X
রবিবার, ১৯ মে ২০২৪
৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ক্ষতচিহ্নিত হাড়মাংস অথবা নিছকই আত্মজনের কথা

গৌতম গুহ রায়
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫:৫৪আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫:৫৪

স্কুল থেকে ফিরে এলে মা মুড়ি ও বাতাসা দিতেন। চা তখনো আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়নি। মুড়ি ও আখের গুড় বা মুড়ি বা চিড়াভাজা ছিল স্কুল ফেরতা আমাদের বিকালের আহার। এরপর আমার কাজ ছিল ঠাকুমার ঘরে গিয়ে তাকে রামায়ণ শোনানো। রামায়ণের গল্প শোনার জন্য ততদিনে একটা আগ্রহীমণ্ডলী তৈরি হয়েছে। মা জেঠিমা, ঠাকুমার সখীরা অপেক্ষায় থাকতেন। আমি গিয়ে ঠাকুমার পাশে, বিছানাতেই বসে পড়তে শুরু করতাম।

‘ত্রৈলোক্য বিজয় যজ্ঞ অতি পরিপাটি।

আতপতণ্ডুলে হোম করে কোটি কোটি।।

লক্ষ লক্ষ শুভ্র বস্ত্র ব্রাহ্মণের হাতে।

ইন্দ্র যম বরুণ যজ্ঞের চারিভিতে।।

এভাবে ঠাকুমাকে পড়ে শোনাতে লাগলাম তার দেশের বাড়ি থেকে আনা কৃত্তিবাসী রামায়ণ। যখন লব কুশের কুটিরের দরজার কাছে রামচন্দ্রের অশ্বমেধের ঘোড়া এসে দাঁড়ালো তখন ঠাকুমার মুখেও একটা অদ্ভুত আনন্দ খেলে যায়, ‘পড়ে যা দাদুভাই, পড়ে যা, এরপর দুই ভাই কী করে দেখ!’ আজ তাই মনে হয় সেদিন ঠাকুমার পক্ষপাত কি ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে চালচুলাহীন দুই কিশোরের চ্যালেঞ্জের পক্ষ নিয়েছিল? 

‘অশ্ব দেখি হরষিত হইল দুইজন।

জয়পত্র ভালে তার দেখিল লিখন।।

...

সে অশ্বমেধের অশ্ব রাখে শত্রুঘন।

দুই অক্ষৌহিণী ঠাট তাহার ভিড়ন।।

জয়পত্র দেখি দুই ভাই জ্বলে।

সাহস করিয়া ঘোড়া বান্ধে বৃক্ষমূলে।।

দুই অখৌহিণী অশ্বে না পারে রাখিতে।

হেন অশ্ব দুই ভাই বান্ধে ভালোমতো।’

আমি পড়তে পড়তেই দেখতাম কখন ঠাকুমা রামায়ণ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। অসুস্থতার পর তার ঘুম যখন তখন চলে আসত, আবার নির্ঘুম রাতও তাকে জাগিয়ে রাখত। ঠাকুমার ঘুম-যাত্রার সময় হয়ত আমি সীতার বনবাস পর্ব শোনাচ্ছিলাম, পরদিন আগের দিনের রেশ ধরে বলতেন– শেষে কী হলো রে? আমি বলা শুরু করতেই তিনি নিজেই সেই গল্প শুরু করে দিতেন। ‘এরপর লক্ষ্মণের কান্না দেখে সীতা-মা জানতে চাইল কী কারণে সে কাঁদছে? লক্ষ্মণ আর গোপন করতে না পেরে বলল– ‘কব কেমন সাহসে, রামের আজ্ঞায় তোমা আনি বনবাসে। মহাত্রাস পান সীতা শুনিয়া কাহিনি, শ্রাবণের ধারা-সম চক্ষে ঝরে পানি।’ লক্ষ্য করতাম ঠাকুমার দুচোখ জলে ভরে যাচ্ছে। এই কান্নাজল যতটা না সীতার জন্য তারচেয়ে কম নয় তার হারানো ভিটা, স্বজনদের জন্য।

আমি যে সময়ের কথা বলছি সেই বয়সটার কথা বলতে গেলে সময়ের কালক্রম মেলান যায় না। স্মৃতিতে নানা ঘটনা একে একে এসে দাঁড়িয়ে পরে। দেশবন্ধু-নগর কলোনির আমাদের ৫ নং গলির পরের গলিতে থাকতেন ছানাকর, মধুকর নামে দুই ভাই। আটষট্টির বন্যায় ভেসে আসা কাঠ ধরে আজ তখন তারা বিত্তশালী। বেশ রমরমা তাদের কাঠের ব্যবসা। ফলত সেই সময় সেই অঞ্চলের অন্যতম ধনবান তারা। ছানাকরের মেয়ে চৈতালি ও আমি এক ক্লাসে পড়তাম। আমার ছোটোকাকু টিউশন করাতেন তাকে। একদিন কাকু বললেন– ‘চল তুইও চৈতালির সঙ্গেই পড়বি আমার কাছে’। সেই থেকে করবাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্কের রসায়ন পালটে যায়। সেই ছানাকরের বাসায় বছরভর নানা পূজা-পার্বণের আয়োজন হত। অষ্টপ্রহর নাম সংকীর্তনে রাধাকৃষ্ণের লীলাকীর্তন হত। বিভিন্ন জায়গা থেকে কৃষ্ণকথা গাইতে আসতেন বিখ্যাত কীর্তনীয়ারা। আমাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ থাকত শেষদিন দুপুরে লাইন দিয়ে বসে গরম খিচুড়ি ভোগ খাওয়া। নৌকাবিলাসসহ নানা পালা ওদের বাড়ির বিশাল উঠানে আয়োজিত  হত। গোটা কলোনির মানুষ সেই গান শুনতে হাজির হত। বাচ্চা একটা ছেলেকে কৃষ্ণ সাজান হত। সেই বংশীবদন ছোকরা এদিক ওদিক বাঁশি হাতে ঘুরে বেড়াত।

কলোনির ৪ নম্বর গলির সেই কর বাড়িতেই আমি প্রথম রামলীলা দেখি। তখনো থিয়েটারের নাগরিক আয়োজন আমাদের কলোনিতে ঢোকেনি, আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকত প্রতিবছর হেমন্তকালে আয়োজিত রামলীলা। উঠানের মাঝখানে বানানো হত পালামঞ্চ, কলাগাছ দিয়ে চৌহদ্দি চিহ্নিত করা থাকত, মাথার উপর ত্রিপল। হ্যাজাকের আলোয় সেই যুদ্ধ যুদ্ধ অভিনয়ের প্রদর্শন আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। হনুমানের লঙ্কা দহন, লক্ষ্মণের শক্তিশেল, ইন্দ্রজিতের যুদ্ধ, অশ্বমেধের ঘোড়া নিয়ে শত্রুঘ্নের লব-কুশের সঙ্গে বিবাদ। মঞ্চের চারদিকে পোয়াল বা খড় বিছান থাকত দর্শকদের বসার জন্য। ঠাকুমা তখনো টগবগে, আমাদের মানে সাত আটজন নাতি নাতনিকে নিয়ে তিনি হাজির হতেন সেই আসরে। ঠাকুমা ছিলেন বলেই রাতের ওই পালাগানে আমরা যাওয়ার অনুমতি পেতাম।

পালাগানে মঞ্চস্থ সেই বীররসে চিত্রিত রামকথা আর ঠাকুমাকে পড়ে শোনান কৃত্তিবাসী রামায়ণ–দুটির স্বাদ ছিল ভিন্ন, পাঠকরা আর শোনা-দেখা দৃশ্যকাব্যের অভিজ্ঞতা স্বতন্ত্র হয়। রামায়ণ জুড়ে একের পর এক আখ্যানের মোচড়, বহুস্তরীয় চরিত্রের সমাহার, গোটা মহাকাব্য জুড়ে অলৌকিক ঘটনার, যৌনতার অনায়াস চিত্রণ ও এক একটি চরিত্রের আবশ্যিক নির্মাণচিহ্ন হয়ে ওঠা। যেখানে রাজমাতা কৌশল্যা স্বয়ং আশ্বমেধের ঘোড়াকে তিন কোপে বলি দেন এবং সেই মৃত ও রক্তাক্ত ঘোড়ার শবদেহের সঙ্গে রাত কাটান। গোটা রামায়ণ জুড়েই বিস্তর অলৌকিক ঘটনার সমাহার। একটা যুদ্ধের আগে ও পরের ঘটনাক্রম নিয়েই এই মহাকাব্য। বিরাট ক্ষমতাধারী, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে একদল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র বানর সেনা নিয়ে মাত্র দুজন আস্ত্রধারী মানুষের এক অসম যুদ্ধের জয়-পরাজয়। এমন একটা অসম যুদ্ধে অলৌকিক উপাদান থাকবেই। গন্ধমাদন, বিশাল্যকরণির সাহায্যে যুদ্ধে প্রায়-পরাজিত হতচেতন রাম লক্ষ্মনের জ্ঞান ফিরে আসা। যুদ্ধে মায়া সীতা, রামের ছিন্ন মস্তক দেখানো, এসবই অলৌকিক ঘটনার সমাবেশ। 

গলায় তুলশি মালা জড়ানো আমার ঠাকুমা বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যখন রামকথা শুনতে চাইছেন তখনো রাম কোনো ধর্মীয় ঈশ্বর চরিত্র নন, রাময়ণ তার কাছে বহুবর্ণের এক আখ্যান, যে আখ্যানে স্বয়ং ঢুকে যান, বেরিয়ে আসেন, রাম এই আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্রমাত্র। রামায়ণ তার কাছে নীতি শিক্ষার পাঠ দিত। আবার সেই নীতিবোধকেই তিনি প্রশ্ন করতেন। এভাবে অনেকদিন আমার তার কথাযুদ্ধ হয়েছে, ৭২-এর সঙ্গে ১২-র, মাঝে ৬০ বছরের দূরত্ব থেকে চলত এই কথাবার্তা। ঠাকুমার রামচন্দ্র বাবার দেওয়া কথাকে রক্ষা করার জন্য বনবাস নেন, সীতা নিষ্পাপ জেনেও ত্যাগ করেন, তিনি সেই সময়ের সামাজিক বিধিবদ্ধ নৈতিকতার যুক্তি দেন। আমি ভিন্ন কথা বলি। আমি প্রশ্ন রাখি জামদগ্নের উদাহরণে, লক্ষ্মণের প্রতি শেষ পর্বে রামের আচরণে। সেই চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পিতার নির্দেশে মায়ের মুণ্ডুচ্ছে করেছিলেন ঋষিপুত্র। বিধিবদ্ধতার যুক্তিতে ঠাকুমার ঢাল ছিল ধর্ম। আমার কাছে ন্যায়। কোথাও সেই ন্যায় ও ধর্মের সংঘাত ঘোটে যেত, আমার ভেতরেও। ঠাকুমা যা বলতেন সেই কথা বাল্মিকীর রামায়ণে আমি খুঁজে পাই–‘ত্বং তু ধর্মম অবিজ্ঞায় কেবলং রোষমাস্থিতঃ।/প্রদুষয়সি মাং ধর্মে পিতৃ-পৈতামহে থিতম।।’ এই বিধিবদ্ধতার যুক্তিহীনতায় রামচন্দ্র একদিন তার ভাই লক্ষ্মণকেও রাজ্যছাড়া করেছিলেন। অপরাধ কী ছিল? আদৌ কি অপরাধ ছিল? রামচন্দ্র একজন ঋষির সঙ্গে নিভৃত মন্ত্রণায় বসলেন। সেই ঋষি ছিলেন স্বয়ং কাল। শর্ত ছিল তাদের আলোচনার সময় কেউ বিরক্ত করতে পারবে না, এমন হলে সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। দরজায় লক্ষ্মণ থাকলেন পাহাড়ায়। এদিকে ঋষি দুর্বাসা এলেন রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে। লক্ষ্মণ তাকে অপেক্ষা করতে বললেন। কোপিত স্বভাবের দুর্বাসা গোটা রাজপরিবাকে অভিশাপের ভয় দেখান। যুক্তি যা বলে সেই অনুযায়ী লক্ষ্মণ মন্ত্রণাকক্ষে গিয়ে রামকে এই খবর দিতে চাইলেন। রাম দুর্বাসাকে অভ্যর্থনা করতে বেরিয়ে এলেন। দুর্বাসা বললেন তিনি কিছু ভালো ভোজন চান। রামচন্দ্র রাজগৃহে তার ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। খেয়েদেয়ে ঋষি চলে গেলেন। কিন্তু রামচন্দ্রকে তার জীবনের শেষ বৈধ প্রতিজ্ঞা পালন করতে হবে। লক্ষ্মণকে হত্যা করতে হবে। রাজপুরুষের কাছে ত্যাগই মৃত্যুর সমান, রামচন্দ্র এই কারণে লক্ষ্মণকে ত্যাগ করলেন। অথচ আমাদের কোনো যুক্তিতেই এই সিদ্ধান্তের সমর্থন মেলে না, কারণ লক্ষ্মণ যা করেছেন তা রাজপরিবারকে দুর্বাসার অভিশাপের হাত থেকে বাঁচাতেই। এভাবেই সেই অসুস্থ ও শয্যাশায়ী মানুষটার পাশে বসে আমার যে পাঠ সূচিত হয়েছিল, আজও সেই পাঠ প্রতিনিয়ত আমাকে জিজ্ঞাসায়িত করে চলছে।

চলবে 

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সংকট থেকে উত্তরণে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান মেননের
সংকট থেকে উত্তরণে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান মেননের
কানে ঝুলছে বাংলাদেশের দুল!
কান উৎসব ২০২৪কানে ঝুলছে বাংলাদেশের দুল!
ধোনি-জাদেজার লড়াই ছাপিয়ে প্লে অফে বেঙ্গালুরু
ধোনি-জাদেজার লড়াই ছাপিয়ে প্লে অফে বেঙ্গালুরু
হীরকজয়ন্তীর পর সংগঠনে মনোযোগ দেবে আ.লীগ
হীরকজয়ন্তীর পর সংগঠনে মনোযোগ দেবে আ.লীগ
সর্বাধিক পঠিত
মামুনুল হক ডিবিতে
মামুনুল হক ডিবিতে
৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবি তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের
৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবি তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের
আমেরিকা যাচ্ছেন ৩০ ব্যাংকের এমডি
আমেরিকা যাচ্ছেন ৩০ ব্যাংকের এমডি
নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভালো সড়ক কেটে ২ বছর ধরে খাল বানিয়ে রেখেছে
নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভালো সড়ক কেটে ২ বছর ধরে খাল বানিয়ে রেখেছে
গরমে সুস্থ থাকতে কোন কোন পানীয় খাবেন? ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় কখন জরুরি?
গরমে সুস্থ থাকতে কোন কোন পানীয় খাবেন? ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় কখন জরুরি?