

আপনি ১৯৪৯ সালে, মানে যুদ্ধের পর জন্মগ্রহণ করেছেন।

মুরাকামি : আমি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলাম তখন মানুষের মনে নিজেদের মধ্যে খুন-খারাবি করার স্মৃতি কম আসতো। আমি এখনও খুব ভালো করে বলতে পারি যে, যুদ্ধটা খুব দ্রুত আমাদের মন থেকে চলে যেতে পারেনি। এখন মানুষ ভাবে যে তারা কঠিন মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু একটা সময় তারা দেখবে যে তাদের পায়ের নিচে আসলে কাদামাটি আছে।

 

আপনি কি মনে করেন, যুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে যে খুন-খারাপির যে মানসিকতা ছিলো তা বর্তমান সমাজে এখনও বিরাজ করছে?

মুরাকামি : আমি মনে করি আমাদের মনের গভীরে অনেক বিচিত্র প্রাণী নীরবে নিভৃতে বাস করছে। ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আমার লেখায় এদেরকে খুব সতর্কতার সাথে আচরণ করি।

আমাদের নিত্য জীবনে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য অনেকেই উৎসাহী হয়ে থাকে। আমাদের মনের খুব গভীরে হিংস্রতা উঁকি দিয়ে দেখে। মাঝে মাঝে আমি ভয় পাই যে, অতীতের কোনো বিষয় হয়তো জীবন ফিরে পাচ্ছে।

 

এরকম সমাজে একজন লেখকের ভূমিকা কেমন হবে?

মুরাকামি : আমরা, লেখকরা স্বাধীনভাবে আমাদের গল্পগুলো সৃষ্টি করে থাকি। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মধ্যে স্বাভাবিক নীতিশাস্ত্রের মূল কথাগুলো বজায় থাকবে। উপন্যাসিকদের একটি দায়বদ্ধতা আছে। খারাপের বর্ণনা যতই বিদঘুটে হোক না কেনো, উপন্যাসিকরা যেই ধারণা প্রদান করবেন সেটাই মৌলিক মান হয়ে দাঁড়াবে।

 

১৯৯৫ সালে টোকিও সাবওয়েতে সিরিন গ্যাস আক্রমণে ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড : দ্য টোকিও গ্যাস এ্যাটাক অ্যান্ড দ্য জাপানিজ সাইকি’ বইটি লিখেছেন। এই কুকর্মটি ওমু শিরিনকিও কাল্টের মাধ্যমে হয়েছে।

মুরাকামি : আমি যখন এটা লিখছিলাম, তখন আমি ভেবেছিলাম যে, উপন্যাসিক হিসেবে আমি একটি গল্প তৈরি করবো। যাতে করে, শোকো আসহারা (ওমু শিরিনকিওর নেতা) তার অনুসারীদের যার কথা বলেছিলো, তাকে যেন আমি হারাতে পারি। ওই সময়ে ওমু সক্রিয় ছিলো আর ধর্মও খুব শক্তিশালী ছিলো। কিন্তু এখন আমি মনে করি যে, ধর্মের থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ক্ষমতা অনেক বেশি। এখানে আদর্শ এবং ধারণাগুলো সরাসরি ছড়ানো যায়। আমি বলছি না যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো খারাপ, কিন্তু আমরা অবশ্যই ভুলে যাবো না যে, ওমুর মতো এরকম শক্তি এখনও বিদ্যমান আছে।

 

তাহলে কি আপনি বলতে চান, কিলিং কমেন্ডেটর এমনই একটি গল্প, যেখানে এমন শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলা হয়েছে?

মুরাকামি : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব আক্রমণ দেখা যায়, তা আসলে খণ্ড খণ্ড রূপে আমরা দেখতে পাই। এদের একে অপরের সাথে কোনো যোগসাজশ নেই। আমি নিজে মনে করি যে লম্বা গল্পগুলোই এদের থেকে ভালো। এদের মধ্যে কমপক্ষে কোনো খণ্ড খণ্ড রূপ নেই। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর মূল্য থাকতে হবে।

 

তাহলে এটাই গল্পের শক্তি?

মুরাকামি : আমি মনে করি, উপন্যাসের মাধ্যমে মানুষ আসল অভিজ্ঞতার মধ্যে যেতে পারবে। এই পৃথিবী কেমন হবে? এটা আসলে উপন্যাস পড়ার মাধমে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং দর্শনের উপর নির্ভর করে। আমি এমনসব গল্প লিখবো যা কিনা হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করবে। উপন্যাস যে ক্ষমতা রাখে তার উপর আমার অনেক আশা আছে।

 

‘কিলিং কমেন্ডেটর’ উপন্যাসে ওয়াটারু মেনসেকি নামে এক রহস্যময়ী ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর আবির্ভাব হয়। তার নামের অর্থ হলো ‘রং এড়ানো’, তাই অনেকের কাছে ‘কালারলেস সুকুরু আজাকি এ্যান্ড হিজ ইয়ারস অফ পিলগ্রিমেজ’-এর গল্প মনে পড়ে যায়।

মুরাকামি : হ্যাঁ, তা ঠিক এবং আমি সেটা বুঝতেও পারিনি। স্কট ফিটজেরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গেটসবি’র গেটসবিকে সম্মান দেখানোর জন্য মিনশিকি চরিত্রটি এনেছি।

 

গেটসবি এমন একটি জায়গায় বাস করে যেখানে সে তার ভালোবাসা ডেইজির বাসা দেখতে পায়। একইভাবে মিনশেকি ওদাওয়ারা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত পাহাড়ের উপর একটি ম্যানশনে বাস করে। সম্ভবত তার কন্যা মারিয়া যে বাসায় থাকে সেটা সে তার ম্যানশন থেকে দেখতে পায়।

মুরাকামি : ধনীদের ধনাঢ্য জীবন গেটসবিকে আকৃষ্ট করেছিলো বলে সে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে তার লক্ষ্যে পৌঁছেছে। উল্টো দিকে মেনসেকি সব সময়ই সাধারণ জীবন যাপন করতো। তাই তাদের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমি গেটসবি থেকে কেবল পরিবেশটা নিয়ে এসেছি।

 

মেনসেকি নায়কের কাছে এসেছিলো তার একটি প্রতিকৃতি অঙ্কনের জন্য। সে বলেছে যে, তার প্রতিকৃতি আঁকাটা হলো একটি ‘বিনিময়’। নিজেদের মধ্যে অংশ বিনিময়। গল্পের নায়ক তার মৃত বোন কোমিচির সাথে বিনিময় করলো, আর মারিয়াও এমন মিথস্ক্রিয়া অনুভব করেছিলো। ‘বিনিময়’ শব্দটা দারুণ প্রভাব ফেলেছে।

মুরাকামি : যেহেতু এই গল্পে সীমিত সংখ্যক চরিত্র আছে, তাই এদের মধ্যে আদান-প্রদানের সম্পর্ক না হলে গল্পটা তেমন একটা জমতো না। মেনসেকি হলো প্রথম ব্যক্তি যে কিনা প্রথম গর্ত করেছিলো। তা না হলে প্রথম দিকেই গল্প হতো না।

 

হ্যাঁ, তা ঠিক, মেনসেকি হলো প্রথম ব্যক্তি যে কিনা লেবারদের ডেকে এনে খোঁদাই করেছে।

মুরাকামি : এই যুক্তিতে বলা যায় যে, এই গল্পের যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। আমার আগের উপন্যাসগুলোতে চরিত্রদের মধ্যে তেমন কোনো যোগাযোগ ছিলো না। সেগুলো দুটি ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ককে পুঁজি করে লেখা হয়েছিলো। চরিত্রগুলোর মধ্যে তেমন কোনো মিথস্ক্রিয়া ছিলো এমন কি কিছু চরিত্রেরও নাম নেই। তাই আমি যত লিখেছি, তাতে অনেক মিথস্ক্রিয়া নিয়ে লিখতে পেরেছি। ‘কালারলেস সুকুরু আজাকি অ্যান্ড হিজ ইয়ারস অফ পিলগ্রিমেজ’-এ বহু ব্যক্তির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া দেখতে পারবেন।

 

‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এ খুব কম চরিত্র আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিলো বলে চরিত্রায়ন করা সম্ভব হয়েছে।

মুরাকামি : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক যে, নিজের কিছু না কিছু একটা আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারে। ‘নরওয়েজিয়ান উড’ উপন্যাসের আগে আমার যেসব উপন্যাস ছিলো, সেগুলোতে যোগাযোগের কাজটি এড়িয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ‘নরওয়েজিয়ান উড’ লেখার পর আমি অনুভব করলাম যে, আমি এমন এক দুনিয়া সৃষ্টি করেছি যেখানে মানুষ যোগাযোগ ছাড়া বাঁচতে পারে না।

 

‘কিলিং কমেন্ডেটর’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি উত্তম পুরষে বর্ণিত। অনেক বছর হয়ে গেছে যে, আপনার অন্যান্য কর্মে এমনটা দেখিনি।

মুরাকামি : আমি লেখালিখি শুরু করেছিলাম উত্তম পুরুষে বর্ণনা করে। তারপর আস্তে আস্তে তৃতীয় পুরুষে বর্ণনা করা শুরু করেছি।

 

আপনার উত্তম পুরুষে বর্ণিত যেসব উপন্যাস আছে তা চিত্তাকর্ষক ছিলো। কিন্তু আপনার ‘আফটার দ্য কোয়াক’ বইয়ে একটি গল্প আছে ১৯৯৫ সালের হানশিন ভূমিকম্পের উপর ভিত্তি করে লেখা, যেটা তৃতীয় ব্যক্তির বর্ণনায় লিখেছেন।

মুরাকামি : ‘১ কিউ ৮৪’ উপন্যাসটি অনেক বড়, যেটা তৃতীয় পুরুষে বর্ণনা করেছি। আর যখন আমি উপন্যাসটা লেখা শেষ করলাম, তখন আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, উত্তম পুরুষের বর্ণনায় আমি কী লিখতে পারবো।

 

উত্তম পুরুষের বর্ণনায় যা লেখা সম্ভব, তৃতীয় পুরুষের বর্ণনায় তা কি লেখা কঠিন ছিলো?

মুরাকামি : উত্তম পুরুষে স্বগতোক্তি দেওয়াটা সহজ। উত্তম পুরুষে অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে বর্ণনা করা সম্ভব আর পাঠকরাও অনেক কিছুই সহজে বুঝতে পারবে। পাঠকরা এমন করলে লেখক হিসেবে আমার কাছে ভালো লাগে।

 

আচ্ছা।

মুরাকামি : ‘দ্য গ্রেট গেটসবি’ কিন্তু উত্তম পুরুষে লেখা। এমনকি, আমার পছন্দের গল্প রেমন্ড সেন্ডেলারের ‘দ্য লং গুডবাই’ এবং জে. ডি. স্লিংগারের ‘ক্যাচার ইন দ্য রে’-ও উত্তম পুরুষে বর্ণিত। এইসব বইগুলো আমি অনুবাদ করেছি। আমি জানি না কেন।

 

‘কিলিং কমেন্ডেটর’ উপন্যাসের শুরুতে বলা হয়েছে যে, কাগজে কলমে নায়কের সাথে তার স্ত্রীর ডিভোর্স হয়েছিলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আবারও বিয়ে করলো।

মুরাকামি : উপন্যাসটার আসল উদ্দেশ্য হলো, নায়ক অন্ধকারে ঘোরাঘুরি করার পর নায়ক আবার যেখান থেকে শুরু করেছিলো সেখানে ফিরে যাওয়া, এটা অনেকটাই জাপানের ধর্মীয় চর্চাটাই নাই মেগুরির মতো। এটা আমি আমার পাঠক এবং নিজেকে শুরুতেই ইঙ্গিত করেছিলাম।

 

এটাই আপনার প্রথম উপন্যাস যেখানে আপনি উপসংহার দিয়ে শুরু করেছেন। তাই না?

মুরাকামি : হ্যাঁ এখনও পর্যন্ত এটাই প্রথম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে শুরু করবো। তাই আমি বিবৃতি দিয়েই শুরুটা করলাম।

 

আর আপনি শেষে লিখেছেন, ‘আমি মেনসেকির মতো হতে চাই না’ এবং ‘এই কারণে যে আমাকে বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতা আছে।’

মুরাকামি : মেনসেকি জানতো না যে মারিয়া কি আদৌ তার মেয়ে কিনা।

 

হয়তো বা সে জানতেও চায় না।

মুরাকামি : সে এটাও সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যে, সে বাইরের দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখবে কি রাখবে না। সে এটাও জানে না যে, সে কোনো কিছু করছে কিনা। সে মনে করে যে সে সব কিছুই করছে কিন্তু বাস্তবে সে আসলেই কিছু করছে না। মানে, সে সব সময়ই একটা দোলাচালের মধ্যে থাকে।

 

নায়ক কিন্তু এমন নয়।

মুরাকামি : নায়কের সঙ্গে মেনসেকির মূল পার্থক্য হলো, স্ত্রীর প্রতি নায়কের ভালোবাসা। নায়কের স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেলেও, স্ত্রীর প্রতি নায়কের সেই আগের ভালোবাসা কাজ করে। সে মনে করে যে, তার স্ত্রী যদি ফিরে আসে তাহলে সে আবার নতুন করে শুরু করতে পারবে। সে এই রকম অঙ্গিকার করেছে।

 

এটা করতে তাকে কোন বিষয়টি উৎসাহ দেয়?

মুরাকামি : অবশ্যই ভালোবাসা, কিন্তু তার থেকে বেশি হলো বিশ্বাস। যা মেনসেকির মধ্যে নেই।

 

গল্পে একটি দৃশ্য আছে যে, কমেন্ডেটরকে খুন করার পর, নায়ক তার মনের সবচেয়ে গভীরে প্রবেশ করে। মনের গভীরতা নিয়ে আপনি যত লিখেছেন, তাদের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভয়ানক মনে হয়েছে।

মুরাকামি : আমি বিশ্বাস করি যে, সবচেয়ে গভীর অন্ধকারে না গেলে পুন: প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কেউ দোষ করার পর যখন সে তার ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসে, তখন তাকে গ্রহণ করাটাকেই ক্ষমাশীলতা বলে। কেউ যখন খুব খারাপ জায়গায় যায় এবং অন্য জায়গা দিয়ে বের হয়ে যায় তখন তার মধ্যে ক্ষমাশীলতার মতো অনুভূতির জন্ম দেবে।

 

নায়কের একাকিত্ব আমি অনুভব করেছি। এটাই তাকে অন্ধকার থেকে বের হতে সাহায্য করেছে।

মুরাকামি : ক্ষমা হচ্ছে ‘ভালো’, ‘খারাপ’, ‘আলো’ এবং ‘আঁধার’-এর উর্দ্ধে। এটাকে অর্জন করার জন্য নায়ককে নিজ হাতে কমেন্ডেটরের হত্যার ধারণা করতে হয়েছিলো বলে আমি মনে করি।

 

আপনার বইগুলোর মতো ‘কিলিং কমেন্ডেটর’-ও নানা দেশে নানা ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। আপনার বইয়ে এমন কি আছে যে আপনি মনে করেন যে সারা পৃথিবীর পাঠকে আকৃষ্ট করে?

মুরাকামি : আমি যখন বিদেশে গিয়ে দেখি যে, অনেক কিশোর-কিশোরীরাই আমার পাঠক। জাপানিজ পাঠকদের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় এদের সকলের বয়স প্রায় ২০-এর কাছাকাছি। যা আমাকে অবাক করে। আমি মনে করি, এরা হয়তো কোনো স্বাধীনতা খুঁজছে।

আমার লেখাগুলো অতোটা সাহিত্যিক ধাঁচেরও নয়। কিন্তু খুবই সাধারণভাবে লিখি। এই কারণে অনুবাদের সময়ে আমার বইগুলোর মানেটা হারিয়ে যায় না। সম্প্রতি আমি খেয়াল করলাম যে, আমার বিদেশি পাঠকেরা স্বাধীনতার সার্বজনীন অর্থ খুঁজছে। অবশ্যই এই কথাটা আমি আমার অনুমান থেকে বলছি।

//জেডএস//

লাইভ

টপ