গল্প

যোগেশ্বর তান্ত্রিক

অলোক আচার্য
০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০০আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০০

ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আমি নতুন পোস্টিংয়ের খবর পেলাম। আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। চাকরির পনেরো বছর হয়েছে। এর মধ্যে সাত জায়গায় চাকরি করা হয়েছে। এখন নতুন জায়গায় যেতে কেমন যেন ইতস্তত লাগে। তাও আবার দেশের বাইরে। এর আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেছি। কিন্তু দেশের বাইরে যাইনি। এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। একটু গোঁ ধরলে হয়তো অফিস বিকল্প কাউকে খুঁজবে। সামনেই প্রমোশন হবে। এখন কর্তৃপক্ষের মতের বাইরে যেতে চাইছিলাম না। আমি সারাজীবন বোহেমিয়ান টাইপের। ফলে দেশ বা দেশের বাইরে এসব নিয়ে খুব একটা তফাত নেই। এক জায়গায় থাকলেই হলো। মনটাকে সেট করতে হবে। তারপর আবার বেশ মোটা বেতন আছে। এনজিওর চাকরিতে খাটুনিটা আছে। চোখ-মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হবে। আবার আনন্দও আছে। অনেক মানুষের সাথে কাজ করা যায়। আমরা কাজটা শিক্ষার নিয়ে। প্রান্তিক পিছিয়ে থাকা শিশুদের শিক্ষার দিকটা আমার দায়িত্বে থাকে। আমাদের একটা এডুকেশন সেন্টার খোলা হয়েছে ভারতের কেরালার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে। আমাকে সেখানেই ইনচার্জ হয়ে যেতে হবে। আমার বস আমাকে হাসিমুখেই বদলির কাগজটা হাতে দিলেন। তিনি জানতেন আমি খুব একটা আপত্তি করব না। আগেও তো করিনি। আমার হাতে বদলির কাগজটা ধরিয়ে দিয়েই বললেন, এবার বাইরে যাওয়ার জন্য রেডি হোন। আমিও মুচকি হেসে কাগজটা নিলাম। এক মাসের সময় হাতে আছে। এর মধ্যেই আমাকে কেরালায় পৌঁছাতে হবে। আমার যাওয়ার ঝক্কি ঝামেলা সব প্রতিষ্ঠানের। আমি ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। নেট ঘেঁটে জায়গাটা সম্পর্কে একটা মোটামুটি কনসেপশন নেওয়ার চেষ্টা করলাম। দেশটাকে একবার দেখে নেয়া কর্তব্য মনে করলাম। আমিও সেই নতুন জায়গা সম্পর্কে কিছুই জানি না। নেট ঘেঁটেও খুব বেশি তথ্য পেলাম। অবশেষে দীর্ঘ জার্নি শেষে এক দুপুরে আমি উপস্থিত হলাম আমার নতুন কর্মস্থলে।

এখানে থাকার খুব একটা সুবিধা করতে পারব বলে মনে হলো না। প্রথম সমস্যা ভাষাগত। আমি নিজেও কিছু বুঝি না আবার আমার কথাও কেউ বুঝতে পারে না। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। কোথাও ভাড়া থাকার মতো জায়গা পেলাম না। এখানে আপনি চাইলে অতিথি হিসেবে দু’চারদিন কোনো বাড়িতে থাকতে পারেন। তবে কেউ ভাড়া দিতে চায় না। এটাই নাকি এই গ্রামের রীতি। অতিরিক্ত ঘর থাকলেও ভাড়া পাওয়া যাবে না। এলাকাটা খ্রিষ্টান অধ্যুষিত। বেশিরভাগ মানুষের গলায়ই ক্রুশ দেয়া মালা। আমার পরিচিত দুনিয়ার থেকে এই গ্রামের হালচাল একেবারে ভিন্ন। ভিন্ন হলেও কিছু করার নেই। চাকরি বলে কথা। থাকতেও হবে, চাকরিও করতে হবে। তাছাড়া নতুন নতুন পরিবেশে কাজ করতে আমার খারাপ লাগে না। সারাদিন ঘুরে আমি যেখানে আশ্রয় পেলাম সেটা গ্রামের একমাত্র উপাসনালয়। একটি গির্জা। বহুদিনের পুরাতন। গির্জার ফাদার রবার্ট গোমেজ ফিংকন। বহু পুরাতন ভারী দরজা ঠেলে ভিতরে গিয়ে একটা ছোট রুমে টোকা দিতেই ফাদার বেরিয়ে এলেন। বয়স আন্দাজ করে মনে হলো ৬৫ বছরের কম হবে না। আমাকে দেখে খুশি হলেন না বিরক্ত হলেন বুঝতে পারলাম না। মুখে কোনো অভিব্যক্তি বোঝা গেল না। আমিই আমার চাকরির বিষয় আর এখানে এসে থাকার জায়গা না পাওয়ার বিষয়টা বুঝিয়ে বললাম। ফাদার সম্ভবত আমার বিষয়টা বুঝতে পারলেন। হয়তো আমার আগেও কেউ এখানে এসেছিল থাকার জন্য সাহায্য প্রার্থী হতে। আমাকে তিনি অন্য একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। সেটা গোছানোই ছিল। দ্বিতীয় কাউকে দেখলাম না। তাই প্রশ্ন করলাম, আপনি এখানে একাই থাকেন ফাদার? তিনি একটু হেসে উত্তর দিলেন, একাই। আর আমার গড থাকেন। আপনার এদিক ওদিক তাকানো দেখে আমি বুঝেছি আপনি হয়তো আমার পরিবারকে খুঁজছেন। আমি একা থাকি। মাঝে মধ্যে আপনার মতো কেউ এখানে এসে বিপদে পড়ে। তখন আমার সাথে থাকেন। আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে ইংরেজিতে। তাও সাবলীল নয়। আমি ভালো ইংরেজি বলতে পারি না। চালিয়ে নিচ্ছি। আমি অফিস আর গির্জা এই নিয়ে আছি। আশেপাশের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার খুব বেশি সুযোগ নেই। প্রধান সমস্যা ভাষা। মুখ চেনা হয়েছে কয়েকজনের সাথে। এখানকার বাজারগুলো উন্নত নয়। অনেকটা অগোছালো। যেন কোনো এক জায়গায় বসলেই হলো! ফলের দোকানগুলোতে বেশ নতুন ধরনের ফল চোখে পরলো। আমাদের বাজারের সাথে মোটেই মেলে না। মাংসের দোকান খুব একটা নেই। প্রাণপণ মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। রাতে অফিস থেকে ফিরে ফাদারের সাথে গল্প করি। খাওয়া দাওয়া নিজের রুমেই করছি। রান্নার হাত আমাদের সাথে মেলে না। তবু অভ্যাস করছি। এভাবে বেশ কয়েকদিন চলে গেল। ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যাচ্ছে। এর মধ্যেই কয়েকটা বিষয় আমার নজর এড়ালো না। প্রথমত, এখানে বাড়িগুলোর দরজা, জানালায় রসুন ঝোলানো থাকে। একটা দুটো না, বেশ কয়েকটা রসুন থাকে। অধিকাংশ বাড়িতেই এটা দেখেছি। ফাদারকে দেখেছি মাঝে মাঝে গির্জার চারদিকে ক্রুশ নিয়ে বিড়বিড় করে কী সব বলতে। আমি অন্য ধর্মের হওয়ায় গলায় ক্রুশ নিতে বলেনি কখনো। তবে জানতে চেয়েছে, তোমরা গলায় ঈশ্বরের মালা দাও না? আমি না বলাতে আর কিছু বলেনি। আমি প্রেতচর্চা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না। পৃথিবীতে কিছু মানুষ প্রেতচর্চা করে। আমার ভূত প্রেতে খুব একটা বিশ্বাস নেই। আবার বিশ্বাস না করেও তো থাকতে পারি না। যতই পড়াশোনা করেছি বিশ্বাস ততোটা বেড়েছে বৈ কমেনি। এসব রসুন ঝোলানো হয় সাধারণত শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচতে। একটা মিথ প্রচলিত আছে কিছু গোষ্ঠী বা জাতির কাছে যে ঘরের সদর দরজায় রসুন ঝুলিয়ে রাখলে কোনো ড্রাকুলা, শয়তান বা কোনো অশুভ আত্মা ঢুকতে পারে না। একদিন সন্ধ্যার পর অফিস থেকে ফিরেছি। বাইরে প্রচণ্ড শীত পড়েছে। শীতের রাস্তায় খুব বেশি কাউকে চলাচল করতে দেখা যায় না। তারপর আবার ঘনঘন লোডশেডিং হয় এখানটায়। কুয়াশায় চারদিক ঢেকে থাকে। এখানকার রাত পেঁচাগুলোও যেন আমার কাছে অচেনা লাগে। মনের ভেতর কী একটা ভয় সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। ফাদারের ভাবচক্কর আমার ভালো লাগে না। ইদানীং খুব চুপচাপ থাকেন। একটা দুশ্চিন্তা যেন সারাক্ষণ তাকে ভাবিয়ে রাখছে। কিন্তু সেটা কি আমার কাছে কখনো খোলসা করে বলেননি। আমি জানতেও চেয়েছি। ফাদার এড়িয়ে গেছেন। তিনি সম্ভবত আমাকে ভয়ের ভিতর রাখতে চান না। অথচ আমি সেই ভয় নিয়ে চলছি। এখন আবার দেখছি গ্রামের কিছু মুরুব্বি ধরনের মানুষজন ফাদারের কাছে আসছে যাচ্ছে। তারাও কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকছে। একদিন রাতে ফিরে আমি ফাদারকে খেতে খেতে জিজ্ঞ্যেস করলাম, আচ্ছা ফাদার আপনাকে অনেকদিন ধরেই একটা কথা বলতে চাইছি। মানে জানতে চাইছি। আপনি কি ইদানীং কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকেন? গ্রামের মানুষজনের মুখেও আমি চিন্তার ছাপ দেখেছি। লোকজন সব কিছুই করছে তবে স্বেচ্ছায় না। কেমন যেন অনীহা ভাব। আমার প্রশ্নের ফাদার প্রথমটায় কোনো উত্তর দিলেন না। গম্ভীর হয়ে মাথা নিচু করে থাকলেন। তারপর খাওয়া শেষে যা বললেন তার সারমর্ম হলো এই যে, এই গ্রামের একটা অভিশাপ আছে। গ্রামে এক সময় নরবলি প্রথা ছিল। খুব ভয়ংকর প্রথা এটা। প্রতি অমাবস্যায় রাজার বাড়ির পূজার জন্য নরবলি দেওয়া হতো। নরবলির জন্য উপযুক্ত ছিল পাঁচ বছর পর্যন্ত ছেলে শিশু অথবা ঋতুচক্র হওয়ার আগ পর্যন্ত কন্যা শিশু। আর এর মূলে ছিল রাজার আশ্রয়ে থাকা এক প্রভাবশালী তান্ত্রিক। ওর নাম ছিল যোগেশ্বর তান্ত্রিক। তন্ত্র শক্তিতে সিদ্ধ ছিল সেই তান্ত্রিক। তান্ত্রিক আসলে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য রাজাকে দিয়ে এসব করিয়ে নিত। অনেক বছর এভাবে চলে আসছিল। গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে রাজা আর তান্ত্রিকের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছিল। এক সময় যখন সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল সেদিন ছিল এরকমই এক অমাবস্যার রাত। একটি পাঁচ বছরের মেয়েকে হাড়িকাঠে বলি দেওয়ার জন্য রাজার বাড়ির মন্দিরের সামনে আনা হয়। আর ঠিক তখনি গ্রামের মানুষ এক হয়ে রাজ বাড়িতে হামলা চালায়। সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। প্রথমে সেই তান্ত্রিককে ধরে গাছের সাথে বেঁধে মেরে আধমরা করে। এরপর রাজবাড়ির সামনেই জীবন্ত কবর দেয়। এরপর রাজাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। গ্রামে শিশু হত্যা বন্ধ হয়। সেই অভিশাপ আজও গ্রামের উপর অশুভ ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। তান্ত্রিক মরেও যেন গ্রামবাসীর মনের ভিতর আতঙ্ক তৈরি করেছে। এত বছরেও তা দূর হয়নি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই গ্রামে অশুভ আত্মার প্রভাব বেড়ে গেছে। ঘর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিশু। পরে সেসব শিশুর দেহ পাওয়া গেলেও সেসবে রক্ত থাকে না। দেহের সাথে মাথাও থাকে না! গ্রামের মানুষের বিশ্বাস সেই তান্ত্রিকের আত্মা ফিরে এসেছে। কেউ কেউ গ্রামের রাস্তায় তান্ত্রিককে হাঁটতেও দেখেছে। এই যে বাড়িতে বাড়িতে রসুন ঝোলানো দেখছো এসব সেই অশুভ আত্মা থেকে বাঁচার জন্যই। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি আত্মাটাকে দূর করতে। কিন্তু সেটা অত্যন্ত শক্তিশালী। তান্ত্রিকের আত্মা হওয়ার কারণে একটু কষ্ট হচ্ছে। গত এক মাসে এই গ্রাম থেকে চারটি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। আমি তখন বললাম, এটা তো শিশু পাচারকারীদের কাজও হতে পারে।

ফাদার হেসে বললেন, হতেই পারে। তুমি এটা বিশ্বাস নাও করতে পারো। তবে এই গ্রামে কোনোদিন এই ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনা তুমি গ্রামবাসীদেরও জিজ্ঞেস করতে পারো। তবে ওরা কিছু বলবে না। চোখে ভয় দেখা দেবে। এতেই তুমি বুঝতে পারবে কী গভীর ভয় ওদের মনে ঢুকে আছে। আর গ্রামবাসীদের বিশ্বাস সেই অশুভ আত্মাটা জেগে ওঠার কারণেই এটা ঘটেছে। ওরা সবাই খুব ভয়ে আছে। বিশেষত যেসব ঘরে ছোট বাচ্চা অথবা সদ্য কিশোরী মেয়ে রয়েছে। তুমি দেখেছো আমার কাছে গ্রামবাসীদের আসতে। ওদের ধারণা সেই আত্মাটাকে দূর করতে একমাত্র আমিই পারি। সন্ধ্যার পর থেকে এইসব আত্মাদের ক্ষমতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তবে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। এই গির্জা একেবারে নিরাপদ। কোনো অশুভ আত্মা এখানে ঢোকার ক্ষমতা রাখে না। আমি দেখছি কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি। আমাকে আজ রাতে কিছু বই পড়তে হবে। আর একটা কথা এই কাজে তোমাকে আমার দরকার হতে পারে। আমি নিশ্চিত তুমি সাহসী। আমি কোনো উত্তর করলাম না। আগ বাড়িয়ে কিছু বলার ইচ্ছা ছিল না। এসব তান্ত্রিক-ফান্ত্রিকের ব্যাপার-স্যাপার আমার কাছে একেবারেই নতুন। প্রেত চর্চা বলে একটা বিষয় আছে পৃথিবীতে। তবে একটা আত্মা জেগে উঠে এসব কাণ্ড করছে সেটা ভাবতেই কেমন যেন হাসি পেলো। ফাদারের সামনে হাসলে অপমান করা হয় ভেবে চেপে গেলাম। মনে মনে ঠিক করলাম এই শিশু নিখোঁজ আর হত্যার পিছনে অন্য কোনো রহস্য আছে কি না কাজের ফাঁকে দেখতে হবে। শুধু ভারত কেন পুরো এশিয়া জুড়েই শিশু ও নারী পাচারকারীদের তীব্র আনাগোনা রয়েছে। এই কেরালার সহজ সরল মানুষগুলোকে যে বোকা বানাচ্ছে না তাই বা কে জানে। হয়তো যোগেশ্বর তান্ত্রিকের ঘটনাটা ওরাই ঘটাচ্ছে। রাতে ঐ পর্যন্তই ফাদারের সাথে আমার কথাবার্তা হলো। আমি খেয়ে ঘুমাতে গেলাম। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করলাম। ঘুম এলো না। মাথার ভিতর যোগেশ্বর তান্ত্রিক আর সেই জমিদারের কথাগুলো ঢুকেছিল। শেষ রাতের দিকে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। স্বপ্নে দেখলাম যোগেশ্বর তান্ত্রিককে। কী বিশ্রী চেহারা! দাঁত বের করে আমার সামনে বসে আছে! মুখ ভর্তি পান। সেই পান দিয়ে দাঁতগুলো লাল টকটকে দেখাচ্ছে। যেন এইমাত্র কারও রক্ত খেয়েছে। তারপর থেকে আমি এক ধরনের ভয় নিয়ে চলাফেরা করি। যদিও আমার পরিবার নেই। কিন্তু গ্রামের শিশুদের দেখলেই বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে। যোগেশ্বর তান্ত্রিকের আত্মার ভয়ে আমি সন্ধ্যার পরপরই গীর্জায় এসে ঢুকি। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। গ্রামের মানুষের চোখে মুখে ভয়টা বুঝতে পারছিলাম। আমার স্কুলটাতেও এ নিয়ে ফিসফিসানি হতো। আমি নিজে থেকেই এড়িয়ে যেতাম। এর মধ্যেই আমার স্কুলের এক শিশু নিখোঁজ হয়ে গেল। ওর ক্ষতবিক্ষত শরীরটা পাওয়া গেলো পুরাতন জমিদার বাড়ির দোরগোড়ায়। আমার তো আর বিশ্বাস না করে উপায় নেই। ভয়ে ভয়ে থাকি। মাঝে একবার হেড অফিসে কথা বললাম। যোগেশ্বর তান্ত্রিকের আত্মার কথা বলতেই বস হেসেই উড়িয়ে দিলেন। আপনি ভাই এইসব আত্মা-টাত্মা নিয়ে ভয়ে আছেন! হাউ ফানি ভাই!

অবশেষে এক রাতে আমি যোগেশ্বর তান্ত্রিকের সামনাসামনি পড়ে গেলাম। এটা আমার জন্য এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল। আমি সেদিন রাতেই মরতে পারতাম। নেহাত আমার মানসিক স্থিরতা অন্যদের থেকে কিছুটা বেশি। তবু যা হয়েছিল তা বর্ণনাতীত! সেদিন ছিল বর্ষার প্রথম সপ্তাহ। দুপুর থেকেই মেঘ ঘনিয়ে বৃষ্টি এলো। আমার অফিসের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে অফিস গোছাতে গোছাতেই রাত দশটা বেজে গেলো। আমি ঘড়ির দিকেই তাকাইনি। এক সহকর্মীকে বলে মোটরসাইকেল চেপে বের হলাম। নতুন অফিস থেকে এক কিলোর মতো রাস্তা। বৃষ্টি থাকায় গাড়ি স্পিডে টানতে পারছি না। তারপর আবার আধ-কাঁচা রাস্তা। স্লিপ করে গাড়ি উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যাই হোক দশ মিনিট হবে। আমার মোটরসাইকেল হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল। আমি পড়লাম মহা বিপদে। আশেপাশে তো ভালো আধ কিলোর মধ্যেও কাউকে পাওয়া যাবে না। বৃষ্টিতে তো ডাকলেও লাভ নেই। চেক করে দেখলাম গাড়িতে তেল ভর্তি আছে। কিন্তু গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে ঠেলতে লাগলাম। এই অবস্থায় গাড়ি ঠেলে আনা প্রায় অসাধ্য কাজ। আমি সেই অসাধ্য কাজটাই করছি। ঠিক এই সময় আমার মনে হলো একজন অথবা কয়েকজন আমার পিছনেই হাঁটছে। আমি প্রথমটায় গা করলাম না। পিছনে তাকাতেও ইচ্ছা হচ্ছিল না। মাথার মধ্যে তান্ত্রিকের কথাটা ঢুকে গেছে। আরও কয়েক মিনিট এভাবে এগোনোর পর আর পারলাম না। মোটর সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে পিছনে ঘুরলাম। যা দেখলাম তাতে আমার অবস্থা খারাপ! পাঁচটা শিশু ঠিক অল্প দূরত্বে আমার দিকেই হাঁটছে। কোনোটারই মাথা নেই। কোনোটার আবার হাতও নেই! আমার পা যেন দাঁড়িয়ে গেছে। খুব ধীরে ওরা আমার দিকেই আসছে। এই সময় সামনের দিক থেকে প্রচণ্ড হাসির শব্দ এলো। তাকাতেই দেখি প্রায় সাত ফুট উঁচু একজনকে। চোখ দুটো জ্বলছে। শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছে। গলায় ডজনখানেক মালা। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সব স্পষ্ট দেখছি। ফাদারের বর্ণনায় এটাই যোগেশ্বর তান্ত্রিক মানে ওর আত্মা। খুব দ্রুত ভেবে নিলাম। বাঁচার কোনো আশা নেই। সামনে পিছনে যাওয়ার উপায় নেই। মোটর সাইকেলের চিন্তা বাদ দিলাম। নিজের জীবনটা তো বাঁচাতে হবে। ডান দিকে ধানখেত। মনের সব শক্তি শরীরে পৌঁছে দিলাম। তারপর দম বন্ধ করে দৌড় দিলাম। জমির পাঁচা শামুকে পা কেটে গেল। আমি দৌড়াচ্ছি। এদিক দিয়েই একটু ঘুরেই পৌঁছানো যাবে গীর্জায়। সেখানে একবার ঢুকতে পারলে নিশ্চিন্ত। পিছনে সেই অট্টহাসি। আমার কোনো হুঁশ নেই। কতক্ষণ দৌড়েছি মনে নেই। গীর্জার দরজায় এসেই জোরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম। ফাদার আমার ফেরার দেরি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে দরজার সামনেই অপেক্ষা করছিলেন। গ্রামের আরও কয়েকজন ছিল সেখানে। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন ফাদার আমার দিকে ঝুঁকে আছেন। এখন কেমন লাগছে? আমি শুধু মাথা নাড়লাম। তারপর আবার চোখ বুজলাম। টানা সাতদিন পড়ে রইলাম জ্বরে। আমার কোনো হুঁশ নেই। এসময় গ্রামেরই দু-একজন আমার সেবা যত্ন করেছে। ভালো হওয়ার পর ফাদার বলেছিলেন, আমি নাকি মরতে মরতে বেঁচে গেছি। এ অবস্থায় সাধারণত কেউ বেঁচে ফিরতে পারে না।

আমি স্বাভাবিক হতে পারছি না। ভাবছিলাম অফিসকে বলে ফিরে যাব। তাছাড়া যোগেশ্বর তান্ত্রিকের আত্মাটা আরও বেশি ক্ষতি করছে গ্রামে। এই সময় এক রাতে ফাদার আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যেতেই বললেন, আগামীকালই আমি যোগেশ্বর তান্ত্রিকের আত্মাটাকে ধ্বংস করতে চাই। কিন্তু আমার সাথে আপনি এবং কয়েকজন সাহসী গ্রামবাসী থাকতে হবে। একা তো পারব না। বয়স হয়েছে। যাবেন তো? কী করব ভাবছিলাম। তারপর বললাম, চলেন দেখি। গ্রামটাও তো বাঁচাতে হবে। আমি ফাদারকে বললাম, আমাদের জীবনের কিন্তু ঝুঁকি আছে? ফাদার সামান্য হেসে বললেন, আর কত বছর বাঁচতে হবে বলেন তো! মরার আগে কিছু একটা তো করি। অবশ্য আপনি চাইল নাও যেতে পারেন। আমাকে যেতেই হবে। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

এর ঠিক তিনদিন পর ছিল অমাবস্যার রাত। আমরা পাঁচজন রওনা হলাম। ফাদার একটা বাক্স থেকে পাঁচটা ক্রুশ নিয়ে আমাদের গলায় পড়িয়ে দিলেন। আমি অবশ্য আগেই একটা তাবিজ জোগাড় করে বেঁধেছিলাম। ফাদারের বাক্সে আরও কিছু জিনিস ছিল। সবাই মিলে রওনা হলাম সেই পুরাতন রাজবাড়ীর দিকে যেখানে তান্ত্রিককে কবর দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের কবর খুঁড়ে তান্ত্রিকের দেহ খুঁজতে হবে, ফাদার বললেন।

আমরা কি সেই দেহ এখন পাব? মানে সেই এত বছর আগের মৃতদেহ এখন তো বেশি কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না!

ফাদারের কাছ থেকে জানলাম যে যারা তন্ত্র সাধনা করে তাদের মৃতদেহ এত সহজে নষ্ট হয় না। সেটাই বের করতে হবে। সাথে তান্ত্রিকের সাথে চাপা দেওয়া তন্ত্র সাধনার জিনিসপত্রগুলো বের করে সব একসাথে পবিত্র আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের সাথে গির্জা থেকে আনা একটি বিশেষ পাত্রে আগুনও ছিল। চারদিকে তখন অন্ধকারে ঢাকা। আকাশে ঘন মেঘের আস্তরণ। প্রায় আধঘণ্টা পর আমরা পৌঁছালাম সেই জায়গায়। শরীরটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। দূর থেকে অসংখ্য শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। আমরা কোদাল নিয়ে কাজ শুরু করলাম। ঠিক সাথে সাথেই চারদিক থেকে ভয়ংকর চাপা গর্জন ভেসে আসতে লাগল। ফাদার আগেই বলেছিলেন কেউ ভয় পাবেন না। ভয় পেলেই বিপদ। তবু ভয় পাওয়ার জায়গায় ভয়টা পেতেই হয়। কাজটা তো করতেই হবে। মনে সাহস নিয়ে কাজ করছি। অনেক পুরাতন কবর। খুঁড়ছি তো খুঁড়ছিই। বেশ অনেকটা সময় খনন করার পর বেরিয়ে এলো কঙ্কাল। আর ঠিক তখনই শুরু হলো ধ্বংসলীলা। তীব্র ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে লাগলো, সাথে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি পরতে লাগলো। মনে হলো পাশেই কেউ তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে। বাতাসে কাজ প্রায় করতেই পারছি না। ফাদার পাশে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে বাইবেল থেকে মন্ত্র বলে চলেছেন। তান্ত্রিকের কঙ্কালের সাথে তন্ত্রমন্ত্রের কিছু জিনিস উঠে এলো। এবার ফাদার চেঁচিয়ে নির্দেশ দিলেন ওগুলো নিয়ে জমিদার বাড়ির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতে। আমরা সেসব এক জায়গায় জড়ো করে দৌড়ে জমিদার বাড়ির বারান্দায় গিয়ে উঠি। সেখানে আগে থেকেই গির্জা থেকে আনা পবিত্র আগুন নিয়ে অপেক্ষা করছিল দু’জন। তাড়াতাড়ি সেসব নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেই। আগুনের সাথে সাথে নিভে যেতে থাকে তান্ত্রিকের আত্মার দাপটও। অবশেষে সব শান্ত হয়। আমরা সবাই নিরাপদে ফিরে আসি গীর্জায়। এর কিছুদিন পরেই আমাকে বাংলাদেশে চলে আসতে হয়। পিছনে পড়ে থাকে কেরালা আর লাল রঙের গীর্জার মায়া।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বাংলাদেশ আর কখনো ক্লায়েন্ট স্টেটে ফিরে যাবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বাংলাদেশ আর কখনো ক্লায়েন্ট স্টেটে ফিরে যাবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এগুলো কীসের আলামত?
এগুলো কীসের আলামত?
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত মোজাফফরের ফেসবুক তথ্য চেয়ে মেটাকে চিঠি
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত মোজাফফরের ফেসবুক তথ্য চেয়ে মেটাকে চিঠি
বিশ্বকাপে স্পেন-আর্জেন্টিনাকে আটকে দেওয়া সেই ভোজিনিয়ার অবশেষে স্বপ্নপূরণ
বিশ্বকাপে স্পেন-আর্জেন্টিনাকে আটকে দেওয়া সেই ভোজিনিয়ার অবশেষে স্বপ্নপূরণ
সর্বাধিক পঠিত
পাকিস্তানে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে থানার সব পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
পাকিস্তানে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে থানার সব পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
মা-কে বিয়েতে দাওয়াত না দেওয়ায় কর্মীকে বরখাস্ত করলেন মালিক
মা-কে বিয়েতে দাওয়াত না দেওয়ায় কর্মীকে বরখাস্ত করলেন মালিক
মোকতাদিরকে জামিন দিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অচল করে দেবো: হেফাজতের মহাসচিব
মোকতাদিরকে জামিন দিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অচল করে দেবো: হেফাজতের মহাসচিব
অক্সফোর্ডের ভুয়া ডিগ্রি ও জালিয়াতি: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক এমপি প্রার্থীর কারাদণ্ড
অক্সফোর্ডের ভুয়া ডিগ্রি ও জালিয়াতি: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক এমপি প্রার্থীর কারাদণ্ড
লোকসংগীত শিল্পী মুজিব পরদেশী কারাগারে  
লোকসংগীত শিল্পী মুজিব পরদেশী কারাগারে