আর্জেন্টিনার গল্প

ব্রহ্মাণ্ডের বার্কলি অথবা একজন মারিয়ানা

লিলিয়ানা হেকার, অনুবাদ : সারফুদ্দিন আহমেদ
২৫ জুলাই ২০২০, ১৩:০২ আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২০, ১৩:০৬

লিলিয়ানা হেকার আর্জেন্টিনার লেখক। লেখেন স্প্যানিশেই। গল্পের পাশাপাশি উপন্যাসও লিখেছেন। জাদুবাস্তবতার ফর্মে লেখা এই গল্পটি স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন আলবার্তো মানহুয়েল। গল্পটি ‘শর্ট স্টোরিজ বাই ল্যাটিন আমেরিকান উওমেন: দ্য ম্যাজিক অ্যান্ড দ্য রিয়েল’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। ব্রহ্মাণ্ডের বার্কলি অথবা একজন মারিয়ানা

'মা বাসায় ফিরতে আর কতক্ষণ লাগবে রে?—এই নিয়ে চারবার মারিয়ানা প্রশ্নটা করল। প্রথমবার সে যখন প্রশ্নটা করেছিল তখন তার বড় বোন লুসিয়া বলেছিল তাদের মা শিগগিরই আসবে। দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা করার পর সে জবাবে বলেছিল, মা কখন ফিরবে তা সে বলবে কী করে? তৃতীয়বার প্রশ্ন করার পর লুসিয়া কোনো জবাব দেয়নি। সে একবার শুধু মারিয়ানার চোখের দিকে চেয়ে অর্থহীনভাবে ভুঁরু নাচিয়েছে আর ঠোঁট উল্টিয়েছে। লুসিয়ার ভাবভঙ্গি দেখে মারিয়ানা টের পেয়েছে, লুসিয়ার ভাবগতিক সুবিধের না, আর প্রশ্ন না করাই বরং ভালো হবে।

মারিয়ানা মনে মনে বলছিল, 'আমার পাশে যখন লুসিয়া রয়েছে তখন মা আসার জন্য এত উতলা হচ্ছি কেন?' পরক্ষণেই সে মনে মনে কথাটা শুধরে নিয়ে মনে মনেই বলল, 'আমার পাশে যখন আমার বড় বোন রয়েছে তখন কেন আমি এত উতলা হচ্ছি।' সে এবার নিঃশব্দে কবিতা আবৃত্তির মতো করে বিড় বিড় করে বলল, 'বড় বোনেরা ছোট বোনদের পেলেপুষে বড় করে, যার বড় বোন আছে তার কত বড় ভাগ্য!'

মারিয়ানা কল্পনায় দেখল, লুসিয়া পরম মমতায় অভিভাবকের পৃষ্ঠপোষকতাসুলভ ভঙ্গিমায় আদর করে তার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। কিন্তু সেই সেই মমতা মেশানো হাত সেকেন্ডের মধ্যেই মারিয়ানার কল্পনায় অন্য কারো হাত হয়ে দেখা দিল। এই দুই বোনের মা তাদের বাসায় 'একা' ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই মারিয়ানার কল্পনায় এমনটা হচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ মারিয়ানা কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে লুসিয়া ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে, তার চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, চুলগুলো সাপের মতো কোকড়ানো। কখনো দেখছে লুসিয়া একটা বন্দুক তার দিকে তাক করে আছে। মাঝে মাঝে কল্পনার সেই রুদ্রমূর্তির লুসিয়ার হাতে বন্দুক থাকে না। মারিয়ানার কল্পনার লুসিয়া মাঝে মাঝে হাউ হাউ করে এগিয়ে আসে। মারিয়ানার চোখের ভেতর নখ ঢুকিয়ে মনি দুটো উপড়ে ফেলতে চায়। কখনো ঘাড় মটকাতে চায়। সব সময়ই একই কারণ কাজ করে। কারণ মনে হয় লুসিয়া পাগল হয়ে গেছে।

সবাই জানে কেউ পাগল হয়ে গেলে সে ভালো মানুষের ওপর চড়াও হয়। মেরে ফেলে। সেই হিসেবে লুসিয়া যদি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সেও মারিয়ানাকে নিশ্চিতভাবে মেরে ফেলবে। সেই ভয়টা যখন মারিয়ানাকে হঠাৎ জেঁকে ধরল তখন সে ভয়ের চোটে লুসিয়াকে চতুর্থবারের মতো বলল, 'মা বাড়ি ফিরতে আর কতক্ষণ লাগবে রে?'

লুসিয়া একটা বই পড়ছিল। চতুর্থবার একই প্রশ্ন শুনে এবার সে পড়া থামাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

সে মারিয়ানার মুখের দিকে চেয়ে বলল, 'এখন আমি তোর কাছে যেটা জানতে চাই...'

মারিয়ানার মনে হলো লুসিয়া কঠোর কর্তৃত্ববাদীর মতো বলেছে, 'আমি জানতে চাই...' অথবা, 'আমি এক্ষুণি জানতে চাই...' অথবা 'আমাকে জানতেই হবে...'।

লুসিয়া তার অসম্পূর্ণ বাক্যটা শেষ করে বলল, '...সেটা হলো খোদার দোহাই তুই আমাকে বলতে পারিস কেন সব সময় তোর পাশে মাকে দরকার হয়?'

'না...' বলেই মারিয়ানা ভাবল, “এখনই লুসিয়া আমাকে ধমক দিয়ে বলবে 'কী—'না'? 'না' মানে কী?' আসলে লুসিয়া আমাকে ধমকের ওপর রাখতে চায়। মুরুব্বিগিরি ফলাতে চায়। কথার মধ্যে বা হাত ঢোকায়।”

কিন্তু লুসিয়া সে রকম কিছু বলল না। মারিয়া বলল, 'না, মানে আমি এমনিতেই বলছিলাম, মা আসতে কতক্ষণ লাগবে।'

'মা বারোটায় ফিরবে'—লুসিয়া বলল।

'বারোটা মানে! হোয়াট ডু ইউ মিন বারোটা' মারিয়ানা প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'এখন তো মাত্র নয়টা বাজতে দশ মিনিট বাকি!'

লুসিয়া বলল, 'বারোটা মানে বারোটা, ছয় আর ছয় যোগ করলে যে বারোটা হয়, সেই বারোটা।'

এবার বড়বোনের বলার ধরণ দেখে মারিয়ানা অট্টহাসি বলতে যা বোঝায় সেই হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে মনে হলো তার দম বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড় হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি, তখন তার মনে হচ্ছিল এই দুনিয়ায় তার বোনের মতো

মজার মানুষ আর দ্বিতীয়টি নেই। সে মনে মনে বলল, 'আমার বোনটা পৃথিবীর সবচেয়ে মজার মানুষ, সবচেয়ে ভালো মেয়ে, সে কেন পাগল হতে যাবে? আমার বোনের মতো ভালো মেয়ে কখনো পাগল হতে পারে না।'

মারিয়ানা আল্লাদি গলায় বলল, 'লু, চল আপু, আমরা কিছু একটা খেলি। চল খেলি, কেমন?'

—উঁহু, আমি পড়ছি

—পড়ছিস? কী পড়ছিস?

—'মিডিওকার ম্যান'

—'আহ্!‌', বলেই মারিয়ানা মনে মনে বলল, 'আমি বাজি ধরে বলতে পারি, লুসিয়া এখন আমাকে

বলবে ' মিডিওকার ম্যান কথাটার মানে কী বল তো?', আমি যেই বলব, 'আমি জানি না',

ওমনি সে মিডিওকার ম্যানের অর্থ আমাকে বোঝাবে আর বলবে, 'তুই তো শব্দটার মানেই জানিস না, তাহলে আহ! বলে অমন

আদিখ্যেতা করলি কেন? ইডিয়ট কোথাকার!'

এরপরই দ্রুত মারিয়ানা বলল, 'লু, আমি মিডিওকার ম্যানের

মানেটা ধরতে পারলাম না। এর মানেটা কী রে?'

—'মিডিওকার ম্যান' মানে সোজা কথায় দালাল, মানে যার জীবনে কোনো নিজস্ব আদর্শ বলে কিছু নেই।

'ও আচ্ছা!' বলেই মারিয়ানা ভাবল, তাহলে তো সে মিডিওকার ম্যান নয়, কারণ তার নিজস্ব আদর্শ আছে। সে সব সময় মনে করে সে বড় হচ্ছে, নিজেই সে নিজের অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলছে, লোকজন

তার কথা বুঝতে পারছে, পৃথিবীকে দিনকে দিন তার অপূর্ব সুন্দর একটি জায়গা বলে মনে হচ্ছে।

সে বলল, 'লু, আমরা, মানে আমি আর তুই মনে হয় মিডিওকার ম্যান না। তোর কী মনে হয়? আমরা মিডিওকার ম্যান?'

লুসিয়া বইয়ে মুখ রেখে বলল, 'তুই হচ্ছিস একটা পোকা। পোকা বুঝিস? কীট। কীট বুঝিস?'

—লুসিয়া, তুই সব সময় সবাইকে খোঁচা মেরে কেন কথা বলিস, অ্যাঁ?

—শোন মারিয়ানা, তুই কি আমাকে একটু শান্তিতে পড়তে দিবি?

—তুই সবার জন্য একটা উৎপাতের মতো। এটা কিন্তু সাংঘাতিক লুসিয়া। তুই মায়ের সাথে ঝগড়া বাঁধাস, তুই বাবাকেও রেহাই দিস না। সবার সাথে, একদম সবার সাথে তুই এ রকম করিস।

মারিয়ানার কান্না পাচ্ছিল। সে বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো ছেড়ে বলল, 'তুই বাবা মাকে প্যাড়া দেওয়া ছাড়া আর কী করেছিস?'

—মারিয়ানা, তুই তো সাংঘাতিক জ্বালাচ্ছিস! তুই সর এখান থেকে, মর গে যা!

—তুই একটা ভয়ানক মেয়ে। খবরদার তুই কখখনো কাউকে 'যা মর গে' বলবি না। জানি দুশমনকেও না, আর নিজের বোনকে তো নয়ই।

—হ্যাঁ, এবার নাকি কান্না শুরু করো, আর পরে তারা এসে আমাকে গালিগালাজ শুরু করুক আর বলতে থাকুক যে আমিই তোমাকে মারপিট করি।

—পরে মানে? কখন? তুই কি জানিস ঠিক কখন মা আসবে?

—পরে মানে জাস্ট পরে

লুসিয়া আবার 'মিডিওকার ম্যান'–য়ে চোখ দিল। পরক্ষণেই আবার মারিয়ানার দিকে চোখ ফেরাল যেন সে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা বলতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিল, আবার তা মনে পড়েছে। সে বলল, 'পরে বলতে আমি ভবিষ্যতকে বুঝিয়েছি।'

—ভবিষ্যত মানে কী? তুই কি বলছিস যে মা খুব শিগগিরই ফিরে আসছে?

লুসিয়া হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। বইতে মুখ রেখে বলল, 'হ্যাঁ, অবশ্যই মা তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে।'

—না, না, তুই ঠিক করে বল, মা কি খুব তাড়াতাড়ি আসছে, নাকি তাড়াতাড়ি আসছে না, কোনটা ঠিক?

লুসিয়া মারিয়ানার দিকে চেয়ে শুকনো হাসি হাসল। মনে হলো সে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করছে। দুই কাঁধ উচু করে সে শ্রাগ করল। বলল, 'এনিওয়ে, বাদ দে, হোয়াট ডাজ ইট ম্যাটার?'

—হোয়াট ডাজ ইট ম্যাটার মানে! হোয়াট ডাজ ইট ম্যটার বলতে তুই কী বোঝাচ্ছিস? তুই কী বলছিস তা তুই বুঝতে পারছিস না? কেউ যদি তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরে বলা হয় তাহলে সে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছেই বোঝায়। তাই না?'

লুসিয়া বলল, 'হুঁ, সত্যিই যদি কেউ ফেরে তাহলে জবাব হচ্ছে, 'হ্যাঁ'

—তার মানে?

—তার মানে যদি সত্যি সত্যিই কেউ ফেরে তাহলেই বলা যায় যে সে সে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছে।

এখন তুই কি আমাকে একটু পড়তে দিবি?

—লুসি, তুই আসলেই একটা গরু। মা আর বাসায় ফিরে আসুক তা আসলে তুই মন থেকে চাস না।

লুসিয়া এবার বইটা বন্ধ করে বিছানার এক পাশে রাখল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে বলল, 'আমারা চাওয়া না চাওয়ায় কিছু যায় আসে না।' সে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলল, 'আমি বলতে চাইছি মা এখানে থাকা আর সেখানে থাকা জাস্ট ডাজ নট ম্যাটার।'

—'সেখানে' বলতে তুই আসলে কোন জায়গার কথা বোঝাচ্ছিস?

—'সেখানে' বলতে আমি যে কোনো জায়গার কথা বোঝাচ্ছি। সবখানের কথা বলছি। সব জায়গাই আসলে এক জায়গা। একই রকম।

—কেন একই রকম?

লুসিয়ানা এবার দুই হাতের তালুতে নিজের চিবুক ভর করে মারিয়ানার দিকে চাইল। সে শান্ত গলায় মারিয়ানাকে বলল, 'শোন মারিয়ানা, তোকে আমার যে কথাটা ভালো করে জানানো দরকার সেটি হলো, আসলে আমাদের মা নেই।'

মারিয়ানা চেঁচিয়ে বলল, 'ডোন্ট বি স্টুপিড, ওকে!' সে পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে কণ্ঠ নিচু করে বলল, 'তুই ভালো করে জানিস, তুই এখন যে ফালতু কথাটা বললি, এ ধরনের কথা বলা মা একদম পছন্দ করে না।'

—এটা মোটেও ফালতু কথা না। এনিওয়ে, যেখানে মায়ের কোনো অস্তিত্বই নেই সেখানে মা কী বলল না-বলল তাতে কী আসে যায়।

—লু, আমি তোকে শেষ বারের মতো বলে দিচ্ছি, আমি এসব ফা–ল–তু কথা একদম পছন্দ করি না, ওকে?'

—দ্যাখ, মারিয়ানা, আমি মোটেও ফালতু প্যাচাল পাড়ছি না। আমি নিজের কোনো কথাই বলছি না। আমি যা বলছি তা একটি থিউরি। এটা এই বই থেকে বলছি।

—এটা, মানে তোর এই বইটা কী বলছে?

—এই এখন আমি যেটা বলছি সেটাই বলছে। এই থিউরি অনুযায়ী কিছুরই আসলে অস্তিত্ব নেই। এই জগৎ সংসার সবই আসলে আমাদের কল্পনা।

—জগতের কোন জিনিসটা আমাদের কল্পনা?

—সবই। সব কিছু।

—লুসিয়া, তুই আসলে আমাকে ভয় দেখাতে চাচ্ছিস। আমাকে ধন্দে ফেলতে চাচ্ছিস। এই ধরনের কথা কোনো বইয়ে থাকার কথা না। তোর এই বই বাস্তব জগত সম্পর্কে কী বলে?

—শোন, তোকে আমি এই কথা হাজার বার বলেছি। আবারও বলছি শোন। তোর সামনে এই যে একটা ডেস্ক দেখছিস, সেটা আসলে ডেস্ক না। তুই জাস্ট ইমাজিন করছিস যে, এখানে একটা ডেস্ক আছে। বুঝলি কিছু? তুই আসলে ঠিক এই মুহূর্তে কল্পনা করছিস, তুই একটা রুমে একটা বিছানার ওপর বসে আমার সঙ্গে কথা বলছিস, আর দূরে অন্য কোথাও মা আছে। এ কারণেই তুই চাচ্ছিস মা চলে আসুক। কিন্তু সেই জায়গার আদতে কোনো অস্তিত্বই নেই। এর সব কিছুই তোর মাথার মধ্যে। এ সবই মগজের চিন্তার খেলা। এ সবই কল্পনার খেলা।

—আর তুই?

—আমি কী?

মারিয়ানা বলল, এই তুই কি আসল তুই? এই ডেস্কটাকে তুই যেভাবে কল্পনা করতে পারবি আমি তো তা পারব না। আমি যেভাবে কল্পনা করব তুই তো তা পারবি না। পারবি?

—ওরে মারিয়ানা, তুই তো কিছুই বুঝতে পারলি না রে আপু। তুই বরাবরই জটিল কিছু বুঝতে পারিস না। এখনও পারলি না। শোন, এটা এমন নয় যে আমরা দুজনই ডেস্কটাকে ঠিক একই জায়গায় বসানো দেখছি না। আমাদের দুজনই ডেস্কটিকে একই জায়গায় দেখছি—এটিও আসলে তোর মনেরই কল্পনা।

—'না। না না না। তুই পুরোটা ভুল জেনেছিস।' মারিয়ানা বলল। সে ব্যাখ্যা করার মতো করে বলল, 'আমাদের প্রত্যেকেই নিজের মতো করে চিন্তা করে এবং একজন যা চিন্তা করে, অন্যজন তা বুঝতে পারে না। ধরা যাক আমি তোকে বললাম, 'এই ঘরে কয়টি ছবি টাঙানো আছে?' আমার কল্পনা ও চিন্তা বলছে এই ঘরে তিনটি ছবি আছে। ঠিক একই সময় তুই বললি এই ঘরে তিনটি ছবি আছে। তার মানে আসলেই এই ঘরে সত্যি সত্যি তিনটি ছবি আছে। এটি আমাদের দুজনের কল্পনার বিষয় নয়। কারণ একই মূহুর্তে একই কথা কল্পনা করা দুজনের পক্ষে সম্ভব নয়।'

—দুজন পারে না। এটা ঠিক। মাথায় রাখতে হবে 'দুজন'। লুসিয়া বলল।

—হোয়াট ডু ইউ মিন? মারিয়ানা জিজ্ঞেস করল।

—আমি বলতে চাইছি দুজন একসঙ্গে একই জিনিস কল্পনা করতে পারে না।

—তোর কথা আমি আগা মাথা কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

—মারিয়ানা, আমি আসলে বলতে চাইছি, তুই আমাকেও আসলে কল্পনাই করছিস। আমি আসলে বাস্তবের

কেউ নই।

—তুই মিথ্যুক, তুই মিথ্যে বলছিস, তুই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মিথ্যুক। আই হেইট ইউ লুসিয়া। তুই আমাকে দেখতে পাচ্ছিস না? আমি যদি তোকে শুধু কল্পনাই করে থাকি তাহলে আমি যে তোকে কল্পনা করছি তা তুই কল্পনা করলি কীভাবে?

—আমি জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি তোরই কল্পনার সৃষ্টি। তুই তোর কল্পনা দিয়ে একটা মেয়েকে বানিয়েছিস, তার নাম দিয়েছিস লুসিয়া, তাঁকে কল্পনায় বোন মনে করেছিস এবং কল্পনা দিয়ে তুই যাকে লুসিয়া বানিয়েছিস সে জানে যে সে তোরই কল্পনার সৃষ্টি। দ্যাটস অল।

—না, কাম অন লু, সোজা কথায় স্বীকার কর তুই যা বললি তা সত্যি না। বইটাতে আর কী কী আছে?

—কোন বই?

—যে বইতে এইসব উদ্ভট কথাবার্তা লেখা আছে।

—এইসব কথাবার্তা মানে কোন সব কথা?

—এই যে কোনো কিছু আসলে নেই, সবই কল্পনা— এইসব কথা।

—আরে, বই বলেও তো কিছু নেই। ওই বইও তো তোর নিজের কল্পনার সৃষ্টি।

—মিথ্যা কথা! ডাহা মিথ্যা কথা! এ রকম বইয়ের কথা আমি জীবনে কল্পনা করিনি। আমি এই বইয়ের বিষয়ে কোনোদিন কিছু শুনিইনি। এ বইয়ে যা লেখা আছে তার কথা আমি জানি না। আমি এ রকম আজব কথা কোনোদিন শুনিনি।

—কিন্তু মারিয়ানা, তুই অন্য যা কিছু কল্পনা করিস এই বই তার বাইরের কিছু না। ইতিহাসের জ্ঞান, কিংবা মাধ্যকর্ষণের সূত্র অথবা গণিত বা অন্য যত ধরনের বিষয় নিয়ে বই লেখা হয়েছে, তা তুই লিখিসনি। অ্যাসপিরিন থেকে টেলিগ্রাফ কিংবা অ্যারোপ্লেন বলতে যা যা আছে তা তুই কিছুই বানাসনি।কিন্তু তোর কল্পনায় তা আছে, যেমনটা এই বইয়ে আছে কিন্তু তুই লিখিসনি।

—না লুসিয়া, না। সবাই এসব বিষয়ে জানে। দ্যাখ, আমি যদি এখন অনেক লোককে এই রুমে ডেকে আনি আর বলি রেডিওটা কোথায়? তাহলে সবাই আঙুল দিয়ে একই দিকে দেখাবে। কেউই তো রেডিওটা বানায়নি। কিন্তু সবাই সেদিকেই আঙুল দিয়ে দেখাবে। এখন আয় আমরা একটা খেলা খেলি। প্লিজ আয়।'

—মারিয়া তুই কী বোকা নাকি অন্য কিছু বলতো? আমি তোকে এত করে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে পৃথিবীর সব মানুষই আসলে তোর কল্পনাজাত চরিত্র। আসলে কেউ নেই। কিছু নেই।

—আমি তোর কথা বিশ্বাস করতে পারছি না।

—তুই আসলে আমাকে জাস্ট ভয় দেখানোর মতলবে এসব বলছিস। আমি দুনিয়ার সব মানুষের কথা কল্পনায় আনতে পারি না। তুই যা বলছিস তাতে দাঁড়ায় মা নেই, বাবাও নেই?

—হুঁ, তারাও নেই।

—তাহলে আমি সম্পূর্ণ একা?

—হ্যাঁ, সম্পূর্ণ একা।

—এটা ডাহা মিথ্যা—ডাহা মিথ্যা! তুই বল, যে সব তুই মিথ্যা বলছিস? তুই শুধু আমাকে ভয় দেওয়ার জন্য এসব বলছিস, ঠিক? আমি শিউর, তুই মিথ্যে বলছিস, কারণ সব কিছুই এখানে আছে। বিছানা–বালিশ, ডেস্ক, চেয়ার—সব আমার চোখের সামনে আছে। আমি এগুলো দেখতে পাচ্ছি, ছুতে পারছি। প্লিজ লুসিয়া, তুই বল এসব যা বললি সব মিথ্যা, সব আসলে আগের মতোই আছে।

—তুই বার বার কেন আমাকে চাপাচাপি করছিস? তুই যখন কল্পনা করবি আমি তোর কথামতো কথা বলছি, তখন ঠিকই দেখবি আমি তোর মতো করে বলছি।

—সব সময়ই যা করার তা কি আমাকেই করতে হবে? মানে আমি ছাড়া আর কেউই কি পৃথিবীতে নেই?

—ঠিক, আর কেউ নেই।

—তাহরে এই যে তুই?

—আমি তো তোকে বললামই আমি আসলে তোর কল্পনার একটা চরিত্র মাত্র। আসলে আমি নেই।

—আমি আর কল্পনা করতে চাই না লু। আমি সত্যিই এখন ভয় পাচ্ছি। আমি আসলেই খুব ভয় পাচ্ছি। মা আসতে আর কতক্ষণ লাগবে?

মারিয়ানা জানালার বাইরে মাথা বের করে দেখল। সে মনে মনে চাচ্ছিল মা তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক। কিন্তু সে হঠাৎ খেয়াল করল সে কার কাছে চাইছে, কেন চাইছে? সে চুখ বুজল, ওমনি পৃথিবী নাই হয়ে গেল। এবার সে চোখ খুলল, পৃথিবী আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সব কিছু এক লহমায় নাই হয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। সব কিছু মানে সব কিছু। সব কিছু। সব কিছু। তার মনে হলো সে যদি এখন তার মায়ের কথা ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তাহলে তার কাছে মা বলে কিছু থাকবে না। যদি সে আকাশের কথা মনে আনতে না পারে, তাহলে আকাশ বলেই কিছু থাকবে না।

কুকুর, মেঘ কিংবা ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। তার একার পক্ষে এত বিষয় নিয়ে ভাবা একেবারে সম্ভব নয়। সে ভাবতে লাগল, সে একা কেন? সে কেন এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একমাত্র একা? এটা মনের মধ্যে ঢুকে যাওয়ায় জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল। আচমকা যেন সে সূর্যের কথা, তার নিজের ঘোড়ার কথা এমনকি লুসিয়ার কথা সে ভুলে গেল। আবার এক ঝলকেই তার মনের মধ্যে লুসিয়া ফিরে এল। কিন্তু এই লুসিয়া শান্তশিষ্ট লুসিয়া নয়, পাগল ও উন্মত্ত এক লুসিয়া তার সামনে যেন হাজির হলো। মনে হলো সেই লুসিয়া তাকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে আসছে। এই কল্পনা যে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তা এখন মারিয়ানা বুঝতে পারছে। কারণ এই কল্পনাটা যদি মারিয়ানা থামাতে না পারে তাহলে লুসিয়া সত্যি সত্যি পাগল হয়ে উঠবে তার সেই উন্মাদ লুসিয়া তাকে খুন করে ফেলবে। আর যদি এই কল্পনাশক্তিটাকে মারিয়ানা থামিয়ে দেয় তাহলে সব নাই হয়ে যাবে। ঘর বাড়ি, গাছ গাছালি, ডেস্ক, খাট, বৃষ্টি–বাজ পড়া সব নাই হয়ে যাবে। রূপ, রস গন্ধ নাই হয়ে যাবে। নাই হয়ে যাবে নীল আকাশ, কালো নিকষ রাত, নাই হয়ে যাবে এই দেশ মহাদেশ। এই ঘরের চড়ুইপাখি থেকে শুরু করে আফ্রিকার সিংহ, হাজার হাজার গান নাই হয়ে যাবে। পুরো পৃথিবী শূন্যে মিলিয়ে যাবে। কেউ জানতেও পারবে না একদিন মারিয়ানা নামের একটা মেয়ে একদিন বিষ্ময়কর জটিল একটা জায়গা আবিষ্কার করেছিল যে জায়াগাটির নাম সে দিয়েছিল ব্রহ্মাণ্ড।

//জেডএস//
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
১০ বছরেও সড়কটি মেরামত হয়নি, হাজারো মানুষের দুর্ভোগ
১০ বছরেও সড়কটি মেরামত হয়নি, হাজারো মানুষের দুর্ভোগ
ইন্দোনেশিয়া-পরীক্ষার আগে হামজা, ‘এটাই আমাদের এখানে আসার মূল কারণ’
ইন্দোনেশিয়া-পরীক্ষার আগে হামজা, ‘এটাই আমাদের এখানে আসার মূল কারণ’
চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশি শিল্প কতটা বড় হচ্ছে?
চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশি শিল্প কতটা বড় হচ্ছে?
প্রথম প্রেমের চিঠি কী করেছিলেন প্রভা
প্রথম প্রেমের চিঠি কী করেছিলেন প্রভা
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আনতে আকাশসীমার অনুমতি কেন দিচ্ছে না, জানালো পাকিস্তান
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আনতে আকাশসীমার অনুমতি কেন দিচ্ছে না, জানালো পাকিস্তান
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
শহীদ আবু সাঈদের ঘর ও কবরস্থান উন্নয়নে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা
শহীদ আবু সাঈদের ঘর ও কবরস্থান উন্নয়নে এক কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা
প্রায় দেড় কোটি রুপি জরিমানা দিয়ে দায়মুক্তি পেলো আদানি গ্রুপ
প্রায় দেড় কোটি রুপি জরিমানা দিয়ে দায়মুক্তি পেলো আদানি গ্রুপ
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী