X
রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪
৮ বৈশাখ ১৪৩১

প্রেম, কাম ও আত্ম-অন্বেষার ব্যতিক্রমী আখ্যান

আহমেদ বাসার
২৯ আগস্ট ২০২৩, ০১:০০আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০১:০০

১.
রুদেবিশ শেকাব এক ব্যতিক্রমী নাম ও অভিনব জীবন নিয়ে বাংলা উপন্যাসে আবির্ভূত—যার ভেতরে সুখী হওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা অথচ বাস্তবতার কশাঘাতে নিয়ত জর্জরিত রক্তক্ষত। ব্যক্তিগত প্রেম, কাম ও আত্ম-অন্বেষায় রুদেবিশ চরিত্র এক শিখরস্পর্শী উচ্চতায় অধিষ্ঠিত, যা বাংলা উপন্যাসের খুব কম চরিত্রের মধ্যে লক্ষযোগ্য। ব্যতিক্রমী পারিবারিক ও সামাজিক আবহে বেড়ে ওঠা রুদেবিশের বৈচিত্র্যময় জীবন খুব সহজেই পাঠকের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে।
ছোটবেলা থেকেই অনেকটা নারীবর্জিত পরিবেশে বেড়ে ওঠায় নারী ও নারীদেহের প্রতি এক অপ্রতিরোধ্য আবেগ ও কৌতূহল জেগে থাকে তার অন্তরাত্মায়।

রুদেবিশের বয়স যখন দুই বছর তখন ম্যালেরিয়ায় তার মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের স্মৃতিও খুব একটা মনে করতে পারে না। অন্য ছেলেরা বারো বছর বয়সে যা শুরু করে রুদেবিশ সেটা শুরু করে তিন বছর বয়সে। চিন্তা-চেতনা ও পরিপক্বতার দিক থেকে রুদেবিশ অন্যদের চেয়ে যুগ ব্যবধানে এগিয়ে। রুদেবিশের জীবনের প্রথম নারী খ্যাপাবুড়ি যে আসলে তার পিতার প্রাক্তন প্রেয়সী। বহুবছর পর পাগলের অভিনয় করে প্রেমিকের কাছে ফিরে আসে। রুদেবিশ খ্যাপাবুড়ির স্পর্শসুখের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার পিতাকে এক অসতর্ক মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত ঘনিষ্ঠতায় আবিষ্কার করে। পিতার এ প্রতারণায় রুদেবিশ কষ্ট পায়।

রুদেবিশের জীবনের দ্বিতীয় নারী লোটাস। প্রকৃতপক্ষে লোটাসই রুদেবিশের সেই প্রার্থিত নারী যে তার আজন্মলালিত নারীদেহের প্রতি অবদমিত কৌতূহল মেটাতে ভূমিকা রেখেছিল। গায়ের রঙের জন্য বিয়ে না হওয়ায় পারিবারিক চাপ ও নিপীড়নের মধ্যে থাকা লোটাস প্রেমের ক্ষেত্রেও প্রতারণার শিকার হয়। প্রেমিক বিনি তারা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে লোটাসকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায়।মর্মাহত লোটাস রুদেবিশের কৌতূহল মিটিয়ে রহস্যময়ভাবে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। অবশ্য তার আগে সে ‘পবিত্র পানি’ ছিটিয়ে বিয়ে না হওয়ার বেদনা লাঘব করে।

রুদেবিশের প্রেম ও নারী-অন্বেষা থেমে যায় না। সহপাঠী রুনিতার খোলা উরু, মসৃণ পা তার ভেতরে প্রেম ও কামের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রুনিতা নারীর সৌন্দর্য সম্পর্কে রুদেবিশের ধারণা পাল্টে দেয়। ক্লাসে রুনিতার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকায় রুদেবিশের প্রেমাকাঙ্ক্ষী রোজা রুনিতাকে আক্রমণ করে। রুদেবিশের প্রেম প্রার্থনা করে সে কয়েকটি চিঠিও লেখে। কিন্তু রুনিতার রূপমুগ্ধ রুদেবিশ রোজাকে প্রত্যাখ্যান করে। রুনিতা শহরে চলে গেলে রুদেবিশের আবার নতুন করে নারী-অন্বেষা শুরু হয়।

রুদেবিশের জীবনে প্রেম সর্বগ্রাসীরূপে দেখা দেয় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায়। গণিতের ছাত্র হওয়ায় কয়েকজন ছাত্রছাত্রী তার কাছে পড়তে আসে। তাদেরই একজন লুনাভা মিনি তার জীবনকে ওলট-পালট করে দেয়। উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায় মূলত লুনাভা মিনির প্রতি প্রণয়ের উচ্ছ্বাস ও রুদেবিশের আত্মবিশ্লেষণে নতুন মাত্রা লাভ করেছে। লুনাভার প্রতি তার প্রণয়ের যেন বাঁধ ভেঙে যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেটা একপাক্ষিক। কারণ লুনাভার দিক থেকে ঠিক ইতিবাচক কোনো সাড়া লক্ষ করা যায় না। লুনাভার আকর্ষণীয় পা দেখে রুদেবিশ গোলাপের পাপড়ি দিয়ে পুরো পৃথিবী ঢেকে দিতে চেয়েছে। লুনাভার সব কিছুই রুদেবিশের কাছে অনন্যসাধারণ। লুনাভা সম্পর্কে সামান্যতম দ্বিধাও রুদেবিশকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত এক নির্মম বাস্তবতা রুদেবিশের পৃথিবী ভেঙে চুরমার করে দেয়। লুনাভা মিনি আর রুদেবিশের ধর্ম ভিন্ন, যা বিদ্যমান সমাজবাস্তবতায় তাদের মিলনের অন্তরায়। লুনাভা মিনিকে ছাড়া জীবনের এক মুহূর্ত টেনে নেয়া অসম্ভব মনে হওয়া রুদেবিশের কাছে। এ বাস্তবতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা পাঠকমাত্রই অনুমান করে নিতে পারে।

লুনাভামগ্ন রুদেবিশের প্রেম এতটাই তীব্র যে সে ধর্মীয় ভেদাভেদও ভেঙে দিতে উদ্যত। কিন্তু এক্ষেত্রে লুনাভার অবস্থান রুদেবিশের বিপরীত বিশ্বে। ফলে লুনাভার হৃদয়মন আকর্ষণ করার জন্য উন্মাদ রুদেবিশ গাছের শাখায় তাবিজ ঝুলিয়ে রাখে। জিন নিয়ন্ত্রকের সহায়তা নিয়েও ব্যর্থ হয়। অবশেষে জ্যোতিষী ধ্রোনের দরবারে হাজির হয়। ধ্রোন তার সামনে জীবনের চরম সত্যটি তুলে ধরেন- ‘তোমার জন্য ভাল জীবনযাপনের কেবল একটা উপায় আছে, নারীর ভালবাসা পাওয়ার আশা না করা।’

যার জীবনের একমাত্র সাধনা নারীর প্রেম, তার জন্য এ বাক্যটি নিঃসন্দেহে বজ্রপাতের সমান। সত্যটি জানার পর রুদেবিশের সামনে একটি সমীকরণ দাঁড়িয়ে যায়- ‘লুনাভা মিনি অথবা মৃত্যু।’ শেষপর্যন্ত সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুদেবিশ তার আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলন্ত হৃদয়ের জ্বালা নেভায়।

২.
‘রুদেবিশ শেকাবের ব্যতিক্রমী জীবন’ উপন্যাসে রুদেবিশের অনিয়ন্ত্রিত প্রেমের টালমাটাল আবহের পাশাপাশি বিদ্যমান সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির আভাসও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও উপন্যাসে লেখক কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের কথা উল্লেখ করেননি, কিন্তু রূপকার্থ ভেদ করে উদ্দিষ্ট দেশটি চিনতে খুব একটা সমস্যা হয় না। লেখকের দৃষ্টিতে সেই দেশটি সমস্যাসঙ্কুল। সমাজে শ্রেণিভেদ প্রবল। সেখানকার ধনিক শ্রেণি একটি কানাডা, একটি অস্ট্রেলিয়া, দুটি নেদারল্যান্ড বা বেলজিয়াম—অথচ দেশটির মতো পৃথিবীর আর কোথাও এত দরিদ্র মানুষ নেই। দেশটিতে মানুষের অগাধ প্রজনন ক্ষমতার কারণে জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। সামাজিক অনাচার ও বহুগামিতার চিত্র উপন্যাসে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রুদেবিশের পিতা দিওনিশ শেকাবের বিবাহ-বহির্ভূত একাধিক সম্পর্কের কথা উপন্যাসে জানা যায়। অথচ বাইরে তিনি ভালো মানুষ সেজে ঘুরে বেড়ান। ধর্মের দোহাই পেড়ে অনৈতিক কর্ম জায়েজ করার নজির উপন্যাসে দৃশ্যমান। ক্ষমতালোভী কতিপয় ব্যক্তি ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। পাদ্রিদের পোশাক পরে ও ঈশ্বরদূতের তছবি দেখিয়ে তারা জনগণকে বোকা বানায়। ‘ঐশ্বরিক ডাকে’ সাড়া দিয়ে জনগণকে রক্ষা করতে এসেছেন বলে তারা দাবি করেন। জাতিকে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতিও তারা দেন। প্রতিটি পরিবারকে একটি করে ইটের বাড়ি, একটি ছোট গাড়ি আর টেলিভিশন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তারা। কিন্তু মাত্র নয়মাসের মাথায় জনগণ বুঝতে পারে ক্ষমতা দখলকারীরা তাদের ধোকা দিয়েছেন। উচ্চপদস্থ লোকদের কাছে ধর্ণা দিয়ে রাতারাতি ক্ষমতার অংশীদার হয়ে ওঠার চিত্রও এখানে লক্ষযোগ্য।

সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলনের তীব্র রূপ উপন্যাসে শিল্পিত রূপ লাভ করেছে। রুদেবিশের দাদি মারা যাওয়ার পর তার দাদা নিজের ও সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্য ডাকাত পরিবারের জানকি নামে এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু জানকির উদ্দেশ্য ছিল স্বামীকে জমিদারি থেকে উচ্ছেদ করা। বিদ্যমান বাস্তবতায় উদ্দেশ্যসাধন অসম্ভব জেনে জানকি সৎপুত্র দিওনিশ শেকাবকে হত্যার চেষ্টা চালায়। রুদেবিশের দাদা বিষয়টি টের পেয়ে দিওনিশকে বাড়ি থেকে বহুদূরের পর্তুগিজ মিশনারিদের স্কুল বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেন। বিয়ের সাত মাসের মাথায় জানকির গর্ভে বিওনিশ শেকাবের জন্ম হলে তাকে ঘিরে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। এখানেও জানকির স্বজনরা এক দরবেশ পাঠিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়। এরপর জানকির গর্ভে কন্যা পিওশানির জন্ম হয়। তবুও জানকির খুব একটা পরিবর্তন আসে না। রুদেবিশের দাদাকে হত্যার চেষ্টা অব্যাহত থাকে যদিও তা সফল হয় না। নানা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে জানকি স্বামীর সম্পদ আত্মসাতের চেষ্টা চালায়। মৃত্যুর আগে রুদেবিশের দাদা তার সব সম্পদ রুদেবিশের বাবাকে দিয়ে যান।

৩.
ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গির দিক থেকে ‘রুদেবিশ শেকাবের ব্যতিক্রমী জীবন’ বাংলা উপন্যাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উত্তম পুরুষে বর্ণিত উপন্যাসটি শুরু হয়েছে কৌতূহল জাগানিয়া বাক্য দিয়ে 'আমি সুখী হতে পারতাম’। এরপর টানটান উত্তেজনা ও আকর্ষণ ছড়িয়ে উপন্যাসটি দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যায়।

উপন্যাসের শেষ বাক্যাটিও চমকপ্রদ ‘প্রকৃতি আপনাকে দুঃখ ভোগের জন্য সৃষ্টি করেনি’। রুদেবিশের জীবন-ট্র্যাজেডি উপলব্ধির জন্য বাক্য দুটি খুব গুরুত্ববহ। সমগ্র উপন্যাস রূপকের আবরণে মোড়ানো। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও রাজনীতির গভীর ক্ষত অভূতপূর্ব ভাষিক রূপ লাভ করেছে উপন্যাসটিতে। উপন্যাসটির আরেকটি গুণ ভাষার গতি ও স্বতঃস্ফূর্ততা। অনেক জটিল বিষয় ও পরিস্থিতি উতরে গেছে ভাষার প্রসাদগুণে। রুদেবিশের প্রেমের তীব্রতা প্রকাশে লেখকের ভাষিক উৎকর্ষের অনন্য উৎসারণ লক্ষযোগ্য। রুদেবিশ যখন নিজের জীবন কাহিনি বর্ণনা করছে তখন সে আর ইহজগতে নেই। স্থান, কাল ও শরীরী সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে এ উপন্যাসের অবস্থান। এক সর্বদ্রষ্টা ও সবজান্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ রুদেবিশ; যেন শিল্পিত স্পর্ধায় জীবন-মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনেও উদগ্রীব। রূপক, সংকেত, উপমা, চিত্রকল্প- কবিতার প্রায় সব গুণই এ উপন্যাসের কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এক মহাকাব্যিক আবহ নিয়ে উপন্যাসটি পাঠকের মন ও মস্তিষ্কে তীব্র আলোড়ন জাগাতে সক্ষম।

প্রকাশক : সৃজন প্রকাশন।
প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান।
মূল্য : ৪৫০ টাকা।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
৯ মাস ঘরছাড়া ২০০ পরিবার: এসপির ব্যাখ্যা চাইলো মানবাধিকার কমিশন
৯ মাস ঘরছাড়া ২০০ পরিবার: এসপির ব্যাখ্যা চাইলো মানবাধিকার কমিশন
লেট’স ভাইব ফেস্টিভ্যাল: ১২ হাজার দর্শক ও অন্যান্য
লেট’স ভাইব ফেস্টিভ্যাল: ১২ হাজার দর্শক ও অন্যান্য
বিমানবন্দরে বাস ঢুকে ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যু: চালকের দোষ স্বীকার
বিমানবন্দরে বাস ঢুকে ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যু: চালকের দোষ স্বীকার
তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবিতে বাসদের তিন দিনের রোডমার্চ
তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবিতে বাসদের তিন দিনের রোডমার্চ
সর্বাধিক পঠিত
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, হিন্দু মহাজোট ‘নেতা’ পুলিশ হেফাজতে
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
জানা গেলো বেইলি রোডে আগুনের ‘আসল কারণ’
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
চট্টগ্রামে ভূমিকম্প, মাত্রা ৩ দশমিক ৭
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
কেএনএফের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত, কেঁদে কেঁদে স্ত্রী বললেন আমার ৩ সন্তানকে কে দেখবে?
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস