১.
সুগন্ধ। সুঘ্রাণ। কস্তুরী মৃগের ঘ্রাণ। জাফরান ফুলের কিংবা ভ্যাম্পায়ার ব্লাডের সুবাস—পৃথিবী থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে বলে বোধহয় আমার; প্রথম প্রথম। কিন্তু কিছুদিন পর খেয়াল করলাম, ঘ্রাণ তার ঘ্রাণের জায়গাতেই আছে, বহাল তবিয়তে, আমিই কেবল কোনো কিছুতেই কোনোরকম সুগন্ধ পাচ্ছি না। এমন নয় যে ঠান্ডা লেগে নাকের কপাট বন্ধ বা করোনা হয়েছে। কেননা দুর্গন্ধ ঠিকই সিঁধেল চোরের মতো মাংস খুঁড়ে খুঁড়ে নাসারন্ধ্র দিয়ে সমস্ত মগজে ঢুকে পড়ে, আগের চেয়েও তীব্রভাবে। হেন বাজে গন্ধ নেই যা আমি পাই না। মানুষের প্রসাব, পচা ডিম, বাসি তরকারি থেকে শুরু করে মুখের চারপাশে ভনভন করে ঘুরতে থাকা নীল ডুমো মাছির গায়ের অতিশয় সূক্ষ্ম দুর্গন্ধও আমার নাক এড়িয়ে যেতে পারে না।
দিন দশেক হলো এই অবস্থা চলছে, সমানতালে। কোনো অদ্ভুত অসুখ নাকি এটা? শারীরিক নাকি মানসিক? ক্যানসার? সিজোফ্রেনিয়া?
না, না, তা কেন হতে যাবে! সকালে ভরপেট খেয়ে অফিস যাওয়া থেকে শুরু করে রাতে ফিরে আদর্শ স্বামীর কর্তব্য পালন—সবই তো চলছে ঠিকঠাক আগের মতন। তবে?
কারো কারো মনে হতে পারে এ এমন কোনো গুরুতর সমস্যা নয়। এ শহরটাই যেখানে ময়লা ফেলার ভাগাড়, যেখানে মানুষ নয়, চারপাশে ঘুরে বেড়ায় অগণিত অপচ্ছায়া, সেখানে সুঘ্রাণের মনোমুগ্ধকর মজমা বসবে—এমনটা আশা করা সেরেফ আহাম্মকি।
কিন্তু আমার বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করেন। কিঞ্চিৎ সংবেদনশীল মনে, উৎকট হিংসাকে সামান্য চাপা রেখে যদি অনুভব করেন আমার বেদনা, নিশ্চিত চমকে উঠবেন।
আর যদি না ওঠেন, তাহলে খুলেই বলি—দিন দশেক আগেও অফিস সেরে বাসায় ফিরে বউয়ের মুখখানা দেখলে সারাদিনের জমানো ক্লান্তি সব উবে যেত। হুরপরীর মতো, কিংবা আরব্য রজনীর শেহেরজাদীর মতো সুন্দরী এই আমার বউয়ের শরীর থেকে আসা জেসমিন ফুলের সুবাসে মেজাজ প্রফুল্ল হয়ে উঠত নিমেষেই।
তারপর ফ্রেশট্রেশ হয়ে যখন খেতে বসতাম, মনে হতো খোদা আমার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। নইলে আমার মতো সাধারণ এই মানুষের কপালে কেমন করে জুটে যায় এমন লক্ষ্মীমন্ত রূপবতী নারী যার রান্নার হাতও অন্য দুনিয়ার।
সামান্য আলু, ফুলকপি আর সিমের সঙ্গে তেলাপিয়া মাছের তরকারিও এত সরেস হতো। জিরা আর ধনিয়ার পরিমিত ঘ্রাণের সঙ্গে মাছের স্বাদ জিভজুড়ে জলকেলি করত।
বউ জিজ্ঞেস করত, কেমন হয়েছে রান্না?
খাবারের প্রতিটা কণা উপভোগ করতে করতে বলতাম, ফার্স্ট ক্লাস!
আরো কিছু বলো প্লিজ।
রান্নাটা মনে হচ্ছে প্রাচীন মিশরের কোনো শেফের তৈরি। তাও ধরো যে সে শেফ না, একদম রাজদরবারের শেফ। ফারাও তুতেনখামেন এই যে এক টুকরো ফুলকপি মুখে দিয়েই বলবে—আহা! খাসা রেঁধেছ! যাও তোমাকে মুক্ত করে দিলাম। সঙ্গে এনাম দুই হাজার স্বর্ণমুদ্রা।
তুমি না! তুমি একটা মিথ্যেবাদী। কী সব যে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলো!
সুখে বউয়ের মুখটা আদুরে হয়ে উঠত। পাপড়িতে ভরা দু'চোখ থেকে ছড়িয়ে পড়ত শীত শীত ভোরের এক মগ দার্জিলিং চায়ের সুঘ্রাণের মতো শান্তি।
আর বউয়ের সঙ্গে রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হতো ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি দরজা আমার খুলে যাচ্ছে বেহেশতের বাতাসে। ওর ঠোঁটে চুমু খেলে আমার মুখে ধাক্কা মারত ব্রাজিলিয়ান কড়া কফির স্বাদ। বুকে নাক ঘষলে মস্তিষ্কে জ্বলে উঠত হাভানা চুরুট।
সে এক দিন ছিল। আনন্দের মন্দির, সুখের মসজিদ, শান্তির গির্জা—সব তার শরীরে খোদাতা'লা গড়ে দিয়েছিলেন, যেখানে পাগলামির ঘনিষ্ঠ নাচ তিনি উদারমনে উপভোগ করতেন।
সেইসব সৌরভময় দিন উবে যাওয়ার আজ দশদিন হলো।
২.
এখন দুর্গন্ধই আমার প্রাণবায়ু। দুর্গন্ধই আমার আফ্রোদিতি। রক্তে দুর্গন্ধ, পাথুরে স্মৃতিতে দুর্গন্ধ। দুর্গন্ধ কলরবমুখর, কোলাহলময়।
আমি মানুষের মনের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে কিলবিল করতে থাকা কৃমির দুর্গন্ধও এখন নিখুঁতভাবে শুঁকে উঠতে পারি। এই যেমন মাঝারি মানের একটি দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক হবার সুবাদে যে প্রভাবশালী লেখকের নিম্নমানের গল্প-কবিতা আমাকে ছাপতে হয়, তা থেকেও পাই এক অনন্য দুর্গন্ধ।
লেখক সাহেব ফোন করলেন সন্ধ্যায়; আমি অফিসে আমার ছোট্ট কামরায় ঝিমুচ্ছিলাম।
লেখক মাহমুদ জলিল মূলত বালুর ব্যবসা করেন। ওঠাবসা মন্ত্রীদের সঙ্গে। লেখালেখি তার আহ্লাদের কাজ। জিজ্ঞেস করলেন, গল্পটা পাঠালাম বেশ কয়েকদিন হলো। এখনও তো ছাপলেন না। আপনার কি পছন্দ হয়নাই?
কোন গল্পটা?
আরে, 'হাজেরার দুঃখের বাসর' গল্পটা।
ঠান্ডা গলায় বললাম, দেখছি দাঁড়ান।
হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে লেখক সাহেবকে লাইনে রেখেই কম্পিউটারের পর্দা খুললাম। মাউসের কয়েক ক্লিকে বের হলো 'হাজেরার দুঃখের বাসর'। গল্পটা যেদিন পাঠিয়েছিলেন উনি, সেদিনই পড়েছিলাম। হাজেরা নামের এক তরুণীকে বাসর রাতেই স্বামীপ্রবর নগ্ন করে বুকে পিঠে বিড়ির ছ্যাঁকা দেন, এরকম বর্ণনা দিয়ে শুরু। তবু অবলা মেয়েটি স্বামীর সংসার করতে থাকে, ঝাঁটা-জুতোর ঠ্যাঙানি খায় নিয়মিত, এবং নিঃশব্দে কাঁদে; আর এ নিয়ে ন্যারেটিভে লেখক মশাইয়ের আবেগে থলোথলো উক্তি। যেমন, 'নারী কেবলই সয়ে যায়। নারীকে সয়ে যেতে হয়। পুরুষরা বোঝে না নারীর দুঃখ। নারী হলো মায়ের জাত। নারীকে প্রত্যহ প্রহার করা কি উচিত? একদমই নয়। নারীকে ভালোবাসতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। যে পুরুষ নারীর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি ঝরায়, সে পুরুষের একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদণ্ড।'
তারপর গল্পে দেখা যায় এই মহাবিশ্বের মহৎ পুরুষদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে লেখক নিজে ওই পাষণ্ড পুরুষটির কাছ থেকে হাজেরাকে ছাড়িয়ে এনে নিজেই বিয়ে করে নেন, এবং তাকে প্রচণ্ড সুখী করেন। গল্পের শেষ দুইপাতা জুড়ে হাজেরাকে সুখী করতে লেখক কত কী আত্মত্যাগ করেছেন তার বিস্তৃত বর্ণনা।
লেখক সাহেবকে লাইনে রেখেই শেষঅংশ আবার জোরে জোরে পড়লাম। নিয়ন্ত্রণহীন অট্টহাসি, হোৎকা মোটা কোনো লোকের কলার খোসায় পা পিছলে পড়ার মতো ঝপাটে দন্তকপাটি খুলে বের হয়ে এলো আমার। ফোনের ওপাশ থেকে মাহমুদ জলিল আর্তনাদ করে ওঠেন, এ কি! আপনি হাসছেন কেন! আমি তো কোনো হাসির গল্প লিখিনি।
আসলেই তো। আমি হেসেছি কেন? গল্পটা কিছু হয়নি বলে? দুর্বল ভাষাভঙ্গি বলে? না, কারণ অন্য। হেসেছি মাহমুদ জলিলকে কাছ থেকে চিনি বলে। এই সেদিনও ফিচার সেকশনের লতিফ ভাইয়ের ডেস্কে আমরা ক'জন মুড়ি-পিঁয়াজুমাখা খেতে খেতে গল্প করছিলাম লোকটার লাম্পট্য নিয়ে। রেগুলার মদ খেয়ে বউ পেটানো নিয়ে। ব্যক্তিগত আড্ডায় তার নারী বিদ্বেষী মন্তব্য করা নিয়ে।
অথচ এই একই লোক লিখেছেন আবার নারীর প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার গল্প। অবশ্য ফিচার সেকশনের লতিফ ভাই এখন থাকলে বলতেন, যায়া দ্যাখো এ বান্দা নতুন কোনো কচি মেয়েকে পটাইতে লিখছে এইটা।
আপনি চুপ করে আছেন কেন ভাই? কোনো সমস্যা?—ঈষৎ চড়া গলায় বললেন মাহমুদ জলিল। ভাবনার জল ছানাছানি রেখে আমি সচেতন হই। হঠাৎ নাকে এসে লাগে পচা মগজের গন্ধ। এ আমার চেনা। একদা একটি নিদারুণ গল্প লেখার জন্য মর্গে মর্গে ঘুরে ভাব জমিয়েছিলাম ডোমদের সঙ্গে। তখন এই বিশেষ দুর্গন্ধটিকে কিয়ৎকাল নাকে ঠাঁই দেবার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছিল। এখন মনিটরের উজ্জ্বল পর্দা থেকে ভুরভুর করে বের হচ্ছে মানুষের পচে যাওয়া মগজের গন্ধ। এই উৎকট গন্ধে মেজাজ খিঁচড়ে গেল। বললাম, আপনার গল্পের নামটা আমার পছন্দ হয় নাই।
ওহ, নাম দেখে আপনি হাসছিলেন? তাহলে নাম চেঞ্জ করে দেন। যদিও 'হাজেরার দুঃখের বাসর' নামটা আমার বেশ পছন্দের।
নতুন কী নাম দেয়া যায় তা ভাবতে মিনিট দুয়েক সময় মাহমুদ জলিলের কাছ থেকে বিনয়ের অবতার হয়ে চেয়ে নিয়েছিলাম।
দু'মিনিটের জায়গায় তার দ্বিগুণ সময় পার করে অপরপ্রান্তের নৈঃশব্দ্য ভাঙতে অবশেষে কোমল গলায় ডাকলাম, লেখক সাহেব।
হ্যাঁ। বলেন, বলেন। তা কী নাম পেলেন শেষমেশ?
ভাবছি গল্পটার নাম 'হাজেরার দুঃখের বাসর' এর বদলে 'হাজেরার গুহ্যকেশের বাসর' হলে কেমন হয়?
মানে! মানে কি এর!
আচ্ছা তাহলে আরেকটু সহজ নাম দিই লেখক সাহেব। এ গল্পের নাম হোক 'হাজেরার বালের বাসর'।
কী! কী বললেন! ইউ ব্লাডি রাস্কেল।
উত্তেজিত লেখক সাহেবের কথা আটকে গেছে, মনে হচ্ছে খাবি খাচ্ছেন। আমি ফোনটা ফট করে কেটে দিলাম।
৩.
দুর্গন্ধের প্রকটতা থেকে খানিকটা বাঁচতে সাহিত্য সম্পাদকের চাকরিটা গোল্লায় যেতে দিয়েছি। বালু ব্যবসায়ী কাম লেখক মাহমুদ জলিলের গল্পটা ছাপাইনি বলে পত্রিকার সম্পাদকের কামরায় তলব ঘটে।
আমার বস বললেন, তোমার জন্য স্যার আমাকে হেভি বকাঝকা করলো কিফায়েত।
(স্যার হচ্ছেন এ পত্রিকার মালিক—মানিক মোহাম্মদ কায়ছান।)
আমি চুপ করে আছি দেখে বস এবার ঝাঁজের সঙ্গে বলেন, তুমি যার লেখা রিজেক্ট করলে জান সে কে?
জানি, আপনার স্যারের বন্ধু।
তো জানলে এ কাজ করলে কেন? এ কেমন ধৃষ্টতা তোমার!
ওনার গল্পটা কিছুই হয় নাই।
তো? খুব সাহিত্যবোদ্ধা হয়ে গেছ দেখি! তুমি নিজে পারো কিছু লিখতে? নিজের লেখা লবডঙ্কা, এসেছে আরেকজনকে জাজ করতে।
সম্পাদক সাহেবের আপেলের মতো লাল সাদা মুখ থেকে একসময় এলাচ লবঙ্গের সূক্ষ্ম মিষ্টি একটি ঘ্রাণ পাওয়া যেত, কাজের ফাঁকে ফাঁকে উনি এসব চিবুতেন। কিন্তু আজ ভুরভুর করে তার গা থেকে বের হচ্ছে বাংলা মদের গন্ধ।
আমার পেট ভীষণ উথলে উঠলে অনায়াসে তার বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপর নাড়ি উলটেপালটে বমি করে দিলাম। তারপর সেদিনই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে একটু সুঘ্রাণের আশায় নিজের একান্ত ছোট বাসাটায় বউয়ের কাছে ছুটে এলাম। কিন্তু বউ আমাকে হতাশ করল। এখন ওর শরীরে কেবল বাসি ঘামের দুর্গন্ধ ছাড়া আর কিছু নেই। বউকে বলি, গায়ে একটু সেন্ট মেরে আসো তো।
বউ তেঁতে ওঠে, কেন? এভাবে আমাকে আর ভালো লাগছে না, না? তুমি তো আগে আমার ন্যাচারাল ফ্রেগরেন্সই পছন্দ করতে।
হুম। তা করতাম। কিন্তু এখন কেমন যেন পারছি না বউ।
তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না।
বিষয়টা আসলে এমন নয়।
বিষয়টা এমনই। বউয়ের কণ্ঠে হতাশা চিড়বিড় করে।
আশাহত আমি মন খারাপি কমাতে বিশাল ডায়েরিটা খুঁজে বের করি ট্রাংক খুলে। নিজের পুরোনো দিনলিপি পড়লে আমাদের মতো এলেবেলে মানুষদের মন ভালো হয়ে যাবার একটা সম্ভাবনা থাকে।
আজকে সম্পাদক সাহেব বলেছেন আমি নাকি লিখতে পারি না। অথচ একসময় শিকলবাহা নদীর মত আমার কলম থেকে তড়তড়িয়ে গল্প কবিতার প্রবাহ ছুটত। ডায়েরির পাতা ওলটাতে ওলটাতে দশ বছর আগের একদিনের দিনলিপিতে চোখ লেপ্টে গেলো আমার— "কী হচ্ছে, কী হবে, উঁচু হবে না নিচু হবে—তা নিয়ে ভাববার সময় নেই কোনো, কেবল লিখতে হবে; কোদাল দিয়ে মাটি কোপাতে কোপাতে। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সব ভাঙতে ভাঙতে। লেখার কোনো ছাঁচ লাগে না, ভাবনা লাগে না। জন্মে যা পেয়েছি মাতৃমুকুর হতে, তাতেই চলবে। লিখব বাসে, বাজারে। টয়লেটে কিংবা বেশ্যার ঘরে। লেখার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা কিংবা সময় প্রয়োজন নেই। লিখব হঠাৎ স্বপ্ন ভেঙে গেলে কিংবা নাক ঝাড়ার সময়টুকু একটু রদ করে। পৃথিবীতে কোনো শুয়োরের বাচ্চা নেই যে আমার লেখার দিকে নাক উঁচিয়ে ছুটে আসবে। কেননা, শুয়োরের বাচ্চাদের আর অবশিষ্ট সময় নেই মদ-মাংস-মেয়েমানুষের আবর্জনা ঘাটার পরে। আমার জন্য এ এক ইতিবাচক বিশ্বব্যবস্থা। সুতরাং, হতাশ হব না। কেবল চালাতে হবে কলম— ঘ্যাঁচ-ঘ্যাঁচ।"
ডায়েরিটা সশব্দে বন্ধ করে সিগারেট জ্বালালাম একটা, বেনসন অ্যান্ড হেজেস। লেখালেখি ছেড়ে দেওয়াতে এই এক উপকার হলো—কমদামি কটুগন্ধের বিড়ি থেকে দামি মোলায়েম তামাকে উত্তরণ ঘটল আমার ধূমপানের। কিন্তু আশ্চর্য, আজ এই প্রিমিয়াম শলাকাটা থেকেও ভকভক করে বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। কেন আমার জীবনে সুঘ্রাণের লেশমাত্র নেই আর? কী অপরাধে এই দণ্ড তার উত্তর হাতড়াতে হাতড়াতে একটা গভীর অন্ধকূপের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি।
৪.
আমার বউ এত মিষ্টি একটা মেয়ে—আপনারা না দেখলে বুঝবেন না। কিশোরী বেলায় জন্মদাতাকে হারিয়েছে, স্কুলশিক্ষক মা একাকী মেয়েকে বড়ো করেছেন নিজে খেয়ে না খেয়ে, বাবার আদরের ঘাটতি মেয়েকে টের পেতে না দিয়ে। ঝকঝকে সুন্দরী হওয়ার সুবাদে পাড়ার বদমায়েশ ছেলেপেলের ফটকেমি থেকে মেয়েকে বাঁচিয়ে বড়ো করার যে কি হ্যাঁপা তা যে ভোগ না করেছে সে কি করে বুঝবে! মেয়ে সবে ইন্টারপাশ করেছে কি করেনি, তখন থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু হয় ঝাঁকেঝাঁকে। কিন্তু মা গোঁয়ারের মতো এক লক্ষ্যে অবিচল, মেয়েকে বড়ো ডাক্তার বানাতে হবে। কেননা মেয়ের বাপ মরে যাওয়ার আগে স্ত্রীর অন্তরঙ্গ কোলে মাথা রেখে এই একটি মাত্র আকাঙ্ক্ষা আমানত রেখে গেছেন। এই ইচ্ছাটাকে তাই ফুলেফলে ভরিয়ে তুলতে ভালো প্রাইভেট টিউটর দিয়ে পড়ানো থেকে শুরু করে যখন যা লাগে তার যথার্থ এন্তেজাম করতে মেয়ের মা চুল পরিমাণ ছাড়ও দেননি। এমনকি বাংলার জন্যও আলাদা মাস্টারের বন্দোবস্ত তিনি করেছিলেন। সে মাস্টার ছিলাম এই অধম আমি। গভীর নিষ্ঠায় পড়াতাম, কোনো ফাঁকিবাজি করিনি।
একসময় মেয়েটি সুযোগ পায় ইন্টারের পর ঢাকা মেডিকেলে পড়ার, আর তাই আমার কাছে বাংলা পড়ার প্রয়োজনও তার ঘুচে যায়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আমার মতিবিভ্রম। ওর মেডিকেল কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কলেজ ছুটি হলে ওকে খাওয়াতে নিয়ে যেতাম। ওর মনে প্রেমের বীজ রোপণ থেকে শুরু করে ভালোবাসার মহিরুহ সৃষ্টি পর্যন্ত সমস্ত সার্থক কসরতের পর একদিন আমাদের বিয়ে হয়ে গেল পালিয়ে। ঘটনা প্রকাশ্যে এলে আমার শাশুড়ি হৃদ্যন্ত্রে ভীষণ ব্যথা পেলেন। নব পরিণীতা বউ তখন আমার প্রেমে ফানাফিল্লাহ প্রাপ্ত হয়েছে। আমিই তখন তার পরমেশ্বর। তাই সেবায় কোনো ভুলচুক যেন না হয় সেজন্য 'একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে, ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী'—এমন কোনো সম্ভাবনা না রেখেই বউ মেডিকেল কলেজের সমস্ত পড়াশোনা থেকে ছাড়পত্র নিয়ে পুরোপুরি পরমেশ্বরের মন পাবার সাধনায় মনোনিবেশ করেছিল। এ ঘটনায় আমার মহীয়সী শাশুড়ির হৃদ্যন্ত্রের কাজকারবার বাধাগ্রস্ত হলে তিনি ইহকালের মায়া ছাড়তে বাধ্য হন।
বিয়ের পর প্রথম দুবছর অতীব চমৎকার কাটে আমার। বললে বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, এ সময়কালে আমি একবারের জন্যও কোনো কিছুতে কোনোপ্রকার দুর্গন্ধ পাইনি। হাঁটার পথে নালা-নর্দমা বা আবর্জনার স্তূপ পড়লেও তা থেকে এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে এসে লাগত। এ অনেকটা আরব শেখদের ব্যবহৃত রয়্যাল আউদ আতরের ঘ্রাণের মতো। কোনো বাজে গন্ধময় পরিবেশে পড়লেও এ ঘ্রাণ নাকের চারপাশে ছোট কুয়াশার দলা হয়ে আমাকে অবিরল বেহেশতে বিচরণের মায়াময় সুখ দিত। তবে ঘটনা হলো, পৃথিবীর প্রায় সব সুখের গল্প যেমন দুঃখের গল্পে গিয়ে শেষ হয়—আমারও এ বেহেশতি গল্প একদিন সমাপ্তিবিন্দুতে পৌঁছাল।
অফিসে কাজের চাপ বাড়ল। অন্য একটা পত্রিকা থেকে এক সাহিত্য সম্পাদক বন্ধু ঈদসংখ্যায় উপন্যাস লিখতে বললে কয়েকদিন চেষ্টা করে একপাতাও লিখতে না পেরে গলদ্ঘর্ম অবস্থা; মেজাজ হয়ে উঠল খিটখিটে। এমন সময় আরেক বিগড়ানো বন্ধুর পাল্লায় পড়ে বারে গিয়ে মদ খেয়ে বাসায় ফেরা নিত্যদিন চলতে লাগল। একরাতে এরকম মদ টেনে পরিপূর্ণ পাকস্থলী নিয়ে বাসার সিঁড়িতে পা দিলে কানে আসে বউয়ের হাসির রিনিঝিনি জলতরঙ্গের শব্দ। নিজেকে হেঁচড়ে তুলে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে নিলে দেখি চারতলার বিপত্নীক ছোঁকছোঁক স্বভাবের পুরুষ তারেক মির্জার সঙ্গে আমার লক্ষ্মীমন্ত বউ হেসে হেসে খুব জমাটি রসের গপ্পো করছে। তা দেখে তৎক্ষণাৎ মাথায় রক্ত চড়ে গেল। রাত তখন এগারোটার কম নয়। তারেক মির্জার দিকে দুটি লাল চোখ আমার খরদৃষ্টি দিলে সে চুপচাপ সটকে পড়ে।
মদ কেন হারাম, সেদিনই তা প্রকৃতপ্রস্তাবে টের পাই। সামান্য ঘটনাকে এই আমার মাতাল অপ্রকৃতিস্থ মস্তিষ্ক দশগুণ অসামান্য অস্বাভাবিক বিকৃত হিসেবে ভেবে নিল। বোধ হলো, আমার অনুপস্থিতির সুযোগে নিশ্চয়ই লুচ্চা তারেকের সাথে বউ খালি বাসায় এতক্ষণ শুয়েছিল। পরিতৃপ্ত এক সংগম শেষে দু'জনের খুশিখুশি মন বিদায় নিতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে নতুন উদ্যমে গল্প জুড়ে দিয়েছে তারপর। এসবই আমার সুরাসক্ত মনের কটুকল্পনা ছিল, যা পরদিন হ্যাংওভারের আলিঝালি স্বাভাবিকতায় বুঝতে পেরেছিলাম; কিন্তু ততক্ষণে তো সুস্থতা কেঁচে গণ্ডূষ। তারেক চলে যাওয়া মাত্রই ঘরের দরজা লাগিয়ে বউকে প্রকাণ্ড এক থাপ্পড় কষিয়ে দিয়েছিলাম। আমার দশাসই দেহের পেল্লায় থাপ্পড়ে পলকা বউটির মাথা ভীষণ জোরে ঠুকে গেল পাশের দেয়ালে। তখনই সে সুতীক্ষ্ণ একটিমাত্র চিৎকার দিয়ে মাথাঘুরে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে।
আমি ভেবে নিয়েছিলাম এ আর কিছু নয়, ছিনালি নারীর ভান। একটু পরেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে। তাই তো মাতাল আমি কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে জামাজুতো না ছেড়েই বেডরুমে গিয়ে বিছানায় নিজেকে কাটা কলাগাছের মতো ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘ এক ঘুম দিয়েছিলাম। গভীর সুখের ঘুম ছিল সে এক।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি বেডরুমের দরজা অবধি রক্তের সরু দাগ। ড্রয়িংরুমে বউ মরে পড়ে আছে। মুহূর্তেই সব মনে পড়ে গেল। লোকে বলে বিপদে আমার মাথা থাকে আশ্চর্যরকম ঠান্ডা, কাজও করে দ্রুত এবং আবেগ-অনুভূতির থার্মোমিটার আমার সব পরিস্থিতিতেই নরমাল রিড দেখায়। তবু ঘণ্টা দুয়েক একাকী হা-হুতাশ যাপন করে গা ঝাঁড়া দিয়ে উঠলাম। পৃথিবীর আর সব প্রাণীর মতো আমিও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাজিয়ে ফেলেছিলাম পরবর্তী কর্মকৌশল।
বাসা থেকে দূরের এক বাজারে গিয়ে কসাইগিরি করার সাজসরঞ্জাম কিনে নিয়ে এলাম। মনে পড়েছিল রুশ সিরিয়াল কিলার আন্দ্রেই ছিকাতিলোর কথা, যে কিনা নারী ও শিশুদের খুন করে মাংস সংগ্রহ করত এবং তা রান্না করে খেত। নিজেকে বাঁচাতে আমি এই ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা নিলাম। রাতভোর বউয়ের ছোটোখাটো দেহটা কেটেকুটে অনেকগুলি পলিথিনের প্যাকেটে ভাগ ভাগ করে রেখে দিলাম ফ্রিজে। আমি ছাড়া ইহজগতে বউয়ের আর কেউ নেই। সুতরাং একমাসের মধ্যে সমস্ত মাংস খেয়ে উঠতে পারলে এ জীবনে ঝামেলা বলতে আর কিছু থাকবে না।
কিন্তু বউকে খুন করার পর আমি হারিয়েছি পৃথিবীর সমস্ত সুবাস। এরপর থেকে কোনো কিছুতেই আমি কোনো সুঘ্রাণ পাই না, কেবল দুর্গন্ধ ছাড়া। বউয়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটে আমার সুগন্ধ উপভোগের ইন্দ্রিয়টির।
৫.
বউকে খুন করেছি বলে আপনারা আবার ভাববেন না যে আমি খুব নিষ্ঠুর। পাষণ্ড। বর্বর।
আসলে আমার বউকে আমি ভালোবাসি, সে এক অন্যরকম ভালোবাসা, আপনারা বুঝবেন না, অবশ্য আপনাদের বোঝার দরকারও নেই। কারণ এ ভালোবাসা যার বোঝার, মানে আমার বউয়ের, সে ঠিকই বুঝেছে। বুঝেছে গভীরভাবে। বুঝেছে বলেই সে পাশের রুমে ইজি চেয়ারে দুলতে দুলতে কবিতা পড়া থামিয়ে আমাকে ডাকে, কিফায়েত, কিফায়েত। আমি জবাব দিই, হ্যাঁ বলো।
তোমার খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। শিগ্গির খেতে আসো।
আসছি দাঁড়াও।
কী কবিতা পড়ছিল বউ? পড়ছিল : "kill me, jump me, end my life like I care, Take this gun and shoot me..."
খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি বউ বিরিয়ানি রেঁধে রেখেছে। আমরা দুজন খেতে বসি। বউ সুন্দর করে সালাদ সহযোগে খাবার বেড়ে দেয়। ও আজ সেজেছেও চমৎকার। চোখে গাঢ় কাজল। তলোয়ারের মতো দু'ভ্রুয়ের মাঝে ছোট একটি খয়েরি টিপ। আর ঠোঁটে রক্তাভ লিপস্টিক।
ওর নিজের প্লেট শূন্য দেখে জিজ্ঞেস করি, তুমি খাবে না?
না। বিরিয়ানিটা আমার রানের মাংস দিয়ে রেঁধেছি। নিজের মাংস কি নিজে খাওয়া যায় পাগল?
একা একা তো খেতে ইচ্ছে করছে না, বউ।
আরে খাও খাও। আজকের রান্নাটা খুব স্পেশাল। এটাকে বলে মেহেক বিরিয়ানি। মেহেক নামের অর্থ জানো? এর অর্থ হচ্ছে সুগন্ধ। একটু খেয়ে দেখো। বুঝতে পারবে কিফায়েত।
প্লেট থেকে একটুকরো মাংসসহ বিরিয়ানির এক লোকমা নাকের কাছে নিয়ে আমি বহুদিন পর টের পাই—একটা মিষ্টি সুবাস আমার নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করছে। গভীর থেকে গভীরে।









