ইব্রাহিম শুনতে পেল, ‘বাবা একটা দুষ্টুলোক… হা করো, হা করো… বাবার মতো দুষ্টুলোক হবা না, আমি দুষ্টুলোক পছন্দ করি না।’
খুকুর কাছে দুষ্টুলোক মানে ভয়াবহ কিছু। কতটুকু ভয়াবহ—তার রূপকথার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সেইসব লোকজন, যারা ছোটবাবুদের ধরে নিয়ে হাত-পা-চোখ বিক্রি করে দেয়। পুলিশও যাদের খুঁজে পায় না।
মাত্রই দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে দিলো মিলি, দরজার উপর ছিল ইব্রাহিমের প্যান্ট ও টিশার্ট, তা এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে ডাইনিংয়ে ফিরে গেল। ইব্রাহিম ভাবল, দরজা আটকানোর হেতু কী? সে যেখানে বসেছিল সেখান থেকে তাকে দেখারও তো কথা না।
কিছুক্ষণ আগে মিলির ডান হাতে মাখাভাত, বাম হাতে মেয়ের গেঞ্জি খুলছিল, ইব্রাহিম কাছে গিয়ে গেঞ্জি খুলে দিতে সাহায্য করল, আর মিলি ঝামটা দিলে বলল, ‘আমি খুলে দিচ্ছি দেখো না?’
‘দিচ্ছ, কিন্তু আমি হেল্প করলে কী ক্ষতি!’ ইব্রাহিম তাকিয়ে দেখল মিলির চোখ, জ্বলছে, চিরাচরিত মেজাজখারাপ-ক্রুদ্ধ ও নিরানন্দ চেহারায় দুটি সার্চ লাইট যেন। তার শাশুড়ির কথা মনে পড়ল, যার একই চেহারা, যিনি চিরদিন ডিপ্রেস্ট ও মেজাজখারাপ নিয়ে বেঁচে থাকার পণ করে আছেন।
ইব্রাহিম বছরের পর বছর মিলির রূঢ় ব্যবহারের সামনে চুপ থেকেছিল, কোনো জবাব দিতে যায়নি, নিজের সহ্য ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মেডিটেশন করত ও ইউটিউবে মোটিভেশনাল স্পিচ শুনত। এখন সে বুঝতে পারে না, মিলির খারাপ ব্যবহারের ঝাঁঝ কিছুটা কমেছে, নাকি তার বোধি প্রাপ্তি হয়েছে!
বিকালে সে ডিপসিককে তাদের দাম্পত্য, বিশেষ করে মিলির রূঢ় ব্যবহার এবং সংসার খরচে মিলির পয়সা না দেওয়ার বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করল। এর আগেও সাইক্রিয়াটিস্টের সঙ্গে মিলির ব্যাপার নিয়ে কথা বলেছিল, মিলি একবার নিজ থেকে বলেওছিল তাকে সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যেতে, কিন্তু বাস্তবে নিজের পাণ্ডিত্যের উপর অগাধ মুগ্ধতা ও অহংকারের কারণে সে কারো কথা শুনবে তা হতে পারে না—তাই তাকে আর নিয়ে যাওয়া যায়নি। দুইএকবার মনে করিয়ে দিতে গেলে সে মুখ ঝামটা মেরে বলেছিল, ‘ডাক্তারের কাছে তোমার যাওয়া লাগবে তুমি যাও। ’
ডিপসিককে ইব্রাহিম বলেছিল, এখন থেকে ধমকের বিপরীতে ধমক দেব, চিৎকারের বিপরীতে চিৎকার করব, গালির বিপরীতে গালি। এই ভাবনার ফল কী হবে তা ডিপসিক বলেছিল। তবু ইব্রাহিম চুপ না থেকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পছন্দ করছে এই যুক্তিতে যে, আর না!
সে জানে বাবা-মায়ের এমন সম্পর্কের কারণে সন্তানরা উচ্ছন্নে তো যাবেই, যায়ই। আর কোথায়ই বা সেই গৃহ যেখানে আছে অবিরাম প্রেম ও মাধুর্য!
রাতের ওই দৃশ্যটুকু ইব্রাহিমের ভবিতব্যে জমেছিল। শুক্রবার থেকেই মিলি ঘ্যান ঘ্যান করছিল শনিবার বাচ্চাদের নিয়ে নৌকায় ঘুরবে, ইব্রাহিমের সম্মতিও ছিল, কিন্তু শনিবার সকালে অফিস থেকে টেক্সট পেল বিকালে অফিসে যাওয়ার। টেক্সটকে বসের অনুরোধ শব্দটি ছিল বলে সে দুঃখিত বলে নিজের অপারগতার কথা না বলে লিখল, আচ্ছা। মিলি বলেছিল, ‘আমি ফোন করে তাকে বলব তুমি যেতে পারছ না?’ ইব্রাহিম দুপুরের খাবার খেতে বসেছিল, সে বলল, ‘আমি বললেই পারি, কিন্তু এই সময়ে অফিসের ব্যাপার ইগনোর করতে চাই না।’ যথারীতি মিলি চটে গেল। ইব্রাহিম প্রতিউত্তরে খুকুর মগটি ফ্লোরে আছড়ে ফেলে বলল, ‘বৃহস্পতিবার বুধবার কী করেছিলে? তখন যেতে চাওনি কেন?’ মিলি গলা চড়িয়ে বলল, ‘আমার অফিস ছিল না? যাব কীভাবে?’ ইব্রাহিম ততোধিক গলা চড়িয়ে বলল, ‘তোমার অফিস আছে আমার নাই? আমি কি ছুটির দিনে মাগি বাড়ি যাচ্ছি?’
ইব্রাহিম খাওয়া ফেলে অফিসে গেল, ইচ্ছে ছিল খাওয়ার পর একটু ঝিমিয়ে নেওয়ার।
অফিসে কোনো কাজ ছিল না, বসের সামনে বসে এক কাপ চা খেতে না খেতেই বস বলল, ‘চলো চলো গ্যালারিতে যাই। না গেলে হারুণ ভাই…।’ ইব্রাহিম স্পষ্ট নয় আজ গ্যালারিতে কী। সে বসের গাড়িতে না উঠে নিজের মোটরবাইকে নিল। কলিগ হিমু যেতে চাইল না, সে তাকে জোরাজুরি করে রাজি করাল।
শ্রাবণ মাসে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি। এখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি নামছে। সে হিমুকে বলল, ‘বৃষ্টির মধ্যে যাব?’ হিমু বলল, ‘আরে চলেন চলেন। এই বৃষ্টিতে ভিজবেন না।’
মিলি ওদের নিয়ে নৌকায় বেড়াতে গিয়ে থাকলে ঝড়বৃষ্টি কোন বিপদ যে ডেকে আনে! কেউ সাঁতারও জানে না।
গ্যালারিতে মিনিট পাঁচেক থেকে বস কিছু সেলফি তুলে বললেন, ‘হাজিরা দেওয়া শেষ। চলো, চলে যাই।’
বৃষ্টি একটু বাড়ছিল। তবুও সে না থেমে বাসায় ফিরে নিভন্ত বিকাল ও দীর্ঘ সন্ধ্যা আরাম চেয়ারে নগ্ন হয়ে বসে বসে ভাবছিল, কত মানুষ গুম হয়ে যায়, নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, তাদের মধ্যে স্বেচ্ছায় কেউ কি লুকিয়ে থাকে না! কোনো পাহাড়ের কোলে বা সমুদ্রের পাড়ে দেহাতি মানুষের মতো কেবল বেঁচে থাকে না!
রাতে খুকুকে তার বিছানায় শুতে আসতে দেখে সে বলল, ‘চলো আজ মজার মজার গল্প বলব।’ কিন্তু খুকুর আশানুরূপ উৎসাহে সে গানওয়ালা গল্প বলতে পারছিল না। ভেতর থেকে তার মনটা দমে গেছে। খুকু আস্তে করে বলল, ‘তুমি মা-র সঙ্গে অমন করলে কেন?’ সে উত্তর দিলো না। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘আজ খুবই ছোট ছোট গল্প বলার কম্পিটিশন। আগে ভাইয়া বলবে, তারপর তুমি, শেষে আমি।’ খুকু এই প্রস্তাব মানতে রাজি না, সে গানওয়ালা লম্বা লম্বা গল্পই শুনতেই চায়। তবু সে বলল, ‘এক বনে ছিল দুই পশু। একটা জিরাফ, একটা হরিণ। তারা কেউ কারো বন্ধু না। শেষ।’
ইব্রাহিম বলল, ‘এক বাড়িতে ছিল দুইজন লোক। একজন গান গাইতে পছন্দ করে, আর একজন নাচতে। কিন্তু যে গাইতে পছন্দ করে সে চোখে দেখে না, আর যে নাচতে পছন্দ করে সে কানে শোনে না। শেষ।’
খোকা এই গল্পের ব্যাখ্যা করতে বসলো। খুকুর তাতে মন নেই। ড্রইং রুমে আলো জ্বলতে দেখে সে মা মা বলে চিৎকার জুড়ে দিলো।
ইব্রাহিম মধ্যরাতে মিলির আগুন নেভানোর কোনো চেষ্টা করল না। নিজ থেকে এখন সে তা করেও না। মিলিও নিশ্চয়ই আশা করেও ছিল না। ইব্রাহিম প্রায় ঘোষণা দিয়েই বলেছিল, ‘আমি কুইট করলাম।’ যদিও সে তার কামনার সমস্ত তাণ্ডব নীরবে সহ্য করে যায়, মিলি মাসে দুইবার বা মেরেকেটে তিনবারের বেশি সাড়া দেয় না। এ মাসে দুইবার ঘুমন্ত ইব্রাহিমের কাছে এসে নিজের চিমসে বুকের উপর তার হাত টেনে নিয়েছিল। ইব্রাহিম স্বপ্ন-জাগরণ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার মধ্যে গাড়ির সঙ্গে ঘোড়া জুড়ে দিয়েছিল, মিলির মুখটা মনেও করতে পারছিল না, চাইছিলও না।
ইব্রাহিম সন্তানদের দিকে তাকালে কেবল নিজেকেই দেখে, এরাও ব্যর্থ দাম্পত্যের ভেতর নিজেকে পিষে পিষে মারবে।
খোকা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা বিয়ে মানে কী?’ সে বলেছিল, ‘বিয়ে হচ্ছে গোলকধাধার মধ্যে একটি গতিশীল গাড়ি, যার কোনো বেকিং সিস্টেম নাই।’
খোকা বলল, ‘মানে ব্রেকলেক কার? তাহলে তো শুধু অ্যাকসিডেন্ট করবে।’
ইব্রাহিম জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, বারবার অ্যাকসিডেন্টের মধ্যদিয়ে আমাদের জন্ম ও জন্মের ওপারে যাত্রা।’ এর অর্থ খোকা কতটা বুঝলো বোঝা কঠিন, সে বছরখানেক আগেই ঘোষণা দিয়েছিল বিয়ে না করার, সে কথাটাই পুনরাবৃত্তি করলো।
ইব্রাহিম পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বলল, ‘বিয়ে নিয়ে একটা জোকস বলি: বিয়ে হচ্ছে পাবলিক টয়লেটের মতো, ভেতরে যে আছে সে বের হওয়ার জন্য অস্থির, আর বাইরে যে আছে সে টয়লেটের ভেতরে যাওয়ার জন্য অস্থির।’









