করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
একমাস হতে চলল ঘরবন্দি। কাজ-কাম নেই। পৃথিবীজুড়ে এক অস্থিরতা বিরাজমান। কোথাও কোনো আশার বাণী নেই। একটি দুর্যোগ যেন পুরোপুরিভাবে পৃথিবীকে জানান দিচ্ছে তোমাদের শক্তি বেশ নড়বড়ে।
মন ভালো নেই। এই সময় কিছুটা স্বস্তি মিলে মায়ের সঙ্গে কথা বললেই। ইদানিং মাকে নিয়ে অজানা আশঙ্কা ভর করে আছে মন-মগজে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মায়ের শরীর। বাবাও নেই। জীবনের প্রয়োজনে বাকি সন্তানরাও বাইরে। রোগা শরীর নিয়ে নিত্য প্রয়োজনে মাকে বের হতে হয়। যেতে হয় হাটবাজার।
মায়ের সঙ্গে কথা বলে ফোনটা রাখলাম। আমি কী খাচ্ছি, কী করছি, কী অবস্থা তার উত্তর দিতে দিতেই ফোনটা রাখতে হলো। আমাকে কিছু বলতে দেয় না। বলে আমি ভালো আছি!
জীবন অক্ষমতা মানে না, প্রয়োজনকে বারবার সামনে আনে। প্রয়োজনে অক্ষমতা দুশ্চিন্তাকে টেনে আনে। দিশেহারা এই পথ কতখানে ঠাঁই খোঁজে! এসব ভাবতে ফোনটা বেজে উঠল। টিং টিং টিং।
ছোট্টবেলার বন্ধু আবির। এখন আমিরাতে থাকে।
আবির—হ্যালো! কেমন আছিস?
আমি—ভালো, তুই?
আবির—বলিসনে! আর ভালো থাকা! তুই তো জানিস। এখনও বছর হয়নি অনেক কষ্টে ঋণ নিয়ে ভিসাটা লাগাইলাম৷ একমাস হলো দুই পয়সাও ইনকাম নেই। মায়ের ওষুধের টাকা দিতে পারিনি৷ খুব টেনশনে আছি।
আমি—একটু ধৈর্য ধর।
আবির—দেখ বন্ধু একটা ভাইরাস আর তার সঙ্গে লড়াইয়ে পারছে না কোটি কোটি মানুষ। বিজ্ঞান, জ্ঞান, রথি-মহারথিদের নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে। স্বপ্নের কথা বাদ, মানুষ যে খাবে সেই খাওয়াও নেই। অর্থনীতি! অর্থনীতির নাকি বেহাল দশা। আচ্ছা পৃথিবীজুড়ে যে কোটি কোটি টাকার মিসাইল/অস্ত্র-টস্ত্র এগুলো খাওয়া যাবে? মানুষ কী খাবে? এগুলো টাকা দেবে না? বল-না দোস্ত, প্লিজ মাকে ওষুধের টাকা কোত্থেকে দেবো? দুঃসাহস করে বাইরেও যেতে পারছি না। মনে হয় করোনায় মরব না। মরব না খেয়ে। আর করোনা নাকি এমন, বিদ্যুতের তার যেমন।
আমি—আচ্ছা ঠিক আছে এখন রাখিরে, পরে কথা হবে। এত চিন্তা নিসনা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
চোখের কোণে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আসমানি ফয়সালা ছাড়া দুইবিন্দু ভরসা কোথাও নেই যেন।
শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক সকল দুর্ভিক্ষ যেন ধেয়ে আসছে মানবসভ্যতায়। রাজনীতি, বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, শক্তিনীতি, মাতব্বরি এসবের কিছুই এখন সমানে নেই। ধর্ম বড় নাকি বিজ্ঞান! কোনো ধরনের বাটপারি ব্যবসাও নেই। আছে কেবল একটা আতঙ্ক!
এসব ভাবতে ভাবতে মেজাজটা ক্ষ্যাপাটে হয়ে গেল। মানুষ মরছে অথচ স্বজনের কোনো সহানুভূতি দেখানোর রাস্তা নেই। পৃথিবী যেন একটা লাশ। একটা লাশের ভয়ে এতদিনের যত্নে গড়া পৃথিবী একদম পালিয়ে যাচ্ছে। আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, প্রেম, স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন দেখানো আজ সব মিথ্যে। আজ সত্য কেবল একটা রোগ, আজ সত্য কেবল লাশ। আজ সত্য কেবল একাকিত্ব। আজ সত্য কেবল তুমি রুগ্ন।
আজ কিছুই সত্য নেই। জুলেখার সঙ্গে দুরন্তপনার সেই কৈশোরের ভালোবাসাও আজ সত্য নয়। নদী, খাল-বিল, গাছ-গাছালিতে, মাঠে, ধানক্ষেতের আঁকাবাঁকা আইলে, ধুলোবালি মাখানো দুজনের সেই ভালোবাসা আজ মিথ্যে। দুজনের একসঙ্গে পথচলার প্রতিশ্রুতি আজ মিথ্যে। আজ কেবল সত্য ‘পার্সোনাল ডিস্টেন্স’ মেনে চলা।
প্রণয়ের গান আজ মিথ্যে। আজ কবিতার আসর মিথ্যে। পূর্ণিমা রাত্রিরে তোমার হাত ধরাও পাপ হবে। আমার ক্রান্তিলগ্নে দুমুঠো ভাত তুলে দেবে তাও মিথ্যে। তোমার মন মাঝারে জমানো আমার জন্য ভালোবাসা তা আমায় দেবে! সব মিথ্যে।
সব মিথ্যে, আজ সত্যি কেবল ‘পার্সোনাল ডিস্টেন্স’।








