তোমার জীবন বর্তমানেই নির্ধারিত
যুবক: সুখী হওয়ার সাহসিকতা, হ্যাঁ?
দার্শনিক: আরও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে কি?
যুবক: না, দাঁড়ান…দাঁড়ান। কেমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি। প্রথমে আপনি বললেন—পৃথিবী একটি সহজ জায়গা। একে জটিল মনে হয় কেবল নিজের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। তা ছাড়া, জীবনকে জটিল মনে হওয়ার কারণ হলো—আমি নিজেই এটাকে জটিল বানিয়েছি এবং তাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরে বললেন, ফ্রয়েডের ঈটিওলজি’র পরিবর্তে আমাদের উচিত টেলিওলজি মতবাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। অর্থাৎ অতীতের ঘটনা প্রবাহের কারণ অনুসন্ধান না করা এবং ট্রমাকে বাদ দেওয়া প্রয়োজন। আপনি আরও বললেন—মানুষ কেবল অতীতের ঘটনার কারণ দ্বারা তাড়িত কোনো জীব নয় বরং সর্বদাই কোনো না কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করে। তাই নয় কি?
দার্শনিক: ঠিক।
যুবক: অধিকন্তু টেলিওলজি’র মূল বক্তব্য উল্লেখ করে বলেছেন যে, মানুষ পরিবর্তন হতে পারে এবং প্রত্যেকেই ক্রমাগতভাবে নিজ নিজ জীবনধারা বেছে নেয়।
দার্শনিক: হ্যাঁ, তাই বলেছি।
যুবক: আর আমি পালটাতে পারছি না কারণ আমি ক্রমাগতভাবেই পরিবর্তন না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। নতুন জীবনধারা বেছে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাহস আমার নেই। অন্য কথায় বলতে হয়, সুখী হওয়ার মতো যথেষ্ট সাহসিকতা না থাকায় আমি অসুখী। কিছু কি ভুল বলেছি?
দার্শনিক: না, তুমি ভুল কিছু বলনি।
যুবক: তাহলে বলুন…প্রশ্ন হলো, আমার কোন পন্থা অবলম্বন করা উচিত? অর্থাৎ আমার জীবনধারা পরিবর্তন করতে কী করা উচিত তা এখনও বলেননি।
দার্শনিক: তুমি ঠিক বলেছ। প্রথমেই যা করা উচিত তাহলো তোমার বর্তমান জীবনধারাকে এখানেই থামিয়ে দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, তুমি আগে বলেছিলে, ‘যদি কেবল ম-এর মতো হতে পার, তাহলে সুখী হবে’। তুমি যদি এই ‘যদি, কিন্তু এবং অমুক-তমুক সম্ভাব্যতার জগতেই বাস কর, তাহলে কখনই পরিবর্তন হতে পারবে না’। কারণ ‘আমি যদি কেবল ম-এর মতো হতে পারতাম’ বলা শুধু নিজেকে পরিবর্তন না করার পিছনে একটি অজুহাত দাঁড় করানো বৈ কিছু নয়।
যুবক: পরিবর্তন না হওয়ার পিছনে অজুহাত?
দার্শনিক: হ্যাঁ। আমার একজন তরুণ বন্ধু আছে; সে ঔপন্যাসিক হতে চায় কিন্তু তাঁর কাজগুলো কখনও শেষ করে না। সে বলে, সারাদিন অন্য কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতে হয় যে, উপন্যাস লেখার যথেষ্ট সময় পায় না। এজন্য তাঁর উপন্যাস লেখাও শেষ হয় না, এবং কোনো সাহিত্য পুরস্কারের জন্য নাম লেখানোও হয়ে ওঠে না। কিন্তু এটা কি গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ হতে পারে? সে কোনোকিছু না করে কেবল ‘চেষ্টা করলে আমি করতে পারি’-সম্ভাবনার এই আত্মতুষ্টি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায়। আসলে সে তাঁর লেখাগুলোকে সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করাতে ভয় পায় এবং নিজেও বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চায় না। কারণ, হতে পারে লেখাগুলো নিম্নমানের হওয়ায় তা বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তরুণ কেবল সম্ভাবনার জগতে বাস করতে চায়; যেখানে সে বলতে পারে—যথেষ্ট সময় এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই সে লিখতে পারে; কারণ তাঁর তো প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই। আগামী পাঁচ-দশ বছরের মধ্যেই সে হয়ত নতুন অজুহাত তৈরি করবে এবং বলতে শুরু করবে ‘আমি এখন আর যুবক নেই’ অথবা ‘এখন আমার একটি পরিবার আছে এবং তাঁদের নিয়ে প্রচুর ভাবতে হয়’। তাই, উপন্যাস লেখা শুরু করতে পারছে না।
যুবক: তাঁর অনুভূতিকে বুঝতে পারছি।
দার্শনিক: তাঁর উচিত সাহিত্য প্রতিযোগিতায় নাম লেখানো; যদি প্রত্যাখ্যাত হয়, হোক। সেটা করলেই সে সামনে এগোতে পারবে; নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে জানতে পারবে। বুঝতে পারবে তাঁর আসলে ভিন্ন কিছু চেষ্টা করা উচিত। কোনো না কোনোভাবে সে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। বর্তমান জীবনধারা পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো তা-ই…শুরু করা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ না করলে সে কখনই উন্নতি করতে পারবে না।
যুবক: হয়ত তাঁর স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
দার্শনিক: আচ্ছা, আমার কী মনে হয় জান?…সহজ কাজ—অর্থাৎ যেগুলো সকলেরই করা উচিত, তা না করে—বারবার না করতে পারার কারণ উপস্থাপনের প্রবণতাই জীবনকে জটিল ও সমস্যাবহুল করে তোলে, তাই নয় কি? ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আমার বন্ধুর ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিষ্কার—এই ‘আমি’ এবং ‘আমিত্ব’ তাঁর জীবনধারাকে এতটাই জটিল করে তুলেছে যে, সে আর শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে পারছে না।
যুবক: কিন্তু… এই যুক্তি খুবই নিষ্ঠুর! আপনার দর্শন একেবারেই রসকষহীন, নির্মম!
দার্শনিক: না, বরং এটি খুবই শক্তিশালী ঔষধ।
যুবক: শক্তিশালী ঔষধ! হ্যাঁ, তা বলতে পারেন—আমি একমত।
দার্শনিক: যদি তোমার জীবনধারা অর্থাৎ পৃথিবী এবং নিজেকে অর্থপূর্ণ করার উপায় পরিবর্তন করতে চাও তাহলে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের ধরন এবং একইভাবে তোমার আচরণেরও পরিবর্তন করতে হবে। এ কথা ভুলে যেও না—তোমাকে পরিবর্তন হতে হবে। তুমি, হ্যাঁ এই তোমাকেই তোমার জীবনধারা বেছে নিতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও আসলে বিষয়টি খুবই সহজ।
যুবক: আপনার কথা মতো ট্রমা বলে কিছু নেই; এমনকি পরিবেশ-পরিস্থিতিও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। এগুলো কেবল আমার উপর চেপে বসা অতীতের বোঝা। আমার সকল দুঃখের জন্য আমিই দায়ী, তাই নয় কি? আমার মধ্যে এমন একটা অনুভূতি হচ্ছে যেন মনে হয় অতীতে আমার যা কিছু ছিল এবং করেছি তার সবকিছুর জন্যই আমি সমালোচিত হচ্ছি।
দার্শনিক: না, তোমাকে কেউ সমালোচনা করছে না। বরং অ্যাডলারের টেলিওলজি আমাদের এই ধারণা দেয় যে, ‘তোমার জীবনে এ পর্যন্ত যা ঘটেছে তার প্রভাব এখন থেকে আর তোমার জীবনধারার ওপর পড়তে দেওয়া যাবে না’। এই তুমি, যে ‘এখানে এবং এখন’ অর্থাৎ বর্তমানে বাস করছ, সেই তুমিই তোমার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করবে।
যুবক: আমার জীবন ঠিক এই ‘এখন এবং এখান’ থেকে নির্ধারিত হবে?
দার্শনিক: হ্যাঁ, কারণ অতীতের কোনো অস্তিত্ব নেই।
যুবক: আচ্ছা! আপনার তত্ত্বের সঙ্গে আমি শতভাগ একমত নই। অনেকগুলো বিষয়ই পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারছি না এবং সেগুলো নিয়ে তর্ক করতে পারি। অধিকন্তু, আপনার তত্ত্বগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই তথা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এটা নিশ্চিত যে, আমি অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহ বোধ করছি। এক রাতের জন্য যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আবার এলে আপনি কিছু মনে করবেন না আশাকরি। যদি একটু বিরতি না দেই, আমার মস্তিষ্ক বিদীর্ণ হয়ে যাবে মনে হয়।
দার্শনিক: আমিও মনে করি, যে-বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হলো সেগুলো নিয়ে তোমার চিন্তা করার অবকাশ প্রয়োজন। আমি সবসময় আছি; তোমার যখন খুশি আসতে পার। সমগ্র আলোচনা আমি উপভোগ করেছি। ধন্যবাদ তোমাকে; আবার কথা হবে।
যুবক: চমৎকার! অনুমতি দিলে আরেকটা কথা বলতে চাই। আমাদের আজকের আলোচনা ছিল দীর্ঘ এবং তীব্র উত্তেজনাময়। কখনও কখনও বেশ রূঢ়ভাবে কথা বলেছি; তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।
দার্শনিক: এটি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। তোমার উচিত মহান প্লেটোর ‘ডায়ালগ’ পড়া। মহান সক্রেটিসের শিষ্যের আচরণ ও ভাষা অবিশ্বাস্য রকম খোলামেলা ছিল; আসলে একটি সংলাপ অমনই হওয়া উচিত।
দ্বিতীয় রাত
সকল সমস্যার মূলেই রয়েছে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা
স্মৃতি সতেজক
যুবক কথা রেখেছে; ঠিক এক সপ্তাহ পরেই সে দার্শনিকের পড়ার ঘরে এসে উপস্থিত। সত্য বলতে কী, প্রথমবার আসার দু-তিন দিন পর থেকেই সে পুনরায় আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল। সে বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখেছে এবং তাঁর সন্দেহগুলো বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। সংক্ষেপে, টেলিওলজি হলো—একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা বৈশিষ্ট্যের কারণ অনুসন্ধান নয় বরং একটি উদ্দেশ্য যোগ করে তাকে অর্থবহ করে তোলার প্রক্রিয়াটি মানুষকে বোকা বানানোর এক ধরনের চতুর কৌশল (sophistry)। তা ছাড়া, ট্রমার অস্তিত্ব প্রশ্নাতীত। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অতীতকে ভুলতে কিংবা এর থেকে মুক্তও হতে পারে না।
আজ যুবক তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে, এই দার্শনিকের অবিশ্বাস্য মতামতকে ভেঙে তছনছ করে দিয়ে প্রথম… হ্যাঁ প্রথম ও শেষবারের মতো বিষয়গুলোর মীমাংসা করে ফেলবে।
নিজেকে অপছন্দ কর কেন?
যুবক: গত দিনের পর আমি শান্তভাবে, গভীর মনোযোগসহকারে সবগুলো বিষয় নিয়ে আদ্যোপান্ত ভেবে দেখেছি। বলতেই হয়, আপনার তত্ত্বের সঙ্গে আমি এখনও একমত হতে পারছি না।
দার্শনিক: ওহ্, তাই নাকি? এগুলো সম্পর্কে তোমার মাথায় কী কী প্রশ্ন ঘুরছে?
যুবক: আচ্ছা! উদাহরণস্বরূপ, সেদিন বলেছিলাম আমি নিজেকে পছন্দ করি না। যা কিছুই করি না কেন, আমার দুর্বলতা ও ত্রুটি ছাড়া আর কিছু যেমন খুঁজে পাই না, তেমনি নিজেকে পছন্দ করার মতো কোনো যুক্তিও দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু তারপরও…অবশ্যই আমি পরিবর্তন হতে চাই। আপনি বলেছিলেন সবকিছুরই একটি লক্ষ্য রয়েছে; কিন্তু এসবের মধ্যে কী ধরনের লক্ষ্য খুঁজে পেতে পারি? বলতে চাচ্ছি যে, নিজেকে পছন্দ না করার মধ্যে কী ধরনের সুবিধা থাকতে পারে? আর, এর মধ্যে থেকে কোনোকিছু অর্জনের কথা কল্পনাও করতে পারছি না।
দার্শনিক: ঠিক আছে। তুমি ভাবছ তোমার কোনো শক্তিশালী দিক নেই; চারিদিকে শুধু ভুল, হতাশা। ঘটনা যাই হোক না কেন…নিজের সম্পর্কে এটাই তোমার একান্ত অনুভূতি। অন্য কথায়, তোমার আত্মসম্মানবোধের মাত্রা একেবারেই নিচু স্তরে রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—কেন তুমি নিজেকে এমন হতভাগ্য মনে করছ? কেনই বা নিজেকে এমন নিচু দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করছ?
যুবক: কারণ এটাই সত্য—আসলেই আমার কোনো শক্তিশালী দিক নেই।
দার্শনিক: তুমি সঠিক নও। নিজেকে পছন্দ করবে না বলে তুমি ঠিক করে নিয়েছ; তাই, নিজের শক্তিশালী বিষয়গুলো এড়িয়ে যাচ্ছ। কেবল দুর্বলতাগুলোই তোমার চোখে পড়ছে এবং সেগুলোর উপরই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করছ। এই বিষয়টিকে আগে বুঝতে চেষ্টা কর।
যুবক: নিজেকে পছন্দ করব না বলে আমি ঠিক করে নিয়েছি?
দার্শনিক: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তোমার নিকট নিজেকে অপছন্দ করা একটি সদ্গুণ।
যুবক: কেন? কী জন্য?
দার্শনিক: আমার মনে হয়—নিজের সম্পর্কিত সেই বিষয়টিই তোমার প্রথমে খুঁজে বের করা উচিত। তোমার নিজের কী কী ধরনের ত্রুটি রয়েছে বলে মনে হয়?
যুবক: আমি নিশ্চিত, আপনি ইতোমধ্যেই তা খেয়াল করেছেন। প্রথমেই যেটা আসে তাহলো আমার ব্যক্তিত্ব। আত্মবিশ্বাসের প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে এবং সবকিছু্তেই নেতিবাচকতা প্রকট। তা ছাড়া, ধারণা করি আমি অতি মাত্রায় আত্ম-সচেতন এবং অন্য মানুষ কী ভাববে তাই নিয়ে সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকি। আর এভাবেই সারাক্ষণ অন্যদের প্রতি অবিশ্বাস নিয়েই জ্বলে মরছি। কখনই স্বাভাবিক আচরণ করতে পারি না এবং যা বলি ও করি তার মধ্যে সবসময় একটা নাটকীয়তা থাকে। কেবল ব্যক্তিত্বই নয়, আমার অবয়ব কিংবা শরীর কোনটাতেই পছন্দ করার মতো কিছু নেই।
দার্শনিক: এভাবে সীমাবদ্ধতাগুলোর তালিকা তৈরির সময় তোমার মাঝে কেমন অনুভূতি হয়?
যুবক: আহ্! খুবই বাজে। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ অপ্রিয়! আমার মতো কদাকার চেহারা ও দোষযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কেউ মিশতে চাইবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আসলে আমিও সেটাই করতাম অর্থাৎ এমন হতভাগ্য, বিরক্তিকর কেউ ত্রি-সীমানায় এলে আমিও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতাম।
দার্শনিক: তাই নাকি! আচ্ছা, তাহলে এ বিষয়টি এখানেই শেষ হলো।
যুবক: কী বলতে চান?
দার্শনিক: তোমার উদাহরণ থেকে বিষয়টি বুঝতে পারা কঠিন হতে পারে; তাই অন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমি এই পাঠগৃহ সাধারণত ‘মনোবিকলন’ (counselling) অর্থাৎ কথোপকথনের মাধ্যমে সহজ প্রকৃতির বিভিন্ন মনোরোগের চিকিৎসা প্রদানের জন্য ব্যবহার করে থাকি। বেশ কয়েক বছর পূর্বে একজন ছাত্রী চিকিৎসা নেওয়ার জন্য এখানে এসেছিল। তুমি এখন যেখানে এবং যে চেয়ারে বসে আছ, সেও ঠিক ওখানেই বসেছিল। তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ নিয়ে। সে জানায় যে, জনসমক্ষে গেলেই তাঁর চেহারা লাল হয়ে যায়। সে এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যেকোনো কিছুই করতে প্রস্তুত ছিল। আমি তাঁর নিকট তখন জানতে চাইলাম-‘এই অবস্থার নিরাময় হলে তুমি কী করতে চাও’? সে জানায় তাঁর পছন্দের একজন পুরুষ ছিল। সে গোপনে তাঁর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করলেও কখনও তা প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এই ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ থেকে মুক্তি পেলেই সে তাঁর পছন্দের পুরুষের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার বাসনা প্রকাশ করবে।
যুবক: হাহ্! এটি মনোবিকলনের জন্য আসা একজন ছাত্রীর জন্য প্রযোজ্য খুবই সাধারণ একটি বিষয়। পছন্দের পুরুষের প্রতি গভীর প্রণয় প্রকাশের জন্য প্রথমে তাঁর ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ থেকে মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন।
দার্শনিক: কিন্তু এটাই কি পুরো গল্প? আমার একটি ভিন্ন মত রয়েছে। কেন তাঁর মধ্যে এই ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ তৈরি হলো? এবং কেনই-বা তা নিরাময় হলো না? কারণ ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’র এই লক্ষণ তাঁর প্রয়োজন ছিল।
যুবক: আসলে কী বলতে চান? আপনার কাছে সে এর নিরাময়ের জন্য এসেছিল, তাই নয় কি?
দার্শনিক: তাঁর কাছে সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় কী ছিল বলে মনে কর? অর্থাৎ কোন বিষয়টি সে তীব্রভাবে এড়াতে চাইত? অবশ্যই পছন্দের সেই মানুষটির দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভীতি। কারণ, এই একতরফা ভালোবাসা এতটাই সর্বগ্রাসী যে, তা প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁর সবকিছু; এমনকি তাঁর অস্তিত্ব ও আমিত্বের অহংকার… সবকিছু ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। এই আঙ্গিকটি সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালীন একতরফা ভালোবাসায় গভীরভাবে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তাঁর মধ্যে যতক্ষণ এই ভীতি থাকবে, সে সবসময় ভাবতে থাকবে—‘আমার মধ্যে লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি রয়েছে বলেই আমি তাঁর সঙ্গে একত্রিত হতে পারি না’। ফলে সাহস সঞ্চয় করে প্রিয় মানুষটির কাছে কখনই তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে না এবং ‘সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ যেকোনোভাবেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করত’ ভেবে সান্ত্বনা খুঁজে নেবে। শেষ পর্যন্ত ‘যদি লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি না থাকত, আমি তবে…’ এমন একটি সম্ভাব্যতার রাজ্যে গা ভাসাবে।
যুবক: অর্থাৎ ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’-কে সে প্রণয়ানুভূতি প্রকাশের অসামর্থতার কল্পিত অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। অথবা, হতে পারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বিমা হিসেবে ধরে নিয়েছে।
দার্শনিক: হ্যাঁ, ওভাবেও বলা যায়।
যুবক: আচ্ছা! এটি কিন্তু খুবই বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য একটি উদাহরণ। আসল ঘটনা যদি তা-ই হয় তবে, তাঁর সাহায্যের জন্য কিছু করা অসম্ভব নয় কি? কারণ, একইসঙ্গে এই ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ তাঁর প্রয়োজন; আবার এটাই তাঁর ভোগান্তির জন্য দায়ী; তাঁর সমস্যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
দার্শনিক: ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ সহজেই দূর করা সম্ভব—হ্যাঁ, আমি তাঁকে ঠিক এ কথাই বলেছিলাম। ‘সত্যি!’ বলেই সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল। ‘কিন্তু আমি তা নিরাময় করব না’-বলায় সে কারণ জানতে চাইল। আমি বললাম—দেখ, তোমার এই ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ আছে বলেই জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি, চারিদিকের রূঢ় পৃথিবী এবং এমনকি কাঙ্ক্ষিত পথে না যাওয়া নিজস্ব জীবনকেও মেনে নিতে পারছ। এটি কেবল তোমার এই ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’র কারণেই সম্ভব হয়েছে। বিস্মিত ছাত্রী জিজ্ঞাসা করল—তা কী করে সম্ভব? আমি বলতে লাগলাম—আমি তোমার এই সমস্যার সমাধান করে দিলাম কিন্তু তোমার অবস্থার আদৌ কোনো পরিবর্তন হলো না, সেক্ষেত্রে তুমি কী করবে? তুমি সম্ভবত পুনরায় আমার নিকট আসবে এবং তোমার ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’-কে ফিরিয়ে দিতে বলবে। আর সেটা আমার ক্ষমতার বাইরে এবং কোনোক্রমেই তা সম্ভব নয়।
যুবক: হুম্…।
দার্শনিক: তাঁর এই কাহিনি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকা শিক্ষার্থীগণ মনে করে পরীক্ষায় পাশ করলেই জীবনটা রঙিন হবে; কোম্পানির চাকরিজীবীগণ মনে করেন বদলি হতে পারলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই প্রত্যাশাগুলোর অনেকাংশ পূরণ হলেও তাঁদের প্রকৃত অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
যুবক: হ্যাঁ, খুবই সম্ভব!
দার্শনিক: ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ দূর করার অনুরোধ নিয়ে কোনো মক্কেল এলে কাউন্সেলরের তা নিরাময় করা মোটেও উচিত নয়। এমনটি করলে সেটি পুনরুদ্ধার করা অধিকতর কঠিন হতে পারে। এ জাতীয় বিষয়গুলোকে নিয়ে এটাই হলো অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানের চিন্তা করার ধরন।
যুবক: সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আপনি তখন কী করেন? আপনি তাঁদের উদ্বেগের কারণ সম্পর্কে জানতে চান এবং যেমন আছে ঠিক সেভাবেই তা রেখে দেন?
দার্শনিক: নিজের প্রতি আস্থার প্রচণ্ড ঘাটতি ছিল সেই ছাত্রীর। বিষয়গুলো যেমন ছিল তেমন থাকলে অথবা তাঁর অনুভূতির কথা প্রকাশ করলেও পছন্দের পুরুষ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে—এটাই ছিল তাঁর ভীষণ ভয়ের কারণ। বাস্তবে তা ঘটলে তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও কমে যাবে এবং সত্যিকার অর্থে আহত হবে। এজন্যই সে ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’ নামক কল্পিত এই লক্ষণের অবতারণা করেছে। প্রথমেই আমি ঐ ব্যক্তিকে ‘বর্তমানের এই আমি’-কে গ্রহণের জন্য প্ররোচিত করতে এবং পরে ফলাফলের কথা না ভেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাতে পারি। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে এই পন্থাকে ‘অনুপ্রেরণা’ (encouragement) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
যুবক: অনুপ্রেরণা?
দার্শনিক: হ্যাঁ! আমাদের আলোচনা আরেকটু এগুলোই আমি ‘অনুপ্রেরণা’ কী নিয়ে বা কীভাবে গঠিত তা ধারাবাহিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করব। আমরা এখনও ঐ স্তরে পৌঁছাতে পারিনি।
যুবক: এতেই চলবে। সে সময় পর্যন্ত আমি ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দটি আমার মস্তিষ্কে গেঁথে রাখব। তারপর ঐ মেয়ের কী হলো?
দার্শনিক: কার্যত, মেয়েটি একদল বন্ধুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল এবং তাঁর পছন্দের মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে লাগল। মজার ব্যাপার, এক পর্যায়ে ঐ ছেলেটিই মেয়েটির সঙ্গে থাকার প্রস্তাব করে বসে। এই ঘটনার পরে অবশ্যই সে আর এই পাঠগৃহে ফিরে আসেনি। আমি জানিও না যে তাঁর ‘লজ্জায় লাল হওয়ার ভীতি’র কী হয়েছে। তবে, সম্ভবত তাঁর কাছে এর আর কোনো প্রয়োজন ছিল না।
যুবক: হ্যাঁ! তাঁর ক্ষেত্রে এর আর কোনো উপযোগিতা ছিল না।
দার্শনিক: একদম ঠিক! ঐ মেয়েটির কাহিনি মাথায় রেখে তোমার সমস্যার ওপর আলোকপাত করা যাক। তুমি বলেছ, ইদানীং নিজের ত্রুটিগুলোই কেবল চোখে পড়ছে। নিজেকে আর কখনও পছন্দ করা তোমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আরও বলেছ যে, তোমার মতো হতাশ ও নেতিবাচক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কেউই মিশতে চাইবে না, তাই নয় কি? ইতোমধ্যে বিষয়টি বুঝতে পেরেছ বলে আমি নিশ্চিত। তুমি নিজেকে কেন অপছন্দ কর? কেবল ত্রুটিগুলোতেই কেন তুমি মনোযোগ দাও এবং কেনই-বা নিজেকে অপছন্দ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছ? এর কারণ হলো, তুমি অন্যদের অপছন্দের শিকার হতে এবং আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঘাত পেতে অতিরিক্ত মাত্রায় ভয় পাও।
যুবক: আপনি কী বোঝাতে চান?
দার্শনিক: সেই লজ্জায় লাল হওয়ার ভয়ে ভীত মেয়েটির মতো—যে কি-না পছন্দের পুরুষ মানুষ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে তটস্থ ছিল। তুমিও অন্যদের দ্বারা উপেক্ষিত হওয়ার ভয়ে সবসময় সন্ত্রস্ত থাক। তোমার ভয় অন্যদের দ্বারা নির্মমভাবে সমালোচিত হওয়া, প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং গভীর মানসিক ক্ষত তৈরির। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ার চেয়ে কারও সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখাকেই তুমি অধিকতর শ্রেয় মনে করছ। অন্যভাবে বলতে হয়, অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে আহত না হওয়াকেই তোমার লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছ।
যুবক: হাহ্...!
দার্শনিক: এখন প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করা যায়? উত্তর খুবই সোজা...নিজের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের কর। নিজেকে অপছন্দ করতে শুরু কর এবং এমন কারও মতো হয়ে যাও যে কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে না অর্থাৎ অসামাজিক। এভাবে যদি নিজেকে খোলসের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলতে পার; তবে, অন্য কারও সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে হবে না। আর কেউ যদি তোমার প্রতি মনোযোগ না দিয়ে অসম্মান করতে চায় তখন তোমার নিকট তার একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা সবসময় তৈরিই থাকবে। ব্যাখ্যাটি হতে পারে এমন যে, ঐ ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাগুলোর জন্যই লোকে তোমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। বিষয়গুলো এমন না হলে তোমাকেও কেউ না কেউ ভালোবাসত।
যুবক: হাহ্...হা! এবার সত্যিকার অর্থেই আপনি আমাকে লজ্জিত করলেন।
দার্শনিক: এভাবে ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে বলো না কিংবা এড়িয়ে যেও না। সকল ত্রুটি নিয়ে ‘যা আছি তা-ই থাকা’ তোমার একটি মূল্যবান গুণ; যা তোমার কাজে লাগে।
যুবক: উহ্! অন্তরে খোঁচা লাগছে। কী পীড়াদায়ক! আপনি খুবই নিষ্ঠুর। তা ঠিক...আমি ভয় পাই, ভীত। পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে মনঃকষ্ট পেতে চাই না। আমার যা আছে তা, সোজা কথায় আমাকে নিয়ে কেউ উপহাস করতে পারে এই ভেবে ভীষণ কষ্ট পাই। যদিও কঠিন, তবুও সত্যকে স্বীকার করতেই হয়...হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন।
দার্শনিক: সত্যকে স্বীকার করতে পারা একটি উত্তম মনোভাব। তবে ভুলে যেও না, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কে আঘাত না পাওয়াটা একদম অসম্ভব। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, কম হোক বা বেশি, আঘাত পাওয়া এবং আঘাত দেওয়া একটি অবধারিত ঘটনা। অ্যাডলারের ভাষ্যে, ‘জীবনে সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটিই উপায়, তাহলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সম্পূর্ণরূপে একাকী বসবাস করা’। কিন্তু তা করা আসলে কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।
সকল সমস্যাই আন্তঃব্যক্তিক সমস্যা
যুবক: এক মিনিট! আমার কি একটা বিষয় এড়িয়ে যাওয়া উচিত? তাহলো, জীবনের সকল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একজনের কি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সম্পূর্ণরূপে একাকী বসবাস করা উচিত? এর দ্বারা আপনি কী বোঝাতে চাইছেন? সম্পূর্ণ একাকী বাস করতে গেলে আপনি ভয়ঙ্কর একাকিত্বে ভুগবেন, তাই নয় কি?
দার্শনিক: একা হওয়া আর একাকিত্ব এক বিষয় নয়। চারপাশে অসংখ্য মানুষ, সমাজ বা সংগঠন থাকার পরেও নিজেকে তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করার গভীর উপলব্ধিই হলো একাকিত্ব। অর্থাৎ ‘একাকিত্ব’ বোধের জন্য অন্য অনেকের প্রয়োজন হয়। অন্যভাবে বলা যায় যে, সামাজিক পরিবেশই মানুষকে ‘একক ব্যক্তি’ (individual)-তে পরিণত করে।
যুবক: আসলেই যদি আপনি একা হন, অর্থাৎ, পৃথিবীতে যদি সম্পূর্ণ একা বেঁচে থাকেন-তাহলে কি আপনি ‘একক ব্যক্তি’ হবেন না? এমনকি একাকিত্ব বোধ করবেন না?
দার্শনিক: আমার মনে হয়, সেক্ষেত্রে একাকিত্ব বোধের এই ধারণাটাই মাথায় আসবে না। তখন তোমার ভাষার প্রয়োজন হবে না। যুক্তি বা সাধারণ জ্ঞানেরও কোনো উপযোগিতা থাকবে না। কিন্তু সেটা আসলে অসম্ভব। এমনকি যদি তুমি জনমানবহীন নির্জন কোনো দ্বীপে বসবাস করতে, তাহলেও হয়তো সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে কারও উপস্থিতির কথা ভাবতে। গভীর নিশুতি রাতে একাকী ঘুমের ঘোরেও কারও নিঃশ্বাসের শব্দ শোনার আশায় কান ব্যথা করে ফেলতে। যতক্ষণ অন্য কোথাও কোনো না কোনো প্রাণের অস্তিত্বের আশা থাকবে, ততক্ষণ তুমি একাকিত্ব দ্বারা তাড়িত হতে থাকবে।
যুবক: সেক্ষেত্রে বিষয়টাকে এভাবে বলা যেতে পারে, ‘এই পৃথিবীতে কেউ যদি সম্পূর্ণ একাকী বাস করে, তবে তাঁর কোনো সমস্যা থাকবে না’, তাই নয় কি?
দার্শনিক: তাত্ত্বিকভাবে ঠিক আছে। অ্যাডলারের ভাষ্যে জোর দেওয়া হয়েছে যে, ‘সকল সমস্যাই আসলে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা’।
যুবক: অনুগ্রহপূর্বক আবার বলবেন কি?
দার্শনিক: তুমি যতবার চাও, আমি বলতে পারি—‘সকল সমস্যাই আসলে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা’। এই মূলভাবের ওপর ভিত্তি করেই অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীতে যদি কোনো আন্তঃব্যক্তিক সমস্যা না থাকে; অর্থাৎ পৃথিবীতে যদি কেবল একজন মানুষ বেঁচে থাকে এবং আর সকল মানুষ উধাও হয়ে যায়; তবে, পৃথিবী থেকে সকল ধরনের সমস্যাও দূর হয়ে যাবে।
যুবক: ডাহা মিথ্যা কথা! এটা মানুষকে বোকা বানানোর জন্য চতুর তাত্ত্বিক কৌশল বৈ অন্য কিছু নয়।
দার্শনিক: পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যতীত আমাদের কোনোভাবেই চলে না। একজন মানুষের অস্তিত্ব, সত্যিকার অর্থে, নির্ভর করে অন্য মানুষের বেঁচে থাকার ওপর। অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে বেঁচে থাকা, নীতিগতভাবে, অসম্ভব। যেমনটা তুমি ইঙ্গিত করছো, ‘যদি কেউ মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ একাকী থাকতে পারত' এই ধারণা একেবারেই অযৌক্তিক।
যুবক: আমার বক্তব্য তা নয়। অবশ্যই আমি স্বীকার করে নিচ্ছি—আন্তঃব্যক্তিক সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। তারপরও এটি একটি চূড়ান্ত অবস্থান...মেনে নেওয়া খুবই কঠিন যে, সব সমস্যাই একটি বিন্দুতে এসে থেমে যায়-আর তাহলো ‘আন্তঃব্যক্তিক সমস্যা’। যে সমস্যাগুলো ব্যক্তির নিজের দিকে নির্দেশ করে, যেমন—পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উদ্বেগ, মানুষ হিসেবে যে সমস্যাগুলো একজনকে ভিতর থেকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে অঙ্গার করে দেয়, সেগুলো সম্পর্কে কী বলবেন? সবগুলোকেই আপনি অস্বীকার করবেন?
দার্শনিক: সম্পূর্ণভাবে একক-ব্যক্তি কেন্দ্রিক সংজ্ঞায়িত উদ্বেগ বলে কিছু নেই; এমনকি তথাকথিত অন্তর্জ্বালা বলেও কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। যে-নামেই ডাকা হোক না কেন উদ্বেগের মধ্যে সবসময়ই অন্য মানুষের ছায়া বিরাজ করে।
যুবক: কিন্তু তারপরও ... একজন দার্শনিক হিসেবে নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা থেকে আরও বড় বড় অনেক সমস্যা রয়েছে। সুখ কী? স্বাধীনতা কী? এবং জীবনের অর্থই-বা কী? দার্শনিকগণ সেই প্রাচীন গ্রিকদের সময় থেকেই এই বিষয়গুলোর অনুসন্ধানে নিয়োজিত নয় কি? অথচ আপনি বলছেন—তাতে কী! আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কই সবকিছু? এই তত্ত্ব আমার নিকট একেবারেই সাদামাটা মনে হয়। বিশ্বাস করতে সত্যিই কষ্ট হয় যে, একজন দার্শনিক কথাগুলো বলছেন।
দার্শনিক: ও আচ্ছা! এখন মনে হচ্ছে বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
যুবক: হ্যাঁ, অনুগ্রহপূর্বক তাই করুন। আপনি যদি দার্শনিক হয়েই থাকেন তাহলে আরও বিশদ ও পরিষ্কারভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করুন; নতুবা এগুলো কোনো অর্থ বহন করে না।
দার্শনিক: তুমি আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক নিয়ে এতটাই ভীত ছিলে যে, নিজেকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিলে। অর্থাৎ নিজেকে অপছন্দ করার মাধ্যমে তুমি সামাজিক সম্পর্কগুলোকে এড়িয়ে যেতে।
এই জোরালো যুক্তি যুবকের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিল। শব্দগুলোর মধ্যে লুক্কায়িত অনস্বীকার্য সত্য যুবকের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে গেল। তারপরও, ‘মানব জীবনের সকল সমস্যার মূলে রয়েছে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা’-এই তত্ত্বকে বাতিল করে দেওয়ার মতো শক্তিশালী যুক্তি খুঁজতে হবে। অ্যাডলার মানুষের সমস্যাগুলোর ওপর কম গুরুত্ব দিয়েছেন। আর আমি যে সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছি, তা এতটা সাধারণ নয়!









