ঈশ্বরদী থেকে পৃথিবীর পথে

Send
তায়েব মিল্লাত হোসেন
প্রকাশিত : ১২:৩৬, অক্টোবর ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪০, অক্টোবর ০৯, ২০২০


এক সকালেই আমরা দেখতে পেলাম আমাদের চিরচেনা পৃথিবী লহমায় কেমন এলোমেলো। কেউ ঘরের বাইরে বের হতে চাইছে না। অলিগলির মুখে পড়েছে আলগা-ফটক। চিকিৎসা বিশারদরা রোগীর ভয়ে পালিয়ে বেড়ান। বাসের চাকা ঘোরে না। পথ যতটুকু দেখা যায়, সেখানে মুখ নয়, মুখোশের ভিড়। এই এপ্রিলের শেষে এসে এমন দেশ ও দুনিয়ার সাক্ষাৎ পাই আমরা। তার আগেই কবি মাসরুর আরেফিন লিখে ফেলেছেন ‘পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়’। করোনাময় দুনিয়ায় এ এক কাকতাল হতেই পারে। কবিরা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এই চিরন্তন বাণী আবার অস্বীকার করি কীভাবে!

‘পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়’ বাস্তবে নেই কোভিডের কথা। কিন্তু মৃত্যু ও ক্ষুধা, বিকার ও বেকারত্ব, অনিদ্রা ও আর্তনাদ—এভাবে যে পাথর সময় বহমান তার প্রতিধ্বনি আছে কবিতায়: “অ্যালেক্সা বলো, সেইসব প্লেগ বা অন্য মহামারী যদি

এইভাবে পৃথিবীকে বেড় দিয়ে ধরে

যদি শহরে ঢেউখেলা ছাদে চিকিৎসাগৃহের পরে

ফের, পরে, একসার হাসপাতালই চলে আসে”

[আমাজন অ্যালেক্সার প্রতি]

আসলে মাসরুর গদ্যের অক্ষরে লিখে চলেন অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের কবিতা। তবে তাতে জীবন্ত হয়ে ধরা পড়ে জীবনানন্দীয় ভাব ও ভাষা। যদিও ‘রূপসী বাংলা’র বরিশালকে নদী-খালসমেত বয়ে নিয়ে বিশ্বজোড়া বিস্তার করে থাকা মহাসমুদ্রের দিকে প্রবাহ দেন মাসরুর আরেফিন। এ একান্তই তার আপনার শৈলী, আপনার সৃজন। আর এভাবে একুশ শতকের বাংলা ভাষা ও কবিতায় নিজের চেহারা দিয়েই বর্তমান থাকেন মাসরুর। তিনি একালের বনলতা সেনের এভাবে চিত্ররূপ দেন:

“সিএমএম কোর্টে বনলতা সেনকে নিয়ে

ফাজলামির দায়ে এবং তা থেকে, আগুন লাগানো থেকে,

মানে যারা কবিতা ভালোবাসে তাদের হাতে এইভাবে

মহিলার নাকাল হবার আগে

কাগজপত্র ঠিকই সিএমএম কোর্টে

ঠিকভাবে জমা দেওয়া হবে।”

[নাটোরে, বনলতা সেন]

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সুরে যে আবেশ সেই রকমই পাঠকককে ঘোরগ্রস্থ করে দিতে সক্ষম এসব কবিতা। কেননা মাসরুরের আখ্যানের দুনিয়ায় সেই জাদুময়তা আছে। তিনি কবিতার এক আজব জাদুকর। যার রহস্য-জাগানিয়া টুপির ভেতর থেকে বেরুতেই থাকে একের পর জাদু ও বাস্তবতার বিবিধ প্রকরণের শব্দকল্প।

সমকালে মাসরুর লম্বা কবিতা লিখে চলেছেন সেই সূচনাবিন্দু থেকে। তাতে টান টান না থাকার যে ঝুঁকি, তা এড়াতে পেরেছেন সার্থকতার সাথে। যার কারণে কবিতাপ্রেমীর পাত শেষ হতে বাধ্য এক আসনে বসেই। পাঠ শুরু করলে শেষ না করে যেন উদ্ধার মেলে না। তবে মগজে নতুন বোধের জন্ম হয় সেই পঠনের পরে। প্রমাণ পেতে পড়া হোক আংশিক:

“শহীদ তারা, মৃত্যু দিয়ে জেহাদের সারবস্তু পুঁতে যান ধানক্ষেতে বাগানে

বাগানে;

       আর এভাবেই অ্যামিশন টেস্টের শেষে ঈশ্বরদীর বনবিবি নাপিত ও

মিসেস চণ্ডাল, ভর্তি হয় ইয়া-আলীর বুনিয়াদি কিন্ডারগার্টেনে।”

[ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প]

দেশ-দুনিয়া, মানুষ-সমাজ, নগর-গঞ্জ, নদী-প্রকৃতি, সভ্যতা ও তার সংকটের নবতর নানান দার্শনিক ভাষ্য নিয়ে হাজির হন মাসরুর। বাংলা কবিতায় যা তাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র স্বর। এই সুর চেনা তবু চেনা নয়—বুকের গভীরে এমন বৈপরীত্যে ভরা স্রোত বইয়ে দিতে বাধ্য। পৃথিবীর অদ্ভুত অথচ নন্দনে ভরা আঁধার দর্শনে কবিতাপ্রেমীরা পাতে তুলে নিতে পারেন এই কবির সৃজনকে। আসুন শেষ করি ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ পড়তে পড়তে:

“আর সিভিল সোসাইটির পানির গ্লাসে ওয়াসা থেকে ভেসে আসবে

করিৎকর্মাদের মেদ-মজ্জা-রস। এবং হুতোম প্যাঁচারা তাকিয়ে…ফাৎনার দিকে, যাতে

সন্ধ্যাবেলা ঈশ্বরদী আঁধার ক’রে ভেসে উঠবে এক বিরাট বাস্তুসাপ।”

/জেডএস/

লাইভ

টপ
X