অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতি বাড়াতে আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে শাবি

Send
নাজমুল হুদা, শাবি
প্রকাশিত : ২২:৩৮, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪১, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মোবাইল ডাটা, আর্থিক প্রণোদনা, লজিস্টিক সাপোর্টসহ নানা ধরনের সেবা দিয়ে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে তৎপরতা চালাচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। বিভাগগুলোতে সেমিস্টার ভেদে ৩০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিলেও দুর্বল গতির ইন্টারনেট, ডিভাইসের সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে বাকি শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারছেন না বলে জানা গেছে।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর গত ১৮ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলে আবাসিক হল ও মেস ছেড়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭টি বিভাগের ১৫০ এর অধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গ যোগাযোগ করে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে অনলাইনে নিয়মিত রুটিন মেনে ক্লাস চলছে প্রত্যেক বিভাগে। তবে বিভাগ ভেদে পৃথক পৃথক সেমিস্টারের নিয়মিত ক্লাসে ৩০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন। এর বাইরে ক্লাসে অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীরা কারণ হিসেবে বলেছেন দুর্বল গতির ইন্টারনেট, ডিভাইসের সমস্যা, পারিবারিক কাজ, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি।

অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে সিদ্ধান্ত অনুসারে, গত এপ্রিল মাসের শেষের দিক থেকে অনলাইনে বিশেষ করে জুম অ্যাপে আগের সেমিস্টারের অবশিষ্ট ক্লাসসমূহ শুরু হয়। যা জুলাই মাসের মাঝামাঝি এসে শেষ হয়। এরপর গত ১৯ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিদ্ধান্ত অনুসারে চলমান নতুন সেমিস্টারের ক্লাস অনলাইনে শুরু হয়েছে।

অনলাইনে ক্লাস শুরুর পর থেকে ইন্টারনেট বাবদ আর্থিক খরচ, দূর্বল গতির ইন্টারনেট সংযোগ ও পারিবারিক নানান সমস্যার কথা তুলে ধরে ক্লাস বর্জন করেছিলেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

এরপর অনলাইনে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রেজিস্ট্রার দফতর থেকে জানা যায়, ১ম পর্বে ২২১৬ জন এবং ২য় পর্বে ২২৪৩ শিক্ষার্থীকে ১৫ জিবি করে ডাটা প্রদান, করোনা সংকটকালীন অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের প্রত্যে ককে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান, তরুণ শিক্ষকদের ল্যাপটপ ক্রয়ের জন্য বিনা সুদে ৫০ হাজার টাকা করে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, অনলাইন ক্লাসের লজিস্টিক সামগ্রী সংগ্রহের জন্য শিক্ষক প্রতি ১০ হাজার টাকা প্রদান, অনলাইনে সুষ্ঠভাবে ক্লাস নিতে শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা, মোবাইল ডিভাইস প্রদানের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে অনলাইনে এ ক্লাস পরিচালনা নিয়ে নানান অভিযোগ ও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই গ্রামাঞ্চলের। ছুটিতে তারা গ্রামে অবস্থান করছেন। যেখানে ইন্টারনেটের গতি খুবই কম। ক্লাসে তারা শিক্ষকের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পারে না। এমনকি শিক্ষকদেরকে ক্লাস রেকর্ডিংয়ের কথা বললেও তারা তা ঠিকমতো পাচ্ছে না।

অনেক শিক্ষক আছেন যারা অনলাইনে ক্লাস নিতে অভ্যস্ত না। এসব শিক্ষকেরা ক্লাস রেকর্ডিং করাসহ বিভিন্ন টেকনিক্যাল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক বিভাগে আবার ক্লাস অ্যাটেন্ডেন্স (উপস্থিতি হাজিরা) নেওয়া হচ্ছে। ফলে যারা ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। এর প্রেক্ষিতে অনলাইনে ক্লাস নিয়ে বিপাকে পড়ছেন সেসব শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসের সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আমাদের ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা নিয়মিত আমাদের ক্লাসও নিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রামে থাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তারা উপস্থিত হতে পারছে না। মোট শিক্ষার্থীর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ নিয়মিত উপস্থিত হতে পারছে। কিছু ক্ষেত্রে তা আরো কম। তাছাড়া ক্লাস করতে অপারগ শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ক্লাস লেকচার রেকর্ডিং দেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কিছু ক্লাসের লেকচার রেকর্ডিং নিয়মিত পেলেও অধিকাংশ ক্লাসের রেকর্ডিং নিয়মিত পাচ্ছি না যেটা ক্লাস করতে অপারগ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যার কারণ।’

ল্যাব কোর্স নিয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোজি বিভাগের শিক্ষার্থী রাইহান বলেন, ‘থিওরি ক্লাসগুলো নিয়মিত চলছে অনলাইনে। উপস্থিতি আমার ব্যাচে ভাল। কিন্ত অনলাইনে তো আর ল্যাব কোর্সের ক্লাস চালানো সম্ভব না। এ ক্লাসগুলো শিক্ষকেরা ক্যাম্পাস খুললে হয়তো নিবেন।’

অনলাইন ক্লাস নিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেহেদী হাসান নাহিদ বলেন, ‘ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কোর্স অনুযায়ী ভিন্ন হচ্ছে। দেখা গেছে, ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক ভাল। সেই তুলনায় যারা সিনিয়র তাদের উপস্থিতি একটু কম। তবে আমরা প্রত্যেক ক্লাসের ভিডিও নির্দিষ্ট ইউটিউবে আপলোড দিয়ে দেই। তারা সেখান থেকে ক্লাসের ভিডিও সুবিধামতো দেখে নিতে পারে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখে। যেকোন বিষয়ে তারা ভাল সাড়া দেয়। এমনকি কোনও কাজ দিলে সময়মতো সাবমিট করে দেয়।’

কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত মেনেই অনলাইনে ক্লাস চলছে। নিয়মিত রুটিন অনুসারে আমরা ক্লাস নিয়মিত নিচ্ছি। তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক না। নিয়মিত ৫০ শতাংশের কাছাকাছি শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে অধিকাংশ ক্লাসে। আসলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইন্টারনেট ডাটা দেওয়া হলেও তারা তা ব্যবহার করতে পারছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে প্রত্যেক সেমিস্টারের ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভের সাঙ্গে আমরা কথা বলি। ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা আমাদেরকে জানান। আমরা সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জায়েদা শারমিন বলেন, গত সেমিস্টারের ক্লাস দিয়েই মূলত অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। তবে গত সেমিস্টারের তুলনায় চলতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ভাল। সেমিস্টার ভেদে উপস্থিতি ভিন্ন। মোটামুটি ৫৫ জনের ক্লাসে ৩০ জনের কাছাকাছি উপস্থিত থাকে। শিক্ষার্থীরা কি কারণে উপস্থিত থাকতে পারছে না তার জন্য আমরা খোঁজ নিয়েছি। তাদেরকে ক্লাসে উপস্থিতির জন্য বিভাগের পক্ষ থেকে যোগাযোগ চলছে।

‘ইন্টারনেটজনিত সমস্যা সারা দেশ জুড়ে’ উল্লেখ করে ড. জায়েদা শারমিন বলেন, ‘একটু মফস্বল শহরে যারা থাকে তারা বেশি এ সমস্যাতে আছে। আমি নিজেও ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যায় থাকি। তেমনি ইন্টারনেট ডাটা বিশ্ববিদ্যালয় দিচ্ছে কিন্তু তারপরও শিক্ষার্থীরা এই সংযোগ সমস্যার কারণে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারছে না। এছাড়া কথা শুনতে পারছে না, কানেক্ট হতে পারছে না, বারবার লিভ নিচ্ছে ক্লাস থেকে ইত্যাদি টেকনিক্যাল সমস্যা হচ্ছে।’

অনলাইনে সুষ্ঠভাবে ক্লাস পরিচালনায় ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনিস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার আইডিয়া আসলে সবার কাছে নতুন। এ জন্য কিছু সমস্যা প্রথম দিকে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাশিউরেন্স সেল (আইকিউএসি) এর অধীনে শিক্ষকদের জন্য ‘ট্রেনিং অন অনলাইন টিচিং; মোটিভেশন, প্রব্লেম অ্যান্ড টেকনিক্যাল আসপেক্ট’ শীর্ষক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের জন্য গত ১২ জুলাই ও ২ সেপ্টেম্বর এটুআই প্রকল্পের ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহারের নিমিত্তে প্রত্যেক বিভাগে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে নির্বাচিত ২ জন শিক্ষক মডারেটর হিসেবে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন।

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন সেশনজট না হয় সেজন্য আমরা শুরু থেকে কাজ করে যাচ্ছি। অনেক আগে থেকেই অনলাইনে আমরা ক্লাস শুরু করেছি। যাতে এই সেশনজটে আমাদের না পড়তে হয়। এমনকি রুটিন মেনে সকল বিভাগেই ক্লাস চলছে। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ভাল। ক্লাসে উপস্থিতি নিয়ে উপাচার্য বলেন, আমরা চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজটে না পড়ুক। এজন্য শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আর্থিক সহায়তা, মোবাইল ডাটাসহ লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছি। এ সাপোর্ট চলমান রয়েছে।’

‘ইন্টারনেটের গতি ধীরগতিসম্পন্ন হওয়াই তারা ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারছেন না’ শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ গ্রামে অবস্থান করছে। যেখানে ইন্টারনেটের গতি অনেকাংশে কম। কষ্ট করে হলেও যেখানে ভাল ইন্টারনেট গতি থাকে সেখানে গিয়ে যেন তারা ক্লাসে উপস্থিত থাকে। তারপরও যদি কোন শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত না থাকে সেটার জন্য সে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনবে।’

‘বিশ্ববিদ্যালয় খুললে রিভিউ ক্লাসের ব্যবস্থা থাকবে’ উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘আমরা অনলাইনে ক্লাস শেষ করে এগিয়ে রাখছি। পরে ক্যাম্পাস খুললে বিষয় ভিত্তিক রিভিউ ক্লাসের ব্যবস্থা থাকবে।’ এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ যেমন ক্লাস ভিডিও, বইপত্র, জার্নাল পেপার প্রদান করছে সেগুলো সংগ্রহ করে হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান উপাচার্য।

 

/এফএএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ
X