X
বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২
২ ভাদ্র ১৪২৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

নারীবাদী সাহিত্য-সমালোচনা

মুহম্মদ মুহসিন
১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:২৬আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:২৬

পূর্বপ্রকাশের পর

অন্যান্য অনেক মতবদের মতো ফেমিনিজম বা নারীবাদও শুরু থেকে সাহিত্যতত্ত্বের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। শুরুতে এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবেই প্রচলিত ও প্রচারিত ছিল। বিংশ শতকে এসে নারীবাদ সাহিত্যতত্ত্বে জায়গা করে নিতে শুরু করে। সাহিত্যতত্ত্বে নারীবাদ প্রথমদিকে পুরুষ লেখকদের লেখায় নারীর অবমূল্যায়িত ও নিগৃহীত চিত্র অনুসন্ধানে ব্যাপৃত ছিল। পরবর্তী সময়ে নারীবাদ সাহিত্যকর্মের অর্থনির্মাণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার সংযোজনে সফলতা প্রদর্শন করে। সাহিত্যতত্ত্বে নারীবাদের এই ভূমিকা ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই প্রথমে আমরা নারীবাদ বিকাশের পর্যায়গুলো ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

আধুনিক সভ্যতায় নারীবাদের আবির্ভাব রাজনৈতিক উদারতন্ত্রের (political theory of liberalism) হাত ধরে। রাজনৈতিক উদারতন্ত্রের বক্তব্য ছিল যে, সরকার ব্যবস্থায় সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ থাকতে হবে এবং আইনের চোখে সকল নাগরিককে সমান মর্যাদায় আনতে হবে। এই ভাবনার ছায়াতলে দাঁড়িয়েই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি অনুযায়ী নারীবাদের প্রথম উচ্চারণটি করলেন মেরি ওলস্টোনক্রাফট (Mary Wollstonecraft : 1759-1797) ১৭৯৮ সালে তাঁর প্রকাশিত A Vindication of the Rights of Women গ্রন্থের মাধ্যমে। ১৮৬৯ সালে দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের গ্রন্থ The Subjection of Women উদারতন্ত্রের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা নারীবাদী আন্দোলনকে আরো একধাপ এগিয়ে দিলো। মেরি ওলস্টোনক্রাফটের হাতে সূচিত নারীবাদের এই ধারাকে আমরা লিবারেল ফেমিনিজম নামে জানি।

ওলস্টোনক্রাফট, স্টুয়ার্ট মিল এবং এঁদের সাথে সহমত পোষণকারী অন্যান্য উদারতান্ত্রিক নারীবাদীদের বক্তব্য থেকে মনে হয়েছিল যে, নারীদেরকে ভোটাধিকার দিয়ে দেয়ার পরে নারীবাদীদের আর নতুন কিছু চাওয়ার থাকবে না। কিন্তু ইতিহাস দেখাল অন্য চিত্র। বিংশ শতকের প্রথম দশকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ দেশে নারীদেরকে ভোটাধিকার দিয়ে দেওয়া হলো। রাষ্ট্রে নারীরা পুরুষের সমমর্যাদায় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হলো। এর কিছুদিনেই নারীরা অনুভব করল যে, এতে নারীদের অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি অর্জিত হয়নি। ভোটাধিকার ও নাগরিক হিসেবে সমমর্যাদার ঘোষণা নারীকে সমাজ, রাজনীতি, আইন, অর্থনীতি কোনোখানেই পুরুষের সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারেনি। এ অবস্থায় উদারতন্ত্র বা লিবারেলিজম নারীমুক্তির উপায় বিধানে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কসিজম নামে রাজনৈতিক অন্য একটি নতুন মতবাদ নারীমুক্তির নতুন এক উপায় নিয়ে হাজির হলো। লিবারেলিজম মনে করেছিল ক্ষমতা নিহিত থাকে সরকারে, আর মার্কসিজম বললো যে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সরকারে থাকে না, থাকে অর্থনীতিতে। মার্কস বললেন ক্ষমতা থাকে তাদের হাতে যারা উৎপাদনের উপায়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন নারীবাদের পক্ষে ব্যাপারটাকে আরো খোলাসা করে এঙ্গেলস বোঝালেন যে, সমাজে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা নীতি আবির্ভাবের মধ্যদিয়েই সমাজে নারীরা পুরুষের অধীন হতে শুরু করেছে। তাই তিনি বললেন সমাজ এই ব্যক্তিমালিকানা বা পুঁজিবাদ থেকে মুক্ত হলেই নারীরাও পুরুষের অধীনতা থেকে মুক্তি পাবে। বিংশশতকে অনেক নারীবাদীই এই মতবাদের সমর্থনে নারীমুক্তির আন্দোলনে মাঠে নেমেছিলেন। নারীবাদের এই ধারার নাম মার্কসিস্ট ফেমিনিজম।

জুলিয়েট মিচেল (Juliet Mitchell : 1940-) নামে একজন খ্যাতনামা নারীবাদী এই মার্কসবাদী ভাবনার সাথে আরো একটি ভাবনার যোগ ঘটালেন। তিনি বললেন নারীরা শুধু পুঁজিবাদের কারণেই নিগৃহীত নয়, তাদের নিগ্রহের আরেকটি বড় কারণ হলো পিতৃতান্ত্রিকতা (patriarchy)। এই ধারার নারীবাদীরা বলছেন যে, নারীদের মুক্তি অর্জন করতে হলে পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্র এই দুই বুনিয়াদকেই ভেঙে ফেলতে হবে। নারীবাদের এই দ্বৈত ধারাকে মার্কসিস্ট/ সোশালিস্ট ফেমিনিজম নামে অভিহিত করা হয়।

এ পর্যন্ত নারীবাদ ছিল অন্য মতবাদ বা তত্ত্বের ওপর দাঁড়ানো। এই সব তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে সমাজের বস্তুগত কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নারীমুক্তির বাঁধাসমূহ সম্পর্কে মন্তব্য প্রদান ও সেগুলো উৎপাটনের প্রচেষ্টা ছিল এযাবৎকালের নারীবাদের কাজ। গোটা সমাজকে সামগ্রিকভাবে বিচার ও বিশ্লেষণের স্বতন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে নারীবাদ কাজ করতে শুরু করেছে যখন নারীবাদ র‌্যাডিকাল ফেমিনিজম, সাইকোঅ্যানালাইটিক ফেমিনিজম ও পোস্টমডার্ন ফেমিনিজমের ধারণাবলয়ে প্রবেশ করেছে তখন থেকে। এইসকল ধারণাবলয়ে প্রবেশের পরে নারীবাদে যে প্রসঙ্গটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তা হলো সমাজে নারীরা কীভাবে ‘নারী’হয়ে ওঠে এবং জেন্ডার কীভাবে সমাজের প্রতিটি বিষয়ের অর্থ তৈরিতে ভূমিকা পালন করে।

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামো অতিক্রম করে নারীবাদকে এই নতুন প্রসঙ্গে প্রবেশের পথে আহ্বান জানিয়েছিল সিমন দে বেভোয়ারের গ্রন্থ ‘দি সেকেন্ড সেক্স’। সিমন দে বেভোয়ার প্রথম বলেছিলেন ‘নারীরা নারী হয়ে জন্মায় না, বরং ধীরে ধীরে নারীতে পরিণত হয়’(One is not born, rather becomes a woman)। ১৯৭০ এর দশকে শুরু হয় নারীবাদের এই নবযাত্রা। এই নবযাত্রায় সমাজে জেন্ডারসৃষ্ট অর্থ অনুসন্ধান এবং তার মাধ্যমে নারীমুক্তির পথসন্ধান ফেমিনিজমের মূল কাজ হলেও সেই একই কাজ র‌্যাডিকাল ফেমিনিজম, সাইকোঅ্যানালাইটিক ফেমিনিজম ও পোস্টমডার্ন ফেমিনিজম আলাদা আলাদা প্লাটফরমে সম্পাদনে ব্রতী হলো।

মূল প্রসঙ্গের সাথে সংযুক্ত করে র‌্যাডিকাল ফেমিনিস্টরা প্রজননে নারীর ভূমিকাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করলেন। তাঁরা বলতে চাইলেন প্রজননের প্রচলিত রীতিপদ্ধতি নারীকে পুরুষের অধীনতায় আবদ্ধ করতে সাহায্য করে। যৌন কর্মকাণ্ড ও মাতৃ কার্যক্রমের প্রচলিত সংস্কৃতি নারীর এই অধীনতাকে স্বাভাবিক ও স্থায়ী করে তুলতে ভূমিকা রাখে। র‌্যাডিকাল ফেমিনিস্ট শুলামিথ ফায়ারস্টোনের (Shulamith Firestone : 1945-2012) মতে নারীর মর্যাদা অর্জনের পথে সকল আইনি ও রাজনৈতিক বাঁধা দূর হলেও যৌনকর্মকা- ও শিশুলালন সংস্কৃতিতে নারীর বর্তমান অবস্থা ও ভূমিকা বহাল থাকলে নারীরা পুরষাধীনই থাকবে। ফায়ারস্টোনের এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা এত যৌক্তিক যে তা অগ্রাহ্য করা দুরূহ, তবে তিনি এ বিষয়ে যা সমাধান দিয়েছেন তা বেশিরভাগ নারীবাদীরাই গ্রহণে নারাজ। তিনি বলেছেন এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে নারীদেরকে বর্তমান রীতির গর্ভধারণ থেকে সরে গিয়ে টেস্টটিউব বেবি পদ্ধতিতে যেতে হবে এবং যৌন কর্মকা-ে নারীকে নিয়ামকের আসনে বসতে হবে। এই সমাধানের দ্বিতীয় অংশ অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও নারী গর্ভধারণের বর্তমান রীতি ছেড়ে দিয়ে টেস্টটিউব বেবি পদ্ধতি অবলম্বন করবে মর্মে প্রদত্ত সমাধান বেশিরভাগ নারীবাদীদের কাছেই অগ্রহণযোগ্য রয়ে গেছে। তবে র‌্যাডিকাল ফেমিনিজমের একটি বিশেষ অবদান এই যে, নারীবাদের এই রূপ প্রথম নারীর মুক্তির জন্য পুরুষের সাথে তার সমতা বিধানের প্রচেষ্টার দিকে না গিয়ে বরং নারীর সাথে পুরুষের অনস্বীকার্য পার্থক্য ও মর্যাদাব্যঞ্জক পার্থক্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সমতা নয় বরং স্বাতন্ত্র্যের ওপর জোর দিয়েছে। র‌্যাডিকাল ফেমিনিজম নারীর স্বাতন্ত্র্যকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।

এই পার্থক্যের সূত্র ধরে ১৯৭০ এর দশকের কতিপয় ফেমিনিস্ট নারীর স্বাতন্ত্র্য ও পার্থক্যের বিষয়াদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য মনস্তত্ত্বের দিকে আগ্রহী হলেন। নারীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্যের বিষয়াদি মনস্তাত্ত্বিক পটভূমিতে অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নারীবাদীরা নারীর পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্যের বিষয়াদির উৎস হিসেবে এমন কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে পারলেন যেগুলো মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের ভাবনা থেকে অনেক আলাদা। ডরোথি ডিনারস্টিন প্রমুখ নারীবাদীরা তাদের ব্যাখ্যা ও পর্যবেক্ষণ শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, নারী ও পুরুষ মৌলিকভাবে পৃথক মনস্তত্বের অধিকারী নয়, অর্থাৎ তাদের মধ্যকার পার্থক্য তাদের জন্মসূত্রে পাওয়া মনস্তত্ত্বের কোনো ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত নয়। মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা পৃথক বরং এ কারণে যে, মায়েরা নারীশিশুদের মনের মধ্যে সমাজে স্বীকৃত একটি আদর্শ ‘নারীমূর্তি’ স্থাপন করে দেয় এবং শিশুটিকে উদ্বুদ্ধ করে ঐ নারীমূর্তিটি অনুসরণ করে জীবন গড়তে। পক্ষান্তরে, মা তার ছেলেশিশুকে লালনের ক্ষেত্রে শিশুটির মনে সমাজে স্বীকৃত একজন আদর্শ পুরুষমূর্তি স্থাপন করে দেয়। ছেলেশিশুটিকে পুতুল কিনে দেয় না খেলার জন্য, বরং তাকে বল কিনে দেয় খেলার জন্য। তাদেরকে দুরকম পোশাক কিনে দেয়, তাদের ভিন্নতা মনে ও আচরণে গেঁথে দেয়া জন্য। এভাবে দুই শিশু ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গঠন নিয়ে বড় হয়, যে গঠন তাদের জেন্ডার থেকে সৃষ্ট নয়, বরং মাতৃলালন প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্ট। মনস্তাত্ত্বিক এই ভিন্নতার বিকাশ থেকে মুক্তির জন্য মনস্তাত্ত্বিক নারীবাদীদের প্রস্তাব হলো শিশুর লালন প্রক্রিয়ায় মা-বাবার দ্বৈত ভূমিকা থাকতে হবে যাতে তাদের ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যগুলো জেন্ডার দ্বারা প্রভাবিত না হয়, বরং তাদের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো যাতে জেন্ডারের ঊর্ধে থাকে। সব মিলিয়ে সাইকোঅ্যানালাইটিক ফেমিনিস্টদের মূল বক্তব্য হলো নারীর মনস্তত্ত্ব পুরুষের মনস্তত্ত্ব থেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র, তবে সে পার্থক্য বা স্বাতন্ত্র্য তার জেন্ডার থেকে উদ্ভূত নয়, জন্মগতভাবে প্রাপ্ত নয়, বরং তার সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত। সিমন দ্য বেভোয়ারের কথাই এভাবে তারা পুনরুচ্চারণ করল যে, নারী নারী হয়ে জন্মায় না, সমাজ তাকে নারী বানায়।

গত শতকের আশির দশকে পোস্টমডার্ন ফেমিনিস্টরা আরেকটি নতুন উচ্চারণ নারীবাদে যোগ করল। তারা বললো যে, এযাবৎকালের নারীবাদের সকল কথা যে নারীকে সামনে রেখে বলা হয়েছে সে একজন মধ্যবিত্ত শে^তাঙ্গ নারী। অন্য নারীরা এযাবৎকালের সকল নারী আন্দোলনে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ (different)। এলিজাবেথ ভি. স্পেলম্যান (Elizabeth V. Spelman : ) তাঁর Inessential Woman গ্রন্থে বললেন যে, নারীবাদে যে নারী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সে একজন মধ্যবিত্ত ও হিটারো-সেকসুয়াল নারী। এর বাইরের নারীদেরকে এই আন্দোলন বলতে গেলে নারী হিসেবেই দেখে না। পোস্টমডার্ন নারীবাদীরা চাইলো আন্দোলনটি এমন এক তত্ত্বের অধীনে সংগঠিত হোক যে তত্ত্ব সরাসরি এই ইস্যুগুলোকেও আমলে নিবে। ফলে আশির দশক থেকে নারীর বর্ণগত ভিন্নতা, এথনিক ভিন্নতা, যৌনজীবন বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা, তৃতীয় লিঙ্গরূপ ভিন্নতা ইত্যাদি ভিন্নতাকে নারীবাদী আন্দোলনের ইস্যুসমূহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আমলে নেয়া হলো। পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী তত্ত্বে তাদের প্রদর্শিত স্ট্যান্ডার্ড ব্যতীত অন্যসবকিছুকে যেভাবে ‘অন্য’(other) করে রাখা হয়েছে, পোস্টমডার্ন নারীবাদীরা সেই সকল ‘আদার’-এর ধারণা মুছে দিতে চাইলেন। কোনো নারীই ‘আদার’ হিসেবে থাকবে না। লুসে ইরিগারে (Luce Irigaray), জুলিয়া ক্রিস্তেভা (Julia Krisreva), হেলেন সিকশু (Helen Cixous) প্রমুখ ফেমিনিস্টরা নারীবাদকে এভাবে পোস্টমডার্নিজমের দিকে চালিত করলেন। তারা চাইলেন নারীবাদকে এতটা বহুত্বমুখী হতে হবে যে, এতে কোনো ‘আদার’- এর সুযোগ থাকবে না।

এই ‘আদার’- এর পরিসীমা থেকে নারীকে চূড়ান্ত মুক্তি দিতে পোস্টমডার্ন নারীবাদের যুগান্তকারী উচ্চারণটি করলেন জুডিথ বাটলার (Judith Butler : 1956-) তাঁর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত Gender Trouble গ্রন্থে। তিনি বললেন নারী একটি কল্পিত সত্ত্বা (the identity of ‘woman’ is a fiction)। নারী নামক সত্ত্বা আছে কারণ সমাজ নারী নামক যে সত্ত্বা তৈরি করেছে নারী সেই সত্ত্বার চাওয়া অনুসারে কাজ করছে। সমাজের চাওয়া অনুসারে সম্পাদিত নারীর ঐ কাজগুলোর বাইরে নারী নামক কোনো মৌলিক সত্ত্বা (essence) নেই। সমাজের প্রত্যাশিত ঐ কাজগুলো যেগুলো দিয়ে নারীর সত্ত্বা তৈরি হয় সেগুলো নারী ছেড়ে দিক তাহলে ‘নারী’ নামক কোনো ‘বিচ্ছিন্ন’ সত্ত্বাও তৈরি হবে না আর সেই কল্পিত সত্ত্বাকে ঘিরে তার মুক্তির তথা ‘নারীমুক্তি’র কোনো আন্দোলনও প্রয়োজন হবে না। এই ছিল নারীমুক্তির পোস্টমডার্ন প্রেসক্রিপশন। স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ নারীবাদীদের কাছে এই পোস্টমডার্ন নারীবাদ এবং নারীমুক্তির এই পোস্টমডার্ন প্রেসক্রিপশন ভালো লাগেনি। তবে যাদের ভালো লেগেছে তারা কিন্তু জোর দিয়ে বলছে যে, এই প্রেসক্রিপশনই পিতৃতন্ত্র থেকে বের হওয়ার মোক্ষম উপায়।

অবশ্য নারীবাদ পোস্টমডার্ন পর্যন্ত এসেই থেমে যায়নি। নারীবাদের তৃতীয় ঢেউ এসেছে পোস্টমডার্নেরও পরে। তৃতীয় ঢেউয়ের নারীবাদীরা বলছে, ‘চুলোয় যাক আপনাদের সব তত্ত্ব, আমরা নারীবাদী আমাদের যাপিত জীবন দিয়ে, কোনো তত্ত্ব দিয়ে নয়’। তাদের বক্তব্য হলো- নারীমুক্তির কোনো একক উত্তর বা উপায় নেই; প্রতিটি নারীকে তার যাপিত জীবন থেকে বুঝতে হবে তার সমস্যা কী এবং সে সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ কী। প্রত্যেকের সমস্যা আলাদা এবং তার সমাধানও আলাদা। তত্ত্ব এ সমাধানের কোনো পথ বাৎলায় না, বরং ঝামেলা বাড়ায়।

নারীবাদী তত্ত্ব নিয়ে এতক্ষণ যে আলোচনা হলো তার মূল প্রসঙ্গ সাহিত্য নয়, তার মূল প্রসঙ্গ ছিল শুধুই নারীবাদ। নারীবাদী এই সকল তত্ত্ব সাহিত্যতত্ত্বকে, বিশেষ করে সাহিত্য-সমালোচনাকে, কীভাবে কতটুকু প্রভাবিত করল, কিংবা বলা যায় সাহিত্য-সমালোচনার তত্ত্বে ও প্রক্রিয়ায় কী অবদান রাখলো এবারে আমরা সেই আলোচনায় অগ্রসর হবো।

নারীবাদী তত্ত্বের প্রথম গ্রন্থ A Vindication of the Rights of Women (১৭৯২) সাহিত্য সমালোচনার কোনো তত্ত্ব উপস্থাপন না করলেও, সেই গ্রন্থেই নারীর অধিকার-বঞ্চনার বিষয়টি প্রমাণ করতে এবং এবিষয়ক লেখকের বক্তব্যকে জোরালো করে তুলতে মিল্টন, পোপ ও রুশোর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এমনকি একেবারে বিংশ শতকের গ্রন্থ ‘দি সেকেন্ড সেক্স’যাকে বলা যায় আধুনিক নারীবাদের সূতিকাগার সেই গ্রন্থেও ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাসে নারীর চিত্রায়ন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। নারীবাদী এসকল তাত্ত্বিক গ্রন্থে সাহিত্য নিয়ে আলোচনার দৃষ্টান্ত থেকে বলা যায় যে, নারীবাদী তত্ত্ব সাহিত্য সমালোচনার কোনো স্বতন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করাতে পারার আগেই সাহিত্য সমালোচনার কাজটি শুরু করে দিয়েছে। সত্যিকার অর্থে নারীবাদী তত্ত্ব একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়সম্পূর্ণ সাহিত্যতত্ত্ব কখনোই উপহার দিতে পারেনি, যেমনটা পেরেছে ফরমালিজম বা স্ট্রাকচারালিজম। ফলে নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনায় আমাদেরকে শুধু অবলোকন করতে হবে নারীবাদ বিকাশের বিভিন্ন স্তরে নারীবাদী তত্ত্বের গ্রন্থসমূহ তাদের প্রতিপাদ্যের সপক্ষে বিভিন্ন সময়ের সাহিত্যকর্মকে কীভাবে ব্যবহার করেছে এবং সাহিত্যকর্মের সাথে নারীর সম্পর্ককে কীভাবে বিশ্লেষণ করেছে।

নারীবাদ কোনো স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্যতত্ত্ব উপহার দিতে না পারলেও নারীবাদী তত্ত্বের উৎপত্তি ও বিকাশে সর্বযুগেই সাহিত্যের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। নারীবাদের যে তাত্ত্বিক ভিত্তি ও শক্তি তার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন যুগে নারী বলতে যে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ বোঝানো হয়েছে তার ওপর। আর সেই বৈশিষ্ট্যসমূহকে নারীবাদীরা প্রামাণ্য করে তুলেছেন বিভিন্ন যুগের সাহিত্যকর্মে উপস্থাপিত নারীচরিত্রদের দ্বারা। নারীবাদীরা যেমন বলেছেন যে, উনবিংশ শতকে নারীরা ছিল সমাজে পেশাহীন এক শ্রেণির মানুষ। তাদের এই বক্তব্যের প্রমাণ হলো উনবিংশ শতকের ইউরোপিয় উপন্যাস যেখানে কোনো নারীকে জীবিকা নির্বাহের জন্য কোনো কাজ করতে দেখা যায় না।

তাই আধুনিক নারীবাদের অভ্যুদয়ের পরেও সত্তুর দশকে নারীবাদীদের সাহিত্য আলোচনায় সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকতো সংশ্লিষ্ট সাহিত্যকর্মটিতে দৃশ্যমান পিতৃতান্ত্রিক সকল আচরণের উদাহরণগুলো জড়ো করা আর বিশ্লেষণ করে দেখানো যে, উক্ত পিতৃতান্ত্রিক আচরণগুলো নারীর জীবনকে কতটা দুর্দশাময় করে রেখেছে। সাহিত্যকর্ম থেকে উদাহরণ জড়ো করে দেখানোর চেষ্টা করা হতো পিতৃতন্ত্র সমাজে স্থায়ী করে দিয়েছে এমন একটি মানসভঙ্গি (mind-set) যা সমাজে নারীর জেন্ডারভিত্তিক অসমতার পক্ষে স্থায়ীভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

আশির দশকে এসে নারীবাদী সাহিত্যসমালোচনার পরিসর আরো প্রসারিত হলো। নারীবাদীরা অন্যান্য সাহিত্যতত্ত্বকেও নারীবাদী সাহিত্য আলোচনায় টেনে আনতে শুরু করল। নারীবাদ সেগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করল মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব। মার্কসীয় তত্ত্বকে সাথে নিয়ে নারীবাদ এবার সাহিত্যকর্মের আলোচনায় দেখাতে শুরু করল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের সুযোগের অভাবে সমাজের ক্ষমতাবলয়ে নারীর প্রবেশাধিকারও মিলছে না, আর ফলস্বরূপ সমাজে তার নিগ্রহের অবসানও ঘটছে না। এর মধ্যদিয়ে নারীবাদী সাহিত্যসমালোচনা শুধু পিতৃতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রকে শাপশাপান্ত করনের একঘেয়ে কর্মকাণ্ড থেকে কিছুটা সরে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে নারীবাদী সাহিত্যসমালোচনার পরিসরে আরা প্রবেশ করল কাঠামোবাদ, সাইকোঅ্যানালাইটিকাল থিয়রি ইত্যাদি। এসবের সাথে আশির দশক থেকে নারীবাদ নিজেই একটি সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার মানসে নারীদের সাহিত্যকর্মের কিছু বুনিয়াদি কানুন নির্মাণেরও প্রয়াস পেলো যাতে ইতিহাসের অবহেলিত নারীলেখককুলের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ‘গাইনোক্রিটিসিজম’নামে এর একটা নামকরণও প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এই প্রয়াসে ইলেইন শোঅল্টার (Elaine Showalter) বললেন যে, নারীবাদী সাহিত্য আলোচনা এবার অ্যান্ড্রোটেক্সট (পুরুষদের সাহিত্যকর্ম) থেকে গাইনোটেক্সটের (নারীদের সাহিত্যকর্ম) দিকে মুখ ঘুরিয়েছে।

গাইনেটেক্সট ও গাইনোক্রিটিসিজমের অস্তিত্ব ও সম্ভাবনার বিষয়ে একটি বড় প্রশ্ন হলো নারীদের লেখালেখির জন্য উপযুক্ত একটি ভাষার বিষয়। ভার্জিনিয়া উলফ নিশ্চয়তার সাথে বলেছেন নারীরা লিখতে গিয়ে ভয়ঙ্করভাবে যে সমস্যাটির সম্মুখীন হলো তা হলো তারা দেখলো যে তাদের লেখার জন্য কোনো ভাষাই তৈরি নেই। পুরুষরা এতকাল লিখে লিখে যে ভাষাটি নির্মাণ করেছে সেটি একেবারেই পুরুষদের ভাষা, নারীর লেখার ভাষা সেটি হওয়ার নয়। সান্দ্রা গিলবার্ট এবং সুসান গুবার নারীর ভাষা বলতে আলাদা কোনো ভাষার অস্তিত্ব স্বীকার না করলেও, হেলেন সিকশু এমন ভাষা এবং সেই ভাষায় নারীর লেখার বিষয়টি এত জোরের সাথে বলেছেন যে, সেই ভাষায় নারীর লেখালেখির তিনি নামই দিয়েছেন ‘এক্রিতুরে ফেমিনিন’ (ecriture feminine)।

নারীবাদ বিকাশের বিভিন্ন স্তরে নারীবাদী সাহিত্যসমালোচনায় যে কাজগুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেগুলো একত্র করে নিম্নরূপ একটি তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

ক) পুরুষ ও নারী লেখকদের লেখায় নারীর চিত্রায়নকে সমালোচকীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নিরীক্ষণ ও বিশ্লেষণ।

খ) কোনো সাহিত্যকর্মে নারীকে ‘অন্য’(Other) হিসেবে চিত্রায়ন করা হলে সাহিত্যকর্মটির বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্যিকের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কঠোর সমালোচনায় বিদ্ধ করা।

গ) সাহিত্যকর্মটিতে উপস্থাপিত সমাজের ক্ষমতাকাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখানো সেখানে নারীর অবস্থান কী। নারী সে ক্ষমতাকাঠামোতে অসাম্যের ও অমর্যাদার শিকার হলে সে অসাম্য ও অমর্যাদায় পিতৃতন্ত্র ও উৎপাদন কাঠামোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা।

ঘ) সাহিত্যকর্মটিতে নারী কতখানি সমাজের তৈরি ‘নারী’, আর কতখানি শরীরবৃত্তীয় পরিচয়ে নারী তা নির্ণয় করা এবং সমাজের তৈরি ‘নারী’দের ক্ষেত্রে সমাজের এই নারীকরণ প্রক্রিয়ায় ভাষার অবদান কতখানি তা নির্ধারণের চেষ্টা করা।

ঙ) সাহিত্যবিশ্লেষণের বিদ্যমান কানুন এ লক্ষ্যে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া যাতে অতীতে বিস্মৃত নারী লেখকদের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং ইতিহাসে অবহেলিত নারী লেখককুল যথাযোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে।

চ) মনঃসমীক্ষণতত্ত্বের নব প্রয়োগের মাধ্যমে নারী ও পুরুষ পরিচয়কে নতুন আলোকে বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণ।

ছ) নারী অভিজ্ঞতার নতুনতর মূল্যায়নের উদ্যোগ গ্রহণ।

নারীবাদী সমালোচনাতত্ত্বে আরো অনেক নতুন প্রসঙ্গ দিন দিন যুক্ত হচ্ছে। তবে আমাদের এই পরিচিতিমূলক আলোচনা আমরা মোটাদাগের এই বিষয়গুলোর মধ্যদিয়েই সমাপ্ত করছি।

শেষপর্ব

/জেড-এস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পারমাণবিক সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালো যুক্তরাষ্ট্র
পারমাণবিক সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালো যুক্তরাষ্ট্র
অনেক মামলা ঝুলে আছে নিম্ন আদালতে
অনেক মামলা ঝুলে আছে নিম্ন আদালতে
ইউক্রেন সফরে আসছেন এরদোয়ান ও গুতেরেস
ইউক্রেন সফরে আসছেন এরদোয়ান ও গুতেরেস
গ্রিস-তুরস্ক সীমান্তের নির্জন দ্বীপে ৩৮ অভিবাসী উদ্ধার
গ্রিস-তুরস্ক সীমান্তের নির্জন দ্বীপে ৩৮ অভিবাসী উদ্ধার
এ বিভাগের সর্বশেষ
প্রান্তরে জীবনের বীজ
শামসুর রাহমানপ্রান্তরে জীবনের বীজ
দুলে ওঠে ঘর না কারবালা
দুলে ওঠে ঘর না কারবালা
কফিনের পোস্টার
কফিনের পোস্টার
লেফট রাইট লেফট
লেফট রাইট লেফট
একটাই তর্জনী
একটাই তর্জনী