করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
বাম হাত থেকে কাজলদানিটা নামিয়ে রেখে পুত্রের মাথা পল্লবিত পাঁচ আঙুলে বেষ্টন করে আবার সে ডানহাত এগিয়ে নিয়ে আসে, সেখানে মধ্যমার মাথায় ঘন কাজল লেপটে আছে। আঙুল ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে কপাল কুঁচকে দুচোখের দৃষ্টি একত্রিত করে, তীক্ষ্ণভাবে নিরীক্ষণ করে সঠিক জায়গাটি! আঙুল একটু সরিয়ে নেয় বামে, আরেকটু সরিয়ে নেয় ডানে, আবার সেখান থেকে একচুল পরিমাণ বামে সরায়। কয়েকবার নড়ানড়ি সরাসরি করে এইবার নিজের মধ্যমা বসিয়ে দেয়, আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের শিমুল ডালে বসা লক্ষ্মীপেঁচাটা ডেকে ওঠে ‘কোঁত’! এতক্ষণ ধরে বুকে চেপে রাখা বাতাসটাকে সে তৃপ্তির সঙ্গে মুক্তি দেয়। তার কুঁচকানো কপাল কলাপাতার জমিনের মতো সোজা হয়ে চকচক করে ওঠে, হ্যাঁ এবারে ঠিক হয়েছে। ডান নয়, বাম নয়, ঠিক জায়গামতো হয়েছে। দুপা পিছিয়ে সে আবার তাকায়, ত্যাড়াবাঁকাও না একদম গোল হয়েছে, পুন্নিমার চান্দের মতন গোল। মধ্যমা নিজের মাথার চুলে ঘষতে ঘষতে পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মন অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে, তার কোলে বেটার মতো এক বেটা হইছে। ওর নিজের গায়ের রং মাজা মাজা কিন্তু বেটা হইছে এক্কেরে বাপের মতন, বাপের রংও অতটা গোরা না, বেটার রং যতটা।
ছেলে এবারে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে তার নিজস্ব অ্যা আ দিয়ে, এর মধ্যে কোলের সন্তান সামলে, ছেলের বাবা সামান্য ঝামরে ওঠে—
—কই হইল তোমার? দেও এবার পিরান, প্যান্টটা পিন্দায় দেও, দেরি হইলে ফির আন্ধার হয়া যাইবে এলা।
—না, না, এই টপকরি ঘুরি আইসেন, বেশি রাইত করেন না। রাইতের বেলা কোলার ছইল নিয়া ঘোরাঘুরি ভালো না, বলতে বলতে, একজোড়া হাঁস বিক্রি করে, সেই টাকায় দুদিন আগে আনা লাল টুকটুকে পিরান আর প্যান্টটা পরিয়ে দেয়। ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে এই তরুণী মা তার পুত্রকে সাজাচ্ছে। কপালে এঁকে দিচ্ছে নজরকাটা টিপ। যে টিপ দিলে কারও কুনজর লাগবে না।
কান পাতলে শোনা যায় মায়ের বুকের ধুকপুক! সঙ্গে শোনা যায় সন্তানের জন্য মঙ্গল প্রার্থনা।
বাপ বেটাকে বিদায় দিয়ে সে সাঁঝবাতি জ্বালায়, ঘরদোরে আলো দেখায়, সমস্ত অমঙ্গল যেন দূর হয়ে যায়। চুলার পাশে শুকনো ডাল পাতা জোগাড় করে রাখে। শুকোতে দেয়া কাপড়গুলো তুলে হাতে হাতে ভাঁজ করে ঘরে রাখে। সান্ধ্যকালীন সব কাজ সমাপ্ত করে আবার ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়।
জন্মের পরে এই প্রথম ওদেরর পুত্র বাবার কোলে চড়ে মেলা দেখতে গেছে।
মানসপটে ভেসে ওঠে—নিজ পিতারআঙুল ধরে দেখা শৈশবের বান্নি দেখা—কুঁচি কুঁচিঘেরের জামা, নাগরদোলা, টমটম গাড়ি, কাঁচের চুড়ি, কদমা, বাতাসা, নকুলদানা, মোয়া, খোরমা, সঙ্গে ভয়ার্ত এক স্মৃতি...
বান্নিতে মানুষ আর মানুষ। কিন্তু একসময় সেটা হয়ে যায় আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে, কালো ধোঁয়া অজগরের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠতে থাকে। মানুষ দুভাগ হয়ে যায়। একদিকে একদল আর আরেকদিকে অন্যদল। কেউ কারও কথা শোনেনা, কারও দিকে তাকায়না। কেবল আঘাত হানো, কেবল নির্মম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়। নিধন করো, নিধন করো। ওকে মারো ও শালা ওই মহল্লার। একে মারো এ শালা এই মহল্লার।
ওর হাতে ছিল বাতাসার প্যাকেট, মৌরির ডাল, আর ছিল হাওয়াই মিঠাই। জান হাতে নিয়ে কোনোরকমে ওর বাবা যখন ওকে কোলে নিয়ে মেলার বাইরে আসে তখন হাতে আর কিছু নেই। কেবল আতঙ্ক, আর্তনাদ, কান্না। বৈশাখী মেলার আয়োজন কারা কীভাবে করবে, কার ভূমিকা কী তা নিয়ে বিবাদ।
পুরনো স্মৃতি সরিয়ে আজ সে নিজ সন্তানকে বান্নি দেখতে পাঠিয়ে, ওদের জন্য অপেক্ষা করে, প্রার্থনা করে। তবে, ওর মনে জ্বলজ্বল করে পুত্রের কপালে নজরকাটা টিপ...








