শ্রদ্ধাঞ্জলি : শিল্পী মুর্তজা বশীর‘আর্ট হলো প্রার্থনার মতো’...

Send
রফী হক
প্রকাশিত : ১৪:০৬, আগস্ট ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, আগস্ট ১৫, ২০২০

শিল্পী মুর্তজা বশীর স্যার চলেই গেলেন? তাঁর বয়স হয়েছিল। অসুস্থ ছিলেন। সবই স্বীকার করছি। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়াটা অকস্মাৎই বলবো। তাঁর সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হতো। করোনার ভেতর তাঁর কাছে যেতে পারতাম না। ফোনে কথা বলতাম। ফোন না করলে অভিমানে সুরে বলতেন, ‘রফী, তুমি আমার খোঁজ করোনি কেন’? আমরা শেষ কথা বলেছি এই ঈদের দিন। এর কয়েকদিন আগেও কথা বলেছি দীর্ঘক্ষণ। তাঁকে একটুও অসুস্থ মনে হয়নি! তাঁর মানসিক জোর ছিল প্রবল। নতুন কী কী কাজ করবেন, এসব কথা বললেন। করোনায় আমাকে ও আমার পরিবারকে সাবধান থাকতে বললেন। বললেন, অনলাইন থেকে বা লাজ ফার্মা থেকে পিপিই, গ্লাভস, সেনিটাইজার কিনে রাখতে!... ভাবতেই পারছি না স্যার নেই। তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ।

১.

আমি কখনোই কোনো শিল্পীর কাছে জানতে চাই না, আপনি ছবি আঁকছেন? গান গাইছেন? শিল্পীকে এ ধরণের প্রশ্ন করা কাজের কথা নয়। শিল্পী যিনি, আবারও বলছি, শিল্পী যিনি তিনি সারাক্ষণ চর্চার ভেতরে থাকেন। শিল্প-ভ্রমণের ভেতরে থাকেন। তাঁর এই জার্নিটি আজীবনের। নিজের পেশা, নিজের প্রতি নিজের কর্তব্য, নিষ্ঠা, দায়বদ্ধতা থাকবেই একজন শিল্পীর ভেতরে। কবি, লেখকদের বেলাতেও তাই। গত সপ্তাহে শিল্পী মুর্তজা বশীর স্যার  আমাকে বলছিলেন— ‘রফী তুমি প্রতিদিন ছবি আঁকো’?

বললাম, 'হ্যাঁ, আঁকি স্যার। কিছু না কিছু আঁকি'।

স্যার বললেন, 'কখন আঁকো'?

'আমি খুব ভোরে কাজ করি। আমি খুব ভোরে উঠি, টানা তিন-চার ঘণ্টা কাজ করি'।

'তোমার রিসেন্ট কিছু কাজ দেখেছি রফী। আমার ভাল লেগেছে। ইউনিক কাজ। তোমার উচিত এখন একটি প্রদর্শনী করা'।

'প্রদর্শনীতে আমার খুব আলস্য'। আমি বললাম।

'তোমার কাজের ভেতর আগে মনিরুল ইসলামের একটা প্রভাব ছিল। আমি লক্ষ্য করেছি, এখন সেটা নেই। এখন তোমার কাজ আর কারোর সঙ্গে মেলে না'। একেবারেই ইউনিক...'

স্যার বললেন, 'আমি নিয়মিত রুটিন করে সারাজীবনে কোনোদিন ছবি আঁকিনি রফী। আবার প্রতিদিনও আঁকি না। একটা গ্যাপ রাখি। কিন্তু আঁকার প্রক্রিয়াটি মাথার ভেতর সারাক্ষণ ধরে চলে...। তার মানে, অন্যভাবে আমি সারাক্ষণই আঁকছি। প্রথমে আমি ভাবনাগুলি গুছিয়ে নিই। তারপর ধরো একটা সিরিজধর্মী কাজ করি। পর পর অনেকগুলি পেইন্টিং! আমার 'এফিটাফ সিরিজ', 'ওয়াল সিরিজ', 'বাটারফ্লাই সিরিজ' সব এভাবেই করা'।

একটু থেমে আবার বললেন, 'রফী, তুমি আমার ওপর বিরক্ত কেন বলো তো'?

'আমি বিরক্ত? আপনার ওপর! আপনার কেন এমনটি মনে হলো বলেন তো?...আমার তো মনে হয়, আমার মতো করে কেউ আপনাকে পড়েনি। আমি স্কুল জীবনে আপনার বিখ্যাত 'আল্ট্রামেরীন' পড়েছি। আপনার ওপর 'সাপ্তাহিক বিচিত্রা'র কাভার স্টোরি পড়েছি। সেই '৭৭ বা '৭৮ সালে! আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আপনার কবিতা, উপন্যাস, আত্মজীবনী আমি মুগ্ধতা নিয়ে পড়ি... সেই মুগ্ধতা আমার এখনো রয়ে গেছে স্যার...

'তবে আমার খোঁজ নাও না যে...' স্যার বললেন।

'খোঁজ আমি নিই। কিন্তু আপনার কাছে আসা হয়ে ওঠে না'।

'তুমি তো টেলিফোনও করতে পারো...'

'আপনি যদি বিরক্ত হন ! এসব ভেবে ফোন করি না...'।

'না না, তুমি ফোন করবে' ।

.

আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেছিলাম সেদিন। তাঁর নাকে অক্সিজেনের নল, ৮৭ বছরের বর্ষীয়ান শিল্পী মুর্তজা বশীরকে আমার একটুও ক্লান্ত বা অবসন্ন মনে হয়নি । বরং তারুণ্যের বিভায় উজ্জ্বল ছিলেন সেদিন। আমরা কথা বলতে বলতে শিল্পী জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, কামরুল হাসান, আনওয়ারুল হক, মোহাম্মদ কিবরিয়া, বিজন চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী, আব্দুল বাসেত, আব্দুর রাজ্জাক, আমিনুল ইসলাম, ইউরোপীয়ান শিল্পী মোদিগ্লিয়ানি, পিকাসো, জিওকোমিত্তির প্রসঙ্গ এসেছিল। স্যার বললেন, 'আমি ইটালী থেকে শুধু প্যারিস গিয়েছিলাম মোদিগ্লিয়ানির প্রদর্শনী দেখতে। মোদিগ্লিয়ানিকে নিয়ে আমার অসম্ভব মুগ্ধতা ছিল'। বশীর স্যারের সঙ্গে কথা বলতে আমার ভাল লাগে। তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর পড়ালেখা, তাঁর শিল্প-ভ্রমণ অসামান্য। আমার ভাল লাগে। আমাদের কথোপকথনটি আমি রেকর্ড করেছি।

কখনো লিখব।

শিল্পী মুর্তজা বশীর ও শিল্পী রফী হক

.

গতকাল খবরের কাগজে দেখলাম, স্যার অসুস্থ হয়ে এ্যাপোলো হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি আছেন। আমি তাঁর সুস্থতা কামনা করি। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের মাঝে আরও বহুদিন থাকেন। আমাদের চিত্রকলা অঙ্গনকে তাঁর দেবার আরও অনেক কিছু রয়েছে। কারণ তিনি শুধু শিল্পীই নন, তিনি কবি, কথা সাহিত্যিক, মুদ্রা সংগ্রাহক, মুদ্রা সংক্রান্ত গবেষক। তিনি তাঁর বাবুর (বাবা) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যোগ্য উত্তারাধিকার ।

.

তিনি সব সময় বলতেন, আমার কাছে আর্ট হলো প্রার্থনার মতো।

 

২.

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা আন্দোলনের পথিকৃৎদের অন্যতম একজন মুর্তজা বশীর।

জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর প্রাণাধিক পুত্র মুর্তজা বশীরকে চিঠি লিখেছেন লাহোরের ঠিকানায়। ১৯৬১ সালে লেখা এই চিঠিটি আমাদের চিত্রকলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বলে মনে করি। তাঁর প্রাণাধিক, স্নেহসিক্ত পুত্র বশীরের শিল্পী হওয়াকে খুব আনন্দের সঙ্গে দেখেছেন, পুত্রকে ‘শিল্পী’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। জন্মভূমিতে বশীরের শিল্প প্রতিভা বিকাশ ও প্রসারের কথা ভেবেছেন, লিখেছেন— ‘...ঢাকায় কিছুদিন পূর্বে আমিনুল ইসলাম ছবি প্রর্দশনী করিয়া ১৫০০/- টাকা পাইয়াছে। তুমিও এখানে আসিয়া প্রর্দশনী কর..’

----------------------------

79 Begum Bazar Road

Dacca 21.3.61

 

Murtaza Bashir

Artist

Pakistan Art Council

Lahore

 

প্রাণাধিকেষু,

অসংখ্য দো’আ এবং ঈদের মুবারকবাদ জানিবে। তোমার ঈদ কার্ড পাইয়া তোমার মা এবং আমি সন্তুষ্ট হইয়াছি। ঢাকায় কিছুদিন পূর্বে আমিনুল ইসলাম ছবি প্রর্দশনী করিয়া ১৫০০/- টাকা পাইয়াছে। তুমিও এখানে আসিয়া প্রর্দশনী কর। সফীর মুখে তোমার সংবাদ শুনিলাম। লাহোরে যখন যত্র আয় তত্র ব্যয়, তখন ঢাকায় আসাই উচিত। এখানে Institute of Art এ হয়ত পদ পাইতে পার । আমরা তোমাকে দেখেতেছি না, কিন্তু আল্লাহ দেখিতেছেন ।....

শুভাকাঙক্ষী — মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

---------------------------------

৮৫ তম জন্মবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানাতে মুর্তজা বশীর স্যারের বাসায় গেলে তিনি এই চিঠিটি আমায় পড়ে শোনান। আমি তাঁকে অনুরোধ করি চিঠিটির একটি কপি আমাকে দিতে। তিনি আগ্রহভরে তা আমাকে দেন। এজন্য আমি কৃতজ্ঞতা জানাই স্যারকে।

মুর্তজা বশীরকে লেখা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর চিঠি

.

চারুকলা বিষয়ক পত্রিকা ‘শিল্পপ্রভা’কে বলেছেন : 'আমি, আমিনুল ছবি এঁকেছি বুদ্ধি দিয়ে। এটা দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তখনকার শিল্পীরা সামাজিকভাবে কেউ সচেতন ছিলেন না। তখনকার শিল্পীরা ছিলেন ভাবের জগতের মানুষ। আমি, আমিনুল আরও পরে দেবদাস, বিজন এলে ছবির বিষয়-বস্তু পাল্টে যায়। আমাদের পেইন্টিংয়ে সাধারণ খেঁটে খাওয়া মানুষেরা প্রথম ক্যানভাসে উঠে আসে...'

'...ছবি আঁকাটা প্রার্থনার মতো। আমি ছবি আঁকি বেডরুমে। ইটালী ও ফ্রান্সে যখন ছিলাম তখনও তাই করেছি। সত্যি বলতে কি, ছবি হলো আমার কাছে প্রেমিকার মত। যাকে না দেখলে ভালো লাগে না। রাতে হয়ত বা হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল, আমি ইজেলে আনফিনশড কাজটি দেখি... এক সময় কাজটির ভিতরে ঢুকে যাই…। আমি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠি। গোসল করে, দাড়ি কেটে, আফটার শেভ মেখে, অডি কোলন মেখে তারপর ছবি আঁকতে বসি...’

‘আমার বয়স আজ পঁচাশি হলো। আমি পিকাসোর চেয়ে একদিন বেশি হলেও বাঁচতে চাই। পিকাসো বেঁচেছিলেন একানব্বই বছর। আমি তাঁর চেয়ে একটি দিন বেশি বাঁচতে চাই কারণ, পিকাসোর চেয়ে বড়ো শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বয়সে একদিনের বড় হলেও পিকাসোর চেয়ে বড় হতে চাই।’…

শিল্পী মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট, আর দু’দিন বাদেই তাঁর জন্মদিবস, তাঁর আগেই তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন ।

.

শিল্পী মুর্তজা বশীর স্যারের প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ