লকডাউন

সাইমুম সোহরাব
১৪ এপ্রিল ২০২০, ১৪:০০আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ১৪:০০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য

লকডাউন দশ ফিট বাই আট ফিটের একটা সাব-কম্পার্টমেন্টে দুটি ডাবল বাঙ্ক, চারটি আলমিরা, আলমিরাগুলোর ওপরে ঝুলে থাকা হ্যাভারস্যাক, চিৎ হয়ে থাকা কারো বাঁধা বেডিং, ওপেন ইউনিভার্সিটির বই, পিক-ক্যাপ, ব্রেট-ক্যাপ, জকি-ক্যাপ। মেঝের আনাচে কানাচে সারিবদ্ধ চার জোড়া বুট, চার জোড়া কেডস, আট জোড়া স্যু, ন্যাপকিন, টাওয়েল, সকস্, আন্ডারওয়্যার, খালি আচারের বয়াম, শুকনো খেঁজুরের বয়াম, ন্যাপথালিনের গন্ধ, মোবাইল চার্জার, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, কারো কারো বেহেশতি জিউর, নূরানি নামাজ শিক্ষা, কারো কারো সহজ ইংরেজি শিক্ষার বই, এক পাশে একটা ডেস্কটপ, একটা চেয়ার, একটা এয়ারকন্ড হ্যান্ডলার সারাক্ষণ ঠান্ডা শিস দিয়ে যাচ্ছে, দুইটা পোর্টেবল ছোট ফ্যান দুই পাশে বাল্কহেডের সাথে সেঁটে সারাদিন বিরামহীন পনপন করে ঘুরে যাচ্ছে। স্টাবোর্ড সাইডে একটা মাত্র পোর্টহোল যেটা তাকবিরের দখলে। তাকবির উপরের বাঙ্কে পোর্টহোলের কাছে শোয়। অফিস আওয়ারের বাইরে সারাক্ষণ সে ওখানেই এপাশ-ওপাশ করে।


মাথার হাত দেড়েক ওপরে রাজ্যের পাইপ, ইলেকট্রিক ওয়্যার প্রাণীর কংকালের নিপুণ সামঞ্জস্যতায় এদিক-ওদিক চলে গেছে। ইঁদুর আর মানুষের এমন সহাবস্থান জাহাজ বাদে আর কোথাও চোখে পড়ে না। ঐ পাইপ লাইনগুলোই ওদের গতায়তের নির্বীর্য, কাপুরুষোচিত, চোরবৎ লুকিয়ে চলার সহজ পথ। ধরতে, মারতে গেলে পাইপের আড়াল ওদের নির্ভেজাল, নিরঙ্কুশ আশ্রয় দেয়। একটা মাত্র হ্যাচওয়ে দিয়ে বিশেষ কায়দায় ৪০/৪৫ জন মানুষের ওঠানামা। বিশেষ স্কাপের জন্য একটা স্ক্যাপহোল আছে। অগ্নি নির্বাপণের এক্সটিংগুইসারগুলো নির্দিষ্ট ক্র্যাডেলগুলোতে কোমরে দড়ি বেঁধে দেয়ালের সাথে সেঁটে আছে।
তাকবির বিয়ে করতে গেলে তার দাদা শ্বশুর বলেছিল, ‘বছরে মাত্র দুই মাস ছুটি তোমার! বাকি দশমাস আমি বুড়া মানুষ তোমার বউ ক্যামনে পালুম? অহনও সময় আছে ভাইব্বা দ্যাখো তাকবির’। শুনে তাকবির হেসেছিল শুধু।
রানু একটা স্কুলে পড়ায়। তাকবিরের বেশিরভাগ সময়ই রানুর সাথে খুনসুটিতে কাটে মোবাইলে। বিয়ের পাঁচবছর পরও তাদের সন্তান হচ্ছে না বলে, রানু এসব নিয়ে না ভাবলেও তাকবির আর তার মা বাবার চিন্তার হিসাব-পত্তর ছিল না।

—ডাক্তারের কাছে গেছিলা?
—তা যাইবা ক্যান?
—তুমি একটা আস্ত গাধা।
হি হি হি হি....
—মেয়েরা গাধা না ঠিকাছে, কথার প্যাঁচ তো সব ঠিকঠাক ধরতে জানো তাইলে কথা শুনো না ক্যা?
আবার খিলখিল শব্দ।

অস্পষ্ট একপক্ষের একতরফা এসব কথা নিচের বাঙ্কে নিঃশ্চুপে শুয়ে থেকে শুনে যায় রঞ্জু। রঞ্জুর আজ ডিউটি তার ডিউটি না থাকলে সে বাসায় থাকে। সপ্তায় একবার তার ডিউটি করতে হয়। ডিউটির দিন সে একটা করে বই নিয়ে আসে, সময় পেলেই চোখের সামনে মেলে ধরে।
‘সাগরের তীর হতে কে যে দূর থেকে আমারে ডেকে ডেকে যায়, আয় আয় আয়..... পারি না তবুও যেতে শেকল বাঁধা এই দুটি পায়...!’
পুনরায় এই গানটি তাকবিরের কণ্ঠে মোবাইলে কান ঠেকিয়ে গাওয়া শুনে রঞ্জু অনুমান করে, তাকবির হয়তো তার স্ত্রীকে গান শুনাচ্ছে।
প্রায়ই এরকম করে ও। আর তো কোনো আড়াল, আবডাল নেই। এছাড়া কথা বলার আর ভালো জায়গাই বা কোথায় এই অয়োময় সীমিত দীর্ঘ প্রস্থের বাউন্ডারিতে।

—নিয়মিত চেক আপ করাবা, ঠিকমতো খাবার দাবার খাবা, নামাজ পড়বা, সবুজ গাছের দিকে তাকায়া থাকবা, ভাল চিন্তা-ভাবনা করবা ঠিকাছে?
—হ, আমি আরও দশটা বিয়া করছিলাম সেই বউদের কাছে এইগুলা শিখছি! পেত্নী কুনহানকার!
—আসব, কাল পরশুই ছুটি হবে আশা করছি।
—না কিনিনি, ওগুলা আমাগো বাজারেও পাওয়া যায়।
—আর কিছু লাগব তোমার?
—পাগলিরে, আমি তো অর্ধেক সরকারের আর অর্ধেক তোমার।
—এইটাই তোমার আমার নিয়তি। অর্ধেকও পাওনা হেই কষ্ট তো তোমার আমার সমান সমান।

রঞ্জুর বই পড়া হয় না। সে ভাবে প্রত্যেকের জীবনের একসুর, একলয়, একতাল, মানুষের মৌলিক ব্যবধান খুব সামান্যই। এমন একটা জীবন সে পার করে এসেছে। তার মনে পড়ে, যখন তার প্রথম সন্তান জন্মায় সে তখন সুন্দরবনের হিরনপয়েন্ট কন্টিনজেন্টে। এখনকার মতো এমন আচম্বিতের সুবিধার সহজ কথা বলার মোবাইল ছিল না। পনেরোদিন কিংবা একমাসও লেগে যেতো একটা চিঠি পেতে। তবে সেই পাওয়া ছিল অনেক আন্তরিক আর গভীর মমতার! বিজ্ঞানের বেগ সত্যিই আবেগকে নিদারুণ পর্যুদস্ত করেছে।
হিরণপয়েন্ট একমাস আবার কখনো কখনো দেড় দুইমাসও থাকতে হতো। ওখান থেকে এসে বেশিরভাগ সময়ই এতদিনের জমানো চিঠিগুলো ঠিকমতো পেতো না রঞ্জু। বেশিরভাগই মুখখোলা থাকত। কেউ হয়তো অতি উৎসাহী হয়ে সেসব পড়ত। মানুষ তো তাই অমানুষিটুকুও তারই।
তাকবিরের ছুটি হয় না। তাকে খুব বিমর্ষ দেখায়। সবাইকে সবার কষ্ট বুঝানো যায় না আর কষ্টও ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেলে হাহাকার শুধু করে। এত কষ্ট মানুষের যে বাই টার্নে তার সমাধান পেতে পেতে সত্যিকারের আনন্দটুকু মাটিচাপা পড়ে যায়। করোনা ভয়াবহ রূপ নেয়। সব রকমের ছুটি বন্ধ ঘোষনা হয়। সুমনের বাবা মৃত্যু শয্যায়, রাকিবের দাদু এক্সিডেন্ট করেছে তাকে খুব দেখতে চাচ্ছে, আবিরের মা জীবনের শেষ সময়টুকু তার সঙ্গে থাকবে, সে মাকে আনতে যাবে। শাওনদের জমিজমা নিয়ে ঝামেলা, কেস-কাচারি আছে। তাকবির সন্দ্বীপ, হাতিয়াতে জরুরি কন্টিনজেন্টে করোনার সচেতনতামূলক ডিউটিতে ডিটেইল হয়। সদ্বীপেই সপ্তাহ খানেকপর সে জানতে পারে সামান্য ঠান্ডা লাগা রানুকে কোনো ডাক্তারই দেখে না, নিদারুণ প্রসব-যন্ত্রণা আর প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে সে বাড়ি ফেরার ভ্যান গাড়িতেই মারা যায়।
তাকবির কে পৃথিবীর কোনো ভাষায়ই শান্ত্বনা দেওয়া যায় না।

//জেডএস//
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি