X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

স্বর্গীয় করুণার ফুল

মূল : সাদত হাসান মান্টো ।। অনুবাদ : দিলওয়ার হাসান
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৭:০৭আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৪৫

[সাদত হাসান মান্টোর গল্পের বই ‘শিকারি আওরত’ ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত। বইটিকে পরম বিনোদনসমৃদ্ধ ও আনন্দোচ্ছ্বাসপূর্ণ এক বিস্মৃত আধুনিক ক্ল্যাসিক বলে অভিহিত করা হয়। ছোট-বড় ৯টি গল্পের এক অমূল্য সাহিত্য-সম্পদ। ১৯৫০ সালের দিকে লাহোর, বোম্বাই ও অমৃতসরের পটভূমিকায় রচিত। অধিকাংশ গল্পেই নারীরা নিগৃহীত বা কোনো ঘটনার শিকার নয়, বরং তারা স্মার্ট, চতুর, আস্থাশীল এমনকি প্রতিশোধপ্রবণ। তবে গল্পগুলো শুধু শিকারিদের নিয়ে নয়, যারা শিকারে পরিণত তাদের নিয়েও—সেই হতভাগ্য আর নিচুতলার মানুষ। গল্পগুলো পাঠকদের নিয়ে যাবে অতীতের সময়রেখায়। মান্টোর অন্যসব গল্পের মতো এই গল্পগুলোতেও প্রতিফলিত হয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক বিক্ষোভ, ভণ্ডামি, উন্মত্ততা আর সময়ের বিষাদ ও হতাশায় ভরা কৌতুক। গল্পগুলো স্পষ্টতই আত্মজৈবনিক; মান্টোর ভিন্ন এক সত্তা আবিষ্কার করা যায় এখানে। গল্পের চরিত্রগুলো কখনো-কখনো আঘাতে-আঘাতে জর্জরিত ও বেদনামথিত—তাদের জীবনবীণায় বেজে ওঠে ট্র্যাজেডির করুণ সুর, আবার কখনো তারা কোমল, যৌনগন্ধী ও উল্লাসমখুর। সবকটা গল্পই সৃষ্টি করেছে এক ভিন্ন আবেদন। গল্পগুলোর রচয়িতা সাদত হাসান মান্টো এই উপমহাদেশের একজন শক্তিমান, সাহসী বিদ্রোহী ও বিতর্কিত লেখক। জন্ম ১৯১২ সালের মে, লুধিয়ানার সামরালায়। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে লাহোরে প্রয়াত হন। ২২টি গল্পগ্রন্থ, একটি উপন্যাস, ৫টি বেতার নাটক, ৩টি প্রবন্ধের বই, ২টি নকশা ও অসংখ্য চিত্রনাট্যের রচয়িতা তিনি। গল্পগুলো বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।]


জমিদার নামের খবরের কাগজটি যখন ডাক্তার রাথোরের ওপর স্বর্গীয় ক্ষমার ফুলের মতো প্রশংসা বর্ষণ করতে লাগল, আর গোলাম রসুলের বন্ধুরা তাকে ডাক্তার রাথোর বলে ডাকতে শুরু করল। অবাক হচ্ছেন? কেন? কারণ ওই দুজন মানুষের সঙ্গে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না। সন্দেহাতীতভাবেই গোলাম রসুল তিনবার এমবিবিএস পরীক্ষায় ফেল করেছিল। এ দুটি মানুষের মধ্যে আসলে কোনো তুলনা চলে না।
বিজ্ঞাপনের জোরোই ডাক্তার রোথোর একজন ডাক্তার যে-কিনা লোকের যৌনাকাঙ্ক্ষা বাড়ানোর ওষুধের কথা রটিয়ে বেড়ায়। সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের নামে শপথ করে ওষুধের গুণগান করে। এই ওষুধের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বলে সে হাজার-হাজার টাকা রোজগার করে। গোলাম রসুল অবশ্য ওইসব ওষুধ বিক্রি করে না। ওই ব্যাপারে তার আগ্রহও নেই। সুখি বিবাহিত জীবন তার। নিজের যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর দরকার নেই। এতদসত্ত্বেও বন্ধুরা তাকে ডা. রাথের বলে ডাকে। যেকোনো কারণেই হোক তাকে দেওয়া এই অভিধা সে মেনে নিয়েছে। হয়তো আর কোনো পথও তার সামনে খোলা ছিল না। একদিকে তার বন্ধুরা নামটি পছন্দ করে, অনদিকে ‘গোলাম রসুলের’ চেয়ে ডা. রাথোর কথাটা শুনতে বেশি ভালো।
কাজেই গোলাম রসুল এখন থেকে ডা. রাথোর নামে অভিহিত হবে। যা-ই বলুন না কেন, লোকের কথাই আসলে ঈশ্বরের বিধান।
ডা. রাথোর ছিলেন নানান গুণের মানুষ। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল—তিনি ডাক্তার ছিলেন না, আর ডাক্তার হওয়ার কোনো ইচ্ছেও তার ছিল না। তবে ছাত্রজীবনে সে ছিলো একজন বাধ্য ছাত্র। বাবা-মার স্বপ্ন পূরণের জন্যে ডাক্তার হতে মন দিয়ে লেখাপড়া করত। এত দীর্ঘ সময় ধরে সে পড়াশোনা করেছে যে কলেজের দালানকোঠা অবধি তার জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিল। কলেজকে সে পরম শ্রদ্ধাভাজনদের আবাস বলে গণ্য করত আর শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে প্রতিদিন সেখানে গিয়ে হাজির হতো। তার বাবা-মা তার ডাক্তারি পড়া ও পাশের ব্যাপারে অনমনীয় ছিলেন। তার বাবার বিশ্বাস ছিল, ভালো একজন সফল ডাক্তারের সব গুণ তার পুত্রের মধ্যে আছে। তার বড় ছেলে সম্পর্কে মৌলভি সালাইউদ্দিন স্ত্রীর কাছে ভবিষ্যৎ বাণী করে বলেছিলেন, সে একজন ব্যারিস্টার হবে। কাজেই এলএলবি পাশ করার পর তাকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল। সে ব্যারিস্টার হয়েই দেশে ফিরেছিল। তবে আইন ব্যবসায় তার সাফল্য অন্য ব্যারিস্টারদের তুলনায় কম। সেটা অবশ্য ভিন্নকথা।
এমবিবিএস পরীক্ষায় তিনবার ফেল করলেও তার বাবা এখনো বিশ্বাস করেন রসুল একজন সেরা ডাক্তার হবে। রসুল এমন একজন কর্তব্যনিষ্ঠ পুত্র যে, সে নিজেও বিশ্বাস করত একদিন লন্ডনের হারলে স্ট্রিটে চেম্বার খুলে প্রাকটিস করবে আর সারা দুনিয়া তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে।
তার আর এক গুণ—সে খুব সাদামাটা। তার চরিত্রের সবচেয়ে অন্ধকার দিক হচ্ছে সে বিস্তর মদ্য পান করে, আর পান করে একা। প্রথম, প্রথম সে কাওকে সঙ্গে না-নিয়ে মদ পানের জোর চেষ্টা চালায়, কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে জ্বালাতন শুরু করে। তারা ওর মদ্যপানের গোপন স্থানের সন্ধান পেয়ে যায়। তারা সন্ধে সাতটার দিকে সিয়াতই বারে গিয়ে হাজির হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাথোরকে সবার মদের দাম পরিশোধ করতে হয়। সবাই তার প্রশংসায় ফেটে পড়লে মদ্যপানজনিত সুখানুভূতিতে রাথোর তার পকেট ফাঁকা করে ফেলে।
এ-ভাবেই পাঁচ-ছ মাস কেটে যায়। ডা. রাথোর বাবার কাছ থেকে ২০০ টাকা পায় পকেট-মানি হিসেবে। বাবা-মার সঙ্গে না থেকে আলাদা বাসা ভাড়া নেয়। মাসিক ভাড়া ২৫ টাকা। সেই দিনগুলো ছিল এক কথায় দারুণ!
এখনো তার স্ত্রীকে সংসার চালাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়, কারণ বন্ধুদের মদের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়ে যায়।

সেই মদ বেশ সস্তাই ছিল বলা যায়—প্রতি বোতল মাত্র ৮ টাকা। কম পড়লে রাথোরকে সাড়ে ৪ টাকাও ধার করতে হতো। কিন্তু পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যেত। রাথোরকে প্রতিদিনই ধার করতে হতো। কাজেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বারে না গিয়ে ঘরে বসে মদ্য পান করবে। কিন্তু স্ত্রীর ভয়ে তাকে ভাবতে হয়েছিল—কী করে তা সম্ভব! তার বউ তো কাল বিলম্ব না-করে তালাক দেবে তাকে। সে মদ খাওয়াকে রীতিমতো ঘৃণা করে। শুধু ঘৃণাই করে না, আতংকিতও হয়। কারও রক্তবর্ণ চোখ দেখলে সে বলে ওঠে, ‘ডাক্তার সাহেব, ওই লোকটার চেহারা কেমন ভয়ংকর। নির্ঘাৎ মদ গিলে মাতাল হয়েছে!’

ডা. রাথোর তখন আপন মনে ভাবতে থাকে—লোকটার চোখ দেখতে কেমন? মদ পানের পর সত্যিই কি কারও চোখ লাল হয়? তাহলে কি তার স্ত্রী তার চোখে লাল রঙের অস্তিত্ত্ব খুঁজে পায়? তার মদ্য পানের গোপন ব্যাপারটি কতদিন গোপন থাকবে? নিশ্চয়ই তার মুখ থেকে বিশ্রী গন্ধ বের হয়? কেমন করে তার স্ত্রী একদিন-না-একদিন ধরে ফেলবে তার মুখনিশ্রিত মদের গন্ধ? তখন সে আকুল হয়ে ভাবে—হয়তো আমি সদাই সতর্ক থাকি, তার সঙ্গে কথা বলার সময় মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখি। যদি সে কখনো জিজ্ঞেস করে—তোমার চোখ লাল কেন?
আমি বলব—চোখে বালি ঢুকেছে। একদিন তো সে আমাকে জিজ্ঞস করেই বসেছিল তোমার মুখে কিসের দুর্গন্ধ। আমি তার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলেছিলাম, ও কিছু না সিগারেটের গন্ধ।

ডা. রাথোর এখন একাই মদ পান করে। তার সঙ্গী-সাথির দরকার নেই। যখন সে সচেতনতার ভেতর থাকে—খানিকটা কার্পণ্য এসে ভর করে তার মধ্যে তদুপরি বন্ধুদের মদ খাওয়ানোর পয়সাও তার হাতে থাকে না। ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে গভীরভাবে চিন্তা করে সে। এককথায় বলতে গেলে একা-একা মদ্য পানের একটা রাস্তা সে বের করতে চায়। পরিত্রাণ পেতে চায় বন্ধুদের মদের টাকা প্রদান থেকে।

একজন পূর্ণ ডাক্তার না হলেও ডা. রাথোর ওই শাস্ত্রের কিছু বিষয় অন্তত জানে। এটা সে ভালোভাবেই জানে বোতলে ওষুধ ঢেলে দিতে হবে। আর লিখে দিতে হবে : সেবনের পূর্বে ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিন। এই বুদ্ধি বিবেচনার ওপর ভর করেই সে পরিকল্পনা করে—বাড়িতে বসে একা একা মদ খেতে হবে। পৃথিবীর সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে তাকে। সে ওষুধের শিশিতে মদ ঢেলে বাড়িতে রেখে দেবে। স্ত্রীকে বলবে—তার প্রচণ্ড মাথা বেদনার ব্যারাম হয়েছে, আর তার সুপারভাইজার সৈয়দ রমজান আলি শাহ্ নিজ হাতে তাকে এই দাওয়াইয়ের প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়েছেন। তাঁকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পনেরো মিনিট অন্তর-অন্তর পানি মিশিয়ে তা পান করতে হবে। আর তাতেই আল্লাহর রহমতে মাথাব্যথা সেরে যাবে। এই পরিকল্পনাটি গ্রহণ করতে পেরে ডা. রাথোর খুবই খুশি। জীবনে একবার অন্তত সে নতুন এক আমেরিকা আবিষ্কারের আনন্দ লাভ করছে। দেরি না করে পরদিন সকালেই সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘নাসিমা, ভয়ংকর এক মাথাব্যথা রোগে আক্রান্ত হয়েছি আমি। মনে হচ্ছে মাথাটা এখনই ভেঙে খানখান হয়ে যাবে।’
নাসিমা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘তাহলে আজ আর মেডিকেল কলেজে গিয়ে কাজ নেই।’
ডা. রাথোর হেসে বলল, ‘প্রিয়ে, যেতে তো আমাকে হবেই। মাথার ব্যারামের ব্যাপারটা নিয়ে ড. সৈয়দ রমজান আলি সাহেবের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। ধারণা করি তাঁর দেওয়া ওষুধ খেলে সেরে উঠব আমি।
‘ও আচ্ছা। তাহলে যাও শিগগিরি। আমার সমস্যাটা নিয়েও আলোচনা কোরো তাঁর সঙ্গে।’
নাসিমার শ্বেতপ্রদর রোগ আছে, যা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তবুও সে বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে ওই বিষয়েও কথা বলব তাঁর সঙ্গে। তবে আমি নিশ্চিত তিনি আমাকে ভীষণ তেতো আর বাজে গন্ধওয়ালা একটা ওষুধ প্রেসক্রাইব করবেন।’
‘তাতে কী। ডাক্তার হিসেবে তোমার তো জানাই আছে ওষুধ কখনো মিষ্টি স্বাদের হয় না।’
‘তা ঠিক, তবে বাজে গন্ধওয়ালা ওষুধ ঘেন্না করি আমি।’
‘দেখ না কী ওষুধ দেন। আগেই এ নিয়ে এত ভাবছ কেন?
মাথায় আঙুল চালাতে চালাতে ডা. রাথোর কলেজের দিকে পা বাড়াল। সন্ধ্যায় ওষুধের বোতলে হুইস্কি ভরে বাড়ি ফিরল সে। বউকে বলল, ‘তোমাকে তো আগেই বলেছিলাম ডা. সৈয়দ রমজান আলি এমন ওষুধই আমাকে দেবেন যা প্রচণ্ড তিতা আর বদ গন্ধযুক্ত।’

বোতলের কর্ক খুলে বউয়ের নাকের সামনে ধরতে সে মুখ দ্রুত সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘কি বিচ্ছিরি গন্ধরে বাবা।’
‘এখন বলো এই বদ গন্ধওয়ালা ওষুধ আমি কী করে সেবন করব?’
‘না না। এ ওষুধ তোমাকে খেতেই হবে, তা নাহলে তোমার ওই বিচ্ছিরি রকমের মাথাব্যথা সারবে কী করে?’
‘আরে ধুর বাদ দাও তো। একা একাই সেরে যাবে।’
‘এমনি এমনি কি করে সারবে? তোমার ওই এক বদ অভ্যাস ওষুধ আনবে, কিন্তু তা ঠিকমতো খাবে না।’
‘কী ধরনের ওষুধ ভাবো একবার? মনে হচ্ছে যেন এক ধরনের মদ।’
‘কিন্তু তুমি তো ভালোই জানো ইংরেজদের তৈরি ওষুধে অ্যালকোহল থাকে।’
‘নিকুচি করি তোমার ওই ওষুধের।’
বোতলের গায়ে ওষুধের দাগকাটা দেখে ডা. রাথোরের বউ বলল, ‘এত বড়োবড়ো ডোজ?’
রাথোর বলল, ‘সমস্যা তো ওখানেই।’
‘একে এখন আর সমস্যা বলে গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহর নাম নিয়ে খেয়ে ফেলো। কতটুকু পানি মেশাতে হবে বলো?’ স্ত্রীর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে বিষণ্ন বদনে ডা. রাথোর বলল, ‘পানিতে হবে না। সোডা ওয়াটার লাগবে। বড়-ই অদ্ভুত ধরনের ওষুধ এটা।’
‘তাহলে তো প্রেসক্রিপশনে সোডা ওয়াটার কথা লেখা উচিত ছিল, তোমার লিভারে সমস্যা হতে পারে।’
‘আল্লাহ্ জানেন সমস্যা হবে কি হবে না!’
একটা ডোজ গ্লাসে ঢেলে ডা. রাথোর বলল, ‘আল্লাহর দোহাই এ ওষুধ আমি খেতে পারব না।’
তার স্ত্রী সোহাগভরে স্বামীর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘সে কী কথা প্রিয়, এ ওষুধ তোমাকে খেতেই হবে। ওষুধের গন্ধ শোঁকার দরকার কী তোমার, নাক-মুখ বুজে পান করে নাও। এভাবেই তো আমি জ্বরের তেতো ওষুধ কোঁত করে গিলে ফেলি...।’

মেজাজ খারাপ করার ভানের ভেতর দিয়ে ডা. রাথোর সন্ধ্যার প্রথম ডোজটি মুখে ঢেলে দিলো। স্ত্রী তাকে উৎসাহিত করতে পিঠ চাপড়ে বলল, ‘আর পনেরো মিনিট পরে আর এক ডোজ খেও। আশা করি শিগগিরই তোমার বিচ্ছিরি ধরনে মাথাব্যথাটা কমে যাবে।’
ডা. রাথোর এতো আন্তরিকতার সঙ্গে পুরো ভান-ভনিতার কাজটি সম্পন্ন করল যে, তার কাছে মনেই হলো না সে হুইস্কি পান করছে। কিন্তু নেশার ঘোর যখন লাগল—আপন মনে হেসে উঠল রাথোর। পুরো ব্যাপারটা ছিল সুখের। ঠিক পনেরো মিনিট পরে তার সোডা মেশানো পানীয়ের দ্বিতীয় ডোজের গ্লাস স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘এখন খেয়ে দেখো, আগের মতো বাজে গন্ধ পাবে না।’
ডা. রাথোর গ্লাস হাতে নিয়ে মুখবিকৃত করে বলল, ‘তুমি খেলে বুঝতে পারতে কি বিচ্ছিরি আর বদগন্ধওয়ালা এই পানীয়। শুঁকে দেখো, একেবারে খাঁটি মদের গন্ধ বেরুচ্ছে।’
‘তুমি তো দেখছি আমার মতোই জেদি।’
‘নাসিমা, বিশ্বাস করো—আমি জেদিও নই, একগুঁয়েও নই। এসব হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। থাক, বাদ দাও।’
একথা বলে ডা. রাথোর সন্ধ্যার দ্বিতীয় পেগ পান শেষ করল। 
সব মিলিয়ে তিন পেগ খেলো। একটু ভালো বোধ করল সে। তবে মাথাব্যথা দেখা দিলো পরের দিন। সে স্ত্রীকে বলল। ‘ডা. সৈয়দ রজমান আলি শাহ্ বলেছেন, তার অসুখটা সারতে সময় লাগবে। ওষুধটা নিয়মিত সেবন করতে হবে। খোদাতালা জানেন এই অসুখের কী নাম তিনি দেবেন। তিনি হয়তো বলবেন, ‘সাধারণ মাথাব্যথা হলে দুই ডোজেই সেরে যেত। কিন্তু তোমার রোগটা একটুখানি সিরিয়াস।’
এ কথা শুনে নাসিমা বলল, ‘এই ওষুধ তোমাকে নিয়মিত সেবন করতে হবে।’
‘পারব কিনা জানি না। তুমি সময়মতো আমাকে ঢেলে দিলে কোনোমতো গলায় চালান করে দিতে পারব হয়তো।’
নাসিমা সোডা মিশিয়ে ডোজটা স্বামীর হাতে তুলে দিলো। পানীয়ের দুর্গন্ধ তার নাকে যেতেই বমি পেতে লাগল নাসিমার। পাছে তার স্বামী তা বুঝে গিয়ে ওষুধ খেতে অস্বীকার করে বসে এ কারণে সে তার চোখে-মুখে কোনো অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা থেকে বিরত রইল। বউয়ের পীড়াপীড়িতে রাথোর তৃতীয় ডোজ পান করে নিলো। স্বামী তার কথা যথাযথভাবে পালন করছে বলে শান্তি পেল নাসিমা। সে এমন একজন মানুষ কদাচিত তার কোনো কথা সে শোনে।
এভাবে অনেক দিন অতিক্রান্ত হলো। রাথোর নিয়মিত পান করে চলে স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে। তার এই কৌশল কাজে লেগেছে বলে ভারি খুশি ডা. রাথোর। এখন আর বন্ধুদের ভয়ে ভীত নয় সে। সন্ধেটা তার ঘরেই কাটে। আয়েশ করে মদ খেয়ে ম্যাগাজিন পড়ে। পনেরো মিনিট পরে স্ত্রী তাকে দ্বিতীয় ডোজ পরিবেশন করে। অতঃপর তৃতীয় ডোজ তার পনেরো মিনিট পরে। স্বামীকে জিজ্ঞেস করারও দরকার হয় না। ডা. রাথোর খুবই সন্তুষ্ট। মদ্য পানের এই রীতি আর রুটিন স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই খুশি। এ-ভাবে অনেক দিন কেটে যায়।
এক সন্ধ্যায় ডা. রাথোর পুরো একটা বোতল নিয়ে বাড়িতে ফেরে। বোতলের লেবেল তুলে ফেলে স্ত্রীকে বলে, ‘ওষুধের দোকানদার আমার বন্ধু মানুষ। সে বলেছে—তুমি তো রোজ তিন ডোজ খাও। ভেঙে ভেঙে কিনলে খরচ বেশি পড়বে। তারচেয়ে পুরো এক বোতল নিয়ে যাও। ছোট একটা বোতলে ঢেলে নিয়ে তিন ডোজ করে খাবে, সাশ্রয় হবে।’
একথা শুনে খুশি হলো নাসিমা। ভাবল ভালোই তো টাকা বাঁচবে। অর্থের সাশ্রয় হবে বলে ডা. রাথোরও খুশি, আট টাকায় গোটা এক বোতল কেনা যায়।
একদিন মেডিক্যাল কলেজ থেকে ফিরে ডা. রাথোর দেখল তার বউ বিছানায় শুয়ে আছে। তাকে ডেকে সে বলল, ‘নাসিমা খাবার লাগাও টেবিলে, বড্ড খিদে পেয়েছে।’
একথার জবাবে অদ্ভুত আচরণ করল নাসিমা। বলল, ‘খাবার দেবো? কেন, খাবার তো তুমি খেয়েই ফেলেছ?’
‘কী বলছ প্রিয়ে? কখন খেলাম?’
‘আরে, মিথ্যে বলছ কেন? আমি নিজে তোমাকে খাবার বেড়ে দিয়েছি!’
হতভম্ভ ডা. রাথোর বলল, ‘কখন দিলে খাবার বেড়ে, আশ্চর্য কথা। সবেমাত্র কলেজ থেকে ফিরলাম।’
একটা দীর্ঘ হাই তুলে নাসিমা বলল, ‘এমন মিছে কথা বলতে পারলে? আজ তো তুমি কলেজেই যাওনি।’
হাসল ডা. রাথোর। ভাবল বউ ঠাট্টা করছে তার সঙ্গে। ‘এই, ওঠো তো। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে,’ বলল সে। নাসিমা টেনে টেনে বলল, ‘না আ আ আ। মিথ্যে কথা। আমরা একসঙ্গেই খেয়েছি একটু আগে!’
‘এই কখন খেলাম আমরা? সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু। যাও, খানা লাগাও।’
বউয়ের হাত ধরে তাকে ওঠানোর চেষ্টা করে ডা. রাথোর বলল, ‘আল্লাহর কসম, সাংঘাতিক খিদে লেগেছে আমার। পেটের ভেতর ছুঁচোর নৃত্য চলছে।’
কলকল করে হেসে নাসিমা বলল, ‘ছুঁচো। বেশ তো পেটভরে ছুঁচোই খেয়ে নাও তাইলে।’ 
অবাক-বিস্ময়ে ডা. রাথোর বলল, ‘প্রিয়ে, তোমার কী হয়েছে? এমন অদ্ভুত আচরণ করছ কেন?’
ব্যাপারটা সিরিয়াস একটা পর্যায়ে চলে যাচ্ছে ভেবে নাসিমা নিজের কপাল টিপে ধরে বলল, ‘জানো ওওও, আমার না ভীষণ মাথাব্যথা আ আ আ করছে... তাই তোমার ওষুধের বোতল থেকে দুই ডোজ ঢেলে খেয়ে নিয়েছি। বেশি না; মাত্র দুইইইই ডোজ। ইঁদুর, নাকি ছুঁচোর কথা বললে? বড্ড জ্বালাতন করছে আমাকে কে কে কে। এই, ওদের মারার জন্যে কটা বড়ি নিয়ে এসো। প্লিজজজজ...। খিদে লেগেছে? একটু দাঁড়ওওওওও। বেড়ে দিচ্ছিইইইই....’
ডা. রাথোর কখন শুধু একটা কথাই বলতে সক্ষম হলো, ‘যাও, ঘুমিয়ে পড়ো গে। আমি খেয়ে নিয়েছি। শিগগির যাও।’
কলকল করে হেসে উঠে নাসিমা বলল, ‘দেখলে তো? আমি কোনো মিথ্যে বলিনি। কী, বলেছি?’
ডা. রাথোর পাশের ঘরে গিয়ে সেদিনের জমিদার নামের সংবাদপত্রের পাতা ওল্টাতেই দেখল সেখানে লেখা—ডাক্তার রাথোরের ওপর ‘স্বর্গীয় ক্ষমার ফুল বর্ষিত হয়েছে।’ নিচেই ছোট্ট একটা খবর : প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির অভিযোগে পুলিশ ডাক্তার রাথোরকে গ্রেফতার করেছে।
গোলাম রসুল ওরফে ডাক্তার রাথোর ভাবল—স্বর্গীয় ফুল তার ওপরও বর্ষিত হয়েছে!...

/জেডএস/
খেলাধুলা পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে: মেয়র আতিক
খেলাধুলা পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে: মেয়র আতিক
আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের লিভ টু আপিল খারিজ
আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের লিভ টু আপিল খারিজ
বৃষ্টির আগে সূর্য-গিলের বারুদ ঠাসা ব্যাটিং
বৃষ্টির আগে সূর্য-গিলের বারুদ ঠাসা ব্যাটিং
বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না, ঢাকায় নেমে রওশন
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশবিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না, ঢাকায় নেমে রওশন
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী