হারুকি মুরাকামির গল্প

টিভির লোকেরা

অনুবাদ : অভিজিৎ মুখার্জি
২৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০২আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২১, ০৯:২৪

এক রোববার সন্ধেয় টিভির লোকেরা এসে হাজির হল। সময়টা বসন্তকাল। অন্তত আমার বসন্ত বলেই মনে পড়ছে। যা-ই হোক, সময়টা ছিল এমনই যে খুব একটা গরমও নয়, ঠান্ডাও নয়।

আসলে ঋতুটার তো কোনো গুরুত্ব নেই, রোববারের সন্ধেবেলাটাই ম্যাটার করে।

রোববারের সন্ধেবেলাগুলো আমার ভালো লাগে না, বা, বলা উচিত, ওই সময়কার ব্যাপার স্যাপারগুলো সব আমার পছন্দ নয়—রোববার সন্ধের পরিস্থিতিটা। রোববার সন্ধে হল কি হল না, আমার মাথাটা একটু ধরবে, অন্যথা হওয়ার জো নেই। কখনো মৃদু, কখনো একটু বেশি রকম, কিন্তু প্রত্যেক বারই। এক ইঞ্চির এক তৃতীয়াংশ কী অর্ধেক মতো গভীরতায়, কপালের ওপর দিকটায়, নরম মাংসল অংশটা দপদপ করতে থাকে—যেন একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, বহুদূরে অপরপ্রান্তটা ধরে কেউ টানাটানি করছে। খুব যে একটা যন্ত্রণা হতে থাকে, তা নয়। যন্ত্রণাই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, তেমন একটা হয় না—যেন একটা খুব দীর্ঘ ছুঁচের সাহায্যে একটা ওষুধ দিয়ে অবশ করা জায়গা পরখ করে দেখা হচ্ছে।

কী সব যেন কানেও আসতে থাকে। শব্দ নয়, অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যেন নৈঃশব্দ্যের ভারী ভারী চাঙড় হিচড়ে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ‘ক্‌ক্‌ক্‌রজশাআতাল ক্‌ক্‌ক্‌ক্‌রজুম্‌ম্‌স্’। এগুলোই প্রাথমিক সংকেত। প্রথমে মাথা ধরা। তারপর, চোখে একটু কেমন যেন আঁকাবাঁকা দেখি। কী যেন একটা ঢেউয়ের মতো এসে ভাবনা চিন্তাগুলোকে গুলিয়ে দিয়ে যায়, কেমন একটা অজানা আশঙ্কা থেকে নানা স্মৃতি ভেসে উঠতে থাকে, আবার নানা টুকরো স্মৃতির উদয় হয়ে কী এক আশঙ্কার দিকে ঠেলে দেয়।

চকচকে ধারালো ক্ষুরের মতো চাঁদ সাদা হয়ে আকাশে ভাসে, মাটিতে সেঁধিয়ে যেতে থাকে সংশয়ের নানান শেকড়বাকড়। আমাকেই কাবু করতে লোকেরা ভয়ানক জোরে আওয়াজ করে করে করিডর দিয়ে হেঁটে যায়। ;কা-রস্‌পাম্‌ক্ দাব্ কার্‌স্‌পাম্‌ক‌ দাবুক্ কারস্‌পাম্‌ক্ দাব্’।

এই জন্যই আরও বেশি করে টিভির লোকেরা এসে হাজির হওয়ার জন্য সময় হিসেবে রোববার সন্ধেটাকেই বেছে নিয়েছে। মন খারাপের মতো, অথবা নীরব চুপিসারে বৃষ্টিপাতের মতো চোরাপথে ঢুকে পড়ে, একেবারে ঠিক সময় বুঝে, স্তিমিত মুহূর্তগুলোতে।

টিভির লোকেদের দেখতে কীরকম সেটা একটু বুঝিয়ে বলি। আপনার আমার চেয়ে ওরা আকারে একটু ছোটোখাটো। খুব সহজেই নজরে পড়ে, এমন নয়—অল্প একটু ছোটো, এই ধরুন, ২০ কিংবা ৩০ পারসেন্ট। শরীরের প্রত্যেকটি অংশই সমান অনুপাতে ছোটোখাটো। ‘ছোটোখাটো’ বলার চেয়েও পরিভাষার দিক থেকে আরও সঠিক হবে হয়তো ‘মাপটা কমানো’।

সত্যি বলতে কী, যদি কোথাও আপনি টিভির লোকেদের দেখা পান, প্রথমটায় হয়তো আপনার নজরেই পড়বে না যে ওরা ছোটোখাটো। কিন্তু তাহলেও, কেমন একটু অদ্ভুত ঠেকবে হয়তো। হয়তো সামান্য অস্বস্তি হবে। কী যেন গণ্ডগোল আছে বলে মনে হবে ঠিকই, আর তাহলেই আপনি আরেকবার তাকাবেন। প্রথম দর্শনে কোনোই অস্বাভাবিকত্ব চোখে পড়বে না, কিন্তু সেটাই আসলে অস্বাভাবিক। ওদের ছোটোখাটো হওয়া কিন্তু মোটেই বাচ্চাদের কিংবা বামনদের মতো নয়। বাচ্চাদের দেখলে, আমরা বুঝতেই পারি যে ওরা ছোটোখাটো, কিন্তু এই বোধটা আসে ওদের দেহের বেখাপ্পা রকম বিষমানুপাত থেকে। ওরা ছোটোখাটো ঠিকই কিন্তু আগাগোড়া সমানভাবে নয়। হাতগুলো ছোট, কিন্তু মাথাটা নয়। একেবারে সবক্ষেত্রে। না, টিভির লোকেদের ছোটো হওয়াটা একেবারে অন্যরকম। ওদের দেখলে মনে হবে যেন মাপ কমিয়ে ফোটোকপি করা হয়েছে, একেবারে যান্ত্রিক সহায়তায় মাপজোক করে। ধরা যাক, হয়তো ওদের উচ্চতা কমিয়ে করা হয়েছে ০.৭ ভাগ, তাহলে কাঁধও চওড়ায় কমে হয়েছে ০.৭ ভাগ; হুবহু তাই (কমে ০.৭ ভাগ হওয়া) পায়ের, মাথার, কানের এবং আঙুলের ক্ষেত্রেও। প্লাস্টিক মডেলের মতো, আসল জিনিসটার থেকে একটু ছোট।

কিংবা সেই ছবিগুলোর মতো যেগুলোতে কোনো মানুষ বা জিনিসকে ক্লোজ আপে দেখলেও মনে হতে পারে যেন অনেক দূরের ত্রঁপ-দ্য-লওয়্যে-র পেইন্টিং-এর থেকে নেওয়া যেন, ওপরের তলটা দোমড়ানো মোচড়ানো। এক একটা অদ্ভুত বিভ্রম, হাতটা যেন খুব কাছের জিনিসকেও ছুঁতে পারছে না অথচ নাগালের বাইরের জিনিসকেও স্পর্শ করছে।

        এরকমই টিভির লোকেরা

         এরকমই টিভির লোকেরা

          এরকমই টিভির লোকেরা

সব মিলিয়ে তিনজন।

ওরা দরজায় টোকাও দেয় না, কলিং বেলও বাজায় না। কোনো সম্ভাষণ নেই। স্রেফ ঢুকে পড়ে। ওদের পায়ের শব্দ অবধি আমার কানে আসে না। একজন দরজা খুললে আর দুজন টিভিটা নিয়ে ঢুকে পড়ে। খুব বড় টিভি নয়। আপনার বাড়ির সাধারণ রঙিন টিভিটার মতো। আমার মনে হয় দরজাটা বন্ধই ছিল, তবে জোর দিয়ে বলতে পারছি না। হয়তো বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। ওটাই তখন সবচেয়ে জরুরি বলে তো ভাবছিলাম না, কে জানে, তাতেই হয়তো। তাহলেও, মনে হয় দরজাটা বন্ধই ছিল।

ওরা যখন এল, আমি তখন সোফায় শুয়ে ঘরের সিলিং-এর দিকে চেয়ে আছি। আমি ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই। সেদিন সন্ধেয় আমার বউ মেয়েদের নিয়ে বেরিয়েছিল—স্কুলে পড়ার সময়কার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু—তার সঙ্গে একটু গল্পগুজব হবে, তারপর বাইরে ডিনার খাওয়া। “তুমি কি নিজের খাবারটা করে নিতে পারবে?” বেরোনোর আগে বউ বলল। “ফ্রিজে আনাজপাতি আর ফ্রোজেন খাবার কিছু আছে। বাকিটা তুমি করে নিতে পারবে তো, পারবে না? আর সন্ধের আগে লন্ড্রিটা দিয়ে আসতে ভুলো না, ঠিক আছে?”

“অবশ্যই, অবশ্যই,” আমি বলি। আমার ঘাবড়ানোর মতো তো কিছু নেই। চাল তো? আর লন্ড্রি তো? নস্যি। এটুকু সামলানো তো অতি সহজ। ‘স্রুপ্‌প্‌প্‌প্‌প্‌ কর্‌র্‌র্‌র্‌স!’

“কিছু বললে নাকি গো?” ও জিজ্ঞেস করে।

“না, কিছু নয়,” আমি বললাম।

সারাটা বিকেল নিশ্চিন্তে অলসভাবে সোফায় গড়ালাম। এটা করতে ভালো লাগল। একটু পড়লাম কিছু একটা—গার্সিয়া মার্কেজের নতুন উপন্যাস—গানবাজনাও শুনলাম একটু। একটা বিয়ার খেলাম। কিন্তু কোনোটাতেই ঠিক মন বসল না। একবার ভাবলাম বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ি কিন্তু উদ্যোগ করে সেটুকুও করে উঠতে পারলাম না। অগত্যা সোফাতেই কুণ্ডলী পাকিয়ে ছাদের দিকে চেয়ে থাকা।

রোববারের সন্ধেগুলো আমি অনেক কিছুই একটু আধটু করার চেষ্টা করি, ভালোমতো হয়ে ওঠে না কোনোটাই। মন বসানোর চেষ্টা করি প্রাণপণে। এই বিশেষ দিনটাতে, সবই ভালোয় ভালোয় সারা যাবে বলে মনে হয়। আমি ভাবতে থাকি, আজ অমুক বইটা পড়ব, তমুক রেকর্ডগুলো শুনব, চিঠিগুলোর উত্তর লিখব। আজ যেগুলো করতেই হবে, সেগুলো হল ডেস্কের ড্রয়ার পরিষ্কার করা, টুকিটাকি জিনিস আনা, একবার গাড়িটা ধোয়া। কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুটো বেজে যায়, তারপর তিনটে বেজে যায়, ধীরে ধীরে আলো কমে আসে, সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে ততক্ষণে। একটা কিছুও করা হয়নি; সারাদিন সোফায় শুয়ে কাটিয়ে দিলাম, প্রত্যেকবারই যা হয়। কানে আসে ঘড়ির আওয়াজ। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। এই শব্দে চারপাশের সবকিছুই কেমন মিলিয়ে যেতে থাকে একটু একটু করে, ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতন। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। একটু একটু করে, রোববারের বিকেলটা ক্ষয়ে যেতে থাকে, মাপে খাটো হতে থাকে। ঠিক ওই টিভির লোকগুলোর মতোই।

প্রথম থেকেই আমাকে ওরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। তিনজনকেই দেখলে মনে হবে যেন আমার মতো কারও অস্তিত্বই অসম্ভব। দরজা খুলে ওরা টিভি নিয়ে ঘরে ঢোকে। বিভিন্ন জিনিস রাখার মতো নানা মাপের খুপরি ও তাকওয়ালা আলমারিটা, যার পোশাকি নাম সাইডবোর্ড—সেটার ওপরে টিভিটাকে রাখে। এতক্ষণ সাইডবোর্ডের ওপরে রাখা ছিল একটা ম্যান্টেল ক্লক আর একগাদা ম্যাগাজিন। ঘড়িটা বিয়েতে পাওয়া, পেল্লায় এবং বেশ ভারী—সময়ের মতোই পেল্লায় এবং ভারী—আওয়াজও জোরালো। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। সারা বাড়ি জুড়ে শোনা যায়। সাইডবোর্ড থেকে সরিয়ে টিভির লোকেরা ওটাকে মেঝের ওপরে রাখে। বউ এসে তুলকালাম করবে, আমি চিন্তা করতে থাকি। জিনিসপত্র এদিক ওদিক এলামেলো সরিয়ে রাখলে ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, সবকিছু ঠিক জায়গামতো না দেখলেই খাপ্পা হয়ে যায়। তার চেয়েও বড় কথা, ঘড়িটা মেঝের ওপর পড়ে থাকলে, মাঝরাত্তিরে আমি ঠিক ওটাতে হোঁচট খাব। চিরকাল যেটা হয়ে আসছে, রাত দুটোয় আমি বাথরুমে যেতে উঠব আর ঘুম জড়ানো চোখে কিছু একটাতে হোঁচট খাবই।

এরপর ওরা যেটা করল সেটা হল ম্যাগাজিনগুলোকে নিয়ে রাখল টেবিলের ওপর। সবগুলোই মেয়েদের ম্যাগাজিন। (আমি ম্যাগাজিন বিশেষ পড়ি না; বই পড়ি—পৃথিবীর যাবতীয় ম্যাগাজিনের বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলেও ব্যক্তিগতভাবে খুশিই হব) ‘এল্’ আর ‘মেরি-ক্লেয়ার’ তারপর ‘ঘরোয়া বিষয়’, এই ধরনের সব ম্যাগাজিন। সাইডবোর্ডের উপর ছিমছাম, সুন্দর গুছিয়ে রাখা। আমার বউ বিশেষ পছন্দ করে না যে আমি ওর ম্যাগাজিনে হাত দিই—নীচেরটা ওপরে, ওপরেরটা নীচে চলে যায়। মাঝে মাঝেই শুনতে হয় সেকথা—সুতরাং আমি ওদিকে ঘেঁষি না। কখনো উলটেও দেখিনি। কিন্তু টিভির লোকেদের কিছু আসে যায় না: সামনে থেকে সরিয়ে দেয়, গ্রাহ্যই করে না কিছু, সাইডবোর্ড থেকে পুরোটা হটিয়ে দেয়, যেভাবে সাজানো ছিল সেটা ওলটপালট হয়ে যায়। ‘মেরি-ক্লেয়ার-গুলো ক্রয়স্যান্ট’-এর ওপরে; ‘ঘরোয়া বিষয়’-গুলো ‘অ্যান-অ্যান’-এর নীচে। এ জিনিস মাফ করা যায় না। তার ওপর, বুকমার্কগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছত্রাকারে ফেলে রাখতে থাকে। দরকারি খবরের পাতাগুলো এরপর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। ঠিক কী খবর বা কতটা দরকারি তা আমি জানি না—কোনো বিশেষ কাজে প্রয়োজনীয় হতে পারে, আবার ব্যক্তিগত কিছু হতে পারে—যাই হোক না কেন, বউ-এর কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সে আমাকে ছাড়বে না। “এসবের মানে কী? বন্ধুর সাথে দেখা করব বলে একটু বেরিয়েছি, আর ফিরে এসে দেখছি পুরো বাড়ি লণ্ডভণ্ড?” লাইন বাই লাইন আমার কানে পরিষ্কার বাজতে থাকে। বাহবা, চমৎকার হচ্ছে—ভেবে মাথা ঝাঁকাতে থাকি।

টেলিভিশনের জন্য জায়গা করতে সাইডবোর্ডের উপর থেকে সবকিছুকে অপসারিত হতে হয়। টিভির লোকেরা প্লাগ পয়েন্টে প্লাগটা গুঁজে দিয়ে সুইচ অন করে দেয়। একটা ঠুনঠুন শব্দ হয়ে টিভির পর্দাটা আলোকিত হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায় একটা ছবি ভেসে উঠেছে। রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে ওরা চ্যানেল পালটাতে থাকে। কিন্তু কোনো চ্যানেলেই কিছু নেই সম্ভবত, আমার সেরকমই মনে হয়, অ্যান্টেনার সঙ্গে তো কোনো কানেকশনই করায়নি সেটটার। ফ্ল্যাটে কোথাও একটা বাইরের অ্যান্টেনার সাথে কানেকশনের ব্যবস্থা আছে। আমরা এই কমপ্লেক্সে উঠে আসার পর, মনে পড়ছে, সুপারিনটেন্ডেন্ট যেন বলেছিল কোথায় সেটা। আপনারা শুধু কানেকশনটুকু করে নেবেন। কিন্তু কোথায় যে, আমার আর তা মনে পড়ছে না। আমাদের টেলিভিশন নেই, তাই আমিও বেবাক ভুলে গেছি।

তবে, যে কারণেই হোক, কোনো সম্প্রচারই যে এসে পৌঁছাচ্ছে না এতে যেন টিভির লোকেদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। অ্যান্টেনার সাথে যোগ হবে কোথা দিয়ে সেটা খুঁজে দেখার কোনো লক্ষণই নেই। স্ক্রিনটা খালি, কোনো ছবি নেই—এতে ওদের কিছু এসে যায় না। বোতাম টিপতেই যেই পাওয়ার এসে গেল, ওদেরও যেন যা করতে আসা, করা হয়ে গেল।

ব্র্যান্ড-নিউ টিভি। বাক্স থেকে বের করা হয়ে গেছে, তবু দেখা মাত্র বলে দেওয়া যায় নতুন। ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়াল আর গ্যারান্টি কার্ড একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে রেখে সেটের পাশে টেপ দিয়ে আটকানো; প্লাগ লাগানোর তারটা ঝকঝক করছে, সদ্যধরা মাছের মতো চকচকে।

সারা ঘরের এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে তিনজন টিভির লোকই ফাঁকা স্ক্রিনটা চেয়ে দেখতে থাকে। ওদের মধ্যে একজন আমার কাছে ঘেঁষে এসে পরখ করে দেখতে থাকে, আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে স্ক্রিনটা ঠিকমতো দেখা যায় কিনা। টিভিটা আমার দিকেই মুখ করা, একেবারে ঠিকঠাক দূরত্বে। সন্তুষ্ট হয়েছে বলে মনে হল ওদের। বেশ একটা কৃতিত্বের ছাপ ওদের হাবেভাবে, একটা কাজ নামল। একজন (যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল) রিমোটটা নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখল।

টিভির লোকেদের মুখে কোনো কথা নেই। নড়াচড়াই এমন সুপরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত যে কথার কোনো দরকারই হয় না। তিনজনই নিজের নিজের আরব্ধ কাজ চূড়ান্ত দক্ষভাবে করে। একেবারে পেশাদারি কাজ। ছিমছাম ও পরিচ্ছন্ন। প্রায় কোনো সময়ই নিল না। কী ভেবে, একজন টিভির লোক ঘড়িটা মেঝে থেকে তুলে ঘরের মধ্যে চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে নিল যে এর চেয়ে রাখার মতো উপযুক্ত জায়গা আর নেই, না পেয়ে আবার নামিয়ে রাখল। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। ভারিক্কি চালে মেঝের ওপর সেটা শব্দ করেই চলল। একেই আমাদের ফ্ল্যাটটা ছোটো, প্রায়ই মেঝের অনেকটা জায়গা খেয়ে নেয় আমার বইপত্র বা বউয়ের দরকারি পত্রপত্রিকা। অনিবার্যভাবে ঘড়িটাতে আমি হোঁচট খাবই। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ে আমার। নির্ঘাত, বুড়ো আঙুলটাতে এমন একটা ঠোক্কর খাব! বাজি ধরা যায়।

টিভির লোকেদের তিনজনেরই ঘন নীল জ্যাকেট। কাপড়টা কী কে জানে, কিন্তু চোখে পড়ার মতো। তার নীচে জিন্‌স আর টেনিস শ্যু। পোশাক, জুতো সবই আনুপাতিক হারে ছোটো মাপের। দীর্ঘতম সময় ওদের কার্যকলাপ দেখে দেখে একসময় আমার মনে হতে শুরু করল যে হয়তো আমারই মাপটা বেখাপ্পা। যেন বিশেষরকম সানগ্লাস পরে আমিই একটা রোলার কোস্টারে চেপে পিছন দিকে ধেয়ে চলেছি। মাথা কাজ করছে না, ছোটোবড় বোধটাই গুলিয়ে গেছে। সমস্ত ভারসাম্য খুইয়েছি, আমার চেনা পৃথিবীটাই যেন কেমন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। টিভির লোকেরা এরকমধারা অনুভূতিরই সঞ্চার করে আপনার মধ্যে।

শুরু থেকে শেষ অবধি একেবারে পুরোটা টিভির লোকেরা কিন্তু একটা শব্দও উচ্চারণ করে না। তিনজন মিলে শেষবারের জন্য স্ক্রিনটাকে পরীক্ষা করে দেখে, কোনো যে সমস্যা নেই সেটা নিশ্চিত হয়ে নিয়ে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে সুইচ অফ্ করে দেয়। আলোটা চুপসে গিয়ে একটা বিন্দুতে পর্যবসিত হয়, তারপর ঠুং করে আওয়াজ হয়ে দপ্ করে নিভে যায়। স্ক্রিন আবার অভিব্যক্তিহীন, ধূসর, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। করিডর দিয়ে অজানা লোকের পদশব্দ ভেসে আসে, সবসময় ইচ্ছাকৃতভাবে জোরে জোরে। ‘কা-র্‌স্‌পাম্‌ক্ দাব্ কার্‌স্‌পাম্‌ক্ দিইইক্’। শব্দ করে জুতোর আওয়াজ। রোববারের সন্ধে।

টিভির লোকেরা আরেকবার চরকিপাক খেয়ে ঘরটা দেখে নেয়, দরজা খোলে, তারপর বেরিয়ে যায়। আবারও, আমাকে ভ্রুক্ষেপই করে না। ওদের হাবে ভাবে মনে হবে আমি লোকটা যেন নেই।

টিভির লোকেদের আসা-যাওয়ার মাঝখানে আমি কিন্তু একটুও নড়ি না। একটা কথাও বলি না। নিথর হয়ে সোফায় শুয়ে শুয়ে কার্যকলাপ লক্ষ করে যাই। আমি জানি আপনি কী বলবেন: এটা যাই হোক, স্বাভাবিক নয়। জানা নেই, শোনা নেই লোকেরা—একজন নয়, তিন তিনজন—না বলে কয়ে আপনার ফ্ল্যাটে এসে ঢুকে পড়ল, দমাস করে একটা টিভি সেট নামাল আর আপনি চিত্রার্পিতের ন্যায় ওদের দিকে চেয়ে বসে রইলেন। একটু বিদঘুটে ব্যাপার নয়?

ঠিকই, ঠিকই। তবে যে কারণেই হোক, আমি মুখ খুলি না, স্রেফ যা ঘটে যাচ্ছে দেখতে থাকি। কেননা, ওরা তো আমাকে গ্রাহ্যই করে না। আমার জায়গায় আপনি থাকলে, মনে হয় আপনিও একইরকম করতেন। নিজের সাফাই গাইতে বলছি না, আপনার ঘরে আপনার সামনেই লোকেরা ঘোরাফেরা করছে অথচ আপনার অস্তিত্বই স্বীকার করছে না, তখন কী করবেন আপনি, সন্দেহ হবে না যে আপনি সত্যিই আছেন কিনা? নিজের হাতের দিকে তাকাই, হয়তো ভেদ করে দৃষ্টি চলে যাচ্ছে দেখব। একেবারে বিধ্বস্ত, শক্তিহীন, একটা ঘোরের মধ্যে আমি তখন। দ্রুত আমার শরীর, মন সবই যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। খুব বেশি নড়াচড়ার শক্তিও যেন নেই। টিভির লোকেরা এসে আমার অ্যাপার্টমেন্টে একটা টিভি নামিয়ে রেখে চলে যাচ্ছে—বসে বসে দেখা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। মুখ খুলতেও ভয় হয়, কেমন আওয়াজ বেরোবে কে জানে!

অতঃপর টিভির লোকেরা চলে গিয়ে আমায় অব্যাহতি দেয়। চারপাশ সম্বন্ধে চেতনা আস্তে আস্তে ফিরে আসতে থাকে আমার। হাতদুটো আবারও আমারই হাত হয়ে যায়। আর তখনই আমি খেয়াল করি যে গোধূলিকে এতক্ষণে গিলে ফেলেছে অন্ধকার। আলো জ্বালিয়ে দিই। তারপর চোখ বন্ধ করি। হ্যাঁ, একটা টিভি সেটই রাখা আছে ওখানে। ঘড়িটা ততক্ষণ টিক্ টিক্ করে, মিনিটগুলো পার হতে থাকে। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’।

আশ্চর্যের ব্যাপার, ফ্ল্যাটে যে একটা টেলিভিশন সেটের উদয় হয়েছে, বউ এসে সেটার উল্লেখ পর্যন্ত করল না। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কিছুমাত্র না। যেন দেখতেই পাচ্ছে না। আমার অদ্ভুত ভয় হতে থাকে। কেননা, আগেই আপনাদের বলেছি, ফার্নিচার বা অন্যান্য জিনিস কোথায় কীভাবে রাখা আছে, সে ব্যাপারে ও অসম্ভব খুঁতখুঁতে, কারও যদি স্পর্ধা হয় ফ্ল্যাটের কোনো জিনিস একচুলও এদিক ওদিক করার, তৎক্ষণাৎ ঝাঁপিয়ে পড়বে। এমনই প্রতাপ! ভুরুটি কোঁচকানো মাত্র জায়গার জিনিস জায়গায় ফিরে আসবে।

আমার ক্ষেত্রে কিন্তু তা নয়। যদি ‘ঘরোয়া বিষয়’ পত্রিকাটি ‘অ্যান-অ্যান’-এর নীচে চলে যায় কিংবা একটা ডটপেন চলে যায় পেনসিল স্ট্যান্ডে, আমি মোটেই অস্থির হয়ে পড়ি না, চোখেই পড়ে না আমার। এসব ওর সমস্যা; ওর মতো হতে হলে আমার দফারফা হয়ে যাবে। একেক সময় ও রাগে ফেটে পড়ে। আমাকে বলে যে গা-ছাড়া ভাবটা নাকি ও একেবারে সহ্য করতে পারে না। সে তো বটেই, আমি বলি, একেক সময় আমিও মহাবিশ্বের অভিকর্ষজ বল, pi অথবা E = mc2 এর ব্যাপারে কোনো হেরফের সহ্য করি না। সত্যি করেই বলছি। কিন্তু এরকম বললে, ও দেখেছি একেবারে দমে যায়, সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে ধরে নেয়। অথচ আমি কিন্তু মোটেই সেই উদ্দেশ্যে বলি না; যা মনে হয় সেটাই বলি।

সেদিন রাতে, বাড়ি ফিরে, প্রথমেই ও ফ্ল্যাটের সবটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। কৈফিয়ৎ আমার তৈরি করাই আছে—কীভাবে টিভির লোকেরা এসে সব তছনছ করল: ওকে বোঝানো কঠিন হবে, তবু পুরো সত্যিটাই ওকে বলতে হবে।

একটা কথাও বলল না, একবার দেখে ছেড়ে দিল। সাইডবোর্ডে একটা টিভি, ম্যাগাজিনগুলো টেবিলের ওপর অগোছালো পড়ে আছে, ম্যান্টেল ক্লকটা মেঝেয় নামানো, আর বউ কোনো মন্তব্যই করছে না। আমারও কিছু ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে না।

“রাতের খাবার খেয়েছ তো?” পোশাক ছাড়তে ছাড়তে জিজ্ঞেস করে ও।

“না, খাইনি কিচ্ছু।” আমি ওকে বলি।

“কেন?”

“খিদে ছিল না খুব একটা,” আমি বলি।

একটু থেমে, পোশাক আদ্ধেক ছাড়া হয়েছে—খানিক ভাবে এ নিয়ে—বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থাকে। এ নিয়ে কথা বাড়াবে কিনা ভাবছে তখন। ঘড়ির শব্দে সেই দীর্ঘ, চিন্তান্বিত স্তব্ধতা ছিন্ন হয়। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। ভাব করি যেন আমার কানে যাচ্ছে না; কিছুতেই আমি ওটা কানে নেব না এখন। কিন্তু এত ওজনদার আওয়াজ, এত জোরে, যে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। ওকেও দেখে মনে হয় আওয়াজটা শুনছে। এবার মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিয়ে বলে, “কিছু একটা চট্ করে বানিয়ে দেব?”

“তা দিতে পার,” আমি বলি, খেতে খুব একটা ইচ্ছে নেই, কিন্তু অফারটা ফিরিয়ে দিতে চাই না। বাড়ির সারাক্ষণের পোশাকটা পরে নিয়ে ও রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে।

জোসুই আর তামাগো-ইয়াকি বানাতে বানাতে বন্ধুদের নিয়ে নানা কথা বলতে থাকে। কে কী করেছে, কে কী বলেছে, কে হেয়ার-ষ্টাইল পালটাতেই বয়েসটা অনেক কম দেখাচ্ছে, কার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। এই বন্ধুদের অধিকাংশকেই আমি চিনি, তাই খানিকটা বিয়ার ঢেলে নিয়ে বসে শুনতে থাকি আর জায়গামতো, যেন খুব মন দিয়ে শুনছি এইভাবে আহ্-ওহ্ করতে থাকি। কিন্তু আসলে, কী বলছিল তার কিছুই শুনছি না। আমি ভাবছি টিভির লোকেদের কথা। তার সাথে, হঠাৎ করে একটা টেলিভিশনের উদয় হওয়ায় পরেও যে ও কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাল না, সেটা নিয়েও। দেখতে পায়নি তা হতেই পারে না। খুবই অদ্ভুত। বলা উচিত বিদ্ঘুটে। এখানে একটা গণ্ডগোল কিছু হচ্ছেই। কিন্তু এ নিয়ে কী করা যায়?

খাবার তৈরি, আমি তাই খাবার ঘরের টেবিলে গিয়ে বসে খেতে থাকি। ভাত, ডিম, উমে-বোওশি[1]। খাওয়া শেষ হলে বউ ডিশগুলো সরিয়ে নেয়। আমি আরেকটু বিয়ার নিই, বউও নেয় সঙ্গে। সাইডবোর্ডের দিকে তাকাই, টিভি সেটটা রাখা আছে, পাওয়ার-অফ করা, রিমোট কন্ট্রোলের যন্ত্রটা টেবিলের ওপর রাখা। আমি টেবিল থেকে উঠে গিয়ে হাত বাড়িয়ে রিমোট কন্ট্রোলটা তুলে নিয়ে সুইচ অন করে দিই। পর্দাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে একটা ঠুনঠুন আওয়াজ হয়। কিন্তু ছবি নেই কোনো, শুধুই সেই ফাঁকা পিকচার টিউবটা। ভল্যুম বাড়ানোর বাটনটা টিপি, শুধু ঘ্যাসঘেসে গর্জনটা আরও জোরালো হওয়া ছাড়া কিছু হয় না। সেই তুষারপাত চেয়ে দেখি বিশ ত্রিশ সেকেন্ড, তারপর সুইচ অফ্ করে দিই। মুহূর্তে আলো, আওয়াজ দুটোই উধাও। বউ এরমধ্যে কার্পেটের ওপর বসে পড়ে ‘এল্’ ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে থাকে, খেয়ালই করে না যে টিভিটা এইমাত্র অন্ করে অফ্ করা হল।

রিমোট কন্ট্রোলটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে ফিরে গিয়ে আবার সোফাতে বসে পড়ি, ঠিক করি যে এখন টানা গার্সিয়া মার্কোয়েজের লম্বা উপন্যাসটা পড়তে থাকব। ডিনারের পর কিছু একটা পড়া আমার চিরকালের অভ্যাস। মিনিট তিরিশেক বাদে বইটা রেখেও দিতে পারি, আবার দু-ঘণ্টা পড়েও যেতে পারি, শুধু পড়াটা রোজ চালিয়ে যাওয়া চাই। তবে আজ আর পাতা দেড়েক-এর পর পড়াটা চালাতে পারি না। মন বসছে না; চিন্তা ফিরে ফিরে যাচ্ছে টিভি সেটটাতে। মুখ তুলে তাকাই ওটার দিকে, ঠিক আমার সামনেই রাখা।

রাত আড়াইটের সময় ঘুম ভেঙে যায়। দেখি টিভিটা রয়েই গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছিলাম এই আশায় যে দেখব জিনিসটা আর নেই। তা হওয়ার নয়। বাথরুম থেকে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিই, পা’টা তুলে দিই টেবিলের ওপর। রিমোট কন্ট্রোলটা হাতে নিয়ে টিভিটাকে অন্ করে দেখি। এতেও নতুন কিছু ঘটে না; আবারও সেই আলো, আওয়াজ, আর কিছু নয়। খানিক তাকিয়ে থেকে, সুইচ অফ্ করে দিই।

বিছানায় ফিরে গিয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করি। মড়ার মতো ক্লান্ত কিন্তু ঘুম আসে না। চোখ বন্ধ করলেই ওদের দেখতে পাই। টিভির লোকেরা টিভি সেটটা নিয়ে আসছে, টিভির লোকেরা ঘড়িটা সরিয়ে রাখছে, টিভির লোকেরা ম্যাগাজিনগুলোকে বয়ে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল, টিভির লোকেরা সুইচবোর্ডের সকেটে প্লাগ ঢুকিয়ে দিল, টিভির লোকেরা স্ক্রিনটা পরীক্ষা করে দেখছে, টিভির লোকেরা দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওরা মাথার ভেতরে রয়েই গিয়েছে। ওখানেই হাঁটাচলা করছে। বিছানা ছেড়ে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে একটা কফি কাপে ডাবল ব্র্যান্ডি ঢেলে নিই। গলায় ব্র্যান্ডিটা ঢেলে নিয়ে আবার গার্সিয়া মার্কেজ পড়া শুরু করব বলে সোফার দিকে এগোই। বইয়ের পাতা খুললেও কেন যেন শব্দগুলো মাথায় ঢুকছে না। লেখাটা আড়াল হয়ে আছে।

ঠিক হ্যায়, আমি গার্সিয়া মার্কেজ সরিয়ে রেখে একটা ‘এল্’  তুলে নিই। কখনো সখনো ‘এল্’ পড়লে কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু ‘এল্’-এ এমন কিছুই কখনো থাকে না যা আমাকে একটুও টানে। নতুন হেয়ারস্টাইল আর দৃষ্টিনন্দন সিল্কের ব্লাউজ আর ভালো বিফ-স্ট্যু পাওয়া যায় এরকম খাবার জায়গা অথবা অপেরায় যেতে হলে কী পোশাকে যাওয়া উচিত, এরকম সব লেখা। এগুলো দিয়ে কী হবে? এটাও সরিয়ে রাখি। ফলে এবার দেখার জন্য রয়ে গেল শুধু সাইডবোর্ডে রাখা টেলিভিশনটা।

কিছু না করে, ভোর হওয়া অবধি জেগে বসে থাকি। ছ’টা নাগাদ একটু কফি বানাই। কিছুই করার নেই, বউ ঘুম থেকে ওঠার আগে নিজেই হ্যাম-স্যান্ডউইচ বানাতে হাত লাগাই।

প্রায় কোনো কথা ছাড়াই ব্রেকফাস্ট সেরে দুজনেই একসাথে বেরোই, যার যার আলাদা আলাদা অফিসের রাস্তায়। বউ চাকরি করে একটা ছোটো প্রকাশনা সংস্থায়। একটা ন্যাচারাল ফুড আর লাইফস্টাইল সম্পর্কিত ম্যাগাজিনের এডিটর।

“শিইতাকে মাশরুম খেলে গেঁটে বাত হবে না,” “জৈব সারে চাষের ভবিষ্যৎ” এইসব লেখা থাকে যে ধরনের ম্যাগাজিনে। খুব একটা ভালো বিক্রি কখনোই নেই, আবার খরচও তেমন নেই, এগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্যও কিছু খ্যাপাটে লোক থাকে। আমি কাজ করি গৃহস্থালির ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি তৈরির একটা কোম্পানির বিজ্ঞাপন বিভাগে। টোস্টার, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, এসবের নতুন নতুন বিজ্ঞাপন ভেবে ওঠাই আমার কাজ।

অফিসে গিয়ে সিঁড়িতে যেন টিভির লোকেদের একজনের পাশ দিয়ে গেলাম। যদি ভুল না হয় আমার, গতকাল যে তিনজন টিভিটা নিয়ে এসেছিল তাদেরই একজন—সম্ভবত যে লোকটা দরজাটা ঠেলে খুলেছিল, সেটটা বয়ে আনতে হাত লাগায়নি। একটাও কোনো ফারাক ছিল না ওদের মধ্যে, ফলে একের থেকে অন্যকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব, হলফ করে বলতে পারছি না, তবে দশের মধ্যে আট কি ন’ভাগ সম্ভাবনা যে ঠিকই ধরেছি। আগের দিনের সেই নীল জ্যাকেটটাই পরা, দুহাতই খালি, জিনিস কিছু নেই। নেহাতই সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। আমি উঠছি। লিফট আমার ভালো লাগে না, তাই সচরাচর সিড়ি দিয়েই উঠি। অফিসটা কিন্তু দশতলায়, খুব চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। তাড়া থাকলে, যখন ওপরে উঠে আসি, ততক্ষণে ঘেমে নেয়ে একশা। তবে আমার কাছে, লিফটে ওঠার চেয়ে একটু ঘেমেচুমে যাওয়াও খারাপ কিছু নয়। সবাই ঠাট্টা করে: টিভি নেই, ভি সি আর নেই, লিফটে চড়ে না, একজন আধুনিক তপোবনবাসী—ছোটোবেলায় হয়তো কিছু একটা আতঙ্কের কারণ ছিল যেটা এখনও চেপে বসে আছে। যা খুশি ভাবুক। আমি বলব, ওরাই বরং কাবু হয়ে আছে।

যাই হোক না কেন, আমি তখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, অন্যান্য দিনের মতোই; সিঁড়িতে আমি একাই—আর কেউই প্রায় সিঁড়ি ব্যবহার করে না—পাঁচতলা আর ছ’তলার মাঝখানটায় যখন, নেমে আসতে থাকা একজন টিভির লোকের পাশ দিয়ে গেলাম। এতই আচম্বিতে ব্যাপারটা ঘটল যে আমি ঠিক করে উঠতে পারি না কী করব। আমার কি কিছু বলা উচিত ছিল?

কিন্তু কিছু বলিনি। আমি জানি না কী বলা উচিত আর লোকটিও কেমন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কোনো সুযোগই দেয়নি; এমন যান্ত্রিকভাবে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে, একটা নির্দিষ্ট গতিতে, একেবারে সুনিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপে। তাছাড়াও, আমার উপস্থিতিকে যেন গ্রাহ্যই করে না লোকটা, আগের দিনের মতোই। ওর দৃষ্টির আওতাতেই আমি আসি না। কী করব বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ফসকে চলে যায়। সেই মুহূর্তে অভিকর্ষজ বলের বিন্যাসটা যেন একটু বেঁকেচুরে যায়।

সকাল থেকে সেদিন ঠাসা মিটিং, কাজের ব্যাপারে। নতুন যেসব প্রোডাক্ট বেরোবে তার সেল ক্যাম্পেইনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ মিটিং সব। বেশ ক’জন নানা রিপোর্ট পড়ল। ব্ল্যাকবোর্ড ভর্তি কত যে সংখ্যা লেখা, কম্পিউটার স্ক্রিন জুড়ে অজস্র বার-চার্ট। আমিও ছিলাম, তবে আমার ভূমিকাটা খুব তাৎপর্যময় নয়, কেননা আমি ঠিক প্রোজেক্টটার সাথে সরাসরি জড়িত নই। মিটিংগুলোর মাঝখানে আমি ব্যাপারগুলো একটু তালগোল পাকাতে থাকি। একবারই মাত্র মুখ খুলি কোনো মতামত দিতে। তেমন মতামতও কিছু না—ওয়াকিবহাল লোক মাত্রেই অবহিত এরকমই কিছু একটা—যত যাই হোক, একেবারে কিছু না বলে তো থাকা যায় না। আমি হয়তো কাজের ব্যাপারে ভয়ানক উচ্চাকাঙ্ক্ষী নই, কিন্তু যতদিন মাইনে পাচ্ছি, একটা দায়িত্বপরায়ণতার পরিচয় তো রাখতেই হয়। সেযাবৎ যতরকম মতামত রাখা হচ্ছিল সেগুলাকে সংক্ষেপে একটা সূত্রে বেঁধে আমি এমনকী একটা রসিকতাও করি, পরিবেশটাকে একটু হালকা করার জন্য। আমি যে টিভির লোকেদের চিন্তায় মশগুল হয়ে আছি, এইভাবে সেটা আংশিক আড়াল করার চেষ্টা করি। অনেকেই হেসে ওঠে। সেই একবার মুখ খুলেই কিন্তু আমি ভান করতে থাকি যেন কাগজপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখছি; চিন্তা জুড়ে তখন টিভির লোকেরা। সেই সময় যদি সবাই মাইক্রোওয়েভ ওভেনটার একটা নতুন নামও ঠিক করে, আমি মোটেই খেয়াল করব না। আমার মনে কেবল টিভির লোকেরা। হঠাৎ করে এই একটা টিভি সেট-এর অর্থ কী? সবচেয়ে বড় কথা, টিভিটাকে বয়ে নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এসে হাজির হওয়াই বা কেন? বউ-ই বা কেন টিভিটার আগমন নিয়ে কিছুই বলল না? আমার কোম্পানিতেই বা কী করে টিভির লোকেরা ঢুকে পড়ল?

মিটিং আর শেষ হয় না। দুপুরে লাঞ্চের জন্য স্বল্প বিরতি। বেরিয়ে গিয়ে কিছু খেয়ে আসার পক্ষে বড়ই অল্প সময়ের। তার বদলে, সবার জন্য এল স্যান্ডউইচ আর কফি। কনফারেন্স-রুম সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দেখে আমি গিয়ে নিজের ডেস্কে বসে খেলাম। খাচ্ছি যখন, আমাদের সেকশনের বড় কর্তা এসে হাজির। সত্যি কথাটা পুরো বললে, আমি লোকটাকে মোটেই পছন্দ করি না। নির্দিষ্ট করে কোনো কারণ দর্শাতে পারব না; ওকে দোষারোপ করার মতো তেমন কিছু আপনি পাবেন না, আক্রমণ করার মতো একটা অন্তত তো কোনোদিক থাকতে হবে। তার ওপর, লোকটা মোটেই নির্বোধ ধরনের নয়। ওর নেকটাইগুলো রুচির পরিচয় দেয়, নিজের ঢাক পেটানোর অভ্যাস নেই কিংবা অধস্তনের ওপর দাপট দেখাবারও আদত নেই। এমনকী কখনো কখনো আমাকে খুঁজে নিয়ে একসাথে বাইরে গিয়ে খেয়ে আসার প্রস্তাবও দেয়। কিন্তু লোকটার মধ্যে কী একটা যেন আছে যা আমার ধাতে সয় না। হতে পারে, এই যে লোকটা কথা বলতে বলতে লোককে ছুঁয়ে ফেলে, সেই কারণেই হয়তো। পুরুষ হোক, মেয়ে হোক, কথা বলতে বলতে এক সময় হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয়। তবে মনে রাখবেন, সেই ছোঁয়ায় কিন্তু কোনো ইঙ্গিত থাকে না। চটপটে লোক, ক্যাজুয়ালভাবেই ঘোরাফেরা করে। এতই স্বাভাবিকভাবে এটা করে যে কারও যদি সেটা নজরেই না আসে, আমি মোটেই আশ্চর্য হব না। তাহলেও—জানি না কেন, আমার অস্বস্তিই হয়। ফলে দেখা হয়ে গেলে নিজের থেকেই আমি দু’বাহু আড়াআড়ি করে নিজেকে আগলে রাখি। যদি বলেন আরেকটু উদার হওয়া উচিত, আমি মানবো। সামনে একটু ঝুঁকে একটা হাত আমার কাঁধের ওপর রাখলেন। “একটু আগে মিটিং-এ যে কথাগুলো বললেন, ভালো বললেন কিন্তু,” আন্তরিকভাবে বললেন সেকশন প্রধান। “মামুলিভাবে বলা, কিন্তু মোক্ষম। আমি খুব ইম্প্রেসড্। ভালো লাগল। সারা ঘরেই আপনার ওই কথায় সাড়া পড়ে যায়। টাইমিং-ও নিখুঁত হয়েছিল, ইয়েস স্যার, বলবেন এরকম সময় সময়।”

কেমন হাওয়ায় ভেসে এগিয়ে যান ভদ্রলোক। হয়তো লাঞ্চে গেলেন। আমি ধন্যবাদ জানালাম, তবে সত্যি কথা বলতে কী, আমি একটু অবাকই হয়েছি। মানে, মিটিং-এ কী বলেছিলাম তার কিছুই মনে পড়ছে না যে। এরজন্য একেবারে আমার ডেস্ক অবধি এসে প্রশংসা করতে গেলেন কেন? আশেপাশে বাগ্-বিভূতির আরও দেদীপ্যমান নিদর্শন অবশ্যই আছে। অবাক ব্যাপার। মাথায় ঢোকে না কিছু, আমি লাঞ্চ করতে থাকি। মনে আসে বউ-এর কথা। কী করছে এখন কে জানে, লাঞ্চে গেছে কি? ফোনে যোগাযোগ করলে হত, একটু কথাবার্তা বললে কেমন হয়, যে কোনো কথা। প্রথম তিনটে নাম্বার ডায়াল করে, কী ভেবে, রেখে দিই। এখন কেন ফোন করব ওকে? আমার কাছে সব হয়তো খুব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমার দুনিয়াটাই কেমন হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে ওর অফিসে ফোন করার কি আছে? ওকে আর এসব নিয়ে কীই বা বলব? তাছাড়া কাজের মধ্যে থাকলে ওকে ডাকাডাকি করতে আমার মোটেই ভালো লাগে না। রিসিভার নামিয়ে রেখে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি। তারপর কফিটা শেষ করি। এরপর শুধু সিন্থেটিক কাপটাকে ময়লা ফেলার বাস্কেটে ছুঁড়ে ফেলা।

বিকেলের একটা মিটিং-এ আবার টিভির লোকদের দেখা পাই। এবার সংখ্যাটা বেড়ে দু’জন হয়েছে। আগের দিনের মতোই গুটিগুটি পায়ে একটা সোনির রঙিন টিভি বয়ে আনে কনফারেন্স রুমের ভেতরে। এক সাইজ বড় একটা মডেল।

একী রে! সোনি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। কম্পিটিটর কোম্পানির জিনিস কোনো কারণে একবার আমাদের অফিসে ঢুকে পড়লে, তার জন্য অনেক খেসারত দিতে হবে। যেসব কোম্পানি একই জিনিস বানায় তাদের জিনিস টেস্ট করার জন্য আনলে অবশ্য সেটা আলাদা ব্যাপার। তবে সেক্ষেত্রে আমরা খেয়াল রেখে কোম্পানির লোগোটা মুছে দিই—কিছুতেই যাতে সেটা অন্য লোকের নজরে না পড়ে। টিভির লোকেরা সে সবের পরোয়াই করে না! দিব্যি দেখা যাচ্ছে, সোনির ছাপটা জ্বলজ্বল করছে। আমাদের দিকে টিভিটা মেলে ধরে দরজা খুলে সরাসরি কনফারেন্স রুমের ভেতরে ঢুকে আসে। এরপর জিনিসটা নিয়ে সারা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখে, কোথায় রাখা যায়। শেষ অবধি জুতসই জায়গা না পেয়ে পিছিয়ে পিছিয়ে ওটা বয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ঘরের অন্য লোকেদের কোনো প্রতিক্রিয়াই হয় না ওদের দেখে। চোখে পড়েনি এমন তো হতে পারে না। না, না, নির্ঘাত চোখে পড়েছে। তার প্রমাণ হল, টিভির লোকেদের যাতায়াতের পথে পড়ে গেলে, তখন সরে সরে দাঁড়িয়েছে সবাই। তবে ওইটুকুই: কাছাকাছির দোকানটা থেকে যে মাঝে মাঝে কফি দিয়ে যায়, তার চেয়ে বেশি আমল পায় না ব্যাপারটা। সবাই যেন একটা প্রাথমিক নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে যে টিভির লোকেদের দেখেও দেখবে না। সবাই জানত ওদের কথা, দেখাল এমন, যেন ওরা নেই।

এসবের মানে কী? এটা কি একটা সর্বজনবিদিত ব্যাপার? শুধু আমিই কিছু জানি না? হয়তো আমার বউও আগাগোড়া ভালো করেই জানতো টিভির লোকেদের কথা। তাই মনে হয়। নির্ঘাত সেই কারণেই টেলিভিশন দেখে একটুও আশ্চর্য হয়নি। এ নিয়ে কোনো কথাও বলেনি। এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু এতে আমার আরও বেশি করে সব গুলিয়ে যেতে থাকে। এই টিভির লোকগুলো তাহলে কী? কারা? সব সময় টিভি নিয়ে নিয়ে ঘুরছেই বা কেন?

একজন সহকর্মী বাথরুমে যাবে বলে সিট ছেড়ে উঠতেই আমিও উঠে ওকে অনুসরণ করি। এই লোকটি আর আমি মোটামুটি একই সময়ে কোম্পানিতে কাজে ঢুকি। আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালোই। মাঝেমধ্যে কাজের পরে একসাথে একটু মদ্যপান করতেও যাই। অধিকাংশ লোকের সাথে আমার অতটা ঘনিষ্ঠতা নেই। ইউরিনালে আমি ওর পাশেই দাঁড়িয়ে। ও-ই প্রথম অভিযোগের সুরে বলে, “দ্যাখো অবস্থা! সারাটা সন্ধে মনে হচ্ছে এই জিনিসই গড়াতে থাকবে। দেখো ঠিক! মিটিং, মিটিং, মিটিং, অন্তহীন কাল চলতেই থাকবে।”

“যা বলেছ”, আমি বলি। দুজনে হাত ধুয়ে নিই। সকালের মিটিং-এ যা বলেছিলাম তার জন্য ও একটু বাহবা জানায়। আমি ধন্যবাদ দিই।

“ওহ্, একটা কথা, টিভি নিয়ে যে লোকগুলো এসেছিল একটু আগে...”, শুরুটা করে আমি আর শেষ করি না।

লোকটা কিছু বলে না। কলটা বন্ধ করে, দেওয়াল থেকে দুটো পেপার টাওয়েল টেনে নেয়। হাত মুছতে থাকে। আমার দিকে একবার তাকায়ও না। হাত শুকোতে কতক্ষণ লাগে? শেষ অবধি টাওয়েলটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হতে পারে যে শুনতেই পায়নি। নাহলে ভান করছে না শোনার। বলা যায় না। কিন্তু পরিবেশটা যেমন পালটে যায়, তাতে আমি নিশ্চিত যে আর কথা না তোলাই ভালো। চুপটি করে হাত মুছে, করিডর দিয়ে কনফারেন্স রুমের দিকে হেঁটে যাই। বিকেলের মিটিং-এর বাকি সময়টা ও আমার চোখে চোখ পড়া এড়িয়ে যায়।

অফিস থেকে যখন বাড়ি ফিরলাম, দেখি ফ্ল্যাট অন্ধকার। বাইরে কালো মেঘে ছেয়ে ফেলেছে। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ফ্ল্যাটেও যেন বৃষ্টির গন্ধ। রাত আসছে। বউ-এর পাত্তা নেই। টাইটা খুলে, ভাঁজ পড়া জায়গাগুলো সমান করে, ঝুলিয়ে রাখি। নিজের স্যুটটা ব্রাশ দিয়ে ঝাড়ি। ওয়াশিং মেশিনে জামাটা ছুঁড়ে দিই। আমার চুল থেকে মনে হল যেন সিগারেটের গন্ধ বেরোচ্ছে, তাই শাওয়ারে স্নান করে শেভ করে নিলাম। আমার জীবনের গল্প বলতে: অন্তহীন মিটিং-এ যাও, মারাত্মক রকম সিগারেটের ধোঁয়া গিলতে থাক সেখানে, তারপর আমার বউ এসে এটা নিয়ে পড়ুক। বিয়ের পর প্রথম যে জিনিসটা ও করল সেটা হল আমাকে সিগারেট ছাড়ানো। চার বছর আগের ঘটনা সেটা।

শাওয়ার থেকে বেরিয়ে, একটা বিয়ার নিয়ে সোফাতে বসে, তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে থাকি। টিভির লোকেদের আনা টেলিভিশনটা এখনও সাইডবোর্ডের ওপরে। টেবিল থেকে রিমোট কন্ট্রোলটা তুলে নিয়ে আমি ‘অন্’-এর সুইচটা টিপি। বারবারই টিপি, কিন্তু কিছু হয় না। স্ক্রিনটা অন্ধকারই রয়ে যায়। প্লাগটা পরীক্ষা করে দেখি, সকেটে ঢোকানোই আছে। সবই ঠিকঠাক। একবার টেনে খুলে নিয়ে আবার ঠিক করে লাগাই। তবু কিছু হয় না। যতই ‘অন’ সুইচটা টিপি না কেন স্ক্রিনে আলো জ্বলে না। আরও নিশ্চিত হয়ে নিতে আমি রিমোট কন্ট্রোলের যন্ত্রটার পিছনের ঢাকাটা ঝট করে খুলে ব্যাটারিগুলো বের করে নিই, তারপর ইলেকট্রিক টেস্টারটা দিয়ে একবার পরখ করে দেখে নিই। ব্যাটারি সব ঠিকই আছে। এবার আমি হাল ছেড়ে দিই। রিমোট কন্ট্রোলটা একপাশে ছুঁড়ে রাখি। তারপর আরো খানিকটা বিয়ার গলায় ঢালি।

এত বিচলিত হচ্ছি কেন আমি? ধরা যাক, যদি জ্বলতও, কী করতাম? জ্বলে উঠে সাদা দানাগুলো কিরকির করত। ওটুকুর জন্য কার মাথাব্যথা?

কিন্তু মাথাব্যথা আছে। কাল রাতে জ্বলেছিল। তারপর আর ওটা ছোঁয়াও হয়নি। এরকম হওয়ার তো কথা নয়।

আরেকবার রিমোট কন্ট্রোলটা দিয়ে চেষ্টা চালাই। আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে চাপ দিই। কিন্তু সেই একই ফল। কোনো সাড়া নেই। টিভির পর্দা নিষ্প্রাণ। ঠান্ডা।

নিষ্প্রাণ ঠান্ডা।

ফ্রিজ থেকে আরেকটা বিয়ার বের করে একটা প্লাস্টিকের বাটিতে রাখা খানিকটা পটেটো স্যালাড খাই। ছ’টা বেজে গেছে। সন্ধের কাগজটা আগাপাশতলা পড়ে ফেলি। প্রত্যেকদিন যেমন বৈচিত্র্যহীন লাগে, তার চেয়ে বেশি বই কম লাগল না। পড়ার মতো একটা লেখাও নেই, শুধু কতগুলো অকিঞ্চিৎকর খবর। কিন্তু তবু পড়ে যাই, এর চেয়ে ভালো আর কিছু করার মতো পাচ্ছি না, যতক্ষণ না পুরোটা পড়া হয়ে যায়। এরপর? ভেবে বের করাটাকে ঠেকিয়ে রাখতে আর খানিক খবরের কাগজটা নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আচ্ছা, চিঠিগুলোর উত্তর লিখে ফেললে কেমন হয়? আমার এক খুড়তুতো বোন একটা বিয়ের নেমন্তন্ন পাঠিয়েছে। যাওয়া যে হবে না, সেটা জানিয়ে দিতে হবে। বিয়ের দিনই আমি আর আমার বউ বেড়াতে বেরিয়ে যাব। ওকিনাওয়া যাব। কতকাল ধরে যে কেবল প্ল্যান করছি; দুজনেই কাজের জায়গায় ছুটি নেব। এখন আর এই পরিকল্পনা বাতিল করা যাবে না। ভগবান জানে, কবে আবার একসঙ্গে একটা লম্বা ছুটি কাটানোর সুযোগ আসবে। তার চেয়েও বড় কথা, এই খুড়তুতো বোন আমাদের খুব একটা ঘনিষ্ঠও নয়; প্রায় দশ বছর হতে চলল, এর মাঝে দেখা হয়নি। কিন্তু তা বলে সেটা শেষ সময়ে জানানোর জন্য ফেলে তো রাখা যায় না। ওরও তো একটা হিসেব দরকার, ক’জন আসবে, ব্যাঙ্কোয়েটের জন্য ক’টা সেটিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। ওহ্, বাদ দাও এসব। এখনই কিছুতেই আর লিখতে বসতে পারছি না। মনই লাগছে না তাতে।

খবরের কাগজটা আবার তুলে নিয়ে সেই আগের লেখাগুলোই আবারও পড়ি। ডিনারটা তৈরি করতে শুরু করলে হত। কিন্তু বউয়ের যদি দেরি হয়, খাওয়া সেরেই ফেরে যদি! একটা অংশ তাহলে ফেলা যাবে। আমার একার খাওয়ার জন্য আগের দিনের রয়ে যাওয়া খাবারেই চলে যাবে; নতুন করে বিশেষ কিছু করার কোনো প্রয়োজন নেই। ও না খেয়ে ফিরলে দুজনে বাইরে গিয়ে একসঙ্গে কিছু একটা খেয়ে নিলেই হবে। কিন্তু একটা খটকা লাগছে। আমাদের দুজনের যে কেউই যদি জানতে পারি যে দেরি হয়ে ছ’টা বেজে যেতে পারে, সবসময় ফোন করি। এটাই নিয়ম আমাদের। দরকার হলে অ্যান্সারিং মেশিনে একটা মেসেজ রাখি। এতে করে অন্যজন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে পারে: একা একাই খেয়ে নিতে পারে, অথবা যে দেরি করে আসবে তার জন্যে কিছু একটা করে রাখতে পারে, কিংবা না খেয়ে বসে থাকতেও পারে। আমার কাজের যা ধরন তাতে প্রায়ই অনেক দেরি অবধি বাইরে থাকতে হয়, ওর আবার প্রায়ই মিটিং থাকে কিংবা প্রুফ পাঠাবার থাকে, বাড়ি ফেরার আগে। দুজনের কারুরই রেগুলার ন’টা থেকে পাঁচটার চাকরি নয়। যখন দুজনই ব্যস্ত থাকি, এমন হতে পারে যে তিন দিন ধরে হয়তো কোনো কথাই হল না। এগুলোও একরকম ব্রেক—তবে এগুলো প্ল্যানের মধ্যে পড়ে না। তাই আমরা দুজনেই কতকগুলো নিয়ম মেনে চলি, যাতে একে অপরের ওপর অবিবেচকের মতো কোনো ভার না চাপিয়ে দিই। যদি মনে হয় যে লেট হব, ফোন করে অন্যজনকে জানিয়ে দিই। আমি ক্কচিৎ কখনো ভুলে গেলেও, ও কক্ষনো, একবারের জন্যও ভোলেনি।

অথচ অ্যান্সারিং মেশিনে কোনো মেসেজ নেই।

খবরের কাগজটা ছুঁড়ে দিয়ে আমি সোফায় টানটান হয়ে চোখ বুজি। স্বপ্নের মধ্যে একটা মিটিং। দাঁড়িয়ে উঠে কিছু বলছি কিন্তু কী বলছি নিজেই বুঝতে পারছি না। মুখ খুলে বলে যাচ্ছি। যদি না বলি, তাহলেই মৃত্যু। কথা বলে যেতেই হবে। অবিরাম কথা বেরিয়ে আসতে হবে। চারপাশে সবাই মরে আছে। মৃত এবং প্রস্তরীভূত। ঘর ভর্তি পাথরের মূর্তি। বাতাস দিচ্ছে খুব। জানালাগুলো সব ভাঙা; দমকা বাতাস এসে ঢুকছে। আর রয়েছে টিভির লোকেরা। তিনজনই। প্রথমবার যেমন ছিল। ওদের হাতে একটা সোনি কালার টিভি। আর তার স্ক্রিনেও টিভির লোকেরা। আমার কথা ফুরিয়ে আসছে; টের পাচ্ছি একটু একটু করে আমার আঙুলের ডগাগুলো আড়ষ্ট হয়ে আসছে। একটু একটু করে পাথর হয়ে যাচ্ছি।

চোখ খুলে দেখি ঘরে আলো জ্বলছে। টেলিভিশনটা অন, বাইরে সবকিছু অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে টিভির স্ক্রিনটা উজ্জ্বল হয়ে ঝিলিক দিয়ে উঠছে, টানা একটা কিরকির করে আওয়াজ। সোফায় উঠে বসে আমি আঙুলের ডগা দিয়ে কপালের দুপাশে টিপে ধরি। আঙুলের মাংস এখন নরমই; মুখে এখনও বিয়ারের স্বাদ। ঢোক গিলি। গলা শুকিয়ে কাঠ; লালা গলায় ঠেকে বিষম খাই। সব সময়ই এটা হয়, খুব জীবন্ত একটা স্বপ্ন দেখার পর জাগ্রত জগৎকে ভীষণ নিষ্প্রভ মনে হয়। কিন্তু এটাই সত্যি। কেউ পাথর হয়ে যায়নি। সময় কত হতে চলল? মেঝেতে ঘড়িটার তল্লাশ করি। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। আটটার সামান্যই বাকি।

কিন্তু, স্বপ্নে যেমনটা দেখেছিলাম ঠিক সেভাবেই টেলিভিশন স্ক্রিনে একজন টিভির লোক। অফিসের সিঁড়িতে যে লোকটার পাশ দিয়ে গেছিলাম, সেই লোকটাই। কোনো ভুল নেই। এই লোকটাই ফ্ল্যাটের দরজাটা প্রথম ঠেলে খুলেছিল। আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত। ওই তো দাঁড়িয়ে আছে লোকটা একটা উজ্জ্বল ফ্লোরেসেন্ট সাদা পশ্চাদপটে, আমার সচেতন বাস্তবতার জগতে যে স্বপ্নগুলো ঢুকে পড়ছে তারই অপসৃয়মান প্রান্তটুকু—আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। একবার বুজে ফেলে আবার চোখ খুলে দেখি, যদি কোনোভাবে লোকটা সুরুৎ করে হাওয়া হয়ে যায় এই আশায়, যেন কোনোদিনই ছিলই না। কিন্তু লোকটা অদৃশ্য হয় না। বরং উলটে আরও বড় হয়ে যায় আকৃতিতে। সমস্ত স্ক্রিন জুড়ে ওর মুখ, ক্রমশই আরও, আরও কাছে চলে আসছে।

এরপরেই যেটা ঘটে, লোকটা স্ক্রিন থেকে বেরিয়ে আসছে। দু’হাতে ফ্রেমটা আঁকড়ে ধরা, শরীরটাকে একটু ওপরে তুলে নিয়ে, একটার পর আরেকটা পা বাড়িয়ে, জানালা দিয়ে যেভাবে উঠে আসে, একটা উজ্জ্বল সাদা টিভি স্ক্রিন পেছনে ফেলে আসছে।

লোকটা তার বাঁ হাতটা ডানহাতের তালুতে ঘষে, ধীরে ধীরে টেলিভিশনের বাইরের জগৎটার সাথে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলতে থাকে। কেবলই মাপে কমানো ডান হাতের আঙুলগুলো ছোটোমাপের বাঁহাতের আঙুলগুলোতে ঘষতে থাকে, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। এমনই নির্বিকার যেন সময়টা কোনো ব্যাপারই নয়। টিভির বেশ অভিজ্ঞ অনুষ্ঠান সঞ্চালকের মতো। তারপর একসময়, সোজা আমার দিকে তাকায়।

“আমরা একটা উড়োজাহাজ বানাচ্ছি”, সেই টিভির লোক আগন্তুক বলে। কণ্ঠস্বরে এ ব্যাপারে ওর মনোভাবের কোনোই আভাস নেই। কী রকম কৌতূহলী, কাগজের মতো পাতলা আওয়াজ।

লোকটা বলামাত্র, স্ক্রিনটা শুধুই যন্ত্রপাতিতে ভরে যায়। বেশ পেশাদারি দক্ষতায় একটা ফেড-ইন। খবরের সময় যেমন হয়। প্রথমে, একটা ফ্যাক্টরির ভেতরটা দেখিয়ে ওপেনিং শট, তারপরেই কাট করে কাজের জায়গার ক্লোজ-আপে ক্যামেরার ফোকাস কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। দুজন টিভির লোক কী যেন একটা মেশিন নিয়ে খুব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, এই রেঞ্চ দিয়ে বল্টু আঁট করছে তো এই নানা গেজ ঠিকঠাক করছে। অসাধারণ মনোসংযোগ। ওরকম মেশিন অবশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি: সোজা করে দাঁড় করানো একটা সিলিন্ডার, ওপর দিকে ক্রমশ সরু হয়ে এসেছে, জিনিসটার গায়ে বেশ সুবিন্যস্তভাবে উঁচু উঁচু হয়ে থাকা অংশ। উড়োজাহাজের চেয়েও জিনিসটাকে অরেঞ্জ জুস তৈরির একটা বিশাল যন্ত্র বলে মনে হয় বেশি। ডানা নেই, সিট নেই।

“উড়োজাহাজের মতো তো দেখাচ্ছে না,” আমি বলি। আওয়াজটা মোটেই আমার গলার আওয়াজের মতো শোনায় না। কেমন পলকা, যেন কোনো ছাঁকনি দিয়ে আওয়াজের সমস্ত রসদ ছেঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ করে কি খুব বুড়ো হয়ে পড়লাম?

“বোধহয় এখনও এটাকে রঙ করিনি বলে,” লোকটা বলে। “কাল ঠিকমতো রং লাগানো হবে। তখন দেখবেন এটা একটা উড়োজাহাজ হয়ে যাবে।”

“সমস্যাটা রং নিয়ে হচ্ছে না, হচ্ছে আকৃতিটা নিয়ে। সেটা মোটেই উড়োজাহাজের মতো নয়।”

“বাঃ, উড়োজাহাজ না হলে, এটা তাহলে কী?” আমায় জিজ্ঞেস করে ও। যদি লোকটাও না জানে, আমিও না জানি, জিনিসটা তাহলে কী? “তাই বলছি, রংটার জন্যই এখনও...” টিভির লোকটা আমায় আস্তে করে বলে। “ঠিকঠাক রং করলেই এটা একটা উড়োজাহাজ হয়ে যাবে।”

আমার আর তর্কাতর্কি করতে ইচ্ছে হয় না। কী এসে যায়? অরেঞ্জ জুসের মেশিন বা উড়োজাহাজ—উড়ন্ত জুস মেশিন? কে পরোয়া করে? কিন্তু এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, অথচ আমার বউ কোথায়? বাড়ি ফিরছে না কেন? আমি আবার কপালের দুপাশে আঙুল দিয়ে চাপ দিতে থাকি। ঘড়িটা টিকটিক করে চলতেই থাকে। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’। রিমোট কন্ট্রোলটা টেবিলের উপর পড়ে, তার পাশেই ডাঁই করা মেয়েদের ম্যাগাজিনগুলো। টেলিফোনটা কোনো আওয়াজ করে না, টিভির চাপা আলোয় ঘরটা যেটুকু আলোকিত হয়।

স্ক্রিনে টিভির লোকদুটো কাজ করেই যায়। আগের চেয়ে ছবি এখন অনেক পরিষ্কার। ডায়ালগুলোর ওপর সংখ্যাগুলো পড়া যায়, মেশিনগুলো থেকে মৃদু গুড়গুড় আওয়াজও আসে। তাআব্‌জ্ রিয়াইফ্‌গ্ তাআব্‌জ্‌রিয়াইফ্‌গ্ আর্‌প‌্ আর্‌প‌্ তাআব্‌জ্‌রিয়াইফ্‌গ্। এই গম্ভীর ভারী আওয়াজটার মধ্যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর একটা তীক্ষ্ণ ধাতব কর্কশ শব্দ। আরিইইন্‌ব‌্‌ট‌্ আরিইইন্‌ব‌্‌ট‌্। বাকি সময়টা জুড়ে ইতস্তত নানা রকম অন্য আওয়াজ; এসব ছাপিয়ে কিছুই পরিষ্কার করে আমার কানে আসে না। তবু টিভির ওই দুজন লোক যথাসাধ্য কাজ করেই যায়। মনে হয় এই প্রোগামটার ওটাই বিষয়বস্তু। ওরা কাজ করে যায় আর আমি তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের দেখি। টিভিটার বাইরে ওদের অন্য সহকর্মী চুপ করে তাকিয়ে দেখে। ওদেরই, আর দেখে ওই জিনিসটাকে—দিব্যি কেটে বলতে পারি, ওটাকে মোটেই উড়োজাহাজের মতো দেখাচ্ছে না, কালো, ময়লা একটা কিম্ভূত যন্ত্র, সাদা আলোর একটা আবহের মধ্যে ভাসছে।

টিভির লোকটা, স্ক্রিনের বাইরের, বলে ওঠে, “তোমার বউ তো আর ফিরবে না হে।”

আমি ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখি। হয়তো ঠিকমতো শুনতে পাইনি ওর কথা। ওর দিকে তাকানো মানেই উজ্জ্বল টিউবটার ভেতরে দেখার চেষ্টা করা।

“তোমার বউ তো আর ফিরবে না হে”, টিভির লোক ঠিক আগের বারের মতো করে উদাসীনভাবে পুনরাবৃত্তি করে।

“তার মানে?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“তার মানে, একটু বেশিই দূর গড়িয়েছে ব্যাপারটা।”

টিভির লোকের গলাটা যেন প্লাস্টিক কার্ড দিয়ে তৈরি হোটেলের চাবি। ওঠাপড়াহীন এমনভাবে আমাকে বিদ্ধ করে যেন কোনো অপরিসর ছিদ্র দিয়ে পিছনে ঢুকে যাচ্ছে। “বহুদূর গড়িয়েছে ব্যাপারটা: সে এখন ওইখানে।”

“বহুদূর গড়িয়েছে ব্যাপারটা: সে এখন ওইখানে।” আমার মাথার মধ্যে বারবারই বাজতে থাকে। সহজ কথা এবং বাস্তবতাহীন। কী প্রসঙ্গে বলা, তা-ই বুঝতে পারি না। কারণ যেন কার্যকে পিছন থেকে ল্যাজ ধরে টেনে পুরোটা গিলে খেয়ে ফেলবে। আমি উঠে রান্নাঘরে যাই। রেফ্রিজারেটারটা খুলে বড় করে একবার শ্বাস নিই, হাত বাড়িয়ে একটা বিয়ারের ক্যান নিয়ে সোফায় ফিরে যাই। সেই টিভির লোক তখনও টেলিভিশনের সামনে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, ডান হাতের কনুইতে সেটের ওপর ভর দিয়ে। আমি ক্যান খোলার আংটা ধরে টানি, ও সেটা দেখে দাঁড়িয়ে। আমার তেমন বিয়ার খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না এই মুহূর্তে; কিন্তু কিছু তো একটা করতে হবে। একবার চুমুক দিই, কিন্তু বিয়ারের স্বাদটা ভালো লাগছে না। ক্যানটা হাতে নিয়ে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ না ওটা এত ভারী লাগতে থাকে যে আমি ওটাকে টেবিলে নামিয়ে রাখি।

এবার টিভির লোক যে কথাটা এইমাত্র জানাল, সেটা নিয়ে ভাবি—বউয়ের যে আর আসা হয়ে উঠল না। লোকটা বলছে ও আর আসবে না। বাড়িতে আসবে না আর বউ। অতটা আমি ঠিক ভেবে উঠতে পারি না। বিশ্বাস হয় না। আমরা একেবারে আদর্শ দম্পতি নই ঠিকই। এই চার বছরে মন কষাকষি হয়েছে; নানা সমস্যা হয়েছে। কিন্তু আমরা দুজনে আলোচনা করেছি সেগুলো নিয়ে। কিছু কিছু ব্যাপারে নিস্পত্তি হয়েছে, কিছু ব্যাপারে হয়নি। যেগুলো নিষ্পত্তি হয়নি সেগুলোকে সহ্য করেছি। এ কথা ঠিক যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আমাদের জীবনে অনেক ওঠাপড়া ছিল। স্বীকার করছি সে কথা। কিন্তু এতেই কি হাল ছেড়ে দিতে হয় ? দেখান তো একটা দম্পতি যাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। তাছাড়া, সবে তো একটু আগে আটটা বেজেছে। নিশ্চয়ই কোনো কারণে ফোন করে উঠতে পারেনি। কতই তো কারণ থাকতে পারে। যেমন... একটাও কারণ মনে আসে না। আমার সব ভীষণভাবে গুলিয়ে গেছে।

সোফার আরও গভীরে সেঁধিয়ে যাই।

আচ্ছা, কী করে ওই উড়োজাহাজটা—যদি আদৌ ওটা উড়োজাহাজ হয়—উড়বে বলে ভাবা হচ্ছে? কীসে চলে ওটা? জানালাই বা কোথায়? সামনের দিক কোনটা? পিছনটাই বা কোনদিকে?

ভয়ানক ক্লান্ত লাগছে। একেবারে নিঃশেষিত। সেই খুড়তুতো বোনের করা বিয়ের নেমন্তন্নে যেতে পারছি না বলে মাফ চেয়ে চিঠিটাও তো লিখতে হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি কাজের চাপের ফলে। খুবই খারাপ লাগছে, তাহলেও, অভিনন্দন জানাই।

আমার প্রতি দৃকপাত না করে, টেলিভিশনের ভেতরে দু’জন টিভির লোক উড়োজাহাজ বানিয়েই যায়। খুব খাটে, কোনো কারণেই থামে না। মেশিনটা সম্পূর্ণ করার আগে অন্তহীন কাজের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে ওদের। একটা কাজ শেষ হতে না হতেই আর একটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনো নির্দেশাবলী নেই যন্ত্রাংশগুলো একত্র করার। কোনো নকশা নেই কিন্তু ওরা নিখুঁতভাবে জানে কখন কী করতে হবে। কোনটার পর কোনটা। ওদের ক্ষিপ্র নড়াচড়া ক্যামেরা চমৎকার অনুসরণ করতে থাকে। একেবারে সরল সাধাসিধে ক্যামেরার কাজ। বেশ বিশ্বাসযোগ্য প্রামাণ্য ইমেজ। নিশ্চয়ই অন্যান্য টিভির লোকেরা (৪ নম্বর আর ৫ নম্বর) ক্যামেরা আর কন্ট্রোল প্যানেল সামলাচ্ছে।

শুনলে হয়তো আশ্চর্য হবেন যতই আমি টিভির লোকেদের ওরকম নিখুঁত কর্মপ্রণালী দেখতে থাকি, ততই জিনিসটাকে দেখে উড়োজাহাজের মতোই লাগতে থাকে। এটুকু বলতে পারি যে, ওটা এরপর সত্যি উড়ে গেলে আমি অন্তত আশ্চর্য হব না। কোনদিকটা সামনে, কোনটা পিছন—দিয়ে কী হবে? অত নিষ্ঠা নিয়ে কাজগুলো করছে, উড়োজাহাজ না হয়েই যায় না। যদি উড়োজাহাজের মতো না-ও দেখায়—ওদের কাছে ওটা উড়োজাহাজই। পুঁচকে লোকটা যেমন বলল, “যদি উড়োজাহাজ না-ই হয়, তাহলে ওটা কী?”

স্ক্রিন থেকে বেরিয়ে আসা টিভির লোক, রিপ্রেজেন্টেটিভ, এতক্ষণ এতটুকু নড়েনি চড়েনি। ডান কনুইতে টিভি সেটের ওপর ভর রেখে আমায় দেখে যাচ্ছে।

আমি নজরবন্দি হয়ে আছি। টিভির লোক—ফ্যাক্টরিকর্মীরা কাজ করে যায়। ব্যস্ত ব্যস্ত ব্যস্ত। ঘড়িটা চলতে থাকে। ‘তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্ তার্‌প্‌প্‌ ক্ শ্‌শাউস্’।

ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেছে, কেমন দমবন্ধ করা ভাব। করিডর দিয়ে কারও হেঁটে যাওয়ার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।

আমার হঠাৎই মনে হয়, হতেই পারে। হতেই তো পারে যে আমার বউ চলে গেছে। বহুদূরে কোথাও চলে গেছে। কোনোরকম একটা যানে চড়ে আমার নাগালের বাইরে বহুদূরে কোথাও। হয়তো আমাদের সম্পর্কটা চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। একদম কিছুই আর বাকি নেই। আমিই হয়তো খেয়াল করিনি। সবরকম সম্ভাবনাই খেলা করতে থাকে আমার মধ্যে, তারপর একসময় সেই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাগুলো মিলে মিশে যায়। “হতেই পারে,” আমি চেঁচিয়ে উঠি। প্রতিধ্বনি হয়, ফাঁকা।

“কাল যখন রং লাগাব, তখন ভালো বুঝতে পারবে,” লোকটা বলতে শুরু করে। উড়োজাহাজ করার জন্য আর শুধু দরকার একটু রং লাগানো।”

আমি নিজের হাতের তালুর দিকে তাকাই। সামান্য ছোটো হয়ে গেছে যেন চুপসে। সামান্যই একটু। নাকি ওরকম ভাবছি নেহাত? হয়তো আলোটার জন্য ওরকম একটা বিভ্রম হচ্ছে। হয়তো আমার পরিপ্রেক্ষিত বিচারের ক্ষমতাটা চলে গেছে। তবে, সত্যিই হাতটা ছোটোই লাগছে। আচ্ছা বেশ, দাঁড়ান তো এক মিনিট! আমাকে একটু কথা বলতে দিন। আমার কিছু বলার আছে। বলতেই হবে আমাকে। বলতে না পারলে আমি মারা যাব, মরে পাথর হয়ে যাব। অন্যদের মতোই।

“শিগগিরই ফোনটা বাজবে,” টিভির লোক—রিপ্রেজেন্টেটিভ বলে। তারপর খুব মেপে, একটু সময় নিয়ে, যোগ করে, “আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই।” টেলিফোনটার দিকে তাকাই; টেলিফোন কর্ডটার কথা ভাবি। ফোনের কেবলগুলো, অন্তহীন দৈর্ঘ্য তাদের, একটার সঙ্গে আরেকটাকে যুক্ত করে। এই অতিকায় বিশাল সার্কিটের কোনো এক প্রান্তে কোথাও একটা আমার বউ আছে। অনেক অনেক দূরে, আমার নাগালের বাইরে। ওর নাড়ির স্পন্দন আমি টের পাই। নিজের মনে ভাবি, আর পাঁচ মিনিট। কোনদিকটা সামনে, কোনটাই বা পেছন? উঠে দাঁড়িয়ে আমি কিছু বলতে চেষ্টা করি, কিন্তু দাঁড়ানো মাত্রই কথাগুলো পিছলে দূরে চলে যায়।

[[1]   নুন দিয়ে জারানো জাপানি প্লাম (ছোট পীচ জাতীয় ফল) দিয়ে তৈরি আচার।]

[অনুবাদকের বানানরীতি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে]

হাতিটা উধাও গত ২ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে হারুকি মুরাকামির গল্পের বই ‘জো-নো-শোমেৎসু’-এর বাংলা অনুবাদ ‘হাতিটা উধাও’। অনুবাদ করেছেন অভিজিৎ মুখার্জি, অনুরাধা চট্টোপাধ্যায়, রীমা রায় এবং শুভা বসু। প্রকাশ করেছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেস, প্রচ্ছদ করেছেন কৌস্তভ চক্রবর্তী, ২৭৯ পৃষ্ঠার বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪৫০ ভারতীয় রুপি। সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি থেকে ‘টিভির লোকেরা’ শীর্ষক গল্পটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনার সৌজন্যে প্রকাশ করা হলো।

 

/জেডএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেফতার ২
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেফতার ২
কর্মকর্তাদের কলম বিরতির নির্দেশনা নেই: ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি
কর্মকর্তাদের কলম বিরতির নির্দেশনা নেই: ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী