চলচ্চিত্রময় এক জেসুইট ফাদার

Send
অনিন্দ্য আরিফ
প্রকাশিত : ১৭:২৯, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩১, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২০

ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ, ছবি- অরুনাংশু রয় চৌধুরী, দ্য হিন্দুফাদার গাস্তঁ রোবের্জ ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসেন। ১৯৫৬ সালে নিজের জন্মশহর কানাডার মন্ট্রিলে জেসুইট ফাদার হিসেবে দীক্ষা নেওয়া ২৬ বছরের এক তরুণ, গাস্তঁ রোবের্জ ভারতের আসার জন্য জাহাজ ধরার আগের রাত্রে নিউইয়র্কের ফিফথ এ্যাভিনিউ-এর আর্ট থিয়েটারে বসে দেখেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজি। ভারত এবং বাংলার সঙ্গে এ সিনেমা দেখার মাধ্যমেই তার সম্পর্কের সূত্রপাত এবং এ সম্পর্ক বহু ডাল-পালা বিস্তার করে ৬০ বছরের দৃঢ় সম্পর্কের মহীরূহতে পরিণত হয়েছিল। অপু ট্রিলজি দেখার পর ফাদারের উপলব্ধি হয়েছিল—‘একটি দুর্দশাময় দেশের সাধুর প্রতিমূর্তি হিসেবে মাদার তেরেসা আমাকে পীড়িত করত। আসলেই কী এমন দারিদ্রতা আছে? দরিদ্রদের কী সহায়তা দেওয়া হয়? এসব প্রশ্ন আমাকে ছায়ার মতো তাড়িয়ে বেড়াত। অপু ট্রিলজি আমাকে তা নিশ্চিত করলো এবং আমি বিমোহিত হলাম।’

কলকাতায় আসার পর ফাদার রোবের্জ বাংলা শিখলেন এবং সুন্দরবনের কাছে বাসন্তী নামে এক এলাকায় জুনিয়র টেকনিক্যাল স্কুলে শিক্ষামূলক প্রকল্পের কাজে যোগ দিলেন। বাংলার এই গ্রামীণ জীবনেই তার সঙ্গে বাস্তবের অপু এবং দুর্গাদের সাক্ষাৎ ঘটলো। ট্রিলজির সঙ্গে একটি সেতুবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হলো।

ভারতে আসার দীর্ঘ নয় বছর পর সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ফাদারের সাক্ষাৎ হয়েছিল। এর মধ্যে অবশ্য তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিয়েটার আর্টস(ফিল্ম)-এর ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই যে বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল, তা বজায় ছিল রায়বাবুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। প্রতি রোববারের সকাল নয়টায় মাণিকবাবুর বাসাতে আড্ডা দেওয়া ফাদারের নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছিল। যখন চিত্রবাণী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন সত্যিজিৎ রায়কে এর সম্মানিত সভাপতির পদের প্রস্তাব ফাদার দিয়েছিলেন এবং রায়-মশাই সাগ্রহে তাতে রাজীও হয়েছিলেন।

ভারতের অন্যতম অগ্রগণ্য গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট হিসেবে চিত্রবাণী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন ফাদার রোবের্জ। পূর্ব ভারতে এটাই প্রথম চলচ্চিত্র কেন্দ্র। বেশ কয়েকজন সিনেমা-তাত্ত্বিক এবং চিন্তকদের সহায়তায় এ প্রতিষ্ঠানটি কলকাতাতে একটি চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক বটবৃক্ষে পরিণত হয়—এর সমৃদ্ধ লাইব্রেরী এবং ফিল্ম আর্কাইভ যেকোনো চলচ্চিত্রপ্রেমীর জন্য আকর্ষণীয়। শুধু সিনেমা দেখা নয়, চিত্রবাণীতে সিনেমার স্বপ্ন বপণ করা হয় এবং চলে সিনেমা নিয়ে ধুন্ধুমার তর্ক-বিতর্ক। কলকাতার অনেক বড় পরিচালকদের সিনেমার বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে। আর এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে ফাদারকে ক্ষুরধার লেখনীও চালাতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে তিনি লিখলেন ‘চিত্রবাণী’। তখন থেকে জীবিত থাকা পর্যন্ত দুই ডজনের বেশি বই লিখেছেন সিনেমার নানা আঙ্গিক, গণযোগাযোগ এবং আধ্যাত্মিকতার ওপর। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো: ‘ম্যাস কমিউনিকেশনস অ্যান্ড ম্যান’, ‘ফিল্ম ফর ইকোলজি অব মাইন্ড’, ‘দ্য কমপ্যাশনেট ফেস অব মিনিং,’ ‘সিনেমার কথা’, ‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’, ‘সংযোগ সিনেমা উন্নয়ন’, ‘আইজেনস্টাইনস আইভান দি টেরিবল : অ্যান অ্যানালাইসিস’, ‘অ্যানাদার সিনেমা ফর অ্যানাদার সোসাইটি’, ‘দি সাবজেক্ট অফ সিনেমা’ ইত্যাদি। এর মধ্যে সংযোগ সিনেমা উন্নয়ন বইটির ইংরেজি সংস্করণের জন্য তিনি ১৯৯৯ সালে ভারতের ৪৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে জাতীয় পুরষ্কারও লাভ করেন।

ফাদার রোবের্জ জনপ্রিয় সিনেমাগুলোকে অ্যাকাডেমিক চর্চার মধ্যে আনতেন এবং তাদের জনপ্রিয়তার উৎসকে বিশ্লেষণ করতেন। তিনি সবসময়েই বলতেন যে দর্শকরাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বিচারক। যদি দর্শকরা সিনেমাকে গ্রহণ করেন, তখন সমালোচকদের আর বিশেষ কোনো কাজ থাকে না। তাই তো তিনি ‘রোজা’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘শোলে’, ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’, ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর মতো সিনেমাগুলো নিয়ে ক্লাস নিয়েছেন এবং লেখালেখি করেছেন। তিনি এর মধ্য দিয়ে সমকালীন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। সিনেমা নিয়ে সামাজিক পর্যবেক্ষণের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। তিনি প্রায়শই জিজ্ঞাসা করতেন—‘কেন জনগণ চলচ্চিত্র উপভোগ করছে? কোন শ্রেণির জনগণ? তাদের শিক্ষা কী? এটা কী সত্যিকারের স্বাক্ষরতা অথবা প্রকৃত শিক্ষা?’

জনপ্রিয় সিনেমা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি কখনোই চলচ্চিত্রের তত্ত্বগত জায়গাকে উপেক্ষা করেননি। এ সম্পর্কে তার জ্ঞান কত প্রগাঢ় ছিল, তা ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষের স্মৃতিচারণায় উপলব্ধি করা যায়। গৌতম ঘোষ লিখেছেন, “গাস্তঁ রোবের্জের চলচ্চিত্র-তত্ত্ব সম্পর্কিত জ্ঞান ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি মহান সোভিয়েত চলচ্চিত্রকার সের্গেই আইজেনস্টাইনের সিনেমার বিষয়ে একজন পণ্ডিত ছিলেন। আমার মনে আছে যে, আমি আইজেনস্টাইনের চর্চাকৃত ‘ওভারটোনাল মন্তাজ’ বুঝতে সমস্যায় পড়েছিলাম।  আমি ফাদারকে বিষয়টি বলতেই তিনি এ জটিল তত্ত্বকে খুব সহজেই বুঝিয়ে দিলেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে খুবই পরিষ্কার হয়ে গেলাম। আরেকবার সেইগফ্রেইড ক্যারাসুইরের জটিল তত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ ‘রিডাম্পশন অব ফিজিক্যাল রিয়েলিটি’-এর বিস্তর জায়গা বুঝতে না পেরে ফাদারের শরণাপন্ন হলাম। আসলে তার বোঝাপড়া খুব পরিষ্কার ছিল বলে তিনি চলচ্চিত্রের জটিল তত্ত্বকে পানির মতো বুঝিয়ে দিতে পারতেন।”

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অপু ট্রিলজির বাইরে ‘চারুলতা’ ছিল ফাদারের সবচেয়ে প্রিয়। চারু যখন একটা জানালা থেকে আরেকটা জানালার কপাট খুলে অপেরা গ্লাস দিয়ে ছাতা মাথায় দেওয়া পথচারীদের দেখছে, তখন সে যে প্রকৃত-অর্থে তার নিজের সিনেমাই সৃষ্টি করছে, এ গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছাত্রদের কাছে তুলে ধরতে ফাদার রোবের্জ কখনোই ভুলেননি। ক্লাসরুমের বাইরে হালকা মেজাজে ফাদার শিক্ষার্থীদের মধ্যে চারুলতার সংলাপের মাধ্যমে কুইজ তৈরি করতেন। ফাদার রোবের্জ সত্যজিতের শেষ তিনটি সিনেমাকে ‘হার্ট ট্রিলজি’ নামে আখ্যা দিয়েছিলেন। যখন কলকাতার চলচ্চিত্র সমালোচকরা ঘোষণা দিতে শুরু করেছিলেন যে সত্যজিৎ তার ধার বা তীব্রতা হারিয়ে ফেলেছেন, তখন ফাদার এই চলচ্চিত্রগুলোর স্বতন্ত্র চরিত্রগুলোর কথোপকথনের মাধ্যমে সৃষ্ট হৃদকম্পনের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

আইজেনস্টাইন যেমন তার মৃত্যু পর্যন্ত সামষ্টিকতার প্রায়োগিক তত্ত্বের স্বপ্ন দেখে গিয়েছেন, তেমনি ফাদার রোবের্জ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভরত মুনির ‘নয়াশাস্ত্রে’র ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ভারতীয় চলচ্চিত্র তত্ত্বের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে গিয়েছেন। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অনেক দৃশ্যাংশকে ‘নয়াশাস্ত্রে’র ভিত্তিতে অনুধাবন করতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে পথের পাঁচালীর অপু এবং দুর্গার অলস বিকালের নিষিদ্ধ আচার অনুষ্ঠান উপভোগের দৃশ্যটিকে এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতেন তিনি। ফরাসি নবতরঙ্গের অন্যতম দিকপাল ফ্রাসোয়া ক্রফো পথের পাঁচালীকে ফিল্মের রাফ কাটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ফাদার-এর সঙ্গে দ্বিমত পোষন করে বলেছিলেন যে, রায়বাবুর শটগুলোতে মূল তথ্য প্রেরণ করা হয়, কেননা তিনি তার দর্শকদের প্রখর রসবোধে নিমগ্ন করতে চান। ফাদার মনে করতেন যে ভারতীয় শিল্পে ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের প্রয়োগ খুবই জরুরি। বিখ্যাত ভারতীয় প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা কে.জি. দাস ফাদারের জীবনকে কেন্দ্র করে ৩৯ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন এবং এটি ৪৫টির বেশি আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল।

ফাদার রোবের্জ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতেন। অনেকবার এসেছেন এই দেশে। সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-কে বাংলাদেশি সিনেমার প্রতীক হিসেবে অবহিত করেছিলেন। এ সিনেমাটি নিয়ে লেখার পাশাপাশি, লিখেছেন নাসিরউদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘একাত্তরের যীশু’ নিয়েও। তারেক মাসুদের ‘অন্তর্যাত্রা’ও তার ভালো লেগেছিল। সত্যিজিৎ রায়ের সঙ্গে তার বন্ধন কত অটুট, তা তার মৃত্যুদিন দিয়েও বোঝা গেছে। কেননা ৬৫ বছর আগের ২৬ আগস্টে যে পথের পাঁচালী মুক্তি পেয়েছিল! 

উইলিয়াম কেরি, ফাদার দাঁতিয়েন, ফাদার আতোয়াঁ—এই ধারারই অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন ফাদার রোবের্জ। জেসুইট ফাদার হিসেবে কলকাতায় এলেন, তারপর এটাই তার নিজের শহর হয়ে উঠল। আর ফিরেও যাননি মাতৃভূমিতে। এমনকি ১৯৯৬ সালে উঁচু মর্যাদার ধর্মযাজকের পদে চলে গিয়েছিলেন ভ্যাটিকান। কিন্তু কলকাতা আর ভারতীয় চলচ্চিত্রের টানে ফিরে এসেছিলেন সেই মায়াবী শহরে।       

সবকিছুতেই পশ্চিমমুখী হওয়াটা আমাদের অনেকেরই মজ্জাগত। কিন্তু আমাদের কাছেও যে সংস্কৃতির বিরাট ভাণ্ডার রয়েছে, তাকেও যে নানাভাবে জীবনের ভেতর প্রবিষ্ট করানো যায়, এই কথাটা খুব কম সময়ই ভাবি আমরা। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে এই কথাটাই বারবার বুঝতে চেয়েছেন ফাদার রোবের্জ; বোঝাতেও চেয়েছেন। ৮৫ বছর বয়সে সেন্ট জেভিয়ার্সের সেই ঘরটা থেকে চিরকালের মতো বিদায় নিলেন তিনি। এখনও যিশুর পাশে বসে রয়েছেন সত্যজিৎ। ফাদার রোবের্জ নতুন একটি জাহাজে উঠলেন। এখনও কি খুঁজে চলেছেন সেই অপুকে? জানা নেই। ফাদার জানিয়ে গেলেন না।

//জেডএস//

লাইভ

টপ