সবেদা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ। গাছের ডালে ডালে উল্টো হয়ে ঝুলছে বাদুড়েরা। সূর্য ডুবে গেছে, তবু আকাশে একরাশ নরম আলো ভেসে আছে। গাঢ় সবুজ পাতাগুলো যেন দিনশেষের আলোয় আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
এই পাতাগুলো প্রায় বছরজুড়েই ডালে ঝুলে থাকে—এগারো, বারো মাস। তারপর একদিন হঠাৎই ঝরে পড়ে। আজ সেগুলোকে দেখে সবুজের মনে হলো, বয়স্ক পাতাদের রং যেন একটু অন্যরকম—কেমন এক অনুশোচনায় ভেজা, দুর্নিবিড়। যেন তাদেরও কিছু দেওয়ার ছিল, কিছু বলা বাকি ছিল। কিন্তু সময় ফুরিয়ে গেছে। ঝরে পড়াই এখন তাদের নিয়তি।
এবার গাছে প্রচুর সবেদা ধরেছে। এলোমেলো ডালপালার ফাঁকে ফাঁকে যেন ফলগুলো লুকোচুরি খেলছে। সবুজ একসময় ভাবল, প্রতিটি পাতার আড়ালেই বুঝি একটি করে সবেদা। সবুজ পাতার ফাঁকে বিবর্ণ, পাকা ফলগুলো নীরবে ঝুলে আছে।
বাদুড়গুলো একটার পর একটা ফল কামড়ে নিচে ফেলে দিচ্ছে। আগে হলে সবুজ নিশ্চয়ই রাগে ফেটে পড়ত। কিন্তু আজ সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে। অদ্ভুতভাবে ভালোই লাগছে দৃশ্যটা।
একসময় সে এই গাছটার জন্য কত যুদ্ধই না করেছে! টিন আর লাঠি বেঁধে রাখত গাছের সঙ্গে। লম্বা রশি দিয়ে দূর থেকে টান দিয়ে টিন পিটিয়ে বাদুড় তাড়াত। মা বলতেন, “সবেদা পাকার মুখে এলেই বাদুড় বেশি আসে। ফজরের সময় দেখবি, নিচে বিছানো থাকে ফল। খায় না, শুধু নষ্ট করে!”
সবুজ হেসে বলত, “ওদের দোষ দাও কেন, মা? ওরা তো মানুষ না—অবুঝ প্রাণী। কিন্তু মানুষ হয়ে মানুষই তো মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে!”
মা অবাক হয়ে তাকাতেন, “তুই কার কথা বলছিস?”
সবুজ বলত, “খালেক চাচার পুকুরে বিষ দিয়ে সব মাছ মেরে ফেলল যে—মানুষ হয়ে এটা কীভাবে পারে?”
জবা বেগম তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতেন। তারপর ধীরে বলতেন,
“মানুষের মতো দেখতে হলেই কি মানুষ হওয়া যায়?”
মায়ের সেই কথার মানে আজও পুরোটা বুঝে উঠতে পারেনি সবুজ।
মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে পড়ে। মা মাঝে মাঝে কারও সঙ্গে কথা বলতেন না—নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। বলতেন, “নিজের সঙ্গে কথা বলছি।” তখন বুঝত না সবুজ। এখন, মায়ের মৃত্যুর পর, একা একা সে-ও কত কথা বলে। হয়তো এটাই নিজের সঙ্গে কথা বলা।
সবেদা ছিল মায়ের খুব প্রিয় ফল। পাকা শুরু হলেই খাটের নিচে পাটের বস্তায় মুড়ে যত্ন করে রেখে দিতেন। সেই দৃশ্যগুলো আজও চোখে ভাসে।
সবেদা গাছের নিচের সরু পথ ধরে সবুজ এগিয়ে যায় মায়ের কবরের দিকে। কবরের মাথার কাছে শিউলি গাছটা এখন বেশ বড় হয়েছে। সাদা ফুলে ভরে ওঠে। প্রতি রাতে শিশিরভেজা ফুলগুলো ঝরে পড়ে মাটিতে—নিঃশব্দে ঢেকে দেয় কবরটাকে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে সবুজের মনে হয়, সন্ধ্যা যেন বলে দিচ্ছে—আরেকটা সাদামাটা দিনের সমাপ্তি।
হালকা বাতাসে শুকনো পাতাগুলো মাটিতে গড়িয়ে যায়। কচি কলাপাতার ঘ্রাণ ভেসে আসে নাকে। হঠাৎ ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে—কচি পাতা খেত, মা বকাঝকা করতেন। সন্ধ্যায় হাত-পা ধুয়ে মায়ের আঁচলে মুখ মুছত। সেই আঁচলের গন্ধ আজও যেন লেগে আছে।
মায়ের বিছানা, চাদর, পুরোনো রান্নাঘর—সবখানেই এক ধরনের অদৃশ্য মায়া জমে আছে। মায়ের ব্যবহৃত চিরুনি, সুগন্ধি সাবান—সবকিছুতেই যেন তাঁর স্পর্শ রয়ে গেছে। ঘরের দেয়াল, পুরোনো চেয়ার-টেবিল—সবই যেন নীরবে মাকে মনে করিয়ে দেয়।
হঠাৎ চোখ ঝাপসা হয়ে আসে সবুজের।
দু’হাতের তালুতে চোখের পানি মুছতে থাকে সে।
সবেদা গাছটার দিকে আরেকবার তাকায়।
তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে থাকে—নিঃশব্দে, একা।









