যাকে যেখানে খুশি সিট দেবো আপনি কে, প্রভোস্টকে কুবি ছাত্রলীগ নেত্রী

কুবি প্রতিনিধি
০৬ মার্চ ২০২৩, ১০:৪২আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ১১:৪২

‘এই হল আমার, আমার কথাতেই চলবে। যাকে যেখানে খুশি সিট বরাদ্দ দেবো। আপনাকে এই হলের দায়িত্ব কে দিয়েছে?’ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট সাহেদুর রহমানকে উদ্দেশ করে এমন মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী ফাইজা মেহজাবিনের বিরুদ্ধে।

শনিবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা হলের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যা সমাধানে কথা বলতে গেলে ফাইজা এমন মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রমতে জানা যায়,  হলের আবাসিক এক শিক্ষার্থী অন্য রুমে শিফট হওয়ার জন্য হল প্রভোস্ট বরাবর আবেদন করলে তাকে ২১৬ নম্বর রুমের একটি সিটে এলটমেন্ট দেওয়া হয়। কিন্তু  রুম পরিবর্তন করতে গিয়ে তার নতুন সিটে অন্য এক শিক্ষার্থীকে অবস্থান করতে দেখেন। ঘটনা সমাধানের জন্য হল প্রভোস্টকে জানান তিনি। প্রভোস্ট সাহেদুর রহমান হলে এসে ওই শিক্ষার্থীকে অবস্থানের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি ফাইজা মেহজাবিনের নাম বলেন। সেই সূত্র ধরে লোক প্রশাসন বিভাগের স্নাতকোত্তরের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফাইজাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ফাইজার এমন আচরণ নতুন কিছু না। তিনি একজন শিক্ষকে এমন কথা বলতে পারেন, তাহলে ভাবুন আমাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করেন। হলে অবস্থানরত সব শিক্ষার্থী তার প্রতি বিরক্ত। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারে না।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা হলের হাউজ টিউটর মো. আল আমিন বলেন, ‘হল প্রভোস্টের সঙ্গে ফাইজার আচরণ শিক্ষার্থীসুলভ নয়।’

এ ব্যাপারে কাজী ফাইজা মেহজাবিন বলেন, ‘স্যারকে এই ধরনের কোনও কথা বলিনি। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম এই হল তো আমারও।’

এ ব্যাপারে হল প্রভোস্ট সাহেদুর রহমান বলেন, ‘হলে কোন শিক্ষার্থী উঠবে আর কোন শিক্ষার্থী উঠবে না, এই এখতিয়ার সম্পূর্ন হল প্রসাশনের। একজন শিক্ষার্থী তো এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হল সংস্কৃতি আমরা তৈরি করতে চাচ্ছি তা শুধু সম্ভব হচ্ছে না ফাইজার জন্য।’

হল শাখা ছাত্রলীগের এই নেত্রীর বিরুদ্ধে এর আগেও নানা অভিযোগ উঠেছে।

গত বছরের ৩১ জুলাই শেখ হাসিনা হল উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের আগে হলে উঠতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ভাইভা নিয়ে সিটে উঠানো হয়। কিন্তু হল উদ্বোধনের পর থেকেই ফাইজা নিজের খেয়াল খুশিমতো সিট বদল করতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বরাদ্ধকৃত সিটে না উঠতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে সেসব সিটে নিজের খেয়ালখুশি মতো শিক্ষার্থী তোলার ঘটনা রয়েছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের হল প্রশাসন সিট দিয়েছে। কিন্তু ফাইজার কথা হচ্ছে সেই সিট বাঁচিয়ে রাখতে গেলে নাকি ছাত্রলীগ করতে হবে। যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না তাদের সিট নিয়ে তিনি বরাবর ঝামেলা করেন।’

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষার্থীকে হল প্রশাসন সিট বরাদ্ধ দেয়নি। কিন্তু ফাইজা  হলে সিঙ্গেল সিট নিয়ে অবস্থানরত অন্যান্য শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছে ১৬ তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই সিটে থাকার জন্য। এছাড়া কোনও শিক্ষার্থী ৫ থেকে ১০দিনের জন্য বাড়ি গেলেই তার সিটে অন্য কাউকে তুলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি চার-পাঁচদিনের জন্য বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আমাকে ফোন দিয়ে ফাইজা বলেন হলে না আসলে নাকি আমার সিট বাতিল করে দেবে। আমার সিট বাতিল করার তিনি কে? পরে হল প্রসাশনের সঙ্গে কথা বলে সিট বহাল রেখেছি।’

হল প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনা হল উদ্বোধনের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও প্রথম আসন বরাদ্দের লিস্টে নাম আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু কাজী ফাইজা মেহজাবিন তার হল ফি ১ হাজার ২৫০ টাকা হল প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেননি। বিষয়টি হল প্রসাশনের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

এ ব্যাপারে হল প্রভোস্ট মো. সাহেদুর রহমান বলেন, ‘সবাই দিলেও ফাইজা হল প্রশাসনকে এই টাকা বুঝিয়ে দেননি। আমি বেশ কয়েকবার বলেছি কিন্তু তিনি নানা অজুহাত দেখান। নিয়ম অনুযায়ী তার সিট বাতিল হওয়ার কথা। আমি তার সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলবো। হল প্রশাসনকে টাকা বুঝিয়ে না দিলে আমি তার সিট বাতিল করার প্রক্রিয়ার দিকে আগাবো।’

এ ব্যাপারে ফাইজা বলেন, ‘আমার টাকা কিছু বাকি ছিল। সেটা আমি দিয়ে দিয়েছি। স্যার সম্ভবত এখনও বিষয়টি জানেন না।’

সার্বিক অভিযোগের ব্যাপারে হল প্রভোস্ট মো. সাহেদুর রহমান বলেন, ‘অনেকেই ফাইজার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছি তাদের। এতে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়। কিন্তু মেয়েরা এখানে পড়তে এসেছে। তারা পরে সমস্যার কথা চিন্তা করে আর কোনও অভিযোগ করেনি। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও ব্যবস্থা নিতে পারিনি।’

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন, ‘এখানে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আছে। প্রভোস্ট স্যারও নাকি ছাত্রলীগ সম্পর্কে বাজে কথা বলেছেন। এখানে দুই জনের দুই রকমের বক্তব্য শুনছি। আমরা তদন্ত করে দেখবো। যদি ফাইজা এমন কিছু বলে থাকেন তাহলে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। হল ছাত্রলীগের না, হল প্রশাসনের, তারা চালাবে।’

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন বলেন, ‘হল চালাবে প্রশাসন। শিক্ষার্থীরা এখানে আসবে কেন? আমি বিষয়টি জেনেছি। এ ব্যাপারে আলোচনা করে দেখবো।’

হল ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ রুয়েছে ফাইজার বিরুদ্ধে। বাসে থাপ্পড় মারার ঘটনাও রয়েছে এর মধ্যে। গত বছরের নভেম্বরে বাসে সিট রাখাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দিয়েছিলেন তিনি। পরে সেই শিক্ষার্থীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ছাড় পান।

/আরআর/
সম্পর্কিত
রাজশাহীতে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
মৌলভীবাজারে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, গ্রেফতার ২
ছয় দফা দাবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মৌন মানববন্ধন
সর্বশেষ খবর
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
নতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
শিশু রামিসা হত্যা মামলানতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী