X
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

মনির-উল হক
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:০০আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:০০

এ বছর কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার? এই প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসার পেছনে সম্ভবত আর কোনো উত্তেজনা অবশিষ্ট নেই। এখন বলতে হচ্ছে কে কে পাননি নোবেল পুরস্কার, বরং এই তালিকাটাই দীর্ঘ। তবু পাঠকের পূর্বানুমানের আকাঙ্ক্ষা একেবারেই উবে যায়নি। কিন্তু সুইডিশ একাডেমির মনোনয়ন শেষ পর্যন্ত, অন্তত বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে অনুমানের কানের ধারকাছ দিয়েও যায়নি, কেবল গুলি হয়েছে বলে খবর রটেছে। অন্যদিকে অনুমানের জুয়ার কোর্ট তো বরাবরের মতোই উল্টে যায়।

তবে পাঠকরা সুইডিশ একাডেমির মনোভাব বুঝতে অনুমানের কিছু টুলস্ ব্যবহার করেন, তার মধ্যে একটি রয়েছে মহাদেশ-বিবেচনা, দ্বিতীয়টি লিঙ্গ-বিবেচনা এবং অন্যটি ইহুদিবাদ। তবে গতবছর পিটার হ্যান্ডকে পুরস্কার লাভ করার পর একটি বিষয় চিরদিনের জন্য সম্ভবত অপসারিত হয়ে গেছে, সেটা হলো লেখককে আর মানবতাবাদী বা যুদ্ধবিরোধী না হলেও চলবে। উপরন্তু ফ্যাসিবাদের সমর্থক হলেও ক্ষতি নেই। বলা যায় সুইডিশ একাডেমি পিটার হ্যান্ডকের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দিয়ে সাহিত্য থেকে রাজনীতির শিরদাঁরাটি প্রায় খুলেই নিয়েছে। সে যাক্ গে, গোল্লায় যাওয়ার জন্য কিছু বাকি না থাকাই ভালো।

হ্যাঁ, মুরাকামি, হারুকি মুরাকামির নামটি আমরা বলাবলি করছি। অন্তত কয়েক বছর আগেও মিলান কুন্দেরার নামটি বলতাম, এখন ভ্রম জাগে কুন্দেরা বেঁচে আছেন কিনা? আচ্ছা একটু গুগল করে দেখি তো! মানে কুন্দেরার কপালে নোবেলের শিকা ছিঁড়ে পড়বে না, তিনি শিকার উপরে উঠে গেছেন। যদিও তার লেখা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা আছে, তাকে নারী বিদ্বেষী ও সেক্সিস্ট বলা হয়। তবে মুরাকামি মনে হয় অন্যদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন পাঠকপ্রিয়তা ও নোবেল কেন্দ্রিক তার স্নায়ুবিক চাপ সহ্য করার কারণে। ২০১৮ সালে যৌন কেলেঙ্কারির কারণে সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত করা হলে সুইডিশ সোসাইটির ১০০ সদস্য নোবেলের পরিবর্তে শুধু ২০১৮ সালের জন্য ‘নিউ একাডেমি প্রাইজ’ প্রবর্তন করেন। সেই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মুরাকামির নাম ছিলো। কিন্তু মুরাকামি তড়িঘড়ি নিজের নাম প্রত্যাহারের আবেদন করে বলেন, ‘সাহিত্যে নোবেলের বিকল্প হিসেবে নিউ একাডেমি প্রাইজকে আমি সমর্থন করছি না।’ তাহলে বোঝাই যায় নোবেল পুরস্কারের জন্য মুরাকামির দীর্ঘ অপেক্ষার বলি বিকল্প পুরস্কারের হাতে দিতে চান না।

চিনুয়া আচেবেকে নোবেল কমিটি সম্মানীত করতে পারেনি, কিন্তু নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গোর মতো একজন শক্তিশালী লেখক, সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ যিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের লেখকদের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, তাকেও যেন আচেবের মতো ভাগ্য বরণ করে নিতে না হয়। ১৯৮৬ সালে নাইজেরিয়ার নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক ওলে সোয়েঙ্কা নোবেল পুরস্কার পান, এবং ২০০৩ সালে জে এম কোয়েটজি, এরমধ্যে আর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান এই পুরস্কার পাননি। ফলে নগুগির পাঠকরা আশান্বিত হতেই পারেন।  

বেশ কয়েক বছর ধরে অ্যাদোনিসের নোবেল পাবার সম্ভাবনা প্রবল, আরববিশ্বে তার চেয়ে প্রভাবশালী কবি আর কেউ নেই, যদি আরববিশ্বকে আঞ্চলিক কোটায় বিবেচনা করা হয়।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ-আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক সালমান রুশদীর কথা আমরা প্রায় ভুলেই গেছি। তার স্যাটানিক ভার্সেস ইসলামিবিশ্বে তুমুল সমালোচনা সৃষ্টি করায় আমাদের অঞ্চলে তিনি কিছুটা অপঠিতই থেকে গেছেন। যদিও তার শক্তিমত্তা বিশাল। তার কাজ মূলত জাদুবাস্তবতার সাথে ঐতিহাসিকতার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানো। তিনি সাধারণত পূর্ব এবং পশ্চিমা সভ্যতার মধ্যে সংযোগ, ব্যাঘাত এবং স্থানান্তর ঘটিয়েছেন। তার বেশিরভাগ কথাসাহিত্য ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে রচিত। তার বুকার পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় উপন্যাস দ্যা মিডনাইটস চিলড্রেন একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এই উপন্যাসে দেশভাগ, ব্রিটিশ কলোনি থেকে মুক্তির দিকে যাত্রার কথা লেখা হয়েছে। এই বইটাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক, উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৭৪ বছর বয়সী সালমান রুশদী নোবেল পুরস্কার সহজেই পাবেন এটা আশা করাই সংগত। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে, হয়তো ইসলামিক দুনিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে কি সুইডিশ একাডেমি কি অন্য কিছু ভাবছে! 

দুইবার বুকারজয়ী কানাডার বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউডের নামও রয়েছে পাঠকের তালিকায়। অপরদিকে ধারণা করা হয় ৮৩ বছর বয়সী ম্যারিস কুন্দে পেতে পারেন এবারের নোবেল। ম্যারিস ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ফ্রান্স শাসিত গুয়াদলুপে জন্মগ্রহণ করেও উপন্যাস এবং নাটকের মাধ্যমে সমসাময়িক ফরাসি সাহিত্যের প্রধান লেখক যিনি হতে পেরেছেন তিনি অবশ্যই নোবেল পুরস্কারের যোগ্য। একজন বিশ্ব-নাগরিকের জীবনের বিভিন্ন অংশে ক্যারিবীয়দের দাসত্ব ও ঔপনিবেশিকতা কেমন প্রভাব ফেলে সেসবই কুন্দের লেখায় প্রতিফলিত হয়।

রাশিয়ান লেখক লিউডমিলা উলিৎস্কায়াকে সম্ভাব্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ধরা যেতে পারে। ২০০৬ সালে তার উপন্যাস ‘দোভাষী দানিয়েল স্তাইন’-এ দেখিয়েছেন কেন ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের এক হওয়া প্রয়োজন। এই উপন্যাসই তাকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি। এছাড়া সাহিত্য অ্যাস্থেটিসিজম সাহিত্য আন্দোলনের রূপকার হিসেবেও উলিৎস্কায়ার খ্যাতি আছে। তবে ২০১৫ সালে সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ নোবেল পাওয়ায় এই পুরস্কার আবার রাশিয়ার দিকে যাবে কিনা সন্দেহ আছে।

ক্যারাবিয়ান সমুদ্রের দ্বীপ অ্যান্টিগুয়ার ঔপন্যাসিক জ্যামাইকা কিনকেডও পাঠকদের প্রত্যাশায় বাতি জ্বেলে রেখেছেন। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার পুরস্কার পেয়ে তিনি নিজেকে নোবেলের জন্য যোগ্য লেখক ভাবতেই পারেন। তার উপন্যাসিকা ‘লুসি’ বিশ্বব্যাপী বহুল পঠিত।

অ্যাদোনিসের বাইরে কানাডিয়ান কবি অ্যান কার্সনকে নিয়েও ভাবা হচ্ছে। তিনি টিএস এলিয়ট পুরস্কার পেয়েছেন। তার বহুল পঠিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ‘ইরোস দ্য বিটারস্যুইট’, ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ এবং ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’।

টনি মরিসন নোবেল পাওয়ার দুযুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এবার আঞ্চলিক তকমা মুছে আরেক মার্কিন কথাসাহিত্যিক সের এবং জয়েস ক্যারলের দিকে চোখ ফেরানো যেতে পারে। আমেরিকার সমসাময়িক ভুবনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা তার লেখার প্রধান বিষয়। নাকি তার ভাগ্যও কুন্দেরার মতো শিকার উপরে উঠে গেছে!

নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচির নাম উচ্চারিত হচ্ছে সম্প্রতি। বয়স কম হলেও এই বয়সে তার লেখার ওজন কোনো দিক থেকেই কম নয়।

আলবেনিয়ার কবি ও কথাসাহিত্যিক ইসমাইল কাদারে এবার নোবেল পেয়ে যেতে পারেন। ষাটের দশক থেকেই তিনি আলবেনিয়ার শীর্ষস্থানীয় লেখক। ১৯৬৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি’ প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাদারে কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এই উপন্যাস তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বর্ষীয়ান কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে মুছে ফেলা যায় না। তার কবিতা ১৫টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকবার জেলে গিয়েছেন কোরিয়ান ডেমোক্রেসিতে অংশগ্রহণ করার জন্য। কোরিয়ার জনগণ বিশ্বাস করেন কো উন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন উপযুক্ত কবি। তিনি দেশের প্রায় সবকটি পুরস্কারের সাথে আমেরিকান অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। তবে চিন্তা থাকতে পারে মো ইয়ানকে নিয়ে, ইয়ান ২০১২ সালে নোবেল পেয়েছেন। একই অঞ্চল আবার রিপিট হবে কিনা।

এছাড়াও মিশরের নারী লেখক নাওয়াল আল সাদাউই, হাঙ্গেরির ঔপন্যিাসিক-নাট্যকার পিটার নাদাস, সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, স্পেনের ঔপন্যাসিক হুয়ান মারসে, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদী, রুশ কথাসাহিত্যিক মিখাইল শিসকিন, স্প্যানিস ঔপন্যাসিক হাভিয়ার মারিয়াস, নরওয়ের নাট্যকার জন ফসে, আইরিশ ঔপন্যাসিক জন বানভিল, বেলজিয়ামের কবি লিওনার্দ নোলেনস প্রমুখের যে কারো নাম নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসেবে উচ্চারিত হতেই পারে।

আগামী ৫ থেকে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে সাহিত্যে আমরা একজন নোবেল লরিয়েটকে পাচ্ছি। তার আগ পর্যন্ত আমরা পাঠক হিসেবে লেখকদের সঙ্গে স্নায়বিক চাপ মোকাবিলা করি।

/জেডএস/
১৩-১৫ সালের নাটকের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে: মির্জা ফখরুল
১৩-১৫ সালের নাটকের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে: মির্জা ফখরুল
বস্ত্র খাতে বিশেষ অবদানে পুরস্কার পাচ্ছে ১০ সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান
বস্ত্র খাতে বিশেষ অবদানে পুরস্কার পাচ্ছে ১০ সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান
যুবদল সভাপতি টুকুসহ ৭ জন রিমান্ডে
যুবদল সভাপতি টুকুসহ ৭ জন রিমান্ডে
জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি
জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি
সর্বাধিক পঠিত
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
হাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
আঙুলের অপারেশন করতে গিয়ে মৃত্যুহাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিনের তোলা বিল ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিনের তোলা বিল ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ